পল্লী বিদ্যুতায়ন কার্যক্রম বিঘ্নিত কেন

13 views

বাংলাদেশের একটি অনিন্দ্য সুন্দর আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জনকারী সেবামূলক কার্যক্রম হলো পল্লী বিদ্যুতায়ন কার্যক্রম এবং তা বাস্তবায়নে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড ও পল্লীবিদ্যুৎ সমিতিসমূহ। যে কোনো দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের সূচক নির্ধারিত হয় বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ দিয়ে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ উন্নয়ন সূচকের নিম্নমান দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের এ দশা থেকে উত্তরণের জন্য ১৯৭৭ সালে পল্লী বিদ্যুতায়ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। এ কার্যক্রম গ্রহণের লক্ষ্যে প্রখ্যাত এক আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক সমীক্ষা করে প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয় তখন। প্রতিবেদনে গ্রামীণ বিদ্যুতায়নের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে চমৎকারভাবে বিবৃত। যে দেশের প্রায় ৮০ ভাগ লোক গ্রামে বাস করে, বার্ষিক প্রবৃদ্ধির ৬৭ শতাংশ ভাগ প্রকৃত অর্থে গ্রামীণ অর্থনীতির অবদান, তথা গ্রামীণ এলাকার অর্থনীতি তথা উৎপাদন প্রক্রিয়ার টানাপোড়েন জাতীয় বিপর্যয় ঘটে, সে এলাকার উন্নয়নই যে জাতীয় উন্নয়নের এক বর্ণাঢ্য বিকাশ ঘটবে, সে কথা ওই সমীক্ষায় স্পষ্ট হয়ে বেরিয়ে এসেছিল।

উল্লেখ্য, পল্লি এলাকায় বিদ্যুতায়ন কার্যক্রম সম্প্রসারণ যে জাতীয় উন্নয়নের চাবিকাঠি, সে বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃত হলেও তখন পর্যন্ত দেশের সমগ্র বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত একটি মাত্র প্রতিষ্ঠানই নিয়োজিত ছিল আর তা হলো বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো)। দুর্নীতি আঁকড়ে নিমজ্জিত থাকায় তার দ্বারা যে এ মহান গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারবে না, তা সর্বদাই বিবেচনায় ছিল। তৎকালে বিউবোর আওতায় ‘পল্লী বিদ্যুৎ কার্যক্রম’ নামে একটি গুরুত্বহীন ও ছোট পরিদপ্তর থাকলেও তার অনেকটা ‘ঢাল নেই, তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার’-এর মতো এক নিভু নিভু প্রদীপের দুর্বল সলতে পল্লির প্রতি এক নিদারুণ অবহেলারই জানান দিচ্ছিল। তথাপি সরকারের নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে পল্লিতে বিদ্যুতায়ন কার্যক্রম বৃদ্ধিতে বিউবোর আগ্রহ ও সক্ষমতা সম্পর্কে জানতে চাইলে চটজলদি এ প্রতিষ্ঠানটি এ কাজে সরাসরি অক্ষমতা প্রকাশ করে। নীতিনির্ধারকরা প্রারম্ভিকভাবে একটি মননশীল চিন্তার পথচিহ্ন খুঁজে পান। এরই ফলে একটি স্বনামধন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশে পল্লী বিদ্যুৎ কার্যক্রমের সম্ভাবনা, ফলাফল, ধরন, প্রকৃতি, গ্রামীণ জনবল ও অর্থনীতিসহ আর্থসামাজিক উন্নয়নে এর প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে একটি সমীক্ষা প্রণয়ন করতে নিয়োগ দেয়, যা আগেই বিধৃত হয়েছে। সে বিষয়ে তাদের ব্যাখ্যাসহ পল্লী বিদ্যুতায়ন কার্যক্রমের একটি বর্ণনা নিচে বিধৃত করার চেষ্টা হলো। ১৯৭৭ সালে একটি অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে এ কার্যক্রম শুরু করা হয়।

বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে সুপারিশকৃত শুরুর দিকে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড গঠনের ধরনটি ছিল এক চমৎকার মিশেল। সুপারিশ অনুযায়ী গঠন করা হয় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, যা একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান; যার প্রধান হবেন একজন চেয়ারম্যান এবং এতে তিনজন পূর্ণকালীন সদস্য ও তিনজন খণ্ডকালীন সদস্য থাকবেন। তিনজন খণ্ডকালীন সদস্য হবেন তিনটি সংস্থা থেকে। একজন বিউবো, একজন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন ও একজন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র শিল্প উন্নয়ন সংস্থা থেকে। উদ্দেশ্য খুব স্পষ্ট। ঘোষণা অনুযায়ী, পল্লী বিদ্যুৎ প্রাথমিকভাবে শুধু বিউবো থেকে বিদ্যুৎই কিনবে না, এরই মধ্যে পল্লী এলাকায় বিউবো কর্তৃক স্থাপিত যেসব বিদ্যুৎ বিতরণী লাইন, উপকেন্দ্র ও স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে এবং বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত ও অপরিকল্পিতভাবে নকশা ব্যতিরেকে লাইন ও যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়েছে, তার প্রয়োজনীয় অংশ পল্লী বিদ্যুতের কাছে অবচয়িত মূল্যের বিনিময়ে হস্তান্তর প্রক্রিয়া সহজ ও সাবলীল করার জন্য বিউবোর সদস্যের অন্তর্ভুক্তি যেমন প্রয়োজন, তেমনি গ্রামীণ কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্প সম্প্রসারণের জন্য লোড চাহিদা নিরূপণ ও নকশা প্রণয়নে প্রয়োজন ছিল বিসিকের একজন সদস্যের অন্তর্ভুক্তি এবং অন্যতম প্রধান ও পবিবোর মূল কার্যক্রম কৃষির ব্যাপক ও বর্ণাঢ্য সম্প্রসারণে কৃষিতে বিদ্যুতের যৌক্তিক ব্যবহারে বিএডিসির নিবিড় সহযোগিতার জন্য এ সংস্থার অন্তুর্ভুক্তিকে বিবেচনায় আনা হয়। আর তিনজন পূর্ণকালীন সদস্য পবিবোর সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত থাকবেন, এর মধ্যে একজন সদস্য (প্রকৌশলী), একজন সদস্য (পবিস ও প্রশিক্ষণ) ও একজন সদস্য (অর্থ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

পূর্ণাঙ্গ সংস্থাটিতে প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, পরিচালক, নির্বাহী প্রকৌশলী এবং তাদের অধীন বিভিন্ন কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়ে প্রায় এক হাজার জনবল নিয়ে গঠিত। পরবর্তীকালে কিছু তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তর ঢাকার বাইরে পবিবো কর্তৃক বিভিন্ন জোনে বিদ্যুৎ বিতরণ স্থাপনাসহ ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের জন্য পদায়ন করা হয়। এ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বাস্তবায়নের প্রধান যে আকর্ষণ তা হলো, বিতরণ ব্যবস্থা পরিচালনা করার জন্য গড়ে আট-নয়টি উপজেলা নিয়ে এলাকাভিত্তিক বিদ্যুৎ বিতরণ সমিতি গঠন করা, যে সমিতির সদস্য হবেন অত্র এলাকায় বসবাসকারী বিদ্যুৎ ভোক্তারা।

যদিও শুরুতে মাত্র ১৩টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি (পবিস) নির্মাণের মাধ্যমে পল্লী বিদ্যুতায়ন কার্যক্রম শুরু করেছে তবে অদ্যাবধি পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড ৮২টি সমিতি নির্মাণ করেছে। এখানে পবিবো ও পবিসের মধ্যে সম্পর্ক হলো পবিবো হলো পবিসগুলোর নীতিনির্ধারক সংস্থা (Regulatory Organisation)। পবিবো পবিসের এলাকা গঠন, গ্রাহক সদস্য অন্তর্ভুক্তিতে সহায়তাকরণ ভৌত অবকাঠামোসহ বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণের নকশা প্রণয়নে পূর্ত ও বৈদ্যুতিক পরামর্শক নিয়োগের পদক্ষেপ, ভৌত অবকাঠামো বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্র ও বিতরণ লাইন স্থাপনের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ, বিউবো থেকে পবিসের নির্মিত উপকেন্দ্র ও বিতরণ লাইন সংযোগে পবিসকে সহযোগিতা করা, পবিস নির্মাণ ও স্থাপনে সরকার থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ ঋণ হিসেবে সংগ্রহ করে পবিসে কাছে ১ শতাংশ সার্ভিস চার্জের ও ঋণের বিপরীতে ২ শতাংশ সুদ অর্থাৎ মোট ৩ শতাংশ সুদ হারে পবিসকে প্রদান (তৎকালে)। সর্বধরনের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এ ছাড়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে মহাব্যবস্থাপকসহ অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ সহায়তা, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে এলাকা পরিচালক নির্বাচনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা ইত্যাদি। উল্লেখ্য, পবিবো এসব কাজে পবিসসমূহের নির্ধারিত নীতিমালার ভিত্তিতে সহযোগিতা করে থাকে। পবিস নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রতিটি সমিতি নীতিমালা অনুসরণ করে বিদ্যুৎ বিতরণ পরিচালন, সংরক্ষণ, গ্রাহক সংযোগ, বিল আদায়, বিউবো/পিজিসিবিকে বিদ্যুৎ কেনার বিপরীতে বিল প্রদান করে। প্রতিটি সমিতির এলাকাকে ১৫-১৬টি ভাগ করে প্রতিটি এলাকা থেকে একজন এলাকা পরিচালক অত্র এলাকার নিয়মিত ও ‘বৈধ’ বিদ্যুৎ গ্রাহকদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হবেন। পরিচালকরা পবিস ও বিদ্যুৎ বিতরণের জটিল বিষয় সম্পর্কে ধারণাগুলো জনগণের তথা সমিতির বিদ্যুৎ গ্রাহকদের কাছে সহজবোধ্য ও স্বচ্ছ করে তোলেন।

কোনো গ্রাহক কখন বিদ্যুৎ সংযোগ পাবেন, কোন এলাকায় কখন লাইন নির্মাণ হবে, কোথায় উপকেন্দ্র বসবে এবং লাইন নির্মাণের ঠিকাদারদের কাজে গুণগতমান নিয়ন্ত্রণসহ নিত্যদিনে পরিচালন, সংরক্ষণ ও কারিগরি সমস্যা সমাধানে পবিবো এবং সংশ্লিষ্ট সমিতি কর্তৃক নিয়োগকৃত বৈদ্যুতিক পরামর্শক পবিসের মহাব্যবস্থাপক ও নিয়োজিত জনবলের দ্বারা গঠিত পরিচালনা পর্ষদের নিয়ন্ত্রণে থেকে একটি নির্ভরশীল, উঁচুমানসম্পন্ন এবং টেকসই বিতরণ ব্যবস্থা নির্মাণ করা হয়।

সমিতি ও পবিবো কর্তৃক পারস্পরিক সহযোগিতার ফলে গড়ে ওঠা পল্লী বিদ্যুতায়ন কার্যক্রমকে বলা যেতে পারে একটি ‘স্বচ্ছ দ্বায়বদ্ধ সাংগঠনিক রীতিনীতির প্রতিফলনে আদর্শ প্রতিষ্ঠানের চালচিত্র’। তবে এ কার্যক্রমে শুরু থেকেই যে সংকটটি সাংগঠনিকভাবে গঠিত ও পরিচালিত এ আদর্শ প্রতিষ্ঠানকে দুমড়েমুচড়ে ফেলছে, তা হলো অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, পবিবো অর্ডিন্যান্সে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা থাকলেও প্রথম থেকেই পবিবো তথা পবিসসমূহকে বিউবো থেকে সরবরাহকৃত মানহীন, গুণহীন, অনিয়মিত ও ক্লান্তিহীন লোডশেডিংয়ের শিকারে নাস্তানাবুদ হতে হয়েছে। এ সমস্যারও একটি সুন্দর সমাধান আছে। পরবর্তী সংখ্যায় এ নিয়ে লিখব।

(প্রথম অংশ)

লেখক: সাবেক মহাপরিচালক, পাওয়ার সেল, বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়

Leave a Comment

Ebarta24.com

Heading Title