[…]ষোড়শ সংশোধনী ও বিচারকদের আচরণবিধি […]ষোড়শ সংশোধনী ও বিচারকদের আচরণবিধি

ষোড়শ সংশোধনী ও বিচারকদের আচরণবিধি

ইবার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকম:
আপডেট সময়:আগস্ট ২, ২০১৭ , ২:৫৫ পূর্বাহ্ন
বিভাগ: প্রতিবেদন

ইবার্তা ডেস্ক:  সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধান পুনর্বহালের পাশাপাশি তা কার্যকর করতে উচ্চ আদালতের বিচারকদের জন্য ৩৯ দফার আচরণবিধি চূড়ান্ত করেছে আপিল বিভাগ।

জানা গেছে, বিচারকের বিরুদ্ধে বর্ণিত আচরণ বিধি লঙ্ঘন হলে তা অসদাচরণ বলে গণ্য হবে এবং সুপ্রিম জুডিশিয়াল কমিশনের মাধ্যমে তদন্ত করে তাকে অপসারণের উদ্যোগ নেয়া যাবে।

উল্লেখ্য, পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খান সুপ্রিম জুডিশিয়াল কমিশনের মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণ বিধান করে। স্বাধীনতার পর প্রথম সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ন্যস্ত করা হয়। জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনের সময় ১৯৭৭ সালে সংবিধানে যুক্ত হয় সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের বিধান যা ২০১৪ সালে ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল করে সংসদের হাতে ক্ষমতা আনা হলে আদালতে রিট করা হয়। গত সোমবার প্রকাশিত ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করে আপিল বিভাগ।

আচরণবিধিতে বলা হয়েছে প্রধান বিচারপতি এবং দুজন জ্যেষ্ঠ বিচারককে নিয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠিত হবে। বিচারকদের জন্য পালনীয় একটি আচরণবিধি কাউন্সিল নির্ধারণ করে দেবে এবং কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে সে বিষয়ে তদন্ত করবে।

কাউন্সিল অথবা অন্য কোনো সূত্র থেকে রাষ্ট্রপতি যদি জানতে পারেন যে, কোনো বিচারক শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণে দায়িত্ব পালনের অযোগ্য হয়ে পড়েছেন বা তার বিরুদ্ধে গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগ রয়েছে তাহলে রাষ্ট্রপতি কাউন্সিলকে বিষয়টি তদন্ত করে ফলাফল জানানোর নির্দেশ দিতে পারবেন।

তদন্তে অভিযোগ বা বিচারকের অসমর্থ্যতার প্রমাণ পেলে এবং কাউন্সিল বিষয়টি রাষ্ট্রপতিকে জানালে তিনি ওই বিচারককে অপসারণের আদেশ দেবেন।

 

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, কোনো রকম বিভ্রান্তি বা সংশয় যাতে দেখা না যায় সেজন্য আমরা সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের অধীনে আচরণ বিধিটি সংস্কার করে দেয়া হলো।

আচরণবিধির ৩৯ দফা

১. বিচার বিভাগের সংহত সততা ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য একজন বিচারকের উচ্চতর মান নিয়ে বিচারকাজে অংশগ্রহণ করা উচিত।

২. দেশের সংবিধান ও আইনের প্রতি সম্মান রেখে বিচারকের কাজ করা উচিত যাতে বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা বজায় থাকে।

৩. একজন বিচারকের রায় পারিবারিক, সামাজিক বা অন্যান্য সম্পর্কের দ্বারা প্রভাবিত হতে পারবে না। নিজের বা অন্য কারো ব্যক্তিগত স্বার্থে বিচারকাজ প্রভাবিত করা যাবে না।

৪. আইন অনুযায়ী একজন বিচারকের পেশাদারী যে এখতিয়ার বা ক্ষমতা, তা আইনের প্রতি সম্মান ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে প্রয়োগ করতে হবে। গণদাবি বা সমালোচনার ভয়ে প্রভাবিত হওয়া যাবে না।

৫. প্রত্যেক বিচারককে বিচারকাজ পরিচালনায় ধৈর্যশীল হতে হবে। সম্মান, শ্রদ্ধাবোধ ও পক্ষপাতহীনভাবে আইনজীবী ও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে বিচারকাজ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

৬. ঘোষিত রায় বা আদেশ প্রকাশ করতে অযাচিত বিলম্ব করা উচিত নয়। দ্রুত নিষ্পত্তি করা উচিত। একটি রায় ঘোষণার পর ছয় মাসের বেশি সময় ক্ষেপনের পর স্বাক্ষর করা ঠিক নয়। তার আগেই স্বাক্ষর করতে হবে।

৭. আদালতে মুলতবি বা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকা মামলার মেরিটের ক্ষেত্রে বিচারককে প্রকাশ্যে মন্তব্য এড়াতে হবে।

৮. যে ক্ষেত্রে বিচারকের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সম্ভাবনা থাকে, সেই মামলার বিচারের ক্ষেত্রে বিচারকের নিজে থেকেই সরে যাওয়া উচিত।

৯. কোনো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, কোনো মামলার সঙ্গে আগে সম্পর্ক ছিল বা আগে কোনো মামলায় তিনি আইনজীবী হিসেবে লড়েছেন বা মামলার কোনো পক্ষের সঙ্গে বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল এমন ক্ষেত্রে তিনি ওই মামলার বিচারকাজে নিজেকে অযোগ্য ঘোষণা করবেন।

১০. একজন বিচারক এমন কোনো বিষয়ে শুনানি গ্রহণ করবেন না যেখানে তার স্ত্রী-সন্তান বা আত্মীয়-স্বজনরা কোনোভাবে জড়িত থাকেন। অথবা এমন কোনো ব্যক্তি জড়িত থাকেন যার দ্বারা বিচারক প্রভাবিত হতে পারেন।

১১. বিচার বিভাগীয় ব্যবস্থায় নিরবচ্ছিন্নতা ও বিচার বিভাগীয় কার্যালয়ের শপথ রক্ষার সনদ থাকতে হবে একজন বিচারকের।

১২. বিচার কার্যালয়ের মর্যাদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ আচরণ অনুশীলন করতে হবে বিচারককে।

১৩. একজন বিচারক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিজে বা কোনো সংগঠন বা সমিতির সঙ্গে ব্যবসায় জড়িত থাকতে পারবেন না।

১৪. একজন বিচারককে অবশ্যই সচেতন থাকতে হবে যে তিনি জনগণের নজরদারির মধ্যে আছেন। সুতরাং বিচারকের কার্যালয়ের সম্মানহানি হয় বা জনগণের কাছে অপ্রত্যাশিত- তেমন কোনো কাজ তিনি করবেন না।

১৫. দেশে বা বিদেশে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে কোনো বিচারক জড়িত হতে পারবেন না।

১৬. প্রধান বিচারপতি যদি জানতে চান, একজন বিচারক তার সম্পদের তথ্য তার কাছে প্রকাশ করবেন।

১৭. শুধু বিচার করলেই হবে না, এটা দৃশ্যমান হতে হবে যে একজন বিচারক ন্যায় বিচার করেছেন। বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনগণের যে আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গা, তা তাকে বিবেচনায় রাখতে হবে। এমন কোনো কাজ করা যাবে না, যাতে নিরপেক্ষতার ওই ধারণা পরিবর্তনের কারণ ঘটে।

১৮. আইনজীবী সমিতির কোনো সদস্যের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে এমন কেউ তার আদালতে মামলা পরিচালনা করলে সেটা পক্ষপাতদুষ্ট বলে বিবেচিত হবে।

১৯. একজন বিচারকের স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে, শ্যালক, শ্যালিকা বা ঘনিষ্ট আত্মীয়-স্বজন, যারা আইনজীবী সমিতিতে অনুশীলন করেন, তাদের কাউকে তার আদালতে মামলা পরিচালনার অনুমতি ওই বিচারক দেবেন না।

২০. পরিবারের সদস্য নয়, কিন্তু আইনজীবী সমিতির সদস্য এমন কোনো ব্যক্তিকে কোনো বিচারক তার বাসস্থানে রাখতে পারবেন না বা নিজের সুযোগ সুবিধা ব্যবহার করতে দেবেন না।

২১. একজন বিচারক জনবিতর্কে অংশ নেবেন না। বিচারাধীন কোনো বিষয় বা রাজনৈতিক কোনো বিষয়ে প্রকাশ্যে নিজের মত প্রকাশ বা আলোচনায় তিনি অংশ নেবেন না।

২২. একজন বিচারক রায় দেবেন, নিজেদের মধ্যে কথা বলবেন। কিন্তু কোনোভাবেই গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেবেন না।

২৩. বিচারক যদি কোনো মামলায় সিদ্ধান্ত দিতে অক্ষম হন, তাহলে তিনি ওই মামলা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেবেন।

২৪. একজন বিচারক নিজেই যুক্তিসঙ্গত পর্যবেক্ষণ দ্বারা নির্ধারণ করবেন যে তার আচরণ বা তিনি যা করছেন তা সঠিক কিনা।

২৫. একজন বিচারককে তার আচরণ ও কাজ দিয়ে বিচার বিভাগের মর্যাদা ও জনগণের বিশ্বাস অর্জন করতে হবে।

২৬. অসদাচরণ ও অযৌক্তিক কর্মকাণ্ড থেকে একজন বিচারক সব সময় বিরত থাকবেন।

২৭. ন্যায়বিচারের স্বার্থে একজন বিচারককে ব্যক্তিগত চলাফেরা বা সামাজিক মেলামেশা সীমিত রাখার নীতি গ্রহণ করতে হবে।

২৮. জজ আদালতে অনুশীলন (মামলা পরিচালনা করেন) করেন এমন কোনো নিকটাত্মীয়কে বিচারকের এড়িয়ে চলা উচিৎ, যেন কোনো প্রকার পক্ষপাতিত্বের সন্দেহ কেউ করতে না পারে।

২৯. বিচারকের পরিবারের কোনো সদস্য যদি কোনো মামলার কোনো পক্ষের প্রতিনিধিত্ব করেন, তাহলে ওই বিষয়ে বিচারক অংশ নিতে পারবেন না।

৩০. আইন পেশায় জড়িত রয়েছেন এবং মক্কেলকে আইনি সহযোগিতা দেন- এমন কোনো ব্যক্তিকে বিচারক তার বাসস্থানে স্থান দেবেন না।

৩১. একজন বিচারক তার পরিবারের কোনো সদস্যকে এমন কোনো সামাজিক বা অন্য কোনো সম্পর্কে জড়াতে দেবেন না, যা তার আদালতের কোনো বিষয়কে প্রভাবিত করতে পারে।

৩২. একজন বিচারক কারো সম্পদ ব্যবহার করতে পারবেন না বা কারো কাছ থেকে ঋণ নিতে পারবেন না, যে ব্যক্তির দ্বারা বিচারকাজে প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পরিবারের সদস্যদেরও এমন কাজ থেকে বিরত রাখবেন।

৩৩. বিচার বিভাগে কর্মরত থাকা অবস্থায় একজন বিচারক ব্যক্তিগত চেম্বার ব্যবহার করতে পারবেন না বা আইন পেশায় অংশ নিতে পারবেন না।

৩৪. বিচারক বা বিচারকের পরিবারের সদস্যরা বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনের জন্য কোনো উপহার চাইবেন না, উপহার গ্রহণ করবেন না বা কোনো ঋণ গ্রহণ করবেন না।

৩৫. একজন বিচারক শালীনতা বজায় রেখে আদালতে উপস্থিত বিচারপ্রার্থী তথা সাক্ষী, আসামি, বাদী, বিবাদী, আইনজীবী, আদালতের কর্মচারিদের নিয়ন্ত্রণ করবেন। প্রত্যেকের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবেন।

৩৬. একজন বিচারক বিচার বিভাগীয় দায়িত্বের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ কোনো আচার-আচরণ করবেন না।

৩৭. প্রধান বিচারপতির বেঁধে দেওয়া সময় অনুযায়ী একজন বিচারক এজলাসে উঠেবেন ও নামবেন। দৈনন্দিন কার্যতালিকায় থাকা বিচারকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি আদালতের সময়সীমার আগে এজলাস ত্যাগ করতে পারবেন না।

৩৮. কোনো বিচারকের অসাদাচরণ বা বিচারকাজের অযোগ্যতা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে বা অন্য কোনো সূত্রে যদি প্রধান বিচারপতি জানতে পারেন, এই অভিযোগ তদন্তে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগে তার পরবর্তী দুইজন সিনিয়র সিনিয়র বিচারপতিকে নিয়ে কমিটি করবেন।

চূড়ান্ত তদন্ত হওয়ার পর প্রধান বিচারপতি অভিযুক্ত বিচারপতিকে অপসারণের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করবেন।

৩৯. উপরোক্ত আচার আচরণ মেনে না চললে একজন বিচারক অসদাচরণ করেছেন বলে গণ্য করা হবে।



নির্বাচন বার্তা