[…]‘কোটা সংস্কারে অনেক জটিলতা রয়েছে’ : অধ্যাপক মীজানুর রহমান

‘কোটা সংস্কারে অনেক জটিলতা রয়েছে’ : অধ্যাপক মীজানুর রহমান

ইবার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকম:
আপডেট সময়:অক্টোবর ৫, ২০১৮ , ৬:১৭ অপরাহ্ন
বিভাগ: এডিটরস' পিক

অধ্যাপক মীজানুর রহমান
আবদুল্লাহ হারুন

≛ যারা কোটা নিয়ে আন্দোলন করেছে তাদের যোগ্যতা ও উদ্দেশ্য প্রশ্নবিদ্ধ।
≛ প্রধানমন্ত্রী সংসদে কোটা বাতিল ঘোষণা করার পর বর্তমান নেতৃবৃন্দ মাদার অব এডুকেশন বলে স্বাগত জানিয়েছিল।
≛ কোটা আন্দোলনের নেতৃত্বে রয়েছে দলীয় এজেন্টরা

কোটা সংস্কার নিয়ে মন্ত্রিসভায় যে অনুমোদন করা হয়েছে তা নতুন কোনও সিদ্ধান্ত নয়। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন— কোনও কোটা থাকবে না। মন্ত্রিসভা থেকেও বলা হয়েছিল। এই জন্য কমিটিও গঠন করা হয়েছে। এই অনুমোদন সেই ধারাবাহিকতারই ফল। যতই কোটা সংস্কারের কথা বলা হোক না কেন, এখানে অনেক জটিলতা রয়েছে।

কোটা সংস্কার আন্দোলন মূলত ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য যে ৩০ শতাংশ কোটা বরাদ্দ ছিল তার বিরুদ্ধে। অন্য কোনও কোটা নিয়ে এত কথা হয়নি। মুক্তিযোদ্ধাদের বরাদ্দ কোটা কোনোভাবেই পূরণ হচ্ছিল না। মেধা কোটা থেকে সেই কোটা পূর্ণ করা হচ্ছিল। ছাত্রদের দাবির প্রেক্ষিতে কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

২০১৮ সালে যে কোটা আন্দোলন শুরু হয় সেটি ১৯৯৭ সালের শিবিরের মুক্তিযোদ্ধা বিরোধী আন্দোলনের লিগ্যাসি। আমরা কয়েকজন শিক্ষক ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা একটি বৈঠকে আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রছাত্রীদের একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই করে দেখেছিলাম। তাতে দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনকোর্স ও অন্যান্য পরীক্ষায় তাদের ফলাফল শেষের কাতারের ছাত্রছাত্রীদের পর্যায়ের। তাদের বেশিরভাগ বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার যোগ্য নয়। তৃতীয় বিভাগ পেয়ে ভাওয়াল কলেজে ভর্তি হওয়া কিংবা উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেসবুক পেইজে পরীক্ষা আরও সহজ করার আবেদনকারীও মেধাবী দাবি করে এ কোটা আন্দোলনে নেমেছে। তাছাড়া বিভিন্ন বিষয়ে তাদের জ্ঞানের যে প্রমাণ পাওয়া গেছে তা অত্যন্ত নিম্ন পর্যায়ের। আন্দোলনের শুরুতে কোটা আন্দোলনের আহবায়ক রাশেদ খান সময় টিভিতে ২% মানুষ ৫৬% কোটা সুবিধা পাচ্ছে বলে উল্লেখ করে যে অপপ্রচার শুরু করেছিল সেটি থামে নি এখনো। তারা কিভাবে মেধাবীর সংজ্ঞা দিয়েছে সেটিও বিভ্রান্তিমূলক। যেমন: সরকারী চাকুরীতে এক লক্ষ ছাত্রছাত্রী পরীক্ষা দিলে প্রিলিতে উত্তীর্ণ হয় ২০ থেতে ৩০ হাজার। সেখান থেকে রিটেন ও ভাইবায় উত্তীর্ণ শীর্ষ পাঁচ হাজার ছাত্রছাত্রীর ক্ষেত্রে কোটা সুবিধা এপ্লাই করা হয়। প্রতিবন্ধি ও উপজাতির ক্ষেত্রে হয়তো আরেকটু বেশি ক্রমে যেতে হয়। কিন্তু এক লাখ প্রতিযোগীর মধ্যে যে পাঁচ হাজার শীর্ষে থাকে তাদের একাংশকে মেধাবী বলা, অপর অংশকে মেধাহীন বলা খুব হাস্যকর ও আপত্তিকর। তারপরও দাবি হতেই পারে, তবে বাকিদের কটাক্ষ করে নয়।

আন্দোলনের শুরুতেই অনেকে বিভিন্ন পত্রিকায় লিখে মন্তব্য করেছিলেন যে, আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীদের দাবি কখনো শেষ হবে না। আমরা দেখলাম কোটা বাতিল ঘোষণার পর তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর চাকুরিতে কোটা প্রসঙ্গ আনা হয়েছে। অথচ সে সকল চাকুরীতে অনেক ক্ষেত্রেই মেধার চেয়ে শারীরিক শক্তি যোগ্যতা হিসেবে বিবেচ্য হয়।

প্রধানমন্ত্রী সংসদে কোটা বাতিল ঘোষণার পর বর্তমান নেতৃবৃন্দ মাদার অব এডুকেশন বলে স্বাগত জানিয়েছিল। মন্ত্রী পরিষদ কোটা বাতিলের সুপারিশ করার পর সে সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করেছে বলে সংবাদ মাধ্যমে বক্তব্য দিয়েছিল। কিন্তু কোটা বাতিলের প্রজ্ঞাপন জারির পর বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, ধন্যবাদ দূরের কথা তারা কেউ হতাশ হওয়ার কথা বলেছে, কেউ বিশেষ নিয়োগ হবে এই মর্মে সমালোচনা করছে। আবার কেউ বলছে পরবর্তিতে এ সিদ্ধান্ত বাতিল করবে। অথচ যে রাজনীতির আমরা সমালোচনা করি, সেখানেও এসামশন বা এমন হতে পারে কিংবা সম্ভাবনার উপর ভিত্তি করে কখনো কোনো আন্দোলন হয় নি। এ নিয়ে কেউ কেউ হুমকি দিয়ে সংস্কারের বিষয়ে ফিরে আসছে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে কোটা নিয়ে যে আন্দোলন হয়েছে তার নেতৃত্বে রয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ধারণ করা কিছু এজেন্ট।

মেধাবীরা যদি নির্বাহী, প্রশাসনে বেশি কাজের সুযোগ পায় তাহলে উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত হবে আশা করা যায়। তবে সত্যিই তারা মেধাবী কি-না সেটা একটা প্রশ্ন। আমাদের দেশের মেধাবীদের কি বড় বড় কাজের যোগ্যতা আছে? দেশে এখন চার লাখ বিদেশি বিভিন্ন বড় বড় জায়গায় কাজ করছে। আর দেশের মেধাবীরা পুলিশ হয়ে সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার করছে।

কোটা সংস্কারের কথা বলা হয়েছিল। সেটা নিয়ে অনেক জটিলতা রয়েছে। এখন যদি জেলা কোটার কথা বলি, ধরা যাক, নীলফামারী, পঞ্চগড় বা কুড়িগ্রামের কোনও পরিবার ঢাকায় এসে ব্যবসা শুরু করল। বসবাস করতে লাগল গুলশানের মতো কোনও অভিজাত জায়গায়। ওই পরিবারের সন্তানটি পড়াশোনা করলো নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। অথচ জেলা কোটার সুবিধা নিয়ে সে নিজের এলাকার নাম লিখল কুড়িগ্রাম। যেই ছেলেটি কুড়িগ্রামে থাকল না, সেখানে পড়াশোনা করল না জেলা কোটার সুবিধা নিয়ে সেই চাকরির যোগ্যতা অর্জন করল। অথচ জেলা কোটা করা হয়েছিল জেলায় থেকে অবকাঠামোগত সুবিধা, উন্নত শিক্ষা যারা পায় নাই তাদের জন্য। যদি বলা হত, কুড়িগ্রামের জেলা কোটায় সুবিধা নিতে হলে তাকে ওই এলাকার বাসিন্দা হতে হবে ও পড়াশোনা করতে হবে তাহলে ঠিক ছিল। কিন্তু বিষয়টি সে রকম ছিল না।

অন্যদিকে আদিবাসী যে কোটা রয়েছে দেখা যাচ্ছে চাকমারাই সেই সুবিধা পাচ্ছে। এদের অনেকেই ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক, প্রশাসনের বড় অফিসার, ব্যবসায়ী হয়ে বসবাস করছে রাজধানীর গুলশান, বনানী এলাকায়। তাদের সন্তানও পড়ছে নামি জায়গায়। অথচ তারা আদিবাসী কোটার সুবিধা পাচ্ছে। অথচ কোটা করা হয়েছিল পার্বত্য অঞ্চলগুলোর সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য যারা উন্নত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত।

প্রাইমারি শিক্ষকদের ক্ষেত্রে ৬০ ভাগ নারী কোটা রয়েছে। কারণ তারা মাতৃস্নেহে শিশুদের পড়ায়। নারীদের যে কোটা রয়েছে সেটা থাকা উচিত। তা না হলে কর্মক্ষেত্রে নারীরা পিছিয়ে পড়তে পারে। প্রশাসনে মাত্র ৭ থেকে ৯ শতাংশ নারী। নারী কোটা আন্তর্জাতিক একটি বাধ্যবাধকতা।

আমাদের দেশে রেললাইন নিয়ে কাজ করে এমন কোনও ইনস্টিটিউশন নেই। সেখানে পোষ্য কোটাতে টেকনেশিয়ানরা পারিবারিক ধারাবাহিকতায় কাজ করছে। অন্যদিকে ক্লিনারদের কাজটাও একইভাবে চলছে। শাহবাগের কোটা আন্দোলনকারীরা এসব কাজ করতে যাবে না। করলেও পরিষ্কার করবে না। সুতরাং এসব ক্ষেত্রে কোটা উঠিয়ে দেওয়া যাবে না।

চাকরি ক্ষেত্রে না হোক, পড়াশোনা বা যোগ্যতা অর্জনের ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা, সুবিধাবঞ্চিতরা যাতে বৃত্তি বা বিশেষ সুবিধা পায় সেদিকে লক্ষ্য রাখা উচিত। আর অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে যদি কেউ পানি ঘোলা করতে চায় সেক্ষেত্রেও সতর্ক সজাগ থাকা উচিত।

অধ্যাপক মীজানুর রহমান, উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
আবদুল্লাহ হারুন, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।



নির্বাচন বার্তা