রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১:৩২ অপরাহ্ন
শীর্ষ সংবাদ
শেখ হাসিনাকে জন্মদিনে মোদী পাঠালেন ফুল, চীনের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন পঁচাত্তরের খুনিদের দায়মুক্তি অধ্যাদেশ “ধর্ষিত” মামুনের স্ক্রিনশপ জালিয়াতি ফাঁস : ইলিয়াস সহ সুশীলদের কটাক্ষ জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ : বিশ্ব সভায় বাংলা ভাষার প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্ব গার্ডিয়ানে প্রকাশিত শেখ হাসিনার নিবন্ধ: ‘আ থার্ড অফ মাই কান্ট্রি ওয়াজ জাস্ট আন্ডারওয়াটার। দ্য ওয়ার্ল্ড মাস্ট অ্যাক্ট অন ক্লাইমেট’ হেফাজতের কর্তৃত্ব যাচ্ছে দেওবন্দের কাফের ঘোষিত জামায়াতের কব্জায় ! অনলাইনে মিলছে টিসিবির পেঁয়াজ আজ টিউলিপ সিদ্দিকের জন্মদিন বাংলাদেশের সঙ্গে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়াতে চায় যুক্তরাষ্ট্র প্রধানমন্ত্রীকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ফোন

পরিবারতন্ত্রের কবলে ব্যাংকিং খাত

ইবার্তা ডেস্ক
আপডেট : বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮

বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোয় পরিবারতন্ত্র জেঁকে বসতে শুরু করেছে। নতুন আইনের বলেই ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের সদস্যদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। এই আইন অনুযায়ী ব্যাংকগুলো এখন থেকে পরিচালক নিয়োগ করতে পারবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ইতোমধ্যে একটি সার্কুলার জারি করা হয়েছে। অনেকেই বলেছেন, ব্যাংকের পর্ষদে পরিবারতন্ত্রের ভর এ খাতে সুশাসনের জন্য অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ব্যাংকে পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠারই জয় হয়েছে। পরিচালকরা নতুন আইনের মধ্যে থেকেই ক্ষান্ত হননি, কোনো কোনো ব্যাংকের পর্ষদে নতুন আইন লঙ্ঘন করে আরও বেশি পরিচালক নিয়োগ করা হয়েছে।

আগে কোনো ব্যাংকে একই সময়ে একই পরিবারের দুজনের বেশি পরিচালক থাকতে পারতেন না। তারা টানা দুই মেয়াদ অর্থাৎ তিন বছর করে ছয় বছর থাকতে পারতেন। নতুন আইনে কোনো ব্যাংকে একই সময়ে একই পরিবারের চারজন পরিচালক থাকতে পারবেন। তারা টানা তিন মেয়াদ অর্থাৎ নয় বছর থাকতে পারবেন। এর ফলে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোয় পরিবারের কর্তৃত্ব বাড়বে। বাধাগ্রস্ত হবে সুশাসনব্যবস্থা।
দেশের বিশিষ্টজনদের তীব্র আপত্তি উপেক্ষা করে পরিচালকদের দাবির মুখে ১৬ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে এই আইন পাস করা হয়। গত ২৮ জানুয়ারি প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে এটি কার্যকর করা হয়েছে।

পরিবার আইনেরও রয়েছে নানা ফাঁকফোকর। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী পরিবারের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘স্বামী বা স্ত্রী, পিতা, মাতা, পুত্র, কন্যা, ভাই ও বোন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল সবাই অন্তর্ভুক্ত।’ এখানে ভাই বা বোনের ছেলে, ভাইয়ের স্ত্রী, বোনের স্বামী, বাবার ভাই ও বোন, নাতি-নাতনি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। আইনের এই দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে একাধিক পরিবার। কিন্তু এর বাইরে নানাভাবে পরিবারের সদস্যদের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যা আইনগতভাবে পরিবারের আওতায় আসছে না। কিন্তু তারা একই পরিবারের সদস্য। এ ছাড়া কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবেও অনেককে পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যা একই গ্রুপের প্রতিনিধিত্ব করছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র দেবাশিস চক্রবর্ত্তী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক আগেই ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের সেই আদেশের ওপর আদালতের স্থগিতাদেশ রয়েছে। বিষয়টি এখন আদালতে বিচারাধীন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আইনে পরিবারতন্ত্রের ক্ষেত্রে ব্যাপক ছাড় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আইনের লঙ্ঘন করে এবং আইনের ফাঁকে আরও বেশি পরিচালক থাকলে তার বিরুদ্ধে ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককে কালক্ষেপণ করা মোটেই উচিত হবে না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আইনের ফাঁক গলে একই পরিবারের সদস্যরা ব্যাংকের পরিচালক পদে আসীন হলেও তারা ব্যাংকের নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না। গোষ্ঠী বা ব্যক্তির স্বার্থের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেন। এতে পর্ষদে কলহ দেখা দেয়, ঘাটতি পড়ে সুশাসনে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, পরিচালকদের নিজেদের দাবি আইনে পরিণত হলেও সে আইনও ভেঙেছে দুটি ব্যাংক। বেসরকারি খাতে প্রথম প্রজন্মের ন্যাশনাল ব্যাংকে ১৩ সদস্যের পর্ষদের মধ্যে একই পরিবারের আছে ছয়জন এবং সিটি ব্যাংকে ১৩ সদস্যের পর্ষদের মধ্যে একই পরিবারের পাঁচজন সদস্য পরিচালক হিসেবে রয়েছেন।

আইন পাস হওয়ার আগে থেকেই ন্যাশনাল ব্যাংকের ১৩ সদস্যের পর্ষদের চেয়ারম্যান, তার স্ত্রী, মেয়ে, দুই ছেলে ও নাতি পরিচালক হিসেবে রয়েছেন। এর মধ্যে ব্যাংকের চেয়ারম্যান হচ্ছেন জয়নুল হক সিকদার। পর্ষদের সদস্য হিসেবে রয়েছেন তার স্ত্রী মনোয়ারা সিকদার, মেয়ে পারভীন হক সিকদার, ছেলে রিক হক সিকদার, রন হক সিকদার ও নাতি জোনাস সিকদার খান।

সিটি ব্যাংকে এর সাবেক চেয়ারম্যানের দুই ছেল এবং তিন ছেলের স্ত্রীসহ মোট পাঁচজন পরিচালক পদে রয়েছেন। পারটেক্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা এমএ হাশেম দ্য সিটি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান। বর্তমানে তিনি নিজে ওই ব্যাংকে পরিচালক পদে নেই। তবে তার দুই ছেলে এবং তিন ছেলের স্ত্রীসহ মোট পাঁচজন পরিচালক পদে রয়েছেন। ব্যাংকটিতে পরিচালক পদে রয়েছেন এমএ হাশেমের ছেলে আজিজ আল কায়সার ও তার স্ত্রী তাবাসসুম কায়সার, আরেক ছেলে রুবেল আজিজ ও তার স্ত্রী সৈয়দা শাহরিন আজিজ এবং আরেক ছেলে আজিজ আল মাহমুদের স্ত্রী সাবেরা এইচ মাহমুদ।

বর্তমানে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকে (ইউসিবি) পরিচালক পদে থাকা পারটেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান এমএ হাশেম বলেন, ব্যাংক কোম্পানি আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে অধিক পরিচালক আমার পরিবার থেকে নেই। ছেলের স্ত্রী বা ভাইয়ের স্ত্রী পরিবারের সদস্যের অন্তর্ভুক্ত হয় না। দুই ছেলে ও তিন ছেলের স্ত্রীরা পরিচালক পদে থাকলেও এতে আইন লঙ্ঘিত হয়নি।

পারটেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান এমএ হাশেম নিজে রয়েছেন ইউসিবি ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে। এই ব্যাংকে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আকতারুজ্জামান চৌধুরী পরিবারেরও আধিপত্য রয়েছে। একসময় আকতারুজ্জামান চৌধুরীও ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন। তার মৃত্যুর পর তার ছেলে ভূমিপ্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদও ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন। বর্তমানে সাইফুজ্জামানের স্ত্রী ও ভাই পরিচালক। বর্তমানে সাইফুজ্জামানের স্ত্রী রকমিলা জামান চৌধুরী ব্যাংকের পর্ষদের চেয়ারম্যান এবং ভাই আনিসুজ্জামান চৌধুরী রনি নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন।
চট্টগ্রামভিত্তিক বহুল আলোচিত এস আলম গ্রুপের মালিকানা রয়েছে বেসরকারি খাতের ৭টি ব্যাংকে। ওই ব্যাংকগুলোর পর্ষদের মধ্যে কোনোটিতে গ্রুপের কর্ণধার, স্ত্রী, ভাই, বোন, মেয়ে, জামাতা, অন্য আত্মীয়স্বজন এবং কোনো কোনো ব্যাংকের তার মালিকানাধীন কোম্পানি কর্তৃক মনোনীত ব্যক্তি পরিচালক হিসেবে রয়েছেন।

এস আলম গ্রুপের বড় অঙ্কের শেয়ার রয়েছে এমন ব্যাংকগুলো হচ্ছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, আল আরাফাহ ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক। এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকে এস আলম পরিবারের চার সদস্য পরিচালক ছিলেন। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার পর তা দুইজনে নামিয়ে আনা হয়।

প্রিমিয়ার ব্যাংকের বেশিরভাগ শেয়ারের মালিক আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ডা. এইচবিএম ইকবাল। এই ব্যাংকেও আগে একই পরিবারের চার সদস্য পরিচালক ছিলেন। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে দুইজনে নামিয়ে আনা হয়।
বর্তমানে এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম মাসুদ রয়েছেন ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে। ওই ব্যাংকের বোর্ডে রয়েছেন তার স্ত্রী ফারজানা পারভীন ও আরেক আত্মীয় আতিকুর নেসা।

ইউনিয়ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন তার ভাই শহিদুল আলম। এই ব্যাংকের পরিচালক পদে আছেন সাইফুল আলমের ছেলে আহসানুল আলম। ওই ব্যাংকের পরিচালক রাশেদুল আলমও তার ভাই। এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের রয়েছেন মেয়ে মাইমুনা খানম ও ভাই মোরশেদুল আলম।

বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকেরও বড় অংশের মালিকানা এস আলম গ্রুপের হাতে। ব্যাংকটির ৪০ শতাংশ ব্যবসায়ী গ্রুপের। ব্যাংকটির পরিচালক পদে আছেন এএএম জাকারিয়া। এর আগে তিনি এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে ৮ বছরের বেশি দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ওই গ্রুপের ঘনিষ্ট লোক বলে পরিচিতি।

গত বছরের ৫ জানুয়ারি ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বড় ধরনের রদবদলের পর ওই গ্রুপের কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে পরিচালক হয়ে চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন আরাস্তু খান। এ ছাড়া বছরের শেষ দিকে দখল হয় সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক। এস আলম গ্রুপের একটি কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক আনোয়ারুল আজিম আরিফ এই চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন। পরিচালক পদে রয়েছেন এস আলমের মেয়ের স্বামী বেলাল আহমেদ। আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন এস আলমের আরেক ভাই আবদুস সামাদ।


আরও সংবাদ