[…]সম্প্রীতি বাংলাদেশের সাহসী অভিযাত্রা

সম্প্রীতি বাংলাদেশের সাহসী অভিযাত্রা

ইবার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকম:
আপডেট সময়:সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৮ , ১০:২৩ পূর্বাহ্ন
বিভাগ: এডিটরস' পিক

মুহম্মদ শফিকুর রহমান

বাংলাদেশের পূর্বপ্রান্তে ডাকাতিয়ার পাড়ের তিন বোনের বসবাস দেবী, কৃষ্ণা এবং দুর্গা। তিন বোনের নামে পাশাপাশি তিনটি গ্রাম। কৃষ্ণার নামে গ্রাম কৃষ্ণপুরে আমার জন্ম সেই মধ্য চল্লিশে (অবশ্য এখন স্থায়ীভাবে বসবাস পার্শ্ববর্তী বালিথুবায়)। আমাদের অঞ্চলে তখন হিন্দু-মুসলিম পপুলেশন মোটামুটি ৫০:৫০। উভয় পক্ষেই গরিব দিনমজুর যেমন ছিল তেমনি ধনাঢ্য সমাজপতিরও অভাব ছিল না। জমিজমা, ব্যবসা তাদের হাতেই ছিল। সমাজতন্ত্রীদের ভাষায় শ্রেণীস্বার্থে কি-না, জানি না; তবে তাদের (সমাজপতিদের) মধ্যে কখনও ঝগড়া-বিবাদ দূরের কথা মুখ কালাকালির ঘটনাও ঘটত না। হিন্দু বাড়িতে বিবাহ, পান-চিনি, পূজা-পার্বণে মুসলমান সমাজপতিরা নেমন্ত্রণ পেতেন, এমনকি আগেভাগে হাজির হয়ে প্রয়োজনীয় কাজেও সহযোগিতা করতেন। আবার মুসলমান বাড়ির বিয়েসাদি, ঈদ-মিলাদে হিন্দু সমাজপতিরাও আসতেন। উভয় পক্ষই উভয় পক্ষের বাড়িতে সাদরে আপ্যায়িত হতেন, পান-জর্দা খেয়ে বাড়ি যেতেন। আবার কোন পরিবারে জমিজমা নিয়ে বা অন্য কোন কারণে ঝগড়া-বিবাদের পর্যায়ে চলে গেলে উভয় ধর্মের সমাজপতিরা একসঙ্গে বসে মিটমাট করে দিতেন। প্রয়োজনে দোষী ব্যক্তির জন্যে শাস্তির ব্যবস্থাও ছিল। আর অপরাধ বেশি হলে সমাজপতিরা তাদের হাফপ্যান্ট আর সোলার হেট পরা পুলিশে দিয়ে দিত। ঘুষ তখনও ছিল; তবে ভাল কাজের সালামি হিসেবে, খারাপ কাজের জন্যে কাউকে ঘুষ খাওয়ানো খুব কঠিন ব্যাপার ছিল। এভাবে তখনকার সমাজে শান্তি বিরাজ করত। দারিদ্র্য ছিল কিন্তু এই দারিদ্র্য কোনভাবেই সমাজের শান্তির বন্ধন ছিন্ন করতে পারত না।

আমাদের গ্রামেও হিন্দু-মুসলিম পপুলেশন ছিল ৫০:৫০। মুসলমানদের মধ্যে মিয়া পরিবার, ভূঞা পরিবার আর হিন্দুদের মধ্যে দত্ত, মজুমদার পরিবার ছিল শিক্ষায়-সম্পদে, জনবলে সেরা। এদের জমিজমায় কাজকর্ম করে বাকি জনগোষ্ঠীর খাওয়া পরা সব চলত। আনন্দের কোন অভাব ছিল না। তরুণরা স্কুল-মাদ্রাসায় ক্লাস শেষ করে বাড়ি ফিরেই বিকেলটা কাটাত খেলাধুলায়। কাবাডি বা হাডুডু, ফুটবল, দাঁড়িয়াবাঁধা, গুড্ডি ওড়ানো, এতে গরিব-ধনী, বনেদি বা নিম্নশ্রেণীর মধ্যে কোন ভেদাভেদ ছিল না। সবাই এসব আনন্দ ভাগ করে উপভোগ করত। আমি মুসলমান, অমুক হিন্দু এটি আমাদের মনেই ছিল না। সকাল-সন্ধ্যায় যেমন মসজিদে মুয়াজ্জিন সুমধুর কণ্ঠে আযান দিতেন এবং আযানের ধ্বনি শোনা মাত্র যে যার মতো করে মসজিদ জামাতে বা ঘরে নামাজ আদায় করতেন। তেমনি মন্দিরে ঘণ্টাধ্বনি বেজে উঠলে হিন্দুরা মন্দিরের দিকে যেতে থাকত, বিশেষ করে হিন্দু কুলবধূরা দীঘির ঘাটে স্নান সেরে কলসিভরে বাড়ি ফিরে মন্দিরে দেব-দেবীর পায়ে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতেন। সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং হলো দীঘির এক পাড়ে মিয়া বাড়ির রাঙা বউ যেমন ঘড়া ভরে বাড়ি যেত অপরপাড়ে ঠাকুরবাড়ির কুলবধূ কলসি ভরে বাড়ি যেত। মাঝে মধ্যে দুইপাড়ের ঘাটলায় কোমরপানিতে নেমে তারা সুখ-দুঃখের কথা বলত। ওরা কেউ কখনও ভাবেনি বা মনে হয়নি;- এই পানি বা জল ভরে নিয়ে যাচ্ছে এর ধর্ম কি? পানি বললে মুসলমান হয়ে গেল আর জল বললে হিন্দু হয়ে গেল, এটি কারও মনে স্থান পায়নি। ‘শোনো হে মানুষ ভাই/সবার ওপরে মানুষ সত্য/তাহার উপরে নাই/’… ‘গাহি সাম্যের গান/ মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই/ নহে কিছু মহীয়ান/’… কেউ কেউ মনে করেন এরা মানুষকে ধর্মবিমুখ করেছে (?) না, আমি মনে করি ধর্মের যে মহান বাণী ‘সৃষ্টির সেরা জীব’ মানুষ, এই কথাটাই তারা বলতে চেয়েছেন।

আমাদের গ্রামে কালীবাড়িতে চৈত্র সংক্রান্তি এবং পয়লা বৈশাখের মেলা বসত। এতে দূর-দূরান্ত থেকে রাধাচক্বর নামে খেলাসহ নানান ধরনের খেলা হতো, গুড্ডি উড়তো, বেচাকেনা হতো, পয়সা দিয়ে জুয়ার ঘর বসত, মুড়ি-মুড়কি, কদমা, বাতাসা মুরালী পসরার পাশাপাশি ঘরগেরস্থালির জিনিস- হাতা, বেঁড়ি, খন্তা, কুড়াল, দা, কাস্তে, ছুরির দোকান বসত। হিন্দু গেরস্থ ঘরের বউরা এবং মুসলিম পরিবারের পুরুষরা সারা বছরের আসবাবপত্র কিনে নিয়ে যেত। বাড়ি বাড়ি পায়েস রান্না হতো। কালীবাড়িতে পয়লা বৈশাখে তিনটি পূজা হতো- শিবমন্দিরে শিবপূজা, কালীমন্দিরে কালীপূজা এবং আমলকীতলায় হতো লক্ষ্মীপূজা। পয়লা বৈশাখের কাকডাকা ভোরে লালপেড়ে গরদের শাড়ি পরে, কপালে সিঁথিতে লাল টকটকে সিঁদুর মেখে হাতের তালুতে কাঁসার থালায় পূজার প্রসাদ নিয়ে হিন্দু বধূরা খেতের আল ধরে সূর্য ওঠার আগেই কালীবাড়িতে আসতেন। দিনভর পূজা হতো। আমরাও হিন্দু বন্ধুদের সহায়তায় নাড়ু খাবার সুযোগ পেতাম। রাতে তাদের বাড়িতে লুচি-লাবড়া খাবার নেমন্ত্রণ পেতাম। ওদের মিষ্টান্ন ছিল মজার খাবার। আমরা দলবেঁধে খেতে যেতাম। সম্প্রীতির বন্ধন এত অটুট ছিল যে কেউ কোন প্রশ্ন তুলত না। এই বাংলার মানুষ প্রথম হোঁছট খেল ১৯৪৭ সালে। তখন ভারতবর্ষে ২টি বড় দল, মুসলিম লীগ ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। মুসলিম লীগের নেতৃত্বে ছিলেন মুহম্মদ আলী জিন্নাহ আর কংগ্রেসের নেতৃত্বে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। দুই দলেই আরও অনেক নেতা ছিল কিন্তু এই দুই মহারথী সবাইকে ল্যাং মেরে একক নেতায় পরিণত হন। দু’জন ছিলেন বিলেতি ব্যারিস্টার। কথিত আছে দু’জনেরই পূর্বপুরুষ ছিল গুজরাটে এবং একই পরিবারে। পরবর্তীতে একজন ধর্মান্তরিত হয়ে আলাদা হন। একজন পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত আধুনিক মানুষ মুহম্মদ আলী জিন্নাহ কায়েদ-এ আজম উপাধি ধারণ করে থিওরি দিলেন মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র চাই। যার নাম ছিল Two Nation Theory.

মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীও মহাত্মা নাম ধারণ করে কংগ্রেসের অন্য নেতাদের ল্যাং মেরে সামনে এগিয়ে এলেন এবং তৎকালীন ব্রিটিশ শাসক মাউন্ট ব্যাটনের সঙ্গে যোগসাজশ করে জিন্নাহর মতো হিন্দুদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র করার পক্ষে মত দিলেন এবং জিন্নাহ-গান্ধীর পরিকল্পনা অনুযায়ী ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে গেল। তখনকার দিনে ভারতবর্ষে সবদিকে সবচেয়ে শক্তিশালী দুটি জাতি ছিল বাঙালী আর পাঞ্জাবি। এই দুটোকে দু’ভাগ করে পাকিস্তান-হিন্দুস্তান দুই দেশের মধ্যে মিলিয়ে দুর্বল করে দেন। এই ব্যাখ্যা অনেকেরই হয়ত পছন্দ হবে না কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী নেতৃত্ব, এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আমাদের স্বাধীনতা তারই সাক্ষ্য বহন করে নয় কি?

১৯৪৭ সালে যেদিন ঞড়ি ঘধঃরড়হ ঞযবড়ৎু-র ভিত্তিতে ভারতবর্ষ ভাগ হলো সেদিন পাকিস্তানের অংশে পড়া হিন্দুরা মনে করল তাদের দেশ হিন্দুস্তান এবং ভারতের অংশে পড়া মুসলমানরা মনে করল তাদের দেশ এটা নয়, হিন্দুস্তান নয়-পাকিস্তান। কারণ, Two Nation Theory-ই রচিত হয়েছিল হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা হবে হিন্দুস্তান আর মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা হবে পাকিস্তান। যদিও ভাগ করার সময় এ নীতিও মানা হয়নি। হলে কলকাতা পূর্ববাংলায় পড়ার কথা ছিল। আর তাই ’৪৭ থেকে পূর্ববাংলার হিন্দুরা হিন্দুস্তানে এবং হিন্দুস্তানের মুসলমানরা পূর্ববাংলায় স্থানান্তর শুরু করল। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, পঁয়ষট্টির পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ হিন্দুদের দেশত্যাগ আরও বেড়ে গেল। বিশেষ করে বর্ধিষ্ণু হিন্দু পরিবারগুলো পশ্চিমবাংলা বা কলকাতায় গিয়ে বসবাস করতে লাগল। যাদের এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে এলো। অনেক ক্ষেত্রে মাতৃভূমির প্রতি টান দেশপ্রেমও কাজ করেছে। বাধ্য না হলে জন্মস্থান ছেড়ে কে যেতে চায়?

এভাবে হাজার বছরের আবহমান বাংলার সম্প্রীতি বিনষ্ট হতে হতে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকালে মুসলিম লীগের চেয়ে আরও হিংস্রভাবে সাম্প্রদায়িকতাকে সামনে নিয়ে আসে মওদুদী গোলাম আযমের দল জামায়াত-শিবির। তারা পাকিস্তানী হানাদার মিলিটারি জান্তার গণহত্যা ও নারী নির্যাতনে সঙ্গী হিসেবে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। সেই থেকে জামায়াত-শিবির-মুসলিম লীগ রাজাকার-আলবদর-আলশামস হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং জাতির পিতা হত্যার পর মিলিটারি জিয়া, মিলিটারি এরশাদ এবং সেমি মিলিটারি খালেদার ছত্রছায়ায় সাম্প্রদায়িক শক্তি আবার মাথা তুলতে শুরু করে। মিলিটারি জিয়া সাম্প্রদায়িক রাজনীতির যে চারাগাছটি রোপণ করে যান তাতে এরশাদ-খালেদারা পানি ঢেলে জঙ্গীবাদের বিষবৃক্ষে পরিণত করে তোলে, যা আজ ডালপালা গজিয়ে গোটা বাংলাদেশকে আচ্ছন্ন করতে চায়, হাজার বছরের সম্প্রীতির বন্ধন ছিঁড়তে চায়।

বাট উই আর গ্রেটফুল এ্যান্ড হান্ড্রেডস অব থাউজেন্টস থ্যাংক্স টু অলমাইটি আল্লাহ দ্য মার্সিফুল যে তিনি ঐ অপশক্তির হাত থেকে আমাদের উদ্ধার করেছেন। বাঙালী জাতির নেতৃত্বে এসেছেন বঙ্গবন্ধুরই কন্যা শেখ হাসিনা যিনি আজ আর কেবল বাংলাদেশ জাতি রাষ্ট্রেরই নেতা নন, বরং বিশ্বের অনেক বড় বড় দেশের জন্যও নেতৃত্বের উদাহরণ সৃষ্টি করে আমাদের সম্মানের আসনে স্থান করে দিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে আমরাও সম্মানিত আজ। আমরাও সাহসের সঙ্গে এগিয়ে চলেছি।

এমনি এক উদাহরণ সৃষ্টি করলেন দেশের খ্যাতিমান সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে উদ্যমী অসাম্প্রদায়িক ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ একদল বাঙালী। এঁরা মুক্তিযোদ্ধা, এঁরা বুদ্ধিজীবী, এঁরা সংস্কৃতি কর্মী, এঁরা আইনজ্ঞ, এরা ধর্মীয় নেতা, এঁরা শিক্ষক, এঁরা সাংবাদিক, এঁরা প্রগতিশীল ছাত্র, এঁরা দেশপ্রেমিক শ্রমজীবী। পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়কে ধন্যবাদ এই সময়োপযোগী উদ্যোগ ও আয়োজনটি করার জন্য। কানায় কানায় ভরা জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তথা সম্প্রীতি বাংলাদেশ নামে সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এতে আহ্বায়ক পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ডাকসুর সাবেক ভিপি মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপিকা মাহফুজা খানম, প্রফেসর ড. একে আজাদ চৌধুরী, প্রফেসর ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, প্রফেসর ড. আবদুল মান্নান, প্রফেসর ড. আনোয়ার হোসেন (সাবেক ভিসি), প্রফেসর ড. আনোয়ার হোসেন ইতিহাসবিদ, বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, আবেদ খান, হারুণ হাবীব, সংঘনায়ক শ্রদ্ধানন্দ মহাথেরো, ডাঃ সারওয়ার আলী, গোলাম কুদ্দুস এবং আরও অনেকে। শহীদ সন্তান ডাঃ নুজহাত চৌধুরীর সঞ্চালনায় জাতীয় প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে সভাপতি হিসেবে আমি (মুহম্মদ শফিকুর রহমান) একাত্মতা প্রকাশ করি।

সম্প্রীতি বাংলাদেশ-এর আত্মপ্রকাশকে স্বাগত জানানোর সঙ্গে সঙ্গে যে কথাগুলো আলোচিত হয় তার মধ্যে রয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নির্দেশিত অসাম্প্রদায়িক তথা ধর্মনিরপেক্ষতার অপব্যাখ্যার প্রশ্নটি। বঙ্গবন্ধু নিজেই বলেছেন, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়, বরং দেশের সকল মানুষ যার যার ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবে, চর্চা করবে। কিন্তু জিয়াউর রহমান থেকে খালেদা জিয়া স্বাধীনতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী জামায়াত-শিবিরকে সঙ্গে সঙ্গে এর অপব্যাখ্যা করে সমাজে, রাষ্ট্রে, মানুষে মানুষে হাজার বছরের সম্প্রীতির বন্ধনকে ভেঙ্গে ফেলে এক জঙ্গী সমাজ গড়তে চায়, যা কোনভাবেই হতে দেয়া যাবে না। সামনে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে একটু বেশি তৎপরতা লক্ষণীয়। এরই মধ্যে খুলনা ও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন হয়ে গেল, সামনে রাজশাহী, সিলেট ও বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। তারপর জাতীয় নির্বাচন। পুরো বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে এ পর্যন্ত যে দু’টি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন হয়ে গেল তাতে বিএনপি হেরে গেলেও তারা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। বিশেষ করে গাজীপুর সিটি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর দিকে তাকালে সহজে পরিষ্কার হবে- বিএনপি জেতার জন্য নির্বাচন করেনি, করেছে নির্বাচনটাকে বিতর্কিত করার জন্য। অবশ্য এছাড়া তাদের বিকল্পও নেই। স্বশিক্ষিত হোন আর অশিক্ষিত হোন; একজন নেত্রী, তিনিও দুর্নীতির দায়ে কারাগারে, তড়িঘড়ি করে দলীয় গঠনতন্ত্রের ৭ ধারা বাতিল করে পুত্র তারেককে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা হলো, তিনিও দুর্নীতির দুই মামলায় ১৭ বছরের কারাদ- মাথায় বিদেশে পলাতক, জনশ্রুতি হলো লন্ডনে। এ অবস্থায় দলের সিনিয়র নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, ড. মঈন খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কে থাকবে আগে? এ নিয়ে দলের অভ্যন্তরে দ্বন্দ্ব আছে। বাইরে থেকে যতটুকু দেখা যায় তাতে মনে হয় জামায়াত-শিবির বেষ্টিতরা এগিয়ে। তদুপরি ২০১২, ১৩, ১৪, ১৫ সালের আগুন সন্ত্রাস, ২০১৪’র নির্বাচন বর্জনের নামে পেট্রোলবোমা মেরে মানুষ হত্যা সব কিছু মিলিয়ে বিএনপি এখন অনেক পেছনে পড়ে আছে। বিএনপির সমর্থক আছে কিন্তু নির্বাচন করার মতো কর্মী নেই। দলীয় তথাকথিত সুশীল বাবুরা যতই বলুন বিএনপিকে রাস্তায় নামতে দেয়া হয় না, দিলে সব ভেঙ্গে যেত। কিন্তু মানুষ দেখছে বিএনপি প্রতিদিন জাতীয় প্রেসক্লাবে বা দলীয় কার্যালয়ে কোলাব্যাঙের মতো ঘ্যাং ঘ্যাং কম করছে না, কিন্তু জনগণ সাড়া দিচ্ছে না। তাছাড়া কেউ কাউকে রাস্তায় নামতে দেয় না, নামতে হয়। ভাবখানা এমন বিএনপিকে লালগালিচা বিছিয়ে দেবে আর তারা তার ওপর দিয়ে হাইহিল পরে হেঁটে হেঁটে সেøাগান দেবে, ‘খালেদা জিয়া জেলে ক্যানো-জবাব চাই দিতে হবে।’ সবচেয়ে বড় কথা একটি জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের আগেই দলের এক নম্বর নেতাকে তুলে ধরতে হয়। কাকে তুলে ধরবে দলটি? খালেদা-জেলে, তারেক-দন্ড মাথায় পলাতক, এরপর কে? জিয়া থেকে শুরু করে অর্জন বলতে তো বড় গোল্লা? কি নিয়ে ভোটারদের কাছে যাবে?

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের একটি কথা উড়িয়ে দেয়া যাবে না। তিনি বলেছেন, ‘কঠোর’ আন্দোলন করবেন। অর্থাৎ আন্দোলন অহিংস হবে না। তবে কি ২০১৩, ১৪, ১৫-এর মতো সহিংস, পেট্রোলবোমা, মানুষ হত্যার আন্দোলন। সম্প্রীতি বাংলাদেশ এই বিষয়াদি দেশব্যাপী তুলে ধরবে। কোনভাবে খালেদা-তারেক-জামায়াত-শিবির নেতৃত্বাধীন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ক্ষমতায় আসতে দেয়া যাবে না, এ আজকের শপথ।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, সভাপতি, জাতীয় প্রেসক্লাব ও সিনেট সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

balisshafiq@gmail.com



নির্বাচন বার্তা