[…]কে এই কালা ফিরোজ!

কে এই কালা ফিরোজ!

ইবার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকম:
আপডেট সময়:সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৯ , ১০:২২ পূর্বাহ্ন
বিভাগ: জাতীয় সংবাদ

শফিকুল আলম ফিরোজ এক যুগ আগেও সন্ত্রাসী কালা ফিরোজ নামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে পরিচিত ছিল। হত্যা, খুন, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, আদম ব্যবসা ও সোনা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত এই কালা ফিরোজ। সময়ের পালাবদলে অপরাধ জগতের এই ত্রাস বিএনপি থেকে দল বদল করে হয়ে যায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা। এ ছাড়াও তিনি জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বায়রার সিনিয়র সহসভাপতি। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চাঁদপুর-৫ (শাহরাস্তি-হাজীগঞ্জ) আসনের নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচনের জন্য ব্যাপক চেষ্টা-তদবির চালিয়েছিল।

১৯৮১ সালে কয়েকটা মামলার ফেরারি আসামী হ্‌ওয়ার কারণে সৌদি আরবে পাড়ি জমান ফিরোজ। পরবর্তিতে দেশে ফিরে মিডল ইস্টে লোক পাঠানোর কাজ শুরু করেন। এক সময় তার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে বিএনপির সাংসদ ও নেতা সিলভার সেলিম ও লুৎফুজ্জামান বাবরের সঙ্গে। যুক্ত হন বিএনপির রাজনীতিতে। পেশিশক্তির জোরে বিদেশ পাঠানোর নামে কয়েক হাজার মানুষকে নিঃস্ব করে ফিরোজ। বাবর ও সিলভার সেলিমের সূত্রে জড়িয়ে পড়েন সোনা চোরাচালানের সঙ্গেও।

আন্ডারওয়াল্ডের সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে জমি দখল ও চাঁদাবাজিতেও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অংশীদার হয়। ফার্মগেট এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হান্নান র‍্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হলে কিছূদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকলেও বাবরের গ্রিন সিগনাল পেয়ে আবার সক্রিয় হন ফিরোজ। আদম ব্যবসা করার সূত্রে সুইডেন আসলামের ভগ্নিপতি নুরুল ইসলামের সঙ্গে সম্পর্কের সুবাদে হুন্ডি ব্যবসা ও ফুওয়াং ক্লাবের অনুসরণে কলাবাগান ক্লাবে জুয়া চালু করে।

শফিকুল আলম ফিরোজ কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে বন্দি সাজিদুল ইসলাম ইমন ও বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী তানভিরুল ইসলাম জয়ের হয়ে কাজ করছিলেন। কৃষকলীগ করলেও আওয়ামী লীগ-বিএনপি—উভয় দলের সঙ্গেই এখনো তার সুসম্পর্ক রয়েছে। ধানমণ্ডি বিএনপির সেক্রেটারি রবিউল ইসলাম রবি ও যুবলীগ উত্তরের এক নেতার সহযোগিতায় কালা ফিরোজ শীর্ষ সন্ত্রাসী জয় ও ইমনের হয়ে চাঁদাবাজির কাজটি দেখভাল করত। এই শীর্ষ সন্ত্রাসীরা বিদেশ থেকে টেলিফোনে যাদের কাছে চাঁদা দাবি করত, পরবর্তী সময়ে কালা ফিরোজসহ অন্য সহযোগীরা সেই টাকা আদায়ের কাজটি সম্পন্ন করত। টাকা না দিলে হুমকি অনুসারেই অ্যাকশন শুরু হতো। কালা ফিরোজ শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের চাঁদাবাজির ক্যাশিয়ার ছিল বলেও জানা যায়। শুধু জয় বা ইমন নয়, শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ও মুরগি মিলনসহ অনেকের সঙ্গেই সেই সময়ে সরাসরি যোগাযোগ ছিল কালা ফিরোজের। জনশক্তি রফতানি বা ট্রাভেলস ব্যবসার আড়ালে ফিরোজ মূলত আন্ডারওয়ার্ল্ডের ভয়ঙ্কর ডনদের সঙ্গে মিলেমিশে রাজধানীর সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করত। ২০০৬ থেকে পরবর্তী সময়ের বেশ কিছু জাতীয় দৈনিকগুলোতে এসব তথ্য সংবলিত নানা খবর বা প্রতিবেদনও প্রকাশ হয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৬ সালের ১৪ মে সন্ধ্যায় পরীবাগের জনশক্তি রফতানি ও ট্রাভেলস এজেন্সি ‘দি তুর্কি অ্যাসোসিয়েটসে’ চাঁদা না দেওয়ায় এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে একজনকে হত্যা ও ছয়জনকে গুলিবিদ্ধ করে আহত করে দুর্বৃত্তরা। পরে এ ঘটনায় রমনা থানায় হত্যা মামলা হলে সেই মামলায় দুই নম্বর আসামি করা হয় আজকের এই কৃষক লীগ নেতা শফিকুল আলম ফিরোজ ওরফে কালা ফিরোজকে। এ ছাড়া এ মামলায় এক নম্বর আসামি করা হয়েছিল ফিরোজের ভাই শমসের আলম নসুকে। ‘দি তুর্কি অ্যাসোসিয়েটসে’র তৎকালীন নিরাপত্তা কর্মকর্তা মঞ্জুরুল আলম বাদী হয়ে মামলাটি করেছিলেন। এ মামলায় বলা হয় চাঁদাবাজি ও ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে শীর্ষ সন্ত্রাসী জয়ের হয়ে কালা ফিরোজ ও জয়ের সহযোগীরা ওই সশস্ত্র হামলা ও হত্যাকাণ্ড ঘটান।

আরও জানা যায়, ২০০০ সালের ২২ সেপ্টেম্বর আন্ডারওয়ার্ল্ডের এক সময়ের ভয়ঙ্কর ডন হুমায়ুন কবির ওরফে মুরগি মিলন আদালতে একটি মামলায় হাজিরা দিয়ে বের হলে শত শত জনতার সামনেই গুলি করে হত্যা করা হয় তাকে। এ ঘটনায় কলকাতা থেকে গ্রেফতার করে ফিরিয়ে আনা আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছিল মুরগি মিলন একজন যুবলীগ নেতার আশীর্বাদপুষ্ট ছিল। ফলে আওয়ামী লীগের সরকারের ওই সময়ে মুরগি মিলন বিমানবন্দর থেকে শুরু করে গোটা রাজধানীর অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করত। এ কারণে যুবদলের এক প্রভাবশালী নেতার ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা সেভেন স্টার বাহিনী ও স্বর্ণ চোরাকারবারী চক্র কোণঠাসা হয়ে পড়ে। এসব কারণেই কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর সমন্বিত পরিকল্পনায় হত্যা করা হয় মুরগি মিলনকে। আর এই হত্যাকান্ডের ব্যয় হিসেবে স্বর্ণ চোরাচালানীরা ৬০ লাখ টাকা খরচ করেছিল। এই টাকা সন্ত্রাসীদের পক্ষে গ্রহণ করেছিলেন এই শফিকুল আলম ফিরোজ ওরফে কালা ফিরোজ।

ক্যাসিনো অভিযানে গ্রেফতারকৃত খালেদ ও জিকে শামীমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণ হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচারে সহায়তা করা ও বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কাছে টাকা পৌঁছে দিতে সহযোগিতা করার মাধ্যমে।

আদম ব্যবসা, হুন্ডি ও ক্যাসিনো ছাড়াও কালা ফিরোজের অন্যতম প্রধান ব্যবসা ছিল ইয়াবা। ঢাকার প্রায় সবগুলো ক্যাসিনোতে এবং প্রভাবশালী যুবদল ও যুবলীগ নেতাদের কাছে ইয়াবা সরবরাহ করতো কালা ফিরোজ। এছাড়া ধানমন্ডি ও কলাবাগান এলাকার নির্মান কাজ থেকে শুরু করে নারী ব্যবসার জন্যও চাদা দিতে হয় ফিরোজকে। আর ফিরোজের মাধ্যমে এ টাকা চলে যায় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কাছে।

সম্প্রতি কালা ফিরোজের আটকের ঘটনায় হতভম্ব অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও। খালেদ ও শামীমের মতো কালা ফিরোজের সহযোগিরাও গা ঢাকা দিয়েছে। ফিরোজের মত আন্ডারওয়ার্ল্ড বা নিষিদ্ধ জগতের ব্যক্তিদের সাধারণ যে বৈশিষ্ট্যটি মিলে যায় তা হচ্ছে এরা সর্বদলীয় ব্যক্তি। আওয়ামী লীগ, বিএনপি যখন যে দলই আসুক না কেন স্রোতে ভেসে সরকারি দলে আশ্রয় নেয়। টাকার জন্য জামাত নেতাদের সঙ্গে আপোষ করতেও কোনো সমস্যা হয় না তাদের।



ফিচার

অপরাধ বার্তা