[…]বিচারপতিদের অপসারণঃ সংসদ বনাম জুডিসিয়াল কাউন্সিল […]বিচারপতিদের অপসারণঃ সংসদ বনাম জুডিসিয়াল কাউন্সিল

বিচারপতিদের অপসারণঃ সংসদ বনাম জুডিসিয়াল কাউন্সিল

ইবার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকম:
আপডেট সময়:অগাস্ট ২৪, ২০১৭ , ১২:৩৫ অপরাহ্ন
বিভাগ: অভিমত

আবদুল্লাহ হারুন জুয়েল:

বাংলাদেশের সংবিধান সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে কম সময়ে প্রণীত সংবিধান। যেমন পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়নে সময় লেগেছিল সাত বছর। দ্রুততম সময়ে সম্পাদিত যেকোনো কিছুর সীমাবদ্ধতা থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধানের মর্যাদা নির্ধারণ করলে তা হবে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সংবিধানের একটি। সম্প্রতি বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে থাকবে নাকি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে থাকবে তা নিয়ে, তথা ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। পৃথিবীর কোনো পদ্ধতিই সমালোচনা বা সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে নয়। এক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য ও সুবিধাজনক পদ্ধতি বেছে নেয়া হয়। সুতরাং বিচারপতি অপসারণের বিষয়টিও সেই আঙ্গিকে বিবেচনা করতে হবে।

পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খান সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করেছিল। বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর ৭২ এর সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয় এবং ৯৬ অনুচ্ছেদে বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা ন‍্যস্ত করা হয় সংসদের উপর। ৭৭ সালে পঞ্চম সংশোধনীতে আইয়ুব খানের অনুকরণে জিয়াউর রহমান বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা দেয় সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে। তখন বিচার বিভাগ স্বাধীন ছিল না। এছাড়া জিয়ার শাসনও ইতোমধ্যে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীতে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু “বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করবে” – এই মর্মে সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০১৪ এর ৫ নভেম্বর হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করা হয়। ৫ মে ২০১৭ আদালত উক্ত সংশোধনী বাতিলের রায় দেন।

প্রশ্ন উঠতে পারে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের বিরোধিতা কি অযাচিতভাবে করা হচ্ছে! একটি মৌলিক বিষয় বোঝা দরকার। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল হচ্ছে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিকল্প যা পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খান এক অধ‍্যাদেশের মাধ্যমে গঠন করার ঘোষণা দিয়েছিল। লক্ষ্য ছিল নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার লোক দেখানো সামঞ্জস্য বিধান করা। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নেই এমন প্রেক্ষাপটে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল রাষ্ট্রপতির হাতের পুতুল মাত্র। ২০০৭ সালে রাষ্ট্রপতির এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিচার বিভাগ পৃথককরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। সংবিধান প্রণয়নের অধিকার সংসদের, তাই আওয়ামী লীগ চাইলে এ নির্দেশ উপেক্ষা বা বাস্তবায়ন বিলম্বিত করতে পারতো। কিন্তু ৭২ এর সংবিধান পুনঃপ্রবর্তনের সদিচ্ছা থাকায় সরকার গঠনের পরই ১৯৯৯ সালে বিচার বিভাগ পৃথককরণ বিধিমালা বাস্তবায়ন করা হয়।

ষোড়শ সংশোধনী ছিল ৭২ এর সংবিধান পুনঃপ্রবর্তনের ধারাবাহিকতা। বিচার বিভাগ যেখানে স্বাধীন সেখানে স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থায় প্রচলিত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের প্রয়োজন নেই। বিচারপতিগণ জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থাকতে পারেন না। সুতরাং অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের মতো বাংলাদেশেও এ ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকবে এটাই প্রত্যাশিত।

সাংসদদের বিরুদ্ধে আ্‌ইনগত ব্যবস্থা:

গত কয়েক বছরে অনেক সাংসদদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে, দুদকে তলব করা হয়েছে। কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি:

১. সাংসদ হান্নানসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল।

২. তাপস পালের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশীট।

৩. এমপি সুবিদ আলীর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা।

৪. সাংসদ শওকতের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র শিগগিরই।

৫. ঝালকাঠির সাংসদ হারুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন।

৬. এমপি মোসলেম উদ্দিনের বিরুদ্ধে মামলা।

৭. গাইবান্ধার সাংসদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র।

৮. আদালতে আত্মসমর্পণ করলেন সাংসদ আমানুর।

৯. সেলিম ওসমানের বিরুদ্ধে সমন জারি।

এছাড়া বদিসহ আ`লীগের অনেক সাংসদদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দৃষ্টান্ত দেয়া যাবে যা অন‍্য কোনো সরকারের আমলে ঘটেনি। তাদের মুক্তি, জামিন বা শাস্তির প্রশ্ন তুললে আদালত অবমাননা হবে বলে আশঙ্কা করি!

বিচারপতি প্রসঙ্গ

১. বিচারপতি মানিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ

আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে ২৯টি অভিযোগ আনেন এবং সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান।

সূত্র: bit.ly/mahmudj

উল্লেখ্য, কোনো একজন ব্যক্তির অভিযোগের ভিত্তিতে জুডিসিয়াল কাউন্সিল গঠন করা যায় না। বিচারপতির পদটি সাংবিধানিক বলে সংবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার কথা। অনেক আইনবিদের মতে, ব‍্যক্তির অভিযোগে জুডিসিয়াল কাউন্সিল গঠন বিচার বিভাগের জন্য হুমকি স্বরূপ।

২. তারেককে খালাস দেয়া বিচারক মোতাহার হোসেন দেশত্যাগ করে মালয়েশিয়ায়। মামলা দায়ের থেকে রায় পর্যন্ত পুরো বিচার প্রক্রিয়ায় অনুপস্থিত থেকে অর্থপাচার মামলায় তারেক রহমানকে খালাস দেন বিচারক মোতাহার হোসেন।

দুদকের কাছে অভিযোগ রয়েছে, মোতাহার হোসেন লন্ডনে একটি বাড়ি, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা না মেনে অর্থ পাচার, ঢাকায় দুটি ফ্লাট, নিজ জেলা পাবনায় জমি ক্রয়, বিভিন্ন ব্যাংকে তার নিজের ও পরিবারের বিভিন্ন সদস্যদের নামে বড় অংকের টাকা, ফ্লাট বাড়ি, জমিসহ অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন।

সূত্র: http://bit.ly/tareqj

৩. বিচারপতিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের কথা প্রধান বিচারপতি স্বয়ং স্বীকার করে ২ জুন ২০১৫ ফরিদপুর আইনজীবী ফোরামের সভায় কথা দিয়েছিলেন যে, বিচারকদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি অভিযোগ পাওয়া গেলে ৭ দিনের মধ্যে ব‍্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

কিন্তু আমরা দেখলাম, তিনি বিচারপতি জয়নাল আবেদীন ও ফজলুল হকের বিরুদ্ধে সংগৃহীত দুর্নীতির তথ্য প্রমাণ উপেক্ষা করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা বন্ধ করার নির্দেশ দিলেন।

ব‍্যক্তিগত মনোভাবে প্রভাবিত না হওয়ার শপথ নিয়েছিলেন। কিন্তু আইন সচিব ও বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরীর ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ক্ষোভের কথা জানা যায়। এছাড়া তার প্রতি শিষ্টাচার বহির্ভূত আচরণের অভিযোগে এক বিচারককে বহিষ্কার করা হয়।

সাকা চৌধুরীর পরিবারের সাথে বৈঠক, বিএনপি নেতা সাইফুর রহমানের পরিবারের সাথে ভ্রমণ – সবকিছুই তো উপেক্ষা করা হয়েছে! কিন্তু সংসদ নিয়ে প্রশ্ন তোলা, রাজনৈতিক মন্তব্য, ইতিহাস বিকৃতি, স্বৈরাচারী নিয়ম প্রচলনের চেষ্টা, সরকারকে পরোক্ষভাবে হুমকি দেয়া ও ব্যর্থ নও জঙ্গি রাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনা – এসবের প্রতিক্রিয়া জনমতে পড়তে বাধ্য।

অন‍্যান‍্য দেশে প্রচলিত বিচারপতিদের অপসারণ পদ্ধতিঃ

১. যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের আর্টিকেল টু অনুসারে বিচারপতিদের অপসারণের পূর্ণ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভকে। এছাড়া সিনেটও অপসারণের উদ‍্যোগ নিতে পারে। এমন কি কোনো অপরাধ না করলেও বিচারপতিকে অপসারণ করতে পারে জনপ্রতিনিধিরা।

২. ভারতের পার্লামেন্ট সংবিধানের ১২৪(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিচারপতিদের অপসারণ করতে পারে।

সংবাদ: ভারতের প্রধান বিচারপতি-সহ সুপ্রিম কোর্টের আট বিচারপতির কারাদণ্ড

সূত্র: http://bit.ly/indiaj

৩. যুক্তরাজ্যের সুপ্রিম কোর্ট এ‍্যাক্ট ১৯৮১ অনুসারে হাউজ অব পার্লামেন্ট বিচারপতি অপসারণ করতে পারে।

৪. শ্রীলঙ্কার প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত। শ্রীলঙ্কার পার্লামেন্টে অভিশংসনের উদ্যোগ।

সূত্র: http://bit.ly/srilankaj

৫. কমনওয়েলথ দেশগুলোতে কিভাবে বিচারপতি অপসারণ করা হয় তার একটি গ্রন্থ রয়েছে যেখানে ১০৫ নং পৃষ্ঠায় বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের বলে উল্লেখ রয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না এ বইয়ে সদস্য দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম রয়েছে।

Compendium on Judicial Appt Tenure and Removal in the Commonwealth

বইটির পিডিএফ ভার্সন:http://bit.ly/justicebd

বিচারপতি বনাম সাংসদ:

একজন সাংসদের বিরুদ্ধে যত সহজে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া যায়, বিচারকদের ক্ষেত্রে তা করা যায় না। এছাড়া শ্রেণী স্বার্থ বলে যে ধারণাটি প্রচলিত আছে তা ষোড়শ সংশোধনী বাতিলে ১১ জনের মধ্যে ৯ জনের একতা থেকে অনুধাবন করতে পারি। দৃষ্টান্ত দেয়া যায় বিচারপতিদের বিরুদ্ধে তদন্ত বন্ধে দুদককে নির্দেশের। সাংসদদের মধ্যে এমন নেই তা নয়, যেমন: বেতন-ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাব সংসদে তোলা হলে কোনো দলের সাংসদরা বিরোধিতা করে না। এছাড়া শ্রেণী স্বার্থ বিষয়টি সাংসদদের মধ্যে দেখা যায় না। কারো দায় কেউ নিতে চায় না কারণ তাদেরকে জনগণ, মিডিয়া, সংসদ, আদালতসহ বিভিন্ন মাধ্যমে জবাবদিহি করতে হয়। তলব করা মাত্র সাংসদ ও মন্ত্রীরা কি আদালতে হাজির হয়নি? আদালত কি স্বপ্রণোদিত হয়ে সরকারকে নির্দেশ দেয়নি?

বিচারপতি পদটি সাংবিধানিক আর সংবিধান প্রণয়নের ক্ষমতা সংসদের। “বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হবে” – এটি যদি যুক্তি হয় তাহলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে কেন বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতেই ন‍্যস্ত! বাংলাদেশের বিচার ব‍্যবস্থা সম্পূর্ণ স্বাধীন। সংবিধান প্রণেতাদের দায়বদ্ধতা থাকলে সাংবিধানিক পদের অধিকারী বিচারপতিদের কি জবাবদিহি থাকবে না? জবাবদিহির জন্য সংসদের চেয়ে গ্রহণযোগ্য আর কি হতে পারে? পৃথিবীতে একমাত্র পাকিস্তানেই সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল আছে। সেই দেশটিতে এ যাবত কোনো সরকার মেয়াদ সম্পন্ন করতে পারেনি। পাকিস্তানের মতো একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে প্রচলিত পদ্ধতি উন্নয়নশীল দেশের মডেল বাংলাদেশ অনুসরণ করবে এটি অপ্রত্যাশিত। সাংবিধানিক পদে থেকে সংসদকে উপেক্ষা করা শুধু অযৌক্তিক নয়, এটি সংবিধান লঙ্ঘন এবং বিশ্বের গণতান্ত্রিক ধারার বিপরীত মেরুকরণ।

অভিমত - বিভাগের আরও সংবাদ