পাট থেকে তৈরি হবে শার্ট-প্যান্ট-জ্যাকেট ও পলিথিনের বিকল্প পলিব্যাগ

ইবার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকম:
আপডেট সময়:অক্টোবর ১২, ২০১৭ , ১২:৩১ অপরাহ্ন
বিভাগ: টেকসই উন্নয়ন

পাটের বহুমুখী ব্যবহার বৃদ্ধির জন্য সরকার ১ হাজার কোটি বরাদ্দ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইতোমধ্যে পাট থেকে ডেনিম কাপড় তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রথমে পাট ও তুলার মিশ্রণে সুতা তৈরি করা হবে। সেই সুতা থেকে বানানো হবে ডেনিম কাপড়। উৎপাদিত কাপড় থেকে প্যান্ট, জ্যাকেট ও শার্টের মতো পোশাক বানিয়ে রফতানি করা হবে। পাশাপাশি দেশের বেসরকারি খাতে কাপড় সরবরাহ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

সম্প্রতি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় একটি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প শক্তি অনুবিভাগ প্রকল্পটি মূল্যায়ন শেষে একনেকে উপস্থাপন করবে। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সূত্রে এ সব তথ্য জানা গেছে। সূত্র জানায়, কম্পোজিট জুট টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস ইউনিট নামে এ কারখানা স্থাপন করবে বিজেএমসি। যদিও রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার আওতাধীন অধিকাংশ পাটকল লোকসানে রয়েছে। বন্ধও রয়েছে অনেক পাটকল। নতুন এ কারখানা স্থাপনে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৬৯ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট পাট ও তুলা এবং একই রকম আঁশ জাতীয় দ্রব্যের সংমিশ্রণে সাশ্রয়ী মূল্যে সুতা উৎপাদনের পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে। এ পদ্ধতি ব্যবহার করে উন্নতমানের ডেনিম কাপড় তৈরি করা যাবে। যা থেকে উন্নতমানের ডেনিম প্যান্ট, জ্যাকেট, শার্ট তৈরি হবে। এ সব পণ্য বিশ্ববাজারে রফতানি করে যেমন অতিরিক্ত রফতানি আয় হবে, তেমনি দেশের কারখানাগুলো চালু থাকবে বলে মনে করছে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়। পোশাক শিল্পের জন্য তিন স্তরের জিএসপি সুবিধা আদায় করতে পরিবেশবান্ধব সংমিশ্রিত সুতা ও কাপড় উৎপাদন সাহায্য করবে। ডেনিম উৎপাদনের পর অতিরিক্ত সুতা থেকে গৃহস্থালির কাজে ব্যবহার করা যায় এমন বস্ত্র ও মালপত্র তৈরি করা হবে।

সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জে কারখানা স্থাপন করবে বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশন (বিজেএমসি)। কর্পোরেশনের খালি জমিতে এ কারখানা করা হবে। চলতি বছরে শুরু করে ২০১৯ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
তবে এ বিয়ষে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারের অধিকাংশ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান লোকসানি। বিজেএমসিও ব্যাপক লোকসান দিচ্ছে প্রতি বছর।এ জন্য প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভায়ও সরকারি সংস্থাটির প্রকল্পটির সফলতা কীভাবে নিশ্চিত করবে তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
জানা গেছে, বিজেএমসির অধীনে বর্তমানে ২৬টি পাটকল রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি পাটবহির্ভূত পণ্যের।

এদিকে পলিথিনের বিকল্প পচনশীল পলিব্যাগ তৈরির প্রকল্প উদ্বোধন করল বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশনের (বিজেএমসি) তত্ত্বাবধানে পাটের তৈরি পলিব্যাগ উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশনের (বিজেএমসি) প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক মহাপরিচালক ড. মোবারক আহমদ। উদ্ভাবিত পলিব্যাগ পাইলট প্রকল্প পর্যায়ে উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত প্রতিষ্ঠান বিজেএমসি।

রাজধানীর ডেমরায় অবস্থিত লতিফ বাওয়ানী জুটমিলে শুক্রবার সকালে পলিব্যাগ তৈরির প্রাথমিক পাইলট প্লান্ট উদ্বোধন করেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী ইমাজ উদ্দিন প্রামাণিক। এ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম।

এ সময় ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান মোল্লা, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব ফয়জুর রহমান, বিজেএমসি চেয়ারম্যান ড. মাহমুদুল হাসান, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের উর্ধতন কর্মকর্তাবৃন্দ, বিজেএমসির বিভিন্ন স্টোক হোল্ডারগণ উপস্থিত ছিলেন।

পাট মন্ত্রী ইমাজ উদ্দিন প্রামাণিক বলেন, সোনালি আঁশ পাটের উৎপাদন ও বহুমুখী ব্যবহার উৎসাহিত এবং জনপ্রিয় করতে পাট চাষিদের সোনালি স্বপ্নপূরণে জোরদার পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। বর্তমান সরকার কাঁচা পাট ও বহুমুখী পাটজাত পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি, পাটজাত পণ্য রফতানি ও অভ্যন্তরীণ ব্যবহার বৃদ্ধি এবং পরিবেশ রক্ষায় পলিথিন বর্জন ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে পাটকে বিশ্ব বাজারে তুলে ধরতে জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার (জেডিপিসি) এ ১৩৫ প্রকার পাটপণ্যের স্থায়ী প্রদর্শনী ও বিক্রয় কেন্দ্র চালু হয়েছে। পরিবেশবান্ধব পাটের ব্যবহার বহুমুখীকরণ ও উচ্চমূল্য সংযোজিত পাটপণ্য উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে চারকোল, ভিসকস, পাটপাতার পানীয়সহ নতুন নতুন বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে জোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে ।

বাংলাদেশী বিজ্ঞানীর আবিষ্কৃত এ পলিব্যাগ দেখতে প্রচলিত পলিথিনের মতোই হালকা, পাতলা ও টেকসই। পাটের সূক্ষ্ম সেলুলোজকে প্রক্রিয়াজাত করে এ ব্যাগ তৈরি করা হয়েছে। পাটের তৈরি পলিথিন মাটিতে ফেললে তা মাটির সঙ্গে মিশে যাবে। ফলে পরিবেশ দূষিত হবে না। এই ব্যাগ দামে সাশ্রয়ী হবে। এভাবে পাটের ব্যবহার বাড়লে ন্যায্য দাম পাবেন কৃষক। অতীতের মতো পাট দিয়েই বিশ্বে সুপরিচিত হবে বাংলাদেশ।

পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম জানান, আগামীতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পাটের পলিথিন উৎপাদন শুরু করা হবে। তিন মাসের মধ্যে বিদেশ থেকে আনা হবে যন্ত্রপাতি। সবকিছু করা হচ্ছে মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব তহবিল থেকে। সরকারীভাবে উৎপাদনের পর বেসরকারীভাবেও এই ব্যাগ উৎপাদনে উৎসাহ দেয়া হবে। দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশেও রফতানি হবে এই ব্যাগ। বাজারে যে পলিথিন ব্যাগ আছে তার চেয়ে দেড়গুণ বেশি টেকসই এবং ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্য পাওয়া যাবে এই পাটের পলিথিনে।

বর্তমানে বিজেএমসির উদ্যোগে এই পচনশীল ব্যাগ তৈরির একটি সেমি অটোম্যাটিক পাইলট প্লান্ট তৈরির কাজ চলছে। তবে বৃহৎ পরিসরে নতুন উদ্ভাবিত এই পাট পলিব্যাগ তৈরিতে দেশে বা বিদেশে কোন মেশিন তৈরি হয়নি। তাই এ ধরনের মেশিন তৈরির জন্য বিভিন্ন দেশে যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে প্রাথমিকভাবে দেশীয় প্রযুক্তিতে কিছু ছোটখাটো মেশিন তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশীয় প্রযুক্তিতে বড় মেশিন তৈরির জন্য টেন্ডার দেয়া হয়েছে, যা দিয়ে পাইলট প্রকল্প পরিচালনা করা হবে। এতে প্রতিদিন ৩-৪ হাজার পলিব্যাগ উৎপাদন করা হবে। প্রকল্পটি সফলভাবে পরিচালন করা সম্ভব হলেই বাণিজ্যিকভাবে এই পলিব্যাগের উৎপাদনের প্রক্রিয়া শুরু হবে।

আবিষ্কৃত এই ব্যাগের ভার বহন ক্ষমতা পলিথিনের প্রায় দেড়গুণ এবং এটি পলিথিনের মতোই স্বচ্ছ হওয়ায় খাদ্য দ্রব্যাদি ও গার্মেন্টস শিল্পের প্যাকেজিং হিসেবে ব্যবহারের খুবই উপযোগী। তা ছাড়া দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করায় এই ব্যাগের দাম প্রচলিত পলিথিন ব্যাগের কাছাকাছিই থাকবে। পাট থেকে আবিষ্কৃত পচনশীল পলিব্যাগ এসব সমস্যা সমাধানে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। তা ছাড়া এই ধরনের প্যাকেজিংয়ের বিদেশেও অত্যন্ত চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে বিজেএমসিতে এই পচনশীল ব্যাগ তৈরির একটি সেমি-অটোম্যাটিক পাইলট প্লান্ট বসানোর কাজ চলছে। পাইলট প্লান্টটি সফলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হলে বাণিজ্যিকভাবে এই ব্যাগের উৎপাদন করার প্রক্রিয়া শুরু করা যাবে।

টেকসই উন্নয়ন - বিভাগের আরও সংবাদ