রোহিঙ্গা নিধনে মিয়ানমারের সেনা ও রাখাইন মিলিশিয়ার সশস্ত্র হামলা

ইবার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকম:
আপডেট সময়:অক্টোবর ৮, ২০১৭ , ১১:৫৮ পূর্বাহ্ন
বিভাগ: সংবাদ

মিয়ানমারের সেনা ও রাখাইন মিলিশিয়াদের হামলায় গুলিবিদ্ধ হাজেরা এসেছেন মংডুর কিন্নিসি থেকে। উখিয়ার থেংখালি আশ্রয়শিবিরের ছবি -মামুনুর রশিদ

মনের ভেতর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থাকলেও মংডু টাউনশিপের আশপাশের গোটা বিশেক গ্রামের রোহিঙ্গারা এত দিন নিরাপদে নিজ বাড়িতে দিন কাটাচ্ছিল। গত ২৪ আগস্ট রাতের পর থেকে পরিচালিত সেনা অভিযানে লাখ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার ছাড়তে বাধ্য হলেও সপ্তাহখানেক আগপর্যন্ত বাড়ি ছাড়ার কথা ভাবতে হয়নি ওই গ্রামগুলোর রোহিঙ্গাদের। উদ্দেশ্য সরল, মিয়ানমার সরকার দেখাতে চেয়েছে, সেনা নির্যাতনে রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে যাওয়ার ঘটনা শুধুই গল্প। কিন্তু নতুন পরিস্থিতিতে ধারণা করা যাচ্ছে, এ উদ্দেশ্য থেকেও সরে এসেছে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীগুলো।

তারা নিজেরা দূরে থেকে উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে এখন ব্যবহার করছে তাদেরই প্রশিক্ষিত রাখাইন মিলিশিয়াদের।

মংডু শহর থেকে ছয় কিলোমিটার দূরের এমনই একটি গ্রাম দরগাপাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ জোনায়েদ গত শুক্রবার সন্ধ্যার পর জানালেন, তাদের গ্রামে আগুন দেওয়া হয়েছে। তবে এ আগুন দেওয়ার কাজটি কোনো বাহিনী নয়, অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত রাখাইনরা ঘটিয়েছে।

প্রশাসনিক বিন্যাসে মিয়ানমারের টাউনশিপ বাংলাদেশের জেলার মতো। রাখাইন রাজ্যে এ রকম টাউনশিপ ১৭টি। ২০১২ সালের আগপর্যন্ত সবক’টি টাউনশিপ মিলে রোহিঙ্গারা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। ব্যাপক বিতাড়নের শিকার না হলে এত দিনে রাখাইনে রোহিঙ্গারা ৭০ শতাংশের বেশি হয়ে যেত। ২০১২ সালের পর বুচিডং (বুথেডং), রাশিদং (রাথেডং) ও মংডু এলাকা ছাড়া রাখাইন রাজ্যের সর্বত্রই রোহিঙ্গারা হয়ে পড়ে সংখ্যালঘু। এ তিনটি টাউনশিপের মধ্যে কিছুদিন আগেও মংডুতে প্রায় শতভাগ ছিল রোহিঙ্গারা।

মংডু টাউনশিপের ৩১৬টি রোহিঙ্গা গ্রামের একটি দরগাপাড়া থেকে জোনায়েদ লুকিয়ে বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছেন গত বুধবার। থাকছেন টেকনাফের লেদা অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে। তিনি বললেন, আগুন যে লাগানো হবে, সেটা কয়েক দিন ধরেই হুমকি-ধমকি দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছিল তাদের। তাই তিনি পরিবারের সবাইকে বাংলাদেশে নিয়ে আসার উপায় খুঁজতে এসেছিলেন। উপায় খুঁজে পাওয়ার আগেই খবর পেলেন, শুক্রবার সন্ধ্যায় গ্রামে আগুন দেওয়া হয়েছে এবং গ্রাম ছেড়ে বাংলাদেশের পথে রওনা দিয়েছে তার স্বজনরা।

এ অবস্থা চলতে থাকলে বাংলাদেশ অভিমুখী ভাটাপড়া রোহিঙ্গা ঢলে আবারও জোয়ার শুরু হবে। খোদ জাতিসংঘের মানবিকবিষয়ক সমল্প্বয় দপ্তরের (ওসিএইচএ) আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক লোকক বাংলাদেশ থেকে জেনেভায় ফিরে শুক্রবার সংবাদ সম্মেলন করে এ আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন। রাখাইন রাজ্যে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে বেসামরিক লোকজনের রোহিঙ্গা বিতাড়নে যুক্ত হওয়ার ঘটনা ২৫ আগস্ট সেনা অভিযানের পর থেকেই শোনা যাচ্ছিল। গত ৬ সেপ্টেম্বর থেকে দফায় দফায় কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ায় পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, রাখাইনে শুধু সামরিক-আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যরাই নয়, বেসামরিক লোকজন, বিশেষ করে রাখাইনরা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে রোহিঙ্গা নির্যাতন, নারী ধর্ষণ এবং দেশ থেকে বিতাড়নে নেমেছে। শুক্রবার দুপুরেই কথা হয় কিম্নিসি গ্রামের হাজেরা বেগমের সঙ্গে। পায়ে গুলিবিদ্ধ হাজেরা এসেছিলেন ত্রাণ সংগ্রহ করতে। উখিয়ার থেংখালি আশ্রয়শিবিরের ত্রাণ বিতরণের লাইনে দাঁড়িয়ে তিনি বলছিলেন, তাদের গ্রামে সেনাদের সঙ্গে মগরাও হামলায় অংশ নিয়েছিল। মগ বলতে রোহিঙ্গারা রাখাইনদের বুঝিয়ে থাকে।

কাওয়ারবিল গ্রামের আলী জোহারও জানালেন, সেনাদের গুলিতে আহতদের মৃতু্য নিশ্চিত করতে মগরা আধমরা মানুষকে জবাই করে থাকে। কাওয়ারবিলে মংডু এলাকার বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) হেডকোয়ার্টার রয়েছে।

হাসসুরাতা গ্রামের রহিমুল্লাহ জানালেন, তাদের গ্রামটি ছিল পুরোপুরি রোহিঙ্গাদের গ্রাম। কিন্তু ২০১২ সালের পর ওই গ্রামে সেনাদের তত্ত্বাবধানে বসানো হয়েছে রাখাইন কলোনি। হাসসুরাতার পাশের গ্রাম উদংয়ের বাসিন্দা আবদুল মতলব বলেন, সেটেলার রাখাইনরা আসার পরই যত সমস্যা দেখা দিয়েছে। এর আগে বহুকাল আরাকানে রোহিঙ্গা ও রাখাইনরা পাশাপাশি বাস করেছে। এই সেটেলার রাখাইনরা মূলত বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে গিয়েছে এবং এখন মিয়ানমারের আদি বাসিন্দা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে বিতাড়িত করার চেষ্টা করছে।

রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে এসব অভিযোগ যাচাই করার সুযোগ সীমিত। রাখাইন রাজ্যের মুসলিম অধ্যুষিত মংডু, বুচিডং ও রাশিদং এলাকায় বাইরে থেকে কোনো সাংবাদিক, গবেষক, এমনকি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার কোনো প্রতিনিধিও যেতে পারছেন না। মিয়ানমারের সাংবাদিকদের কেউ কেউ এ বিষয়ে লেখালেখি করে রাষ্ট্রের কোপানলের শিকার হয়েছেন। বাইরের মানুষের চলাচলের ওপর এ রকম নিষেধাজ্ঞা বহু দিনের।

তবে গত বছরের অক্টোবরের পর কড়াকড়ি বেড়েছে। ওই অক্টোবরের ঘটনার পর ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ ‘মিয়ানমার : রাখাইন রাজ্যে নতুন মুসলিম বিদ্রোহ’ শীর্ষক গবেষণা শুরু করে। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে বিশ্বের বিভিম্ন অঞ্চলের যুদ্ধ ও সংঘর্ষ নিরসন এবং প্রতিরোধে কার্যকর বেলজিয়ামের ব্রাসেলসভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ওই গবেষণার সারসংক্ষেপের ‘সরকার এবং নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিক্রিয়া’ নামে উপশিরোনামে নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা মিলিশিয়া তৈরির কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘মিয়ানমারের বিভিম্ন এলাকায় বিদ্রোহ দমন প্রক্রিয়ার একটি সাধারণ অংশ হচ্ছে স্থানীয়দের নিয়ে সশস্ত্র মিলিশিয়া বাহিনী গঠন। উত্তরের রাখাইন জাতীয়তাবাদী এবং বুড্ডিস্ট গ্রামবাসী অনেক দিন ধরেই সরকারের প্রতি তাদের অস্ত্র সরবরাহ করার জন্য আহ্বান জানিয়ে আসছে। বিশেষ করে ২০১২ সালের পর থেকে তারা প্রবলভাবে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, যেহেতু উত্তরে তারা মুসলিমদের তুলনায় সংখ্যায় অনেক কম।’

ক্রাইসিস গ্রুপ তাদের প্রতিবেদনে স্পষ্ট করেই বলেছে, বেসামরিক রাখাইনদের অস্ত্রশস্ত্রের প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে সহিংসতা ভয়াবহভাবে উস্কে দেওয়া হবে। প্রতিবেদনটি প্রকাশের সময় গত বছর ডিসেম্বরের আগেই ১২০ জন রাখাইনকে বিজিপি মিলিশিয়া গঠনের প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দিয়েছে বলে জানানো হয়েছিল। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমার সরকার বলছিল যে এটা বিজিপির বর্ধিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, যা একটি ঢিলেঢালা ভর্তি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শুরু হয়েছে এবং এই প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা পরে বিজিপির নিয়মিত সদস্য হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হবে।

গত বছরেরই নভেম্বরে সংবাদ সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে রাখাইনে কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছিল, রাখাইন প্রদেশের উত্তরে রোহিঙ্গা হুমকি মোকাবেলায় রাখাইনদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেছে মিয়ানমার সরকার। রাখাইনের পুলিশপ্রধান সেই লুইন তখন রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন, তারা সীমান্তবর্তী মংডুতে একটি ‘রিজিওনাল পুলিশ’ বাহিনী গঠন প্রক্রিয়া শুরু করেছেন রাখাইন এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের নিয়োগদানের মাধ্যমে। সেই লুইন আরও বলেছিলেন, যেসব প্রার্থী শিক্ষাগত যোগ্যতার অভাবে অথবা অন্যান্য যোগ্যতা, যেমন- নির্দিষ্ট উচ্চতা না থাকার কারণে নিয়মিত বাহিনীতে যোগ দিতে পারেননি, তাদের এ বাহিনীতে নেওয়া হবে। তবে শর্ত হচ্ছে, রিজিওনাল পুলিশ বাহিনীতে যোগদানে ইচ্ছুকদের ওই এলাকার বাসিন্দা হতে হবে এবং তারা তাদের নিজ নিজ এলাকায় দায়িত্ব পালন করবেন।

এদিকে, আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে রাখাইন পার্লামেন্টের সদস্য এবং অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসির নেতা মিন অং এ প্রসঙ্গে বলেন, শুধু মিয়ানমারের নাগরিকরাই এই প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। ফলে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী, যাদের ওই দেশে নাগরিকত্ব নেই, তারা এই বাহিনীতে যোগদানের অযোগ্য বিবেচিত হয়। মিন অং অবশ্য আল জাজিরাকে বলেছিলেন, সরকারের এই কর্মসূচি হাতে নেওয়ার কারণ সংখ্যালঘুদের তাদের শত্রুভাবাপন্ন প্রতিবেশীর কাছ থেকে রক্ষা করা।

বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের বিবরণ থেকে ধারণা করা যায়, সমরাস্ত্রে সজ্জিত রাখাইনদের সংখ্যা এখন হাজারের বেশি হবে। বিবিসির একজন প্রতিবেদক জোনাথন হেড মিয়ানমার সরকারের সহায়তায় রাখাইন রাজ্য ঘুরে এসে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন, তা থেকেও রোহিঙ্গাদের বিতাড়নের জন্য রাখাইনদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।