[…]জামায়াতের ভাড়া করা ব্রিটিশ আইনজীবীর প্রতিবেদনেই অভিযুক্ত জামায়াত

জামায়াতের ভাড়া করা ব্রিটিশ আইনজীবীর প্রতিবেদনেই অভিযুক্ত জামায়াত

ইবার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকম:
আপডেট সময়:অক্টোবর ১৮, ২০১৯ , ৭:৫৭ অপরাহ্ন
বিভাগ: এডিটরস' পিক

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরুর পর জামায়াতে ইসলামী তার সর্বোচ্চ ক্ষমতা ব্যবহার করে বিচার বন্ধের চেষ্টা চালায়। প্রায় কয়েক হাজার কোটি টাকার বাজেট নিয়ে ইংরেজি, আরবী, উর্দু ও ফ্রেঞ্চ সহ বিভিন্ন ভাষায়ও ব্যাপকভাবে প্রচারণা চালানো হয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান, মিশর, ভারত ও তুরস্কে লবিস্ট নিয়োগ করা হয়। এছাড়া ইখওয়ানুল মুসলিমিন ও একেপার্টি সহ জামায়াতে ইসলামীর সহযোগী সংগঠনগুলোও সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এ সকল প্রচারণায় সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল
ব্রিটিশ আইনজীবী জিওফ্রে রবার্টসনের প্রতিবেদন ‘রিপোর্ট অন দ্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস অব বাংলাদেশ’।

‘বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের ফাঁসি’ বন্ধ করার আহ্বান করেছিলেন ব্রিটিশ আইনজীবী রবার্টসন এবং ‘১৯৭১ সালে অনেক মুক্তিযোদ্ধাও মানবতাবরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন’ এমন দাবি করে চালানো প্রোপাগান্ডার শিকার হয়েছিল বাংলাদেশের গণমাধ্যমও। বিশেষ করে, মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত নেতাদের দল জামায়াতও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয় এবং তাদে্র দলীয় ওয়েবসাইটে তা প্রকাশও করে। আড়াল হয়ে যায় জামায়াত নেতাদের স্বাধীনতার বিরোধিতা, খুন, ধর্ষণ ও পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সঙ্গে গণহত্যায় জড়িত থাকার তথ্য।

রবার্টসনের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়, ‘ইন্টারন্যাশনাল ফোরাম ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’ ব্যানারে। তার প্রতিবেদনের শুরুতেই সংস্থাটির ওয়েবসাইটের লিংক দেওয়া থাকলেও বাস্তবে তা অকার্যকর।

সম্প্রতি রবার্টসন বলেছেন, মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা বিদেশি আইনজীবীদের একটি সংগঠনের অনুরোধে তিনি ‘রিপোর্ট অন দ্য বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল’ শীর্ষক প্রতিবেদন সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপন করেন।

জানা যায়, মীর কাশেমের সঙ্গে বৃটিশ একটি লবিস্ট ফার্মের ১৯ কোটি মার্কিন ডলারের চুক্তি হয়। ব্রিটিশ আইনজীবী জিওফ্রে রবার্টসনের বিশেষ ভাবমূর্তি থাকায় তার সূত্র উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারণা চলে। এই প্রচারণার সূত্র ধরে আন্তর্জাতিক আরও কিছু সংস্থা ও ব্যক্তিবর্গের সমর্থন লাভে সমর্থ হয় জামায়াত। ২০১৫ সালে বৃটিশ আইনজীবীর প্রতিবেদন প্রকাশের চার বছর পর এ বিষয়টি আলোচনায় এসেছে কারণ আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের কিছু সীমাবদ্ধতা নিয়ে যে পর্যবেক্ষণ ছিল, জামায়াত ও তার লবিস্ট ফার্ম শুধু সেটি নিয়েই বড় পরিসরে প্রোপাগান্ডা চালিয়েছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে উক্ত প্রতিবেদনে জামায়াতের যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার কথাও যে উল্লেখ করা হয়েছে, তা বলা হয় নি একবারও।

ব্রিটিশ আইনজীবী বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং এর বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশের পর তা গ্রন্থ আকারে প্রকাশের উদ্যোগ নেয় জামায়াত।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগে সমর্থন দেন এবং ফান্ড সংগ্রহের চেষ্টা করেন। ডা. শফিকুর রহমান গ্রন্থটি প্রকাশের অনুমতি দেন। বইটি আরবী ভাষায়ও অনুবাদ করা হয়।

গ্রন্থ প্রকাশের পর এ বছরের শুরুর দিকে জামায়াত নেতাদের কেউ-কেউ প্রশ্ন তোলেন, খোদ জামায়াতের বিরুদ্ধেই লিখেছেন ব্রিটিশ আইনজীবী। বিষয়টি সামনে আসার পরই দলের ভেতরে সমালোচনা শুরু হয়।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের একাধিক সদস্য জানান, প্রথম থেকে এই প্রতিবেদনটি বই আকারে প্রকাশের পেছনে সেক্রেটারি জেনারেল শফিকুর রহমানের ভূমিকার কথাই জানতেন তাদের অনেকে। এই বছর বিষয়টি নিয়ে দলের ভেতরে সমালোচনা শুরু হওয়ার একপর্যায়ে তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ। দুই সদস্যের এই তদন্ত কমিটিতে আছেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ ও মোবারক হোসেন।

জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির সদস্য, জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, ‘আমি এই বিষয়ে কথা বলতে বিব্রত হচ্ছি। এ নিয়ে কোনও কথা বলতে পারবো না।’

জামায়াত নিয়ে কী আছে রবার্টসনের প্রতিবেদনের ভূমিকায়?

ব্রিটিশ আইনজীবী জিওফ্রে রবার্টসন ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভূমিকাতেই উল্লেখ করেছেন, জামায়াত ১৯৭১ সালে পাকিস্তান আর্মিকে সহযোগিতার পাশাপাশি স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে।

প্রতিবেদনের ৯ নম্বর পৃষ্ঠায় তার ভূমিকায় রবার্টসন লিখেছেন, ‘সরকার ইস্যুটিকে পুনরায় সামনে নিয়ে আসতে খুব আগ্রহী ছিল না। যদিও ‘জনতার আদালতে’ কিছু প্রমাণ উঠে আসে এবং কয়েকজন পাকিস্তানি জেনারেল ও তাদের বাংলাদেশি সহযোগীকে তাদের অনুপস্থিতিতে মানবতাবিরোধী অপরাধী হিসেবে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। এই জনতার আদালতের কোনও আইনগত প্রভাব ছিল না। জামায়াত নেতারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সমর্থন দেওয়ার পাশাপাশি স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছেন। ৭১ এ গণহত্যা, ধর্ষণ ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের দায় জামায়াত এড়াতে পারে না।

রবার্টসনের প্রতিবেদন নিয়ে জামায়াতের বক্তব্য:

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ‘রবার্টসনের প্রতিবেদনের সঙ্গে জামায়াতের কোনও সম্পর্ক ছিল না’ বলে দাবি করেন দলটির ইউরোপের মুখপাত্র ব্যারিস্টার আবু বকর মোল্লা।

বৃহস্পতিবার (১৭ অক্টোবর) রাতে বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জিওফ্রে রবার্টসনের বাংলাদেশের মানবতাবিরোধী অপরাধ নিয়ে যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, এর সঙ্গে জামায়াতের কোনও সম্পর্ক নেই।

‘তাহলে জামায়াত তদন্ত কমিটি করেছে’ এই ব্যাপারে আপনি কী বলেন—এমন প্রশ্নের উত্তরে ব্যারিস্টার আবু বকর বলেন, ‘এটা কেন করবে, সেটা আমার জানা নেই।’

রবার্টসনের আর কোনো তদন্ত প্রতিবেদন ও বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে তার ব্যক্তিগত সহকারী সাবরিনা বোদরা বলেন, ২০১৫ সালের ওই প্রতিবেদনের ওপর মিস্টার রবার্টসন পরবর্তী সময়ে কোনও ফলোআপ প্রকাশ করেননি।



ফিচার

কর্মসংস্থান

অপরাধ বার্তা