গুলশান-বনানীতে রাজউকের ৩৭টি বাড়ির নিয়ন্ত্রণ দখলদারদের হাতে

ইবার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকম:
আপডেট সময়:অগাস্ট ১৭, ২০১৭ , ১২:০৪ অপরাহ্ন
বিভাগ: এডিটরস' পিক

রাজউক প্লটরাজধানীর গুলশান-বনানীর ৩৭টি বাড়ির মালিক কাগজে-কলমে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। তবে অভিজাত এলাকার কোটি কোটি টাকা মূল্যের এসব বাড়ির ওপর দখল নেই সংস্থাটির। বিভিন্ন কৌশলে বাড়িগুলো নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন দখলদাররা। সম্প্রতি খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজউকের পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকায় থাকা মূল্যবান এ বাড়িগুলোয় খোদ দখলদারদেরও অনেকে থাকেন না। তাদের অধিকাংশই দেশের অন্যত্র কিংবা বিদেশে থাকেন। আর বাড়িগুলোয় থাকছেন তাদের আত্মীয়-স্বজন ও ঘনিষ্ঠজন।

অন্যদিকে, মামলা থাকায় রাজউক চাইলেও বাড়িগুলোর দখলে যেতে পারছে না। কয়েকটিতে রাজউকের পক্ষে রায় আসলেও অধিকাংশ মামলা এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। পরিত্যক্ত তালিকার ওইসব প্লটে নতুন ভবন নির্মাণের নকশাও অনুমোদন দিচ্ছে না রাজউক। মামলায় জেতা সম্ভব নয় মনে করেই দখলদাররা বাড়িগুলোতে থাকেন না বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বেদখল হয়ে যাওয়া প্লটমুক্তিযুদ্ধের আগে এই বাড়িগুলো তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে বরাদ্দ নিয়েছিলেন পাকিস্তানি নাগরিকরা। যুদ্ধের সময় তারা বাড়ি ফেলে বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যান। এর পর সেই বাড়িগুলোর জাল দলিল ও ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে দখল করে নেয় প্রভাবশালীরা। পরে এসব বাড়িগুলোকে পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে তালিকা করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। কিন্তু আইনি জটিলতায় এগুলোর দখল নিতে পারছে না রাজউক।

সরেজমিনে গুলশানের ১০৩ নম্বর রোডের ১৩ নম্বর প্লটে (সাবেক সিইএন-ডি-২০) গিয়ে দেখা গেছে, বাড়ির ভেতরে একটি ডুপ্লেক্স ভবন থাকলেও তাতে কেউ বসবাস করছে না। রাজউকের তালিকায় এই প্লটের দখলদার নেছার মোহাম্মদ খান। তবে গেটের সামনে দায়িত্বরত পাহারাদার জানালেন, তিনি নেছার খান নামের কাউকে চেনেন না। তিনি বলেন, ‘বাড়ির মালিকরা দেশের বাইরে থাকেন। মাঝে মধ্যে শুধু দেখতে আসেন। শুনেছি, বাড়ি নিয়ে ডিআইটির (রাজউক) সঙ্গে সমস্যা আছে। কোর্টে মামলা আছে।’

গুলশানের এই প্লটটি নিয়ে মামলা চলছেরাজউকের ওই তালিকায় থাকা গুলশানের ১০১ নম্বর সড়কের ১৩ নম্বর বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, গাছগাছালি ঘেরা ডুপ্লেক্স ভবনটির প্রধান ফটক বন্ধ। গেটে সাঁটানো সাইনবোর্ডে ইংরেজিতে লেখা রয়েছে ‘টু-লেট, অনলি ফর ফরেনার্স’। সেখানে কোনও ফোন নম্বর নেই। যোগাযোগের জন্য ই-মেইল ঠিকানা দেওয়া আছে। তবে তাতে কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনও জবাব মেলেনি। পাশের বাড়ির দারোয়ান জানান, ১৩ নম্বর বাড়িতে দুই-তিনজন থাকেন।

নিজের বাড়ি কিভাবে রাজউকের পরিত্যক্ত বাড়ির তালিকায় গেল সে প্রশ্ন রেখে গুলশানের ৪১ নম্বর রোডের ৬ নম্বর প্লটের মালিক পরিচয়দানকারী সুলতানা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটা আমাদের কেনা সম্পত্তি। এখন রাজউক বলে এটা তাদের। ভবন করতে নকশা অনুমোদন দিচ্ছে না। মাঝে মধ্যে উচ্ছেদ অভিযানের কথা বলতে শুনি।’ তবে তিনি নিজেও বাড়িটিতে থাকছেন না বলে জানান।

রাজউক-এর প্লটে ব্যবসা কেন্দ্রশুধু এ তিনটি বাড়ি নয়, রাজউকের তালিকায় থাকা বাড়িগুলোর মধ্যে অন্তত ১৫টি বাড়িরে ক্ষেত্রে এমন চিত্র দেখা গেছে। মামলায় হার কিংবা রাজউকের সঙ্গে টিকতে পারবেন না এমনটি নিশ্চিত হয়েই অনেকে বাড়িগুলোর হাল ছেড়ে দিয়েছেন। তাছাড়া ওই প্লটগুলোয় রাজউকের পক্ষ থেকেও ভবন নির্মাণের জন্য নকশা অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না। ফলে আগের ভবনগুলো জরাজীর্ণ হয়ে গেলেও নতুন করে স্থায়ী কোনও আবাসন নির্মাণ করতে পারছেন না তারা। অন্যদিকে সেবা সংস্থাগুলোরও অধিকাংশের সার্ভিসও বন্ধ রয়েছে। ফলে ‘বসবাস উপযোগী’ না হওয়ায় বাড়িগুলোতে মালিক দাবিদারদের অনেকেই থাকছেন না।

কয়েক দশক ধরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের দখলে থাকা গুলশান-২ এর ৭৯ নম্বর সড়কের ১৫৯ নম্বর বাড়িটি উচ্চ আদালতের রায়ে গত ৭ জুন উচ্ছেদ করে রাজউক।

রাজউক সূত্র জানিয়েছে, ১৯৫০ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে এসব জমি প্লট আকারে বরাদ্দ দিয়েছিল পাকিস্তান সরকার। তৎকালীন ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) থেকে পাকিস্তানি নাগরিকরা এসব প্লট বরাদ্দ পেয়েছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তারা বাংলাদেশ ত্যাগ করেন। ১০ কাঠা থেকে দুই বিঘা পর্যন্ত আয়তনের এই প্লটগুলোর মালিক তৎকালীন ডিআইটি (বর্তমান রাজউক)। এসব বাড়ির অনেকটাই এখন আর রাজউকের দখলে নেই। প্রভাবশালীরা নানা কৌশলে এগুলো দখলে রেখেছেন।

রাজউক-এর প্লটরাজউকের সম্পত্তি শাখা সূত্র জানিয়েছে, অবৈধ দখলে থাকা গুলশান ও বনানীর বাড়িগুলো নিয়ে রাজউক অনুসন্ধান শুরু করে ২০০৮ সালে। এতে মওদুদ আহমদের বাড়িটির মতো আরও ৩৮টি বাড়ির সন্ধান পাওয়া যায়। এই বাড়িগুলোর মধ্যে আরও একটি বাড়ি দখলে নিয়েছে রাউজক। সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করে ফ্ল্যাট বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি। পর্যায়ক্রমে বেদখলে থাকা এই বাড়িগুলোর আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে তাতেও এমন উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, চারদলীয় জোট সরকারের সময় এমন ১৮টি প্লট ও বাড়ি নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। বাড়িগুলো এখন রাজউকের হাতছাড়া। তবে এ ঘটনায় সংস্থার ক্ষতি হওয়ায় সাবেক পূর্তমন্ত্রী মির্জা আব্বাস ও রাজউকের তৎকালীন চেয়ারম্যান শহিদ আলম, ইকবাল উদ্দিনসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। কয়েকজন জেলও খেটেছেন।

রাজউকের বেদখল হওয়া বাড়িগুলো হচ্ছে- গুলশানের ১৪ নম্বর সড়কের ৪ নম্বর বাড়ি, ৪৪ নম্বর সড়কের ৩০এ নম্বর বাড়ি, ৪১ নম্বর সড়কের ৬ নম্বর বাড়ি, ১১ নম্বর সড়কের ৩ নম্বর বাড়ি, ৯৩ নম্বর সড়কের ১৫/সি প্লট, ৯৬/৯৩ সড়কের ১৯ নম্বর প্লট, ১০১/১০৩ নম্বর সড়কের ১৩ নম্বর প্লট, ১০৮ নম্বর সড়কের ১৪ নম্বর প্লট, ১০৮/১১২ নম্বর সড়কের ১ নম্বর প্লট, ১০৯ নম্বর সড়কের ৪ নম্বর প্লট, ১১৫ নম্বর সড়কের ১০ নম্বর প্লট, ১১৬ নম্বর সড়কের ৯ নম্বর প্লট, গ নম্বর সড়কের ৮০ নম্বর প্লট, ৪৯/ক নম্বর সড়কের ১ নম্বর প্লট, ৪৯ নম্বর সড়কের ১ নম্বর প্লট, ৪৭/৪৮ নম্বর সড়কের ২ নম্বর প্লট, ৪১ নম্বর সড়কের ৬ নম্বর প্লট, ৪৪ নম্বর সড়কের ৩০/এ নম্বর প্লট, ৪৪/গ নম্বর সড়কের ৩০/এ নম্বর প্লট, গ নম্বর সড়কের ১১৩ নম্বর প্লট।

গ নম্বর সড়কের ১০৫ নম্বর ও ৭৯ নম্বর প্লট, ১৬/২১ নম্বর সড়কের ৬ নম্বর প্লট, ৩ নম্বর সড়কের ৭২ নম্বর প্লট, ৭১/৭৪ নম্বর সড়কের ৯ নম্বর প্লট, ৮৭ নম্বর সড়কের ৪ নম্বর প্লট, ৫৯ নম্বর সড়কের ১৯ নম্বর প্লট, ৫৪ নম্বর সড়কের ১৩ নম্বর প্লট, ৫৩ নম্বর সড়কের ১২ নম্বর প্লট, ৫০ নম্বর সড়কের ১৯ নম্বর প্লট, গ-১১ নম্বর সড়কের ৩৫ নম্বর প্লট, ১১ নম্বর সড়কের ৩ নম্বর প্লট, ১৪ নম্বর সড়কের ৪ নম্বর প্লট, ২/১ নম্বর সড়কের ২ নম্বর প্লট, ৪৬/৫২ নম্বর সড়কের ২৭ নম্বর প্লট, বনানী ডি ব্লকের ১৩ নম্বর রোডের ৪৭ নম্বর প্লট, বনানীর জি ব্লকের ৭ নম্বর রোডের ৩১ নম্বর বাড়ি, সি ব্লকের ৬ নম্বর সড়কের ৬ নম্বর বাড়ি, ডি ব্লকের ১৩ নম্বর সড়কের ২৫ নম্বর বাড়ি, ই ব্লকের ১৭/এ, ১২ নম্বর সড়কের ১২ নম্বর বাড়ি, আই ব্লকের ৩ নম্বর সড়কের ২৮ নম্বর বাড়ি, জি ব্লকের ৭ নম্বর সড়কের ৩১ নম্বর বাড়ি। এছাড়া, ২২ দিলকুশার প্লট ও ৫৪ মহাখালীর প্লটও এ তালিকায় রয়েছে।

গুলশানে রাজউক-এর দখল হয়ে যাওয়া বাড়িরাজউকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে রাজউকের আইন অনুযায়ী বাড়িগুলোয় প্লট অথবা ফ্ল্যাট তৈরি করে বিক্রি বা বরাদ্দ, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দান, নিলামে বিক্রি অথবা রাজউকের দখলে রাখা হবে। তবে বর্তমানে যেহেতু রাজউক আবাসন সমস্যা সমাধানে বেশি নজর দিচ্ছে, তাই যেসব প্লট উদ্ধার হবে সেগুলোতে ফ্ল্যাট তৈরি করে বিক্রি বা বরাদ্দ দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি।’

রাজউকের সদস্য (উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ) আসমাউল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এমন প্লটগুলোর সব ক’টির বিরুদ্ধে মামলা চলছে। মামলার কারণে আপাতত কিছু করা যাচ্ছে না। যে কয়েকটিতে রায় হয়েছে, রায় আমাদের পক্ষেই হয়েছে। সেগুলো আমরা দখলে নিয়েছি। আশা করি, বাকিগুলোতেও আমরা জিতবো। এরপর এক এক করে দখলে নেবো।’

প্রতিবেদক: শাহেদ শফিক, বাংলা ট্রিবিউন