মানুষকে বাঁচাতে প্রকৃতির অবদান

12 views

সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে বর্তমান পর্যন্ত পৃথিবীতে যত নগর বা শহরের প্রতিষ্ঠা ও উন্মেষ হয়েছে, তার বেশিরভাগই নদী কেন্দ্র করে। নদী হলো মায়ের মতো। মা যেমন সন্তান জন্ম দিয়ে তিলে তিলে বড় করে তোলেন; নদীও তেমনি মানুষের প্রয়োজনে নিজ তীরকে দান করে প্রতিষ্ঠা করে নগর। নদীর তীরে ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে নগর। নগরে বাস করে মানুষ। মানুষের অশুভ চাওয়ার কারণে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে নদী। ঠিক যেমন করে প্রতিষ্ঠিত সন্তান কখনো কখনো মায়ের অবদান ভুলে প্রসূতিকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে কুণ্ঠিত হয় না, তেমনি মানুষও নগরের প্রসূতি নদীকে দখল, দূষণ; এমনকি মেরে ফেলতেও কুণ্ঠিত হয় না। আমাদের প্রাণের শহর ঢাকা ঠিক কবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে, তা স্পষ্ট করে বলা না গেলেও এ কথা স্বীকার্য যে—ঢাকা বুড়িগঙ্গা নদীকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠা ও উন্মেষ লাভ করেছে। সুতরাং স্পষ্ট করে বলছি, বুড়িগঙ্গা ঢাকা শহরের জন্মধাত্রী ‘মা’। প্রতিষ্ঠা থেকে উন্মেষে সর্বদা বুড়িগঙ্গা তার রত্নভান্ডার উন্মুক্ত করে রেখেছে। নগরবাসী তাদের জীবনধারণের অত্যাবশ্যকীয় উপাদান বুড়িগঙ্গা নদী থেকে সংগ্রহ করে জীবন বাঁচিয়েছে, জীবন সাজিয়েছে, কোনোকালেও কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেনি বরং বিবেকের দৈন্য প্রকাশ করে নির্বিচারে দূষণে মত্ত থেকেছে।

আজ বুড়িগঙ্গার উৎসমুখ লুপ্ত। বাকিটুকু জীর্ণশীর্ণ হয়ে কোনোমতে টিকে আছে। নদীর প্রাণ পানি। দুঃখের বিষয় বুড়িঙ্গার পানি অত্যন্ত দূষিত। দুর্গন্ধযুক্ত। নিচের দিকটা দেশের বৃহত্তম নৌপথের অংশ হওয়ায় এখন পর্যন্ত প্রশস্ততা ও গভীরতা ঠিক আছে। আমার জন্মস্থান চাঁদপুর হওয়ায় বহুবার এ-পথে গমন করেছি। দূষিত বুড়িগঙ্গাকে নিজ চোখে দেখেছি কিন্তু কখনো তার বেদনা অনুভব করিনি। ২০১৮ সালের পর স্ত্রীকে নিয়ে বুড়িগঙ্গায় নৌ-ভ্রমণে গিয়েছিলাম। অর্ধাঙ্গিনী পানিতে স্পর্শ করে বলেছিলেন, পানি দূষিত ও দুর্গন্ধযুক্ত। পরক্ষণে মাঝির সঙ্গে এ ব্যাপারে আলাপ করি। মাঝি স্পষ্টত বলল, আমার জন্ম বুড়িগঙ্গার তীরে। শৈশব ও কৈশোর এখানে কেটেছে। আরও বলল, ১৯৭০-৮০ দশকে তীরবাসী গৃহস্থালি কাজে এ নদীর পানি ব্যবহার করত। আমরা দিনভর জলকেলিতে মত্ত থাকতাম। আমি নদীর অবদান অনুমান করতে পারলাম এবং নিজেকে বুড়িগঙ্গার তীরের একজন বালক হিসেবে কল্পনা করে, দুটি লাইন লিখতে সমর্থ হলাম।

তব করুণ রোদন কলতানে শুনি, বাঁচাও বাঁচাও বলা আহ্বান ধ্বনি

এককালের প্রমত্তা বুড়িগঙ্গার আজ দূষিত ভাগাড়, তীরবাসী স্বচক্ষে সে দৃশ্য প্রত্যক্ষ করছে কিন্তু তার করুণ বোদন অনুভব করছে না। প্রশ্ন হলো কেন ও কীভাবে বুড়িগঙ্গা মৃত্যু পথযাত্রী হলো? উত্তর হলো শিল্পবিপ্লবের কুফল ও মানুষের অশুভ চাওয়া। মূল সংগঠক বাংলাদেশের অপরিকল্পিত শিল্প (চামড়া, পোশাক ও অন্যান্য)। আমরা শিল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের উৎপাদক অর্থাৎ উন্নত বিশ্বের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে পোশাক, প্রক্রিয়াজাত চামড়া ও অন্যান্য পণ্য তৈরি করি। শিল্পের রাসায়নিক মিশ্রিত পানি ও অন্যান্য বর্জ্য সরাসরি নদীর পানিতে মিশ্রিত হয়ে পানি দূষিত হচ্ছে। উন্নত বিশ্ব কোনোমতেই এর দায় এড়াতে পারে না, এ ক্ষেত্রে আমাদের উচিত ভোক্তা অধিকার আইন অনুসরণ করে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ চাওয়া। দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশের কোনো সরকারই তা চায়নি। বর্তমানে বুড়িগঙ্গা যে পরিস্থিতিতে আছে, তা অত্যন্ত জটিল (তীরজুড়ে অপরিকল্পিত শিল্প ও আবাসন তলজুড়ে পলিথিন ও অন্যান্য আবর্জনা, রাসায়নিকমিশ্রিত পানি) একটা জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একমাত্র সাকার মাছ ছাড়া অন্য কোনো দেশি মাছ বেঁচে আছে বলে আমার বিশ্বাস হয় না। বুড়িগঙ্গার হারানো গৌরব ঢাকা নগর ও নগরবাসীর প্রয়োজনেই ফিরিয়ে আনা দরকার। দেশের অনগ্রসর প্রযুক্তি এবং দেশবাসীর অযাচিত চাওয়া সে ক্ষেত্রে বড় বাধা। এমতাবস্থায় জাতিসংঘের সুদৃষ্টি প্রত্যাশা করছি। একমাত্র জাতিসংঘই পারবে বুড়িগঙ্গার জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে একটি পরিকল্পিত পুণ্যতোয়া বুড়িগঙ্গা উপহার দিতে। এ ক্ষেত্রে প্রধান উপদেষ্টার সময়োচিত পদক্ষেপ কামনা করছি এবং পুনরুজ্জীবিত পুণ্যতোয়ার স্বীকৃতি আদায় করতে বিনীত অনুরোধ করছি। ফলে দেশবাসী উপকৃত হবে এবং বিশ্বের সব দূষিত নদী উদ্ধারের পথ সুগম হবে।

 

  • এম. রাকিব, জুনিয়র অফিসার
  • বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ফান্ড লিমিটেড

Leave a Comment

Ebarta24.com

Heading Title