[…]মাহবুবুল হক শাকিল; চলে যাওয়া মানেই প্রস্থান নয় […]মাহবুবুল হক শাকিল; চলে যাওয়া মানেই প্রস্থান নয়

মাহবুবুল হক শাকিল; চলে যাওয়া মানেই প্রস্থান নয়

ইবার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকম:
আপডেট সময়:ডিসেম্বর ৬, ২০১৭ , ২:৩৫ পূর্বাহ্ন
বিভাগ: সোশ্যাল মিডিয়া

লিখেছেনঃ জুয়েল রাজ 

বারবার লিখছি আবার মুছে ফেলছি… কী দিয়ে শুরু করব, তিনি আমার কেউ না, আমি তাঁর কেউ না। তবু বিষণ্ণ, উদ্ভ্রান্ত আমি, তবু বুকের ভিতর কেমন হাহাকার…

আমার মা অসুস্থ হয়ে চিকিৎসাধীন, সেই বিষয়টা সারাদিন আমার মাথায় আসেনি। আমি আমার মায়ের খোঁজ নিতে ভুলে গেছিলাম।

মাহবুবুল হক শাকিল, আমার ভাই, আমার নেতা, আমাদের প্রজন্মের বিশ্বাসের ভিত্তি ভূমি। তাঁর সাথে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় ছিলনা। তাঁর সাথে পরিচয় অন্তর্জালে। তাঁর চারপাশের কিছু ঘনিষ্ঠ মানুষের মাধ্যমে। প্রতিনিয়তই তাঁর যাপিত জীবনের গল্প শুনতাম তাদের কাছে, মাঝে মাঝে তার ভরাট কণ্ঠস্বর তাদের কানের সীমানার বাইরে আমাদের কানে ও বাজত। বুকের ভিতর তাঁর জন্য শ্রদ্ধা বাড়ত।

মাস দুয়েক আগে লন্ডনে এসেছিলেন বইমেলায়। ইচ্ছে ছিল একটু কথা বলি, কিন্তু, কৃপা-প্রার্থীদের ভিড় ঠেলে আর যাওয়ার সাহস হয়নি। একই দিনে অক্সফোর্ড হাউজে এক সংগীত অনুষ্ঠানে ও ঢু মেরেছিলেন তিনি, একটা ছবি ও আছে দর্শক গ্যালারীর। ঠিক আমার এক সারি সামনে বসেছিলেন। জরুরী একটা কাজে আমিই প্রোগ্রাম শেষ না করে চলে আসি। আর কথা হয়নি। তাঁর সাথে কথা না বলার কষ্টটা থেকে গেল।

মাহবুবুল হক শাকিল সাবেক ছাত্রনেতা, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী, সময়ের রাজনীতিতে আপোষ করলে তিনি হয়তো অনেক কিছুই করতে পারতেন। কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেও তিনি লোভের ঊর্ধ্বে ছিলেন। তাঁর ফেইসবুক স্ট্যাটাস থেকে নেয়া.

“পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় কষ্টের নাম – অর্থকষ্ট। গত কয়েকমাস ‘বাঁশের চেয়ে কঞ্চি বড়’ স্টাইলে চলার পর এমাসের শেষে এসে তা খুব ভালোভাবেই বুঝছি এবং ভুগছি।
আরেকটা কথা, শুধু প্রেম বা বিরহের কষ্ট নয়, অনেক সময়ে অর্থকষ্টও কবিতা লিখিয়ে নিতে পারে।
আরো একটা কথা, নিজে স্বনির্ভর না হওয়ার আগে পকেটের যাবতীয় কিছু অন্য কাউকে দিয়ে দিতে নেই। মানুষ মূলত কৃতঘ্ন। তার কাজই হলো, স্নেহ এবং বিশ্বাসের সুযোগ নেয়া। আমি নিজেও এর ব্যতিক্রম নই হয়তো!”

তাঁর কবিতায় নিজেকে এঁকেছিলেন-
“মূলত আমি কেউ না, না রাজনীতিবিদ, না কবি, না গল্পকার, এমনকি নই তুমুল সংসারী।
এক অভিশপ্ত চরিত্র যার কিছুই থাকতে নেই। সাধু কিংবা সন্ত নই, চোখ জ্বলজ্বল করে জীবনের লোভে।
চন্দ্রাহত, বিষাদ এবং ভূতগ্রস্ত, বসে থাকি ব্রহ্মপুত্র ঘাটে, শেষ খেয়ার অপেক্ষায়……..”

শেষ খেয়া এতো দ্রুত ঘাটে ভিড়ল? তাঁর টাইমলাইন ঘেঁটে সাম্প্রতিক সময়ের অনেকগুলো কবিতাই দেখলাম যা “অবিচুয়ারী” তবে কি নিজের অবিচুয়ারী নিজেই লিখে গেলেন?

চরম দু:সময়ে প্রচলিত রাজনীতি যখন দম বন্ধ হয়ে আসত, হতাশা ভর করত। ঠিক তখনই তার কয়েক ছত্রের স্ট্যাটাস আলো দেখাত। সাহস ফিরে পেতাম।

মনে হত একজন মানুষ এখনো শেখ হাসিনার পাশে এখনো আছেন, যিনি আমাদের ভাষা বুঝেন। আমাদের কষ্ট বুঝেন। অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল রাজনীতি লালন করেন। যিনি ৫ বছরের ধর্ষিত পূজার পাশে দাঁড়ান। যিনি খাদিজার খোঁজ রাখেন। যিনি কবি হেলাল হাফিজের খোঁজ রাখেন। যিনি নতুন প্রজন্মের চিন্তাকে প্রশ্রয় দিতেন। ব্যক্তিগত পরিচয় সম্পর্ক না থাকলে ও ভরসা ছিল, একজন মানুষ ছায়া হয়ে আছে।

তাঁর লেখা সর্বশেষ গল্প ছিল “রেখো মা দাসেরে মনে” দেশান্তরী ব্লগারদের বেদনা তিনি বুঝতেন বলেই এমন গল্প লিখতে পেরেছেন।

হৃদরোগ, স্বাভাবিক মৃত্যু, আত্মহত্যা নাকি খুন, এর কোনটাই জানিনা। শুধু জানি চলে গেছেন তিনি, তবুও মিডিয়া আমাদের বিভ্রান্ত করেছে। জানিনা পোস্টমর্টেম প্রতিবেদন কোন ভয়ংকর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাবে আমাদের।

আওয়ামী লীগের সদ্য সমাপ্ত কাউন্সিল ঘুরেফিরে নাম আসছিল মাহবুবুল হক শাকিলের। কিন্তু তিনি নিজে থেকেই না বলেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের প্রতি ভালোবাসা শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন এভাবেই
“প্রিয় মানুষেরা, আমার শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা জানবেন। আপনারা যারা বিভিন্ন অনলাইন নিউজের সূত্র ধরে আগামী সম্মেলনে আমাকে আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে দেখতে চেয়েছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা|

আমি বিনীতভাবে বলতে চাই, যে দল জাতির পিতার নেতৃত্বে সার্বভৌম দেশ এনে দিতে পারে সে দলের নেতা হওয়ার ন্যুনতম যোগ্যতাও আমার নেই। এটি ভণিতা নয়, আমার হৃদয়ের কথা।

ছাত্রলীগের একজন সামান্য কর্মী ছিলাম, এটিই আমার গর্বের পরিচয়। বঙ্গবন্ধু-কন্যা প্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনার পায়ের কাছে বসে থাকতে পারি, এর চেয়ে বড়ো অহংকার আর কীইবা থাকতে পারে এক জীবনে?

যতদিন বেঁচে থাকবো নেত্রীর প্রতিটি কাজ আমার সাধ্যমত সম্পাদন করার চেষ্টা করবো, বাকিটা সময় ব্যস্ত থাকবো লেখালেখি নিয়ে। অনুগ্রহ করে আমাকে নিয়ে এ ধরণের পোস্ট না দিলে বাধিত হবো। সবার জন্য প্রীতি। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

তিনি লাল নীল মুজিব কোটের ছিলেন কট্টর সমালোচক।

রাজনীতি ভালোবাসি। তার চেয়ে বেশি ভালোবাসি বঙ্গবন্ধু আর আমাদের নিরাশার উপকূলে আশার বাতিঘর শেখ হাসিনাকে।

ব্যর্থ আমি! রাজনীতি ছেড়ে দিলাম। মন্দ কি? বিরহের কবিতা লিখি!

আপনারা যারা নতুন রাজনীতিবিদ হয়েছেন তাদের জন্য শুভাশিস। দলকে এগিয়ে নিয়ে যান আগামীর পানে। শুধু একটি দোহাই, মুজিবকোটের অবমাননা করবেন না। আপনি মুজিবকোট পরেন। এটা পরিধানের ভার বহন করতে পারবেন?

এই ছিলেন মাহবুবুল হক শাকিল, যাকে অন্তর্জালে লাখ তরুণ ফলো করত। অকালের দিনে যিনি বিশ্বস্ততায় চীনের প্রাচীরের মতো ছিলেন। যার মাঝে আমরা ছায়া খুঁজেছি আগামী দিনের সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের।

আমি দাবা খেলা খুব ভাল বুঝিনা… কিন্তু রাজা চেক ব্যাপারটা বুঝি । রাজাকে চেক দিতে হলে সৈন্য, ঘোড়া, নৌকা, মন্ত্রী সব খেয়ে এসে রাজাকে চেক দিতে হয়। কোন অলৌকিক পরিকল্পনায় সেই নৌকা, মন্ত্রীগুলো আমরা একে একে হারিয়ে ফেলছি।

আপনার দিব্য-চোখ দিয়ে দৃশ্যায়ন করেছেন চলে যাবার পরের দৃশ্য।

আমি চলে যাবার পরেও
মাহবুবুল হক শাকিল

আমি চলে যাবার পরেও ঢাকার রাস্তায় থাকবে
নিত্যদিনের যানজট, রিকশার টুংটাং, পথচলতি মানুষের মিছিল,
মফস্বল থেকে আসা বোকা মুখের বিস্ময়।

রাজনীতির তুমুল তর্ক থাকবে,
ক্ষমতার পালা-বদল থাকবে,
চলমান থাকবে বহুতল ভবনের নির্মাণ।

থাকবে আজকের মতোই ভালবাসা-বাসি
বিরহী প্রেমিকের বিষণ্ণতা, অভিমানী প্রেমিকার কান্না।

চলে যাবার পরেও থেমে থাকবেনা সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত,
জন্ম এবং সৎকার।

যে প্রিয় বইয়ে বারবার ছোঁয়াতাম তৃষার্ত আঙুল
তেমনি আর কারো আঙুল ছুঁয়ে যাবে আরেকটি বইয়ের পাতা।
শূন্য থাকবেনা পানশালায় প্রতিদিনের নির্ধারিত চেয়ার
জানালার পাশে, যেখানে বসে স্থবির আমি চলাচল শহর দেখতাম।

আমার মা সন্তান বিয়োগের দুঃখে চোখ ভাসাবেন জলে,
প্রাকৃতিক নিয়মেই; দীর্ঘতর হবে
আমার পিতার জায়নামাজে বসে থাকার স্থিতিকাল।
একমাত্র সহোদর নিঃসঙ্গ হতে হতে একসময় বুঝে যাবে
একাকীত্বই জীবনের মৌলিক ভ্রাতা, ইচ্ছা বা অনিচ্ছায়।

মেনে নিতে কষ্ট হবে প্রিয়তমা কন্যার ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন
আর স্বপ্নজুড়ে আমাকে দেখে সারারাত জেগে থাকবে বোবা কান্না নিয়ে।

একসময়ে সেও বড়ো হবে,
পিতাকে নিয়ে সযতনে রাখা কষ্ট-স্মৃতি
ফিকে হয়ে আসবে নতুন স্বপ্নের উৎসবে।

কোন একদিন সুখী হবে আমার আত্মজা।
চলে যাবার পথে আমি দূরদ্বীপবাসিনী দুটি চোখ দেখি,
সেই চোখে আমি কোন কোন কান্না দেখিনা।

পেশাদারি ব্যস্ততা দেখি,
সংসার সাজানোর নিত্য-নতুন আয়োজন দেখি।
কেবলমাত্র দুর্লভ অবসরে
মীর্জা গালিব বা রবীন্দ্রনাথ যখন তার সঙ্গী তখন টের পাই
আমার চলে যাওয়ার পথে এক বিরল দীর্ঘশ্বাস,
মুক্তার দানার মতো অশ্রুবিন্দু।

আমি চলে যাবার পর পৃথিবীর আর কোন ভাবান্তর দেখি না।
পৃথিবীতে অনেক ভাবান্তর ঘটেছে, এই যে আমার মতো অনেকেই ভালবাসত তোমায়, তুমি কি জানতে, কত যুবকের হাহাকার বাতাস ভারী করেছে তুমি কি জানো?
সময়ের অমোঘ নিয়মে চলে যেতে হয়, চলে যায় মানুষ, কিন্তু অবেলায় কেন? কোন সে অভিমানে বিদায়, কোন সে হন্তারক যার কাছে কবির চিঠি এখনো পৌঁছায়নি।