[…]প্রসঙ্গ নির্বাচন: ভোটাধিকার হরণের অভিযোগ ও বাস্তবতা

প্রসঙ্গ নির্বাচন: ভোটাধিকার হরণের অভিযোগ ও বাস্তবতা

ইবার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকম:
আপডেট সময়:ডিসেম্বর ১৩, ২০১৭ , ১২:০২ অপরাহ্ন
বিভাগ: সোশ্যাল মিডিয়া

লিখেছেন: কনক মজুমদার

যুদ্ধোত্তর দেশের অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করতে বঙ্গবন্ধু বাকশাল বা দ্বিতীয় বিপ্লব নামে যে শাসনব্যবস্থার প্রণয়ন করেছিলেন, তা নিয়ে অনেকে অভিযোগ তোলেন। বঙ্গবন্ধু বাকশাল গঠন করার আগেই সুস্পষ্টভাবে বলেছিলেন, আমি কারও ভোটাধিকার কেড়ে নিচ্ছি না। সকল প্রার্থী বাকশাল থেকে নির্বাচনে দাঁড়াবে। বাকশাল তার সমস্ত খরচ বহন করবে। জনগন যাকে যোগ্য মনে করবে তাকে নির্বাচিত করবে।

বাকশাল কোনো একক দল ছিল না। বা+ক+শা+ল= বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক লীগ। এটা কোনো এলিট শ্রেণীর শাসন ব্যবস্থা ছিল না। বাংলার কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের আশা আকাঙ্খা পূরণ করার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগকে সাময়িক মেয়াদের জন্য এ ব্যবস্থার চেয়ে উত্তম কোন বিকল্প ছিল না।

আমাদের সুশীল সমাজ প্রায়ই বলে থাকেন প্রতীক নয়, যোগ্য প্রার্থী দেখেই ভোট দেওয়ার জন্য। প্রতীক না প্রার্থী বড় এটা নিয়ে টকশো এবং কলেজ পর্যায়ের বিতর্ক অনুষ্ঠানও নেহাত কম হয়নি। আজ আমরা জাতীয় জীবনে যোগ্য প্রার্থীর যে প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি, বঙ্গবন্ধু তা উপলব্ধি করেছিলেন ৪২ বছর আগে। বঙ্গবন্ধু যে অত্যন্ত দূরদর্শিতাসম্পন্ন নেতা ছিলেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

কিছু জ্ঞানপাপী সৎ ও যোগ্য প্রার্থীর জন্য বিপুল টাকা খরচ না করে নির্বাচিত হওয়ার বিধান থাকার পরও বাকশালকে জনগণের ভোটাধিকার হরণের অভিযোগে অভিযুক্ত করেন। এই অপপ্রচার গুলো করার সুযোগ পায় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের দ্বিতীয় বিপ্লবের (বাকশাল) প্রকৃত রূপরেখা জনসাধারণের কাছে তুলে ধরতে না পারার কারণে। বাকশাল নিয়ে আলোচনার আওতা ব্যাপক এছাড়া আজকে লেখার ফোকাস বাকশাল নয়, ভোটাধিকার প্রসঙ্গ।

৫ই জানুয়ারি নির্বাচন না হলে দেশে সাংবিধানিক সংকট দেখা দিত এ ব্যা্পারে কেউ দ্বিমত করেন না। কারও কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের কোন সুযোগও আ’লীগের ছিল না। তত্ত্বাবধারক সরকার আদালত কর্তৃক বাতিল হয়েছিল এবং সংসদে এর বিলও পাস হয়। অন্যদিকে নির্বাচন না হলে আওয়ামী লীগ সরকারের সাংবিধানিক বৈধতা চলে যেত। সুতরাং পরবর্তীতে এই সরকারের অধীনে কোন নির্বাচনও বৈধতা পেত না। এমনকি আ’লীগের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নির্বাচন দিলে অর্থাৎ আগামি নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসলেও সেটি অবৈধ হিসেবেই সাংবিধানিকভাবে গণ্য হত।

৫ই জানুয়ারি নির্বাচন নিয়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কিছু অপপ্রচার প্রচলিত আছে।

১) ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন অবৈধ।
২) একতরফা ভোটার বিহীন নির্বাচন।
৩) জনগনের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

৫ই জানুয়ারির নির্বাচন কোনভাবেই অবৈধ নয়। সাংবিধানিক নিয়মে ধারাবাহিকতায় হয়েছিল। সুতরাং এ নির্বাচন বা বর্তমান সরকারকে কোনভাবেই অবৈধ বলা যায় না। যে ১৫১ জন সংসদ সদস্য বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছিল বলে প্রশ্ন তোলা হয়, তাদের ব্যাপারে আদালতে যে রিট হয়েছিলো তা আদালত কর্তৃক খারিজ হয়ে গিয়েছে। তবে এটা বলা যায় যে এই সরকারের জবাবদিহিতার সুযোগ শক্তিশালী নয়।

একতরফা কিংবা ভোটারবিহীন নির্বাচনের যে অভিযোগ করা হয় তারজন্য কি আদৌ আ’লীগ দায়ী নাকি যারা নির্বাচনে আসেনি তারাই পরিস্থিতির জন্য দায়ী?

এখন প্রশ্ন তুলতে পারেন শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠ হতো না। যদিও নির্বাচন হয় নির্বাচন কমিশনের অধীনে হয়। ধরে নিলাম শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন হয়। বিভিন্ন উপনির্বাচনে বিরোধী দলীয় প্রার্থী জয়ের অনেক দৃষ্টান্ত আছে। তাহলেও কিসের ভিত্তিতে নির্বাচন সুষ্ঠ হতো না বলে অভিযোগ করা হচ্ছে তা বোধগম্য নয়।

৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের আগে এই নির্বাচন কমিশন কিংবা শেখ হাসিনার অধীনেই আ’লীগ পাঁচটি সিটি কর্পোরেশনসহ বিভিন্ন স্থানীয় নির্বাচনে হেরেছিল। সেই নির্বাচনগুলোতে সরকার দলীয় কেউ হস্তক্ষেপ করেছেন এমন দেখা যায়নি।

নির্বাচনে বিভিন্ন দলকে আনতে সরকারের কি আন্তরিকতার অভাব ছিলো? অবশ্যই না। সরকার তার অবস্থান থেকে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে। যদি কেউ এমন দোষারোপ করে থাকে সেটা গ্রহণযোগ্য নয় বলে আমি মনে করি।

আমরা দেখেছিলাম মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে টেলিফোন করে ছিলেন। ৩০ মিনিটের কথোপকথনে খালেদা জিয়া যে অসৌজন্যমূলক আচরন করেছিলেন তা কারো ভুলে যাওয়ার কথা নয়। প্রধানমন্ত্রী আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর খবর শুনেও ছুটে গিয়েছিলেন খালেদা জিয়ার বাসায়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীকে বাসায় ঢুকতে দেওয়া হয়নি। তিনি বাসার নিচ থেকে ফিরে এসেছিলেন, যা রাজনৈতিক শিষ্টাচার বর্হিভূত। পরে জাতিকে জানানো হল শিমুল বিশ্বাস ম্যাডামকে ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিলেন।

তৎকালীন বিরোধীদল বিএনপিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন আপনারা যে যে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিতে চান আমরা সেসব মন্ত্রণালয় দিতে রাজি আছি। এমনকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ নিতে চাইলেও আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু বিএনপি রাজি হয়নি এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। বিএনপি নির্বাচনে আসবে না এই অজুহাতে অন্যান ছোট দলগুলোও নির্বাচনে আসেনি। তাহলে প্রশ্ন করা যায় অন্যান্য দলগুলোর কাছে বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণ করাই কি নির্বাচন সুষ্ঠ হওয়ার মাপকাঠি?

নির্বাচন প্রতিহতের নামে প্রিজাইডিং অফিসার হত্যাসহ হাজার হাজার স্কুলে আগুন দিয়ে পুঁড়িয়ে দেয়া, বাসে বোমা মারা এবং সারাদেশে সাম্প্রদায়িক হামলা চালিয়েছিল বিএনপি।

জাতীয় পার্টি ছাড়া অন্যান্য দলগুলো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নাই বলেই এত সংখ্যক সংসদ সদস্য কে বিনা ভোটে নির্বাচিত হতে হয়েছে। নির্বাচনে যদি কোন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকলে একক প্রার্থী নির্বাচিত হবে এটাই স্বাভাবিক নয় কি?

ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছে কারা? আওয়ামীলীগ নাকি বিএনপি সহ যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নাই তারা? আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছে। অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো আপনাদের বিবেকের উপর রেখে গেলাম।