[…]বঙ্গোপসাগরের ব্লক ॥ ১২ বিপুল তেল-গ্যাস মজুদ!

বঙ্গোপসাগরের ব্লক ॥ ১২ বিপুল তেল-গ্যাস মজুদ!

ইবার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকম:
আপডেট সময়:আগস্ট ৩০, ২০১৮ , ৯:৩৪ পূর্বাহ্ন
বিভাগ: টেকসই উন্নয়ন

ᴥ জরিপ শেষে কোরিয়ান কোম্পানি পোসকো দাইয়ু কর্পোরেশন পাঁচটি লিড শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে
ᴥ দুটি লিড পেলেই লাভজনক বলে ধরা হয়
ᴥ আমদানির বদলে দেশীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের পক্ষে বিশেষজ্ঞগণ

রশিদ মামুন ॥ বঙ্গোপসাগরের ব্লক ১২ তে বিপুল পরিমাণ তেল-গ্যাস মজুদ থাকতে পারে। বাংলাদেশের সমুদ্র এলাকায় তেল গ্যাস অনুসন্ধানে এখন পর্যন্ত সব থেকে বড় সাফল্য হতে পারে এটি। ব্লক ১২ এর ৩ হাজার ৫৬০ লাইন কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক জরিপ (২ডি সাইসমিক সার্ভে) শেষে কোরিয়ান কোম্পানি পোসকো দাইয়ু কর্পোরেশন সম্ভাবনাময় পাঁচটি লিড বা প্রসপেক্ট শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে। এরমধ্যে তিনটিকে বেশ সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখানো হচ্ছে। সাধারণত দুটি প্রসপেক্ট পেলেই ব্লকটি তেল গ্যাস উত্তোলনে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক বলে মনে করা হয়।

দেশে গ্যাসের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে সরকার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করছে। সম্প্রতি এলএনজি পাইপ লাইনে সরবরাহ শুরু হয়েছে। আগামী বছর মাঝামাঝি নাগাদ দৈনিক অন্তত এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানি করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে দেশের জ¦ালানি নিরাপত্তা আমদানি নির্ভর হয়ে উঠবে বলে মনে করা হয়। দেশের জ¦ালানি বিশেষজ্ঞরা আমদানির বদলে দেশীয় তেল গ্যাস অনুসন্ধানে সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার বিদ্যুত জ¦ালানি এবং খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির যে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে তাতে জ¦ালানি বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন জমা দেয়া হচ্ছে। ওই প্রতিবেদনে সাগরে তেল গ্যাস মজুদের এই সুখবরের কথা জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে ব্লক-১২ এ তেল গ্যাসের অবস্থা আরও নিশ্চিত হতে আগামী নবেম্বর থেকে দুই হাজার লাইন কিলোমিটার তৃতীয়মাত্রার ভূকম্পন জরিপ করা হবে।

জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, দ্বিতীয় মাত্রার ভূকম্পন যে জরিপ করা হয়েছে তাতে দেখা যায় বেশ কয়েকটি এলাকায় সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে দুটি প্রসপেক্ট থাকলেই তাকে লাভজনক বলে ধরা হয়। তবে এর চেয়ে ব্লক ১২ তে আরও বেশি প্রসপেক্ট রয়েছে। তিনি বলেন তৃতীয়মাত্রার জরিপ হলে তেল-গ্যাসের পরিমাণ সম্পর্কে আরও নিশ্চিত ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানি পোসকো দাইয়ু কর্পোরেশনের সঙ্গে ব্লক-১২ তে তেল গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ১৪ মার্চ ২০১৭ সালে উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) সই করে। দাইয়ু কর্পোরেশন এই চুক্তির আওতায় ব্লক ১২ এ তেল গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

সমুদ্র উপকূল থেকে ব্লকটি বঙ্গোপসাগরের ১৮০ কিলোমিটার দূরে। ব্লকটির উপর পানির গভীরতা রয়েছে গড়ে এক হাজার ৭০০ মিটার।

এর আগে বঙ্গোপসাগরের সাঙ্গু থেকে গ্যাস তোলা হয়েছে। তবে দ্রুত গ্যাস তোলায় সাঙ্গু সময়ের আগেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন নিয়ম মেনে গ্যাস উত্তোলন করলে সাঙ্গু থেকে আরও বেশিদিন গ্যাস পাওয়া যেত। সাঙ্গু ছাড়াও বঙ্গোপসাগরে মার্কিন কেম্পানি কনোকো ফিলিপস ১০ এবং ১১ নম্বর ব্লকে তেল গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য জরিপ চালায়। ওই জরিপেও ভাল ফল পাওয়ার কথা জানায় মার্কিন কোম্পানিটি। এরপর সরকারকে স্বাক্ষরিত পিএসসি ২০০৮ সংশোধন করে দাম বৃদ্ধির জন্য চাপ দেয়। কিন্তু পিএসসি সংশোধন করে দাম বৃদ্ধি করা আইনগতভাবে জটিল হওয়াতে সরকার রাজি হয়নি। শেষ পর্যন্ত কনোকো ব্লক দুটি ফেলে রেখে চলে যায়।

জ¦ালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেন, সাধারণত সাগরে কোন স্ট্রাকচারে এক ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) মজুদ থাকলেই তাকে ভাল ক্ষেত্র বলে বিবেচনা করা হয়। ততে ৫০০ বিসিএফ এর নিচে মজুদ থাকলে কোন কোম্পানি কাজ করতে আগ্রহী হওয়ার কথা নয়। এখানে বলা হচ্ছে ৫টি লিড পাওয়া গেছে। এরমধ্যে একটিতে এক টিসিএফ পেলে আরও একটিতে পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো আগ্রহী হতে পারে।

সাগরে তেল বা গ্যাস পাওয়া গেলে সাধারণত দুটি প্রক্রিয়ায় তা তীরে আনা হয়ে থাকে। দুই প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি পাইপ লাইন নির্মাণ অন্যটি গ্যাস ক্ষেত্রটির কাছে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন। সাধারণত সাগরে এক কিলোমিটার পাইপ লাইন নির্মাণের জন্য ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে একটি ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণ করতে ৪০০ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হয়ে থাকে। তবে গ্যাস ক্ষেত্রটিতে মজুদের উপর নির্ভর করে এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে থাকে। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও ২০০ কিলোমিটার সাবসি পাইপ লাইন (সাগরের অভ্যন্তরে নির্মাণ করা পাইপ লাইন) রয়েছে। গ্যাস ক্ষেত্রের আয়তন বড় হলে এই ধরনের পাইপ লাইন নির্মাণ কোন জটিল বিষয় নয়।

বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার মোট আয়তন এক লাখ ১১ হাজার ১২৬ বর্গ কিলোমিটার। এরমধ্যে অগভীর সমুদ্র রয়েছে ৫৮ হাজার ৭২৯ বর্গ কিলোমিটার আর গভীর সমুদ্র রয়েছে ৫২ হাজার ৩৯৭ বর্গ কিলোমিটার। পেট্রোবাংলা সমুদ্র এলাকাকে ২৬টি ব্লকে ভাগ করেছে। এরমধ্যে ১১টি অগভীর আর ১৫টি পড়েছে অগভীর সমুদ্রে। এরমধ্যে মাত্র চারটি ব্লকে তেল গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ চলছে। পড়ে রয়েছে বাকি ২২টি ব্লক। দাইয়ু ছাড়াও ভারতীয় কোম্পানি ওএনজিসি এসএস-৪ এবং এসএস-৯ ব্লকে, সান্তোস এসএস-১১ নম্বর ব্লকে কাজ করছে।



নির্বাচন বার্তা