[…]সোনার বাংলার স্বপ্নপূরণের দায়িত্ব কাকে দেবেন?

সোনার বাংলার স্বপ্নপূরণের দায়িত্ব কাকে দেবেন?

ইবার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকম:
আপডেট সময়:নভেম্বর ২৫, ২০১৮ , ৯:০৩ পূর্বাহ্ন
বিভাগ: অভিমত

মো. জাকির হোসেন

বাঙালির হৃদয়ের মধ্য গগনে অতি সযতনে লালিত স্বপ্নের নাম সোনার বাংলা। যুদ্ধের সময় শরণার্থী হিসেবে ভারতে আশ্রয় নেওয়া এক কোটিরও বেশি মানুষ দেশে ফিরে আসছিল। দেশের ভেতরে প্রায় দুই কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। ২০ লাখ মানুষের কোনও ঘরবাড়িই অবশিষ্ট ছিল না। ছিল ব্যাপক খাদ্য ঘাটতি। তখনও বেসামরিক প্রশাসন পুরোপুরি পুনর্গঠিত ছিল না। স্বাধীন বাংলাদেশের তখন মাথাপিছু আয় ছিল ৫০-৬০ ডলারের মতো এবং তা ছিল প্রায় স্থবির। মানুষের গড় আয়ু ছিল ৫০ বছরেরও কম। বেকারত্বের হার ছিল ২০-৩০ শতাংশ। শিক্ষার হার ২০ শতাংশ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার মাইনাস ১৪ শতাংশ। স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২-৭৩ সালে বহির্বিশ্বের পরিস্থিতিও ছিল চরম প্রতিকূল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই মার্কিন প্রশাসন ‘স্মিথসোনিয়ান এগ্রিমেন্ট’ গ্রহণ করে, যার ফলে গোল্ড থেকে ডলারকে পরিবর্তন করার যে পরিমিত সমীকরণ (ইকুয়েশন) ছিল, সেটাকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। ফলে ৩ ডলারের তেলের ব্যারেল হয়ে গেল ১১ ডলার। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন গমের মূল্য ৮০ ডলার থেকে বেড়ে হয়ে গেল ২৪০ ডলার। ৮০ ডলারের প্রতি টন সারের মূল্য বেড়ে হলো ২০০ ডলার। পুরো বিশ্বে এবং উন্নত অর্থনীতিগুলোর অনেকগুলোয় নজিরবিহীন মূল্যস্ফীতি দেখা দিলো। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারত ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ছাড়া দৃঢ়ভাবে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর মতো বন্ধুর বড়ই অভাব ছিল। সব মিলিয়ে দেশটির টিকে থাকা নিয়েই শংকা ছিল।

এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলো ও বড় পরাশক্তির ধারণা হয়েছিল যে সদ্য স্বাধীনতা পাওয়া বাংলাদেশ মাথা তুলে দাঁড়াতেই পারবে না। হেনরি কিসিঞ্জারের নেতৃত্বাধীন এক কমিটি মনে করেছিল, এটি হবে আন্তর্জাতিক এক তলাবিহীন ঝুড়ি। এখানে যতই সাহায্য ঢালা হোক না কেন, তা কোনও কাজেই লাগবে না। দেশটিতে দ্রুতই দুর্ভিক্ষ ও মহামারি দেখা দেবে। ওই সময়ে সিআইএ’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এত অল্প জায়গায় এত মানুষের বাস এবং এত দারিদ্র্যের কারণে দেশটি তার প্রতিবেশী এবং বিশ্বের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে। এমনি এক চ্যালেঞ্জিং সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেন বঙ্গবন্ধু। মুক্ত স্বদেশে পা রেখেই ঘোষণা করেন, মাটি ও মানুষকে কাজে লাগিয়েই তিনি ‘শ্মশান বাংলাকে সোনার বাংলায়’ রূপান্তর করবেন। সোনার বাংলা বলতে বঙ্গবন্ধু কী নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন? তাঁর সোনার বাংলার মূল দর্শন ছিল শোষণমুক্ত, ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত এক সমাজ। সংবিধানের প্রস্তাবনায় তাই শোষণমুক্ত, সমাজতান্ত্রিক এক সমাজ গঠনের অঙ্গীকার করা হয়। যেখানে বলা হয়েছে, নাগরিকদের মানবাধিকার, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য ও সুবিচার নিশ্চিত করা হবে। এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পন্থাও সংবিধানে সংযোজন করেন বঙ্গবন্ধু। সংবিধানের ১৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয়, সমবায়ী এবং ব্যক্তিমালিকানায় সম্পদের বণ্টন ব্যবস্থা করা হবে। সংবিধানের ১৪ ও ১৫ অনুচ্ছেদে খেটে খাওয়া কৃষক, শ্রমিক ও পিছিয়ে পড়া জনগণকে শোষণ থেকে মুক্ত করা এবং পরিকল্পিত উপায়ে রাষ্ট্রে উৎপাদনশীল শক্তির বিকাশ ঘটিয়ে নাগরিকদের জীবন মান উন্নত করে খাদ্য, বস্ত্র, আবাসন, শিক্ষা ও চিকিৎসার অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

সোনার বাংলা গড়তে সংবিধানের ১৬ অনুচ্ছেদে আরও নিশ্চয়তা বিধান করা হয়েছে যে, নগর ও গ্রামাঞ্চলের জীবনযাত্রার মানের বৈষম্য ক্রমাগতভাবে দূর করার উদ্দেশ্যে কৃষি বিপ্লবের বিকাশ, গ্রামাঞ্চলে বৈদ্যুতিকরণের ব্যবস্থা, কুটিরশিল্প ও অন্যান্য শিল্পের বিকাশ এবং শিক্ষা, যোগাযোগ-ব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের আমূল রূপান্তর সাধনের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সোনার বাংলা গড়তে শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের গুরুত্ব অনুধাবন করে বঙ্গবন্ধু সংবিধানের ১৭ ও ১৮ অনুচ্ছেদে বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক শিক্ষার পাশাপাশি জনগণের পুষ্টির স্তর-উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতিসাধনকে রাষ্ট্র অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য বলে ঘোষণা করেছেন। আর ১৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়, নাগরিকদের সবাইকে সমান সুযোগের ব্যবস্থা করবে রাষ্ট্র।

হৃদয়ে ও সংবিধানে সোনার বাংলাকে ধারণ করে বঙ্গবন্ধু অতি অল্প সময়ের মধ্যে দেশটির ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ করে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার শক্ত পাটাতন তৈরি করতে মনোযোগী হলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ যখন মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে ঠিক তখনই কিছু মানুষ পরিকল্পিতভাবে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়। তথাকথিত বৈজ্ঞানিক রাজনৈতিক আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য মানুষ হত্যা, অরাজকতা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংসের মতো অবৈজ্ঞানিক পন্থা বেছে নেয়। এরা পাঁচজন সংসদ সদস্যসহ কয়েক হাজার মানুষকে হত্যা করে, ঈদের জামাতে হামলা করে, পাটের গুদামে আগুন ধরিয়ে দেয়, রেললাইন ধ্বংস করে, সার কারখানা ধ্বংস করে, জাহাজ ডুবিয়ে দেয়। হেনরি কিসিঞ্জার বঙ্গবন্ধুর সরকারের বিরুদ্ধে খাদ্যাস্ত্র ব্যবহার করে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো বঙ্গবন্ধুবিরোধী রাজনৈতিক দল-উপদলকে বঙ্গবন্ধুর সরকারকে উৎখাতের জন্য অর্থ ও অস্ত্র সাহায্য দেন। Stanley Wolpert তাঁর ‘Zulfi Bhutto of Pakistan’ গ্রন্থে দালিলিক প্রমাণসহ লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের কয়েকটি বামপন্থী দল ও স্বাধীনতাবিরোধীদের পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো অর্থায়ন করতেন।’ অন্যদিকে ১৯৭৩ সালে গোলাম আযম পূর্ব-পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি গঠন করে সোনার বাংলা পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে মুজিব সরকারের বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করে। বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য ভুট্টো ও তার এজেন্টরা উঠেপড়ে লাগে।

ভয়ানক প্রতিকূলতা ও ষড়যন্ত্রকে পাশ কাটিয়ে অর্থনীতি সবে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল। ১৯৭৫ সালের শুরু থেকে কৃষি উৎপাদন ও রফতানি বাড়ছিলে, মূল্যস্ফীতি কমে আসছিল। সত্যি কথা বলতে, সোনার বাংলার পথে যাত্রা শুরু করেছিল বাংলাদেশ। ঠিক তখনই সোনার বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টাকে সপরিবারে হত্যা করা হলো। সোনার বাংলার স্বপ্নকে সমূলে উপড়ে ফেলতে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সারথী জাতীয় চার নেতাকে জেলখানায় নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সহযোদ্ধাদের হারিয়ে সোনার বাংলার স্বপ্নরাই কেবল নয়, বাংলাদেশ নিজেও পথ হারিয়ে ফেললো। বাংলাদেশে দুঃস্বপ্নের মতো ফিরে আসলো নাজায়েজ পাকি স্বপ্ন। দীর্ঘ সময় পর বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে পথহারা বাংলাদেশ ও সোনার বাংলার স্বপ্নরা আবার নিজ ঠিকানা খুঁজে পেয়েছে। বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বে স্বপ্নের সোনার বাংলা দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় উদ্বেগ প্রকাশ করে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল এ দেশ কোনও দিন মাথা তুলে দাঁড়াতেই পারবে না। বরং দারিদ্র্যের কারণে দেশটি তার প্রতিবেশী এবং বিশ্বের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

আজ যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, জাপান, ফ্রান্স, কানাডা, ইতালি, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিশ্বের ১০০টি দেশের যে ব্র্যান্ড ইমেজের তালিকা তৈরি করা হয়েছে, সেই একই কাতারে বাংলাদেশকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ব্র্যান্ড ফাইন্যান্স-এর সদ্য প্রকাশিত ‘নেশন ব্র্যান্ডস ২০১৮’ প্রতিবেদন অনুযায়ী ১০০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান হয়েছে ৩৯তম। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ব্র্যান্ড ইমেজ নির্ভর করে সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর। বিশ্ববাজারে এটি একটি বড় সম্পদ। ইমেজ ভালো থাকলে বিনিয়োগ বাড়ে, রফতানিতে গতি সঞ্চার হয় এবং পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়ে। ব্র্যান্ড ইমেজে নজিরবিহীন উত্থান নয়, বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের রোল মডেল। বঙ্গবন্ধু কন্যা সাংবিধানিক অঙ্গীকার মাথায় রেখে বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক দর্শনকে সুদৃঢ়ভাবে রূপায়ণ করে চলেছেন বলেই বাংলাদেশের উন্নয়ন ধারাটি বিশ্বজুড়ে রোল মডেল হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। আর সেই কারণেই শিশুমৃত্যু, মাতৃমৃত্যু, নারীর ক্ষমতায়ন ও গড় আয়ুর মতো সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ পাশের দেশ ভারতসহ উন্নয়নশীল বিশ্বের চেয়ে অধিকতর অর্জনের অধিকারী হতে পেরেছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিশুমৃত্যু, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ইত্যাদি বিষয়ে ১৫৭টি সদস্য রাষ্ট্রের ওপর বিশ্বব্যাংকের করা নতুন জরিপে মানবসম্পদ সূচকে (হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনডেক্স) বাংলাদেশ ভারত ও পাকিস্তান থেকে এগিয়ে গিয়েছে। মানবসম্পদ উন্নয়নে এগিয়ে থাকার পর ক্ষুধা দূর করার ক্ষেত্রেও ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়েছে বাংলাদেশ।

সম্প্রতি প্রকাশিত ‘বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক-২০১৮’-তে এ তথ্য মিলেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় তিন ধাপ পিছিয়েছে ভারত; গত বছর ভারতের অবস্থান ছিল ১০০ নম্বরে, এবার ১০৩ নম্বরে। ভারতের চেয়েও তিন ধাপ পেছনে ১০৬ নম্বরে রয়েছে পাকিস্তান। অন্যদিকে, দুই ধাপ এগিয়ে বিশ্বের ১১৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ এবার ৮৬তম, গত বছর ছিল ৮৮তম। বিশ্বের উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোর সুষম উন্নয়ন সূচকে প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে অনেক এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। দ্রুত সময়ের মধ্যে দারিদ্র্য হ্রাসে বাংলাদেশের সাফল্যকে জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংক মডেল হিসেবে বিশ্বব্যাপী উপস্থাপন করেছে। সামাজিক সূচকগুলো ছাড়াও অর্থনৈতিক সূচকেও বাংলাদেশের অর্জন ঈর্ষণীয়। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩-১৬ সময়কালে ভারতের মাথাপিছু আয় যেখানে বেড়েছে ০.১৩ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে তা বেড়েছে .৩৯ শতাংশ। অর্থনৈতিক অগ্রগতির সূচকে বিশ্বের শীর্ষ ৫টি দেশের একটি বাংলাদেশ। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন প্রায় ৮ লাখ কোটি টাকারও বেশি। যা জিডিপির ভিত্তিতে বিশ্বে ৪৪তম এবং ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে ৩২তম। ধারাবাহিকভাবে ৬.৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি ধরে রেখে পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপার্স-এর রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বের ২৯তম ও ২০৫০ সাল নাগাদ ২৩তম অর্থনীতির দেশে উন্নীত হবে। অবশ্য লন্ডনভিত্তিক এইচএসবিসি-র বৈশ্বিক গবেষণার এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির ভিত্তিতে ২৬তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হবে বাংলাদেশ।

গত ১০ বছরে সব সামাজিক সূচক উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় মাথাপিছু আয় বেড়েছে ১৪৯.০৭ শতাংশ। এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ, বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট। সারা দেশেই আড়ালে-আবডালে ঘটে চলেছে অভাবনীয় বিপ্লব। উন্নয়ন, উৎপাদন, প্রযুক্তিতে দেশের ঈর্ষণীয় অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। একের পর এক সম্ভাবনার হাতছানিতে বাংলাদেশ দৌড়িয়ে নয়, লাফিয়ে এগুচ্ছে। জিঞ্জিরা শিল্প, ধোলাইখাল ব্র্যান্ড, বগুড়ার ফাউন্ড্রি শিল্পসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ব্যতিক্রমী সাফল্যের পর কৃষিক্ষেত্রেও নীরব বিপ্লব অর্জিত হয়েছে। দেশীয় প্রযুক্তিতে উদ্ভাবন ও উৎপাদিত ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ দেশের চাহিদা মিটিয়ে এখন বিশ্ববাজারেও ঠাঁই পেয়েছে। রেল-বিমানের যন্ত্রাংশ, মোবাইল ফোনসেট, ফ্রিজ, টিভি, গাড়ি থেকে শুরু করে সমুদ্রগামী জাহাজ পর্যন্ত তৈরি হচ্ছে দেশে। শিক্ষা, প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যায় কমিউনিটি হেলথ ক্লিনিক, ক্ষুদ্র উদ্যোগে অর্থায়ন ও প্রশিক্ষণ এবং গ্রামে বিদ্যুতায়নসহ বহুবিধ কর্মসূচির প্রভাব গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে সামাজিক উন্নয়নের গতিকে ত্বরান্বিত করেছে। বাংলাদেশ এখন ধান উৎপাদনে পৃথিবীতে চতুর্থ। হেক্টরপ্রতি ধান উৎপাদনে বৈশ্বিক গড়কে পেছনে ফেলতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। শুধু ধান নয়, গম ও ভুট্টা উৎপাদনেও বিশ্বের গড় উৎপাদনকে পেছনে ফেলে ক্রমেই এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। সবজি উৎপাদনে তৃতীয়। বিশ্বে ফল উৎপাদন বৃদ্ধির হারের ভিত্তিতে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের প্রথম। বাংলাদেশ আম উৎপাদনে বিশ্বে সপ্তম এবং পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম স্থানে উঠে এসেছে। মাছ চাষে বাংলাদেশ এখন শুধু স্বয়ংসম্পূর্ণই নয়, ১০ বছর ধরে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি দেশের মধ্যে রয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ২০১৫-এর প্রতিবেদন অনুসারে, মিষ্টি পানিতে মাছ উৎপাদনে বিশ্বে পঞ্চম এবং চাষের মাছ উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ। সব মিলিয়ে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিজমি কমতে থাকাসহ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও বৈরী প্রকৃতিতেও খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উদাহরণ। গ্রামীণ অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত হওয়ায় গ্রাম ও শহরের পার্থক্য ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। আর এভাবেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা নির্মাণ এগিয়ে চলেছে।
সংবিধানের বিধান অনুযায়ী আবারও জনগণের সামনে পালা এসেছে দুটো বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের– এক. তারা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা চান কিনা? দুই. সোনার বাংলার নির্মাণকে আরও এগিয়ে নিতে কাকে দায়িত্ব দেবেন? নির্বাচনের দিনক্ষণও নির্ধারণ হয়েছে। এবার জনগণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা, সোনার বাংলা নির্মাণ অব্যাহত রাখতে কাকে নির্বাচিত করবেন, বঙ্গবন্ধু কন্যাকে না অন্য কাউকে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি বিষয় স্মরণ রাখতে হবে, বাজারে সোনার তৈরি জিনিসের পাশাপাশি সোনার প্রলেপ দেওয়া গোল্ড প্লেটেড জিনিসও বিক্রি হয়। যাচাই করে দেখতে হবে যারা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তারা সোনার বাংলা নির্মাণের, না সোনার প্রলেপ দেওয়া ‘গোল্ড প্লেটেড’ বাংলাদেশ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। তবে একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, বঙ্গবন্ধু বিদ্বেষীদের সঙ্গে ঐক্য করে আর যাই হোক সোনার বাংলা নির্মাণ করা মোটেও সহজ হবে না।
লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল: zhossain@justice.com



নির্বাচন বার্তা