রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ০৬:৪৮ অপরাহ্ন
শীর্ষ সংবাদ

সাধারণ নেতাকর্মীদের মতামতের মূল্য নেই বিএনপিতে

ইবার্তা ডেস্ক
আপডেট : সোমবার, ২৫ জানুয়ারী, ২০২১

মেয়াদ উত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে চলছে বিএনপি

দলের সাধারণ নেতাকর্মীদের মতামত উপেক্ষা করে রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি চলছে মেয়াদউত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে। দলটির বর্তমান নির্বাহী কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে আরও দুই বছর আগে। তারপরও নতুন কমিটি গঠনের কোন চেষ্টা নেই। ইতোমধ্যেই ৫৯২ সদস্যের বর্তমান কমিটির পদে থাকা কেউ কেউ মারা গেছেন। অনেকে আবার দলে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছেন। যারা সক্রিয় আছেন তারাও দলীয় কর্মকাণ্ডে খুব একটা মনোযোগী নন। সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা সর্বস্তরে দলের নতুন কমিটি গঠনের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু বর্তমান নির্বাহী কমিটিতে থাকা কিছু প্রভাবশালী নেতার কারণে নতুন কমিটি গঠনের কোন উদ্যোগ নেই। বছর দুয়েক আগে দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া কারাগারে বন্দী থাকা অবস্থায় তার নির্দেশে নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়ে কিছু নেতা সক্রিয় হলেও এক পর্যায়ে তা থেমে যায়। এর পর আরও কয়েকবার এমন উদ্যোগ নিয়েও তাতে সফল হতে পারেননি দলের নেতারা। যতবারই সাধারণ নেতাকর্মীরা নতুন কমিটি গঠনের বিষয়ে সোচ্চার হয়েছেন ততবারই দলীয় হাইকমান্ড বিভিন্ন কৌশলে তাদের থামিয়ে দিয়েছেন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে পরাজয়ের পরপরই দলের কিছু সিনিয়র নেতা নির্বাহী কমিটির সভা ডেকে হোক আর কাউন্সিল করে হোক বিএনপির নতুন নির্বাহী কমিটি গঠনের দাবিতে সোচ্চার হন। সারাদেশের তৃণমূল পর্যায় থেকেও তাদের এ দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী। অপরদিকে নির্বাচন কমিশন থেকেও বিএনপিকে নতুন নির্বাহী কমিটি গঠনের তাগিদ দেয়া হয়। বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবীরাও সর্বস্তরে মেয়াদউত্তীর্ণ কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে নতুন কমিটি গঠনের কথা বলে। কিন্তু দলের কিছু প্রভাবশালী নেতার কারণে এখন পর্যন্ত নতুন নির্বাহী কমিটি গঠন করার পথে অগ্রসর হতে পারেনি।

বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দলটির নির্বাহী কমিটিতে স্থান পেতে অনেক নেতা ক’বছর ধরে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। কিন্তু তাদের এই অপেক্ষার পালা কবে শেষ হবে কেউ তা জানে না। তবে এ পরিস্থিতির কারণে দলের অনেক নেতা হতাশ ও নীরব হয়ে গেছেন। আর এ হতাশা ও নীরবতা দলের ভবিষ্যত রাজনীতির জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছে।

সূত্র মতে, বিএনপির পরবর্তী নির্বাহী কমিটিতে স্থান পেতে দলটির দুই শতাধিক নেতা অপেক্ষায় রয়েছেন। তাদের সঙ্গে অপেক্ষায় রয়েছেন সংস্কারপন্থী কিছু বিএনপি নেতাও। অনেত আগেই তাদের দলীয় হাইকমান্ড পরবর্তী কমিটিতে স্থান দেয়ার আশ্বাস দিয়ে রেখেছেন। এ ছাড়া যারা ৫৯২ সদস্যের বর্তমান নির্বাহী কমিটির অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন এমন নেতারাও ভাল ভাল পদে যাওয়ার জন্য নতুন কমিটির অপেক্ষায়। তাই অন্য রাজনৈতিক দল যথাসময়ে কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠন করলেও বিএনপি এখনও না করায় এসব পদ প্রত্যাশী নেতারা সিনিয়র নেতাদের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন। তবে হাইকমান্ড নাখোশ হতে পারে ভেবে তারা প্রকাশ্যে কিছুই বলছেন না। তবে যে কোন সময় তারা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পারেন।

বিএনপির একটি অঙ্গ সংগঠনের সাবেক প্রভাবশালী এক নেতা নাম প্রকাশ না করে জনকণ্ঠকে বলেন, ২০১৬ সালে বিএনপির সর্বশেষ নির্বাহী কমিটিতে বিভিন্ন কারণে স্থান না পেলেও পরবর্তী কমিটিতে স্থান পাওয়ার আশ্বাস পেয়ে অপেক্ষায় রয়েছি। কিন্তু ৩ বছরের কমিটি ৫ বছর সময় পার করলেও নতুন নির্বাহী কমিটি গঠনের কোন উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। এ কারণে আমার মতো অনেকের মধ্যেই হতাশা বিরাজ করছে। কবে নতুন কমিটি হবে এমনটিও জানতে পারছি না। তাই এখন কি করব বুঝতে পারছি না। তবে আমরা চাই দ্রুত মেয়াদউত্তীর্ণ কমিটি পুনর্গঠন করে দলকে গতিশীল করা হোক।

বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুসারে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির মেয়াদ ৩ বছর। ২০১৬ সালের মার্চ মাসে ৫৯২ সদস্যের বর্তমান নির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়। সে হিসেবে বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে আরও ২ বছর আগেই। ২০১৯ সালে কমিটি পুনর্গঠনের কথা থাকলেও খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে দায়িত্বে থাকা দলীয় হাইকমান্ডের অনুমতি তখন পাওয়া যায়নি। খালেদা জিয়া কারাবন্দী থাকায় এ ব্যাপারে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান অনুমতি দেননি। আর গত প্রায় ১০ মাস ধরে দেশে চলছে করোনাভাইরাস মহামারী। এ পরিস্থিতিতে দলীয় হাইকমান্ড বিএনপির নতুন নির্বাহী কমিটি করতে চায় না। আর কবে নতুন কমিটি করতে পারবে এমন আশ্বাসও নেতাকর্মীদের দেয়া হচ্ছে না কৌশলগত কারণে। কারণ, অনেক দেরিতে নতুন কমিটি হবে এমন খবর জানতে পারলে বর্তমানে মোটামুটি সক্রিয় আছেন এমন নেতাকর্মীরাও দলীয় কর্মকাণ্ডে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবেন এমটিই মনে করা হচ্ছে।

বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া কারাগার থেকে সাময়িক মুক্ত হলেও এখন তিনি দলীয় রাজনীতি নিয়ে ভাবছেন না। সরকারের নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে সাময়িক মুক্তি পেয়ে গুলশানের বাসা ফিরোজায় অবস্থান করলেও তিনি দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন না। দু’একবার দলের কয়েকজন নেতা তার সঙ্গে দেখা করতে গুলশানের বাসায় গেলেও তিনি দলীয় রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে তেমন আগ্রহ প্রকাশ করেননি। এছাড়া মুক্তির মেয়াদ না বাড়লে আর মাত্র ২ মাস পর তাকে আবারও কারাগারে চলে যেতে হবে। তাই আবারও মুক্তির সময় বাড়িয়ে নেয়া যায় কি না সে চেষ্টায় রয়েছেন তিনি। আর এ কারণে আপাতত দলের নতুন কমিটি গঠনের বিষয়ে তিনি আগ্রহ দেখাবেন না এটিই স্বাভাবিক।

এদিকে লন্ডন প্রবাসী বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে তিনি দেশে আসতে চান না। তাই তিনিও চান না তার অনুপস্থিতিতে বিএনপির নতুন নির্বাহী কমিটি হোক। তারেক রহমান না চাওয়ায় তার অনুসারী নেতারও চান না এখন বিএনপির নতুন নির্বাহী কমিটি হোক। আর এ কারণেই বিএনপির পরবর্তী নির্বাহী কমিটি কখন হবে তা দলের কোন পর্যায়ের নেতারাই বলতে পারছেন না।

জানা যায়, নতুন কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ রক্ষা করা কঠিন হতে পারে ভেবে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে একটি অংশ আপাতত কমিটি পুনর্গঠনের বিপক্ষে। কারণ, বিগত ৫ বছরের কর্মকাণ্ডের কারণে তারা ত্যাগী নেতাদের তোপের মুখে পড়তে পারেন এবং নতুন কমিটিতে নিজেদের নাম লেখাতে ব্যর্থ হতে পারেন এমন আশঙ্কা রয়েছে তাদের মনে। এ কারণেই তারা তারেক রহমানকে নতুন নির্বাহী কমিটি না করার জন্য অনুরোধ করেছেন বলে জানা যায়।

সূত্র মতে, শুধু যে বিএনপির নির্বাহী কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ তাই নয়। দলটির কেন্দ্র থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত সব কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ। এর ফলে দলের সার্বিক কার্যক্রম স্থবির। এ অবস্থার অবসান করে দলকে গতিশীল করতে বিভিন্ন স্তরে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি পুনর্গঠন করার কোন উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। তবে সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের চাপের মুখে কয়েক মাস আগে তারেক রহমান এক ভার্চুয়াল সভায় বিএনপির সিনিয়র নেতাদের সর্বস্তরে দলের মেয়াদউত্তীর্ণ কমিটি পুনর্গঠনের নির্দেশ দেন। কিন্তু তার এ নির্দেশ এখনও আলোর মুখ দেখেনি।

জানা যায়, তারেক রহমান নিজেই আপাতত দলের পুনর্গঠন চান না। আর তাই সিনিয়র নেতাদের নিয়ে ভার্চুয়াল সভায় সর্বস্তরে দল পুনর্গঠনের বিষয়ে তার দেয়া নির্দেশটি লোক দেখানো ছিল। আর এটি বুঝতে পেরেই দলের কিছু নেতা কিছুদিন এ নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করে পরে থেমে যায়। এ কারণে দলের সাধারণ নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বিএনপি সমর্থক বুদ্ধিজীবীরাও হতাশ হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।

বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পরও সর্বস্তরে দলের কমিটি পুনর্গঠন করতে না পারায় সাধারণ নেতাকর্মীরা সাংগঠনিক কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এর ফলে সব পর্যায়ে দলীয় কর্মকাণ্ড ঝিমিয়ে পড়েছে। বিশেষ করে দেশে করোনা পরিস্থিতি শুরুর পর দলের অবস্থা আরও নাজুক হয়ে পড়ে। যে কারণে বিএনপি এখন কোন কর্মসূচীর ডাক দিলেও তা পালন করতে কোন স্তরের নেতাকর্মীরাই এগিয়ে আসে না। এর ফলে দলের সব কর্মসূচীই ফ্লপ হচ্ছে। এ নিয়ে দলীয় হাইকমান্ড ক্ষুব্ধ হলেও কৌশলগত কারণে কাউকে কিছু বলছেন না।


আরও সংবাদ