[…]আ’লীগ পুনরায় সরকার গঠন করতে পারবে নাকি অন্য কিছু জড়িত?

আ’লীগ পুনরায় সরকার গঠন করতে পারবে নাকি অন্য কিছু জড়িত?

ইবার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকম:
আপডেট সময়:সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৮ , ৯:১৪ পূর্বাহ্ন
বিভাগ: অভিমত

রিপন পোদ্দার

রাজনীতি করার কারনে গত কিছু মাস যাবৎ যেখানেই যাই না কেন সর্বত্র একটি প্রশ্ন শুনতে হয়, তা হল,

“নির্বাচন কি হবে?”

আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে ঐ ব্যক্তিই (হোক আ’লীগ বা বিএনপি সমর্থক) বলে ফেলে, “ফেয়ার নির্বাচন হলে তো আপনার দল ক্ষমতায় আসতে পারবে না.”

আমি প্রশ্ন করি, “এত উন্নয়ন কাজ করার পর ও কেন পুণঃরায় আ’লীগ ক্ষমতায় আসতে পারবে না?”

* প্রশ্নকর্তা এবার উত্তর দেয়, ” ভাই উন্নয়ন হয়েছে অস্বীকার করার উপায় নাই তারপরও দেখেন না চারদিকে লোকজনের চিন্তাভাবনা, সবাই তো দেখি আ’লীগ এর উপর বিরক্ত.”

=>আমি বলি কেন আ’লীগ এর উপর বিরক্ত?

* উত্তর আসে আপনাদের মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের কর্মকান্ড দেখেন না! তাদের জন্যই তো দলের আজ এই অবস্থা.

=>আমি চিন্তা করি এবং সমসাময়িক পত্রিকা পড়ে জানার চেষ্টা করি শুধুই কি মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের অপকর্মের কারনেই মাঠে এমন ধারনা প্রতিষ্ঠিত যে, নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আ’লীগ পুনঃরায় সরকার গঠন করতে পারবে না, নাকি এর সাথে অন্য কিছু জড়িত?”

#চলুন জানার চেষ্টা করি.

=> সমস্ত অাগষ্ট মাস জুড়ে শুনে আসছি সেপ্টেম্বর মাসে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা গরম হবে কিন্তু আজ মাসের ১০ তারিখ যাচ্ছে কিন্তু প্রকৃতির অসহ্য গরম ব্যতীত রাজনৈতিক কোনো গরম অনুভূত হয় নি. রাজনৈতিকভাবে আ’লীগ এর সিনিয়র নেতারা ট্রেন যোগে উত্তরবঙ্গ সফর করে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছে এবং বিএনপি সেপ্টেম্বরের ১ তারিখে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দলীয় কার্যালয়ের সামনে জনসভা এবং আজ প্রেসক্লাবের সামনে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবীতে মানববন্ধন করেছে. কিন্তু এর বাইরে সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্রকরে রাজনীতির মাঠে নানা ধরনের খেলোয়াড়রা মাঠে নামার চেষ্টা করছে. সরকারের বিরুদ্ধে একটি চক্রব্যূহ রচনার চেষ্টা হচ্ছে. এছাড়া সরকার হুমকি দিচ্ছে বিএনপি-জামায়াতকে, আর সরকারবিরোধী সবাই কখনো একসঙ্গে, কখনো ভিন্নভাবে সরকারকে হুমকি দিচ্ছে. এসব পাল্টাপাল্টি হুমকিতে সাধারণ মানুষের কারো মধ্যে কিছু আগ্রহ তৈরি হচ্ছে, কেউ এসবকে কোনো ধর্তব্যের মধ্যেই আনছে না.

নিরপেক্ষ_দৃষ্টিতে_দেখলে_দেখা_যাচ্ছে “সরকার মনে করছে তাদের পায়ের নিচের মাটি শক্ত আছে. বিরোধী দল তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারছে না. আবার বিরোধী দল মনে করছে সরকারের পায়ের নিচের মাটি সরে গেছে. শক্তভাবে ধাক্কা দিলেই সরকার পতন হবে.”

=> আমার ক্ষুদ্রজ্ঞানে মনে হচ্ছে, ” প্রকৃত পরিস্থিতি সব সরলরেখায় অগ্রসর হচ্ছে না. নানা ধরনের অন্তঃস্রোত বইছে বলে মনে হচ্ছে. ” আমি প্রায় সব জায়গায় একটা কথা বলার চেষ্টা করি যে, আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যেমন জয়লাভের লক্ষ্য নিয়ে অংশ নেবে, তেমনি সম্মিলিত আওয়ামী বিরোধী শক্তিও নির্বাচনে যাবে এবং আওয়ামী লীগকে হারানোর জন্য মরণ কামড় দিবে. এখন দুপক্ষের মুখোমুখি লড়াইয়ে ফলাফল কি হবে তা এখনো বলার মতো সময় হয়নি. আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে.

পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৪টিতে জিতে আওয়ামী লীগ নেতারা একটি শক্ত অবস্থানে আছে মনে করে আন্মতৃপ্তিতে ভূগলে জাতীয় নির্বাচনে সমস্যা বাড়বে. এছাড়া আওয়ামী লীগ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বলে বিএনপি যে ঢালাও সমালোচনা করে সেটার যথার্থতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে. যদিও সিটি করপোরেশন নির্বাচনগুলো সুষ্ঠুভাবে হয়নি বলে বিএনপির অভিযোগ আছে. কিন্তু স্থানীয় জনগণের পক্ষ থেকে বড় কোনো প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায়নি. আবার আওয়ামী লীগের এই জয়ের ধারা চ্যালেঞ্জ করে সিলেট সিটি করপোরেশনে বিএনপি জয়লাভ করে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে. বিএনপির প্রার্থী ভোট শেষ হওয়ার আগেই নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জনের ঘোষনা দিয়েছিলেন অথচ ফলাফল ঘোষণার পর দেখা যায় বিএনপির প্রার্থী জয়লাভ করেছে এবং মেনে নিয়েছে. তার মানে আওয়ামী লীগ গায়ের জোরে বা অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে ভোটে জেতে, সেটা সম্ভবত শতভাগ সত্য নয়.

এখন জাতীয় প্রশ্ন হচ্ছে, “আগামী জাতীয় নির্বাচনে কি হবে, কেমন হবে? জাতীয় নির্বাচন কি সিটি নির্বাচনের মডেলে হবে? ফলাফল কি হবে ৪:১?

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে এ নিয়ে বিতর্ক ও ভিন্ন মত আছে. কেউ বলেন, সিটি নির্বাচনের স্টাইলেই জাতীয় নির্বাচনও হবে. বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে ভালো, তাদের কিছু আসন দেয়া হবে. সংসদে প্রধান বিরোধী দলের সম্মান দেয়া হবে. আবার এমন কথাও শোনা যায় যে খালেদা জিয়া এ ধরনের কোনো সমঝোতায় রাজি নন. দেশে বড় ধরনের কোনো গণআন্দোলন গড়ে না উঠলে বিএনপি অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই নির্বাচনে যেতে বাধ্য হবে.

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সাম্প্রতিক একটি বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য. এরশাদ বলেছেন, ” বিএনপি যদি নির্বাচনে অংশ নেয় তাহলে তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ নির্বাচন করবেন, আর খালেদা জিয়া অংশ না নিলে তিনি বিরোধী দলের অংশ হবেন এবং ৩০০ আসনে প্রার্থী দেবেন.” এরশাদের অবস্থান পরিষ্কার. তিনি যে কোনো অবস্থায় আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকবেন (এখনো তিনি তাই আছেন) গতরাতে এরশাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে বৈঠকটি একথার সত্যতা নিশ্চিত করে.

এখন রাজনীতিতে বড় প্রশ্ন হলো “আওয়ামা লীগ কি বিএনপিকে বাইরে রেখে এবারো একটি বিতর্কিত নির্বাচনের ঝুঁকি নেবে?
বিএনপি অংশ না নিয়ে একশটি দলও যদি নির্বাচনে অংশ নেয়, তাহলে তাকে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বলে দেশের ও বিদেশের মানুষ মনে করে না. তাহলে বিএনপিকে নির্বাচনে আনার জন্য আওয়ামী লীগ কি কোনো ছাড় দেবে? শেখ হাসিনাকে যারা ঘনিষ্ঠভাবে চেনেন, তারা এটা বলেন যে খালেদা জিয়াকে ছাড় দেয়ার কোনো সামান্য ইচ্ছাও শেখ হাসিনা মনের কোণে পোষণ করেন না. প্রধানমন্ত্রী সর্বশেষ সংবাদ সন্মেলনেও স্পষ্ট করে বলেছেন. তাহলে প্রশ্ন জাগে,”বিএনপি কি আওয়ামী লীগের শর্তেই আগামী নির্বাচনে যাবে? না গেলে বিএনপির সামনে ভালো বিকল্প কি আছে?”

বিএনপি মনে করছে,  “শেখ হাসিনার সরকার এবং বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না.” তাই বিএনপি একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি জোরালোভাবে সামনে আনবে. এ ক্ষেত্রে বিএনপি আওয়ামী লীগ বিরোধী সব রাজনৈতিক শক্তির সমর্থন পাবে. কিন্তু ক্ষমতাসীন আ’লীগ এই দাবী মানবে না তা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার. তাই এখন প্রশ্ন হলো, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপির পক্ষে দেশে কোনো বড় আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব কিনা! অর্থাৎ দেশের মানুষ বিএনপির নেতৃত্বে কোনো আন্দোলনে মাঠে নামবে কিনা? অতীত অভিজ্ঞতা এটা বলে যে মানুষ বিএনপির কিছু দাবির প্রতি একাত্ম হলেও তাদের ডাকে আন্দোলনে নামে না. আবার ছাত্রদের সাম্প্রতিক অন্তত দুটি আন্দোলনে মানুষের ব্যাপক সমর্থন লক্ষ করা গেছে. তবে সেখানেও দেখা গেছে, আন্দোলন দীর্ঘমেয়াদি এবং সহিংস হয়ে উঠলে মানুষ দূরে সরে গেছে. তার মানে, মানুষ কোনোভাবেই আর অশান্তি চায় না. ভবিষ্যতে কোনো আন্দোলনের কর্মসূচি দেয়ার আগে বিএনপি এবং তার মিত্রদের মানুষের এই বিশেষ মনস্তাতিক দিকটির কথা বিবেচনায় রাখতে হবে.

বিএনপিকে এটাও মনে রাখতে হবে যে সরকারের নিয়ন্ত্রণ কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই শিথিল হয়নি. সরকারের সঙ্গে তার দল এবং দলের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন যেমন আছে, তেমনি আছে সরকারের শক্তিশালী প্রশাসন. দেশে যে কোনো অরাজকতা বা নাশকতা সৃষ্টির অপচেষ্টা কঠোরভাবে দমন করার ক্ষমতা সরকারের এখনো আছে. কোনো কোনো রাজনৈতিক পণ্ডিত একটি আপ্তবাক্য উচ্চারণ করে থাকেন যে, অত্যাচার করে কোনো সরকার ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে না. কথাটা ঠিক এবং আবার বেঠিকও. আওয়ামী লীগ একটি জনসমর্থনপুষ্ট দল. এই দল শাসন ক্ষমতায় থেকে কিছু জনবিচ্ছিন্ন হলেও প্রতিটি বাড়িতে এই দলের সমর্থক আছে.এই দলের বড় শক্তি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান. কাজেই আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হলে যে ধরনের গণজাগরণ দেশে ঘটাতে হবে সেটা করার ক্ষমতা বিএনপির নেই বলেই আমার মনে হয়. সবচেয়ে বড় কথা, বিএনপি এর আগে ক্ষমতায় ছিল. তারা যে আওয়ামী লীগের চেয়ে ভালো শাসন উপহার দিতে পারে না, এটা দেশের মানুষের অজানা নয়. আমি বিএনপি-ছাত্রদলের অনেক বড় বড় নেতাদের প্রশ্ন করেছি যে, আপনাদের দল ২০০১-০৬ পর্যন্ত ৫ বছর ক্ষমতার আমলে দেশের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে একটি প্রকল্প গ্রহন করেছে তা দেখাতে পারবেন? প্রায় সকলেই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আ’লীগ এর বিভিন্ন ব্যর্থতার কথা বলে প্রসঙ্গ পাল্টাতে তৎপর থাকে.

কিন্তু বি্এনপির বাইরেও আজ যারা আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে তারা কিন্তু দেশকে এর চেয়ে ভালো শাসন উপহার দেয়ার জন্য ব্যস্ত নয়. তাদের ব্যস্ততার কারণ বিদেশী বিভিন্ন দেশের স্বার্থসংরক্ষন এবং লুটপাটে অংশ নেয়া. এর সঙ্গে আছে জঙ্গিবাদ-সাম্প্রদায়িক শক্তির উৎপাতের আশঙ্কা. জঙ্গিবাদ এখন এক বৈশ্বিক সমস্যা. বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় শেখ হাসিনার সরকারের জিরো_টলারেন্স নীতি বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে. পশ্চিমা বিশ্বের যারা বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মুখস্ত বাক্য উচ্চারণ করছেন, তারা জঙ্গিবাদের বিপদের কথাটা মাথায় রাখছেন কিনা, সেটা একটি বড় প্রশ্ন. বাংলাদেশের মানুষ একটি ভালো নির্বাচন চায়, ভোট দেয়ার অধিকার চায়- এটা যেমন সত্য তেমনি ভোট দিয়ে এমন কাউকে ক্ষমতায় বসাতে চায় না, যারা ক্ষমতায় বসে বা তার আগেই ২০০১ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাবে.

আমাদের দেশে এক শ্রেণির তথাকথিত সুশীলসমাজ তৈরি হয়েছে যারা আওয়ামী লীগকে অগণতান্ত্রিক দল বলতে মজা পান. কিন্তু বিএনপির মতো একটি শঠতাপূর্ণ দলের গায়ে গণতন্ত্রের আলখাল্লা চড়িয়ে দিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলেন এবং মার্কিন ডলারে বেতন পেয়ে যারা দেশে সুশাসন কায়েম করতে চান, নাগরিক আন্দোলনের নামে যারা বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে খানাপিনা করে দাঁতের ফাঁকে লেগে থাকা মাংসের অংশবিশেষ খিলান দিয়ে পরিষ্কার করে দেশবাসীকে গণতন্ত্রের সবক দিতে চান তাদের মুখোশ উন্মোচন করাও এখন একটি জাতীয় কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে.

রাজনীতিবিদদের আয়ের উৎস নিয়ে যাদের মনে প্রশ্ন জাগে তাদের মনে তো দৃশ্যত রোজগারহীন সুশীলদের পাজেরো হাঁকানো এবং বিদেশিদের মেহমানদারির ব্যয়ের উৎস নিয়েও প্রশ্ন ওঠা উচিত নয় কি? তাছাড়া এই সুশীলরা সরকারের সকল কাজের শেষে ব্যর্থগুলো নিয়ে আলোচনার ঝড় তুলেন কিন্তু সমাধানের কোন পরামর্শ দিতে সক্ষম হন না. তাছাড়া তারা সরকার গঠন করলে তারা কোন কোন পথেদেশের সমৃদ্ধি ঘটাবে সে সম্পর্ক -এ কিছু বলেন না.



নির্বাচন বার্তা