[…]বামদের ইতিহাস বিকৃতির ইতিহাস […]বামদের ইতিহাস বিকৃতির ইতিহাস

বামদের ইতিহাস বিকৃতির ইতিহাস

ইবার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকম:
আপডেট সময়:ফেব্রুয়ারী ১, ২০১৮ , ১২:৫৩ অপরাহ্ন
বিভাগ: অভিমত
কনক মজুমদার

বাম সমর্থক এবং বাম ঘেঁষা সবাই হয়তো আমার উপর অসন্তুষ্ট হবেন কিংবা বাম বিদ্বেষী ভাববেন। কিন্তু এটাও সত্য যে আমি বাকশালের রূপরেখার সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী, অন্যের কাছ থেকে ধার করে আনা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী নই।

বলা হয়: হাজার-লক্ষ আ’লীগ নেতাকর্মী ছিল অথচ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে প্রথম মিছিল করেছিল বামেরা।

হ্যাঁ এটা সত্যি যে বঙ্গবন্ধু কে হত্যার পরে যেভাবে প্রতিবাদ প্রতিরোধ হওয়ার কথা ছিল সেভাবে হয় নাই। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে একেবারে প্রতিবাদ হয়নি। বামেরা প্রথম প্রতিবাদী মিছিল বের করেছিলেন ২০ শে অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে সেখানে ছাত্রলীগও ছিল।
এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা আ. মোতালেব মৃধা রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর নিহত হওয়ার খবর শুনে তৎকালীন বরগুনা মহকুমা প্রশাসক সিরাজ উদ্দিন আহমেদের কাছে পৌঁছান। সেদিন সকাল সাড়ে ৮টায় মহকুমা প্রশাসক তার সরকারি বাসভবনে ছাত্রলীগ নেতাদের নিয়ে প্রথম প্রতিবাদ সভা করে। সভা শেষে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগকে প্রতিবাদ ও নতুন যুদ্ধের প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

বরগুনা মহকুমায় তৎকালীন এসডিও হিসেবে দায়িত্বে থাকা সিরাজ উদ্দিন আহমেদের সহযোগীতায় বরগুনার আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা রাস্তায় বেরিয়ে আসেন এবং বিক্ষোভ মিছিল করেন। প্রায় একই সময় আমতলী, বামনা, বেতাগী, পাথরঘাটায় বাকশালের নেতা-কর্মীরা বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদ জানান। ঐ একই দিনে ভৈরব, কিশোরগঞ্জ, খুলনায়ও বিক্ষোভ প্রতিবাদ হয়। এমনকি ১৫ই আগস্ট সকালে এমপি হোস্টেলে ভি.পি. মোহাম্মদ উল্যাহ উপস্থিত নেতাদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আপনারা বেঁচে আছেন আর আমার পিতাকে মরতে হল কেন? ” বলে বাকবিতাণ্ডে জড়িয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে নোয়াখালী চলে আসেন। এবং ঐ দিন সন্ধ্যায় উনার নেতৃত্বে নোয়াখালীর চৌমুহনীতে বিক্ষোভ মিছিল হয়।

বলা হয়: বাম নেতাদের ত্যাগের কাছে আওয়ামী লীগ নেতারা নস্যি।

এই বাংলার ইতিহাসই আওয়ামীলীগের ত্যাগ তীতিক্ষায় লেখা। এমন কোন আন্দোলন সংগ্রাম দেখাতে পারবেন না যেখানে আওয়ামীলীগ, ছাত্রলীগ নেতৃত্ব দেয় নাই। দেখাতে পারবেন না এমন কোন আন্দোলন যেখানে আওয়ামীলীগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মী জেল জুলুমের স্বীকার হয় নাই। উনাদের কত জন নেতা জেলে গিয়েছিল? কতজন নেতা নেতৃত্ব দিয়েছল। সেই হিসেব উনারা কেউ কখনও দেখাতে পারেন নাই। সংখ্যাতত্ত্বের হিসেব করলে বাইনোকুলার দিয়েও তাদের খুঁজে পাওয়া যাবে না।

বলা হয়: ভাষা আন্দোলন ছাত্র ইউনিয়নের হাতে গড়া।

এটা কি সম্ভব! ব্যাপারটি আমার কাছে পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্যের মত লাগে। সংক্ষেপে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস দেখে নিলেই বুঝতে পারবেন।

পশ্চিম পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন ফোরামে শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমানের উদ্যোগে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রচেষ্টা শুরু হলে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তারা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৪৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাত্রসভার আয়োজন করে। এ মাসেরই শেষদিকে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়, যার আহবায়ক ছিলেন তমদ্দুন মজলিসের অধ্যাপক নূরুল হক ভূঁইয়া।

১৯৪৮ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারী তারিখে পাকিস্তান গণপরিষদে ইংরেজী ও উর্দুর পাশাপাশি সদস্যদের বাংলায় বক্তৃতা প্রদান এবং সরকারি কাজে বাংলা ভাষা ব্যবহারের জন্য একটি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করেন গণপরিষদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। সংসদ সদস্য প্রেমহরি বর্মন, ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত এবং শ্রীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর এ প্রস্তাবকে স্বাগতঃ জানান।

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ গণপরিষদের ভাষা-তালিকা থেকে বাংলাকে বাদ দেওয়া ছাড়াও পাকিস্তানের মুদ্রা ও ডাকটিকেটে বাংলা ব্যবহার না করা এবং নৌবাহিনীতে নিয়োগের পরীক্ষা থেকে বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে রাখার প্রতিবাদস্বরূপ ওইদিন ঢাকা শহরে সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়।

বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা এবং পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করার দাবীতে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ এই শ্লোগানসহ মিছিল করার সময় শওকত আলী, কাজী গোলাম মাহবুব, শামসুল হক, অলি আহাদ, শেখ মুজিবুর রহমান, আবদুল ওয়াহেদ প্রমুখ গ্রেপ্তার হন।

আব্দুল মতিন, আবদুল মালেক উকিল প্রমুখ ছাত্রনেতাও উক্ত মিছিলে অংশ নেন; বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বিরাট সভা হয়। একজন পুলিশের নিকট থেকে রাইফেল ছিনিয়ে চেষ্টা করলে পুলিশের আঘাতে মোহাম্মদ তোয়াহা মারাত্মকভাবে আহত হন এবং তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে ১২-১৫ মার্চ ধর্মঘট পালিত হয়।

১৯৪৯ সালে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ গঠিত হলে ভাষা আন্দোলন একটি নতুন মাত্রা পায়।

১৯৫০ সালের ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়; এর আহবায়ক ছিলেন আবদুল মতিন।

১৯৫২ সালের শুরু থেকে ভাষা আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিতে থাকে। ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দীন করাচি থেকে ঢাকায় আসেন। তিনি পল্টন ময়দানে এক জনসভায় বলেন যে, প্রদেশের সরকারি কাজকর্মে কোন ভাষা ব্যবহূত হবে তা প্রদেশের জনগণই ঠিক করবে। কিন্তু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে কেবল উর্দু। সঙ্গে সঙ্গে এর তীব্র প্রতিক্রিয়া হয় এবং ‘রাষ্টভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগানে ছাত্ররা বিক্ষোভ শুরু করেন।

৩০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘট পালিত হয়। ৩১ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক দলের প্রতিনিধিদের এক সভায় ‘সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়, যার আহবায়ক ছিলেন কাজী গোলাম মাহবুব। এ সময় সরকার আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব পেশ করে। এর বিরুদ্ধেও তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারি ( একুশে ফেব্রুয়ারি) সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল, জনসভা ও বিক্ষোভ মিছিল আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়।

ঢাকা শহরের স্কুল-কলেজের হাজার হাজার ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে সমবেত হয়ে পাঁচ-সাতজন করে ছোট ছোট দলে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগান দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসলে পুলিশ তাঁদের উপর লাঠিচার্জ করে, ছাত্রীরাও এ আক্রমন থেকে রেহাই পায়নি। ছাত্রছাত্রীরা পুলিশের দিকে ইট-পাটকেল ছোড়া শুরু করলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে।

বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের সামলাতে ব্যর্থ হয়ে গণপরিষদ ভবনের দিকে অগ্রসররত মিছিলের উপর পুলিশ গুলি চালায়। গুলিতে রফিক উদ্দিন, আহমদ, আবদুল, জববার, আবুল বরকত (রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ শ্রেণীর ছাত্র) নিহত হয়। বহু আহতকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং তাঁদের মধ্যে সেক্রেটারিয়েটের পিয়ন আবদুস সালাম মারা যায়। অহিউল্লাহ্ নামে আট/নয় বছরের এক কিশোরও সেদিন নিহত হয়।

পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি ছাত্র-জনতা নিহতদের গায়েবানা জানাজার নামায পড়ে ও শোকমিছিল বের করে। মিছিলের উপর পুলিশ ও মিলিটারি পুনরায় লাঠি, গুলি ও বেয়োনেট চালায়। এতে শফিউর রহমানসহ কয়েকজন শহীদ হন এবং অনেকে আহত অবস্থায় গ্রেপ্তার হন। ছাত্ররা যে স্থানে গুলির আঘাতে নিহত হয় সেখানে ২৩ ফেব্রুয়ারি একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। ১৯৬৩ সালে এই অস্থায়ী নির্মাণের জায়গায় একটি কংক্রীটের স্থাপনা নির্মিত হয়।

১৯৫২ সাল, ২৬ শে এপ্রিল ছাত্র ইউনিয়ন গঠিত হয়ে ভাষা আন্দোলন গড়ে তোলে কিভাবে? ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়ের পরে যেই দলের জন্ম সেই দল কিভাবে ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়!

সব আন্দোলনেই বামদের সমর্থন ছিলো আবার বিরোধিতা ছিলো, কারণ বাম তো সবাই একতাবদ্ধ ছিলো না। সমর্থন আর নেতৃত্ব এক বিষয় না, কেউ নেতৃত্ব দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় সমর্থন দেয়া বা তাদের সাথে একত্রিত হওয়া মানে তো কৃতিত্ব তাদের হয়ে যায়না।

আমাদের সৌভাগ্য যে মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব আওয়ামী লীগ দিয়েছিল। এ নেতৃত্ব যদি বামেরা দিতো তাহলে কেয়ামত পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধও শেষ হতো না, দেশও শত্রু মুক্ত হতো না।



নির্বাচন বার্তা