[…]খালেদা বিহীন বিএনপি গড়তে সিনিয়র নেতাদের প্রথম পদক্ষেপ কী বার্তা দিচ্ছে!

খালেদা বিহীন বিএনপি গড়তে সিনিয়র নেতাদের প্রথম পদক্ষেপ কী বার্তা দিচ্ছে!

ইবার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকম:
আপডেট সময়:এপ্রিল ২, ২০১৮ , ১:১৩ অপরাহ্ন
বিভাগ: এডিটরস' পিক

ড. নজরুল ইসলাম: খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব দু’বার বড় ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখী হয়েছিল, একটি জিয়ার মৃত্যুর পর ১৯৮৪ সালে এবং দ্বিতীয় বার ২০০৭ সালে। কেউ হয়তো কখনো সেভাবে ভাবেনি যে দু’বারই তার শেষ রক্ষা হয়েছে মূলত শেখ হাসিনার কারণে। তাই অন্য মেরুতে যখন শেখ হাসিনা আছেন তাই বিএনপির রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দিহান হওয়ার যথেষ্ট কারণ থাকে।

বিএনপিতে টানাপোড়ন চলছে বহুদিন থেকেই। ২০ দলীয় জোটের অবস্থাও বলতে গেলে নাজুক। খালেদার সাজাকে কেন্দ্র করে খালেদা ও তারেক মুক্ত বিএনপি গড়তে আবার সক্রিয় হয়েছেন সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত সিনিয়র নেতারা। আসন্ন গাজীপুর ও খুলনা সিটি নির্বাচনে অংশ নেয়াকে সরকারের সাথে গোপন আঁতাত বলে মনে করছেন বিএনপির একাংশ। রুহুল কবীর রিজভী ও তার অনুগতদের ছাড়াই রোববার রাতে দলের সিনিয়র নেতাদের এক সভা শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গাজীপুর ও খুলনা সিটি নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান। মনে করা হচ্ছে খালেদা বিহীন রাজনীতির এটিই দৃশ্যমান প্রথম পদক্ষেপ।

বিএনপিতে তারেক রহমানের অনুসারী একটি অংশ থাকলেও সিনিয়র নেতাদের সাথে তারেক রহমানের ঠাণ্ডা যুদ্ধ ছিল বরাবরই। তবে সাকা চৌধুরী যেভাবে টেন পার্সেন্ট বলে অভিহিত করে তারেক রহমানের বিরোধিতা করতেন অন্যরা তা প্রকাশ্যে না করলেও সুযোগ পেলেই সদ্ব্যবহারের চেষ্টা সবসময়ই পরিলক্ষিত হয়েছে।

জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর খালেদার নেতৃত্ব নিয়ে শীর্ষ নেতারাই প্রশ্ন তুলেছিলেন যার ফলে খালেদা জিয়া ভাইস চেয়ারম্যান পদ নিয়েও দলে ভাঙ্গন রুখতে পারেন নি। তখন আন্দোলন করার মত সাংগঠনিক সক্ষমতা শুধু আওয়ামী লীগেরই ছিল। এছাড়া বিভিন্ন দল ও মতের সুবিধাবাদী অংশকে এনে দল গঠন করায় নেতাকর্মীদের মাঝে রাজনৈতিক আদর্শ ও কমিটমেন্টের অভাব থাকাই ছিল স্বাভাবিক। এ কারণেই ৯১ এর নির্বাচনে বিএনপি সকল আসনে প্রার্থীও দিতে পারে নি এবং যে সকল সকল আসনে প্রার্থী দিয়েছিল তার কয়েকটিতে জামানতও বাজেয়াপ্ত হয় কয়েকজনের। এরশাদ সরকারের মাথাব্যথার মূল কারণ ছিল আওয়ামী লীগ। অন্যথায় বিএনপির একটি নামসর্বস্ব রাজনৈতিক দলে পরিণত হতো আরও আগেই।

৯১ সাল থেকে ২ বার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৭ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করা হবে এবং শীর্ষ নেতারা তারেক রহমানের বিরোধিতা করে দু’ভাগে অবস্থান নিবে এটি রাজনীতির কোনো সমীকরণে মেলানো যায় না। ১/১১ এর প্রেক্ষাপটে খালেদা জিয়া যখন দেশত্যাগে সম্মত হয়ে সময় চেয়েছিলেন। খালেদার দেশত্যাগে চুক্তির সংবাদটি তখন বিবিসি ছাড়াও অন্যান্য সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। http://news.bbc.co.uk/2/hi/south_asia/6562811.stm
তখনও এরশাদ আমলের মত শেখ হাসিনার অটল সিদ্ধান্তের কারণে ভণ্ডুল হয়ে যায় মাইনাস টু ফরমুলা।
তারেক রহমান ছাড়া আরাফাত রহমানকে নিয়ে দেশত্যাগে সম্মত হয়েছিলেন। তারেক রহমানসহ বিদেশে চলে যাওয়ার সুযোগ দিলে তিনি সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য যে সময় চেয়েছিলেন তা না করেই দেশত্যাগ করতেন – এটি বললে ভুল হবে না। এই দেশত্যাগের ঘটনা নিকট ভবিষ্যতে ঘটবে না এমন আশঙ্কা থেকে মুক্ত নন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারাও।

সার্বিক পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা করলে দেখা যায় বিএনপির এত খারাপ সময় আসেনি কখনোই। আওয়ামী লীগকে প্রতিপক্ষ করে জাতীয় পার্টিকেও পাশে পায়নি, অন্যদিকে রাজাকারদের বিচার নিয়ে প্রথমে সরব হয়ে পরবর্তিতে ফাঁসির পর প্রতিক্রিয়া না দেখানোর কারণে জামাতের তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষোভ রয়েছে ব্যাপক। আর এর প্রতিফলন দেখা গেছে খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারের পর বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ না নিয়ে জামাত আমীর কর্তৃক দায়সারাভাবে বিবৃতি দেয়ার ঘটনায়। খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারের পর সারাদেশে অচল করে দেয়া হবে এমন হুমকিই দেয়া হয়েছিল। রায়ের দিন দশ লক্ষ লোক সমাগমের পরিকল্পনা নিয়ে সক্রিয় করা যায় নি নেতাকর্মীদের। খালেদাকে গ্রেফতার করা হবে আর কোনো প্রতিক্রিয়া হবে না এটা বোধহয় আ’লীগ সমর্থকরাও ভাবে নি।

এদিকে খালেদার বিরুদ্ধে দেয়া রায়ে শক্ত প্রমাণাদি থাকার কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বার বার আকুতি জানানোর পরও সকলে নীরব। দুর্নীতি ইস্যুতে বিশ্বের নেতারা পক্ষে বলবেন না এটি বোঝার মত রাজনৈতিক পরিপক্কতা আছে কিনা এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। কারো সাড়া না পেয়ে খালেদার জন্য বিতর্কিত ব্রিটিশ আইনজীবী লর্ড কারলাইনকে নিযুক্ত করায় মওদুদ আহমেদসহ বিএনপির কয়েকজন নীতি নির্ধারক বিচারিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থেকে দলের ভেতরে যে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিলেন তার জন্য পৃথক সংবাদ সম্মেলনও করতে হয় বিএনপিকে। এছাড়া ইসলামী দলগুলোকে বিএনপি নেতারা প্রভাবশালী হিসেবে গণ্য করে। চরমোনাই পীর কর্তৃক বিএনপি জামাতকে ক্ষমতায় আসতে না দেয়ার ঘোষণা, হেফাজত ও অন্যান্য সকল ইসলামী দল পারতপক্ষে বিএনপিকে এড়িয়ে চলা এবং সারাদেশে শুরু হওয়া আলেম ওলামাদের জামাত বিরোধি ধারাবাহিক কর্মসূচির কারণে বিএনপির সিনিয়র নেতারা নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের কথা ভেবেই সরকারের সাথে আপোষ করতে চাইছেন।

গতকাল মির্জা ফখরুলের সভাপতিত্বে বৈঠকে স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, জমিরউদ্দিন সরকার,মাহবুবুর রহমান, রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। সরকারকে অবৈধ হিসেবে অভিহিত করে ইতোপূর্বে বক্তব্য দিলেও সে পথ থেকে সরে এসে নির্বাচনে অংশ নেয়া সরকারের প্রতি আস্থার প্রতিফলন হিসেবে বিবেচ্য হবে।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সারাংশ টানলে দেখা যাচ্ছে, খালেদাকে আটকের পর যেখানে আন্দোলন হয় নি সেখানে সরকার বিরোধী আন্দোলন হওয়া অসম্ভব কল্পনা মাত্র। নির্বাচনে খালেদা জিয়া বা তারেক কেউই অংশগ্রহণ করতে পারবেন না বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে খালেদাকে নিয়ে নির্বাচনের দাবি করতে চাইলেও খালেদা জিয়া যদি সরকারের সাথে কোনো সমঝোতা করেন তাহলে দাবিদারদের রাজনৈতিক ভবিষ্যত থাকবে না। সিনিয়র নেতারা অভিজ্ঞ বলেই জানেন যে, বিএনপির প্রতি আনুগত্য না থাকলেও তাদের ছাড়া দল চলতে পারবে না, তাই তাদেরকে রাখতেই হবে। অতীতেও এটিই ঘটেছে। সুতরাং অন্তত বিএনপির সিনিয়র নেতারা সরকারের সহযোগী হচ্ছেন রাজনীতির স্বার্থে এবং বাস্তবতা উপলব্ধি করার কারণে।

লেখক: বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক, গবেষক ও লেখক।



নির্বাচন বার্তা