শনিবার, ০৬ মার্চ ২০২১, ০৩:২৭ অপরাহ্ন
শীর্ষ সংবাদ

বিতর্কিত ৩ চরিত্র ও ‘জোড়াতালি’ ষড়যন্ত্র

দুলাল আহমদ চৌধুরী
আপডেট : রবিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

আল জাজিরার ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টারস মেন’ প্রতিবেদন নিয়ে দেশে-বিদেশে পক্ষে-বিপক্ষে চলছে নানা আলোচনা। সরকারের বিরোধীপক্ষ এই প্রতিবেদন নিয়ে ব্যাপক উচ্ছ¡সিত, বিশেষ করে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত সমর্থকরা। অপরদিকে দেশের বিজ্ঞজনরা প্রতিবেদনটির সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেছেন। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির গভীর ষড়যন্ত্রের আভাস হিসেবে দেখছেন অনেকে।

বিজ্ঞরা বলছেন, প্রতিবেদনটিতে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার নীতিমালা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসরণ হয়নি। সার্বিক বিবেচনায় প্রতিবেদনটির দুর্বলতা রয়েছে বিস্তর। সবচেয়ে বড় বিষয়-পুরো চিত্রের অনেক অভিযোগের

শক্তিশালী প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি প্রতিবেদনটিতে। রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীর সঙ্গে অপরাধীদের সম্পর্কের যে তথ্যে জোড়াতালি দিয়ে দৃশ্য সাজানো হয়েছে-পুরো প্রতিবেদনে এর প্রমাণ অনুপস্থিত। তাছাড়া প্রতিবেদনের প্রধান তিন চরিত্র বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে বিতর্কিত এবং মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের সঙ্গে তাদের কার্যক্রম সরাসরি সম্পৃক্ত।

যারা পুরো প্রতিবেদনে সরকার ও সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত তথা অত্যন্ত সুকৌশলে শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল অর্জন ধ্বংস করার চেষ্টা করেছে। বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘে বাংলাদেশি একটি মহল এরইমধ্যে খোঁচাখুঁচিও শুরু করেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, স্বাধীনতাবিরোধী মহল সেনাবাহিনীর মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টায় লিপ্ত। যে কারণে শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কার্যক্রম বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হয়েছে পরিকল্পিত এই প্রতিবেদনে।

 

‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টারস মেন’ নামের ওই প্রতিবেদনে প্রাধান চরিত্রগুলোর অন্যতম একজন সামি। যার দীর্ঘ বক্তব্য প্রতিবেদনটির প্রধান উপাত্ত। তার বক্তব্যের মাধ্যমেই হাঙ্গেরিতে বসবাসরত হারিস আহমেদ নামের এক ‘আসামি’র পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। হারিস বুদাপেস্টে ‘মোহাম্মদ হাসান’ নামে বসবাস করছেন। গোপন ক্যামেরায় ধারণকৃত সেই ব্যক্তির কথার ওপর ভিত্তি করে তারা ঘুষ ও অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে বাংলাদেশে সরকারি ও রাজনৈতিক পদ-পদবি, কেনাকাটায় দুর্নীতির যোগসাজশের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে পুরো প্রতিবেদনজুড়ে।

একইসঙ্গে সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের সহোদর হওয়ায় ওই ব্যক্তি তার উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগকে ‘কাজে লাগিয়ে’ এসব অর্থ উপার্জন করেন বলে অভিযোগ তোলা হয়। আহমেদ পরিবারের বাকি সদস্যরাও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক আশীর্বাদপুষ্ট, এমন যোগসূত্র তৈরির চেষ্টা করা হয় প্রতিবেদনে। কিন্তু এর সঠিক প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। হারিসের বক্তব্য দেখানো হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এই বক্তব্যের সত্যতার কোনো প্রমাণ আনা হয়নি প্রতিবেদনে।

 

প্রতিবেদনটির সবচেয়ে দুর্বল দিক হচ্ছে-‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টারস মেন’ নামকরণ করে যাদেরকে প্রধানমন্ত্রীর লোক হিসেবে দেখানো হয়েছে, তাদের কারোর সঙ্গেই প্রধানমন্ত্রীর কোনোপ্রকার যোগাযোগ আছে এমন প্রমাণ দেখাতে পারেনি আল জাজিরা। বাস্তবেও এই বিষয়টি একেবারেই অনভিপ্রেত। যারা এই প্রতিবেদন তৈরিতে বিভিন্ন বিষয় তাদের মুখে তুলে ধরেছেনÑতাদের তিনজনেরই অতীত কর্মকাণ্ড বাংলাদেশ তথা মহান মুক্তিযুদ্ধবিরোধী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত সত্য। বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করতে আল জাজিরা অতীতেও বিভিন্ন ইস্যুতে এসব ব্যক্তিদের মাধ্যমে প্রতিবেদন করেছে।

২. প্রতিবেদনে তৃতীয় যে বিষয়টি তুলে ধরা হয়, তা হলো- ইসরায়েলের একটি কোম্পানির কাছ থেকে ফোনের নজরদারির প্রযুক্তি কিনছে বাংলাদেশ। ‘পিকসিক্স’ নামের ওই কোম্পানির সঙ্গে ২০১৮ সালে একটি চুক্তির দলিল হাজির করেছে আল জাজিরা। হাঙ্গেরিতে একজন আইরিশ মধ্যস্থতাকারীর সহযোগিতায় দুই ইসরায়েলির সঙ্গে একটি বৈঠকের কিছু অংশও তুলে ধরা হয়। তবে তারা যে আদৌ ইসরায়েলের কি না- এমনটির সঠিক প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। তা ছাড়া ক্রয় চুক্তিতে সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী দেশের নাম হাঙ্গেরি উল্লেখ আছে।

ইসরায়েল থেকে নজরদারি প্রযুক্তি কেনার চুক্তির বিষয়টি নাকচ করেছে পররাষ্ট্র দফতর। ‘ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো চুক্তি করা হয়নি বলে সাফ জানিয়ে দেয়া হয়েছে। এখানে অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে ইসরায়েলের নাম যুক্ত করে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

এছাড়া প্রতিবেদনের বাকি অংশগুলোও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করেছেন বিশ্লেষকরা। যেখান থেকে অনুমান করা যায়, আল জাজিরার প্রধান টার্গেট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সেনাবাহিনী। যার দৃঢ় নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে উন্নয়নের জন্য সারাবিশ্বে মডেল হয়ে আছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। বাংলাদেশের অসাধারণ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য যেখানে সরকারের ভ‚মিকা প্রমাণিত, সেই অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সরকারকে কক্ষচ্যুত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করেছে আল জাজিরা।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও সারা বিশ্বে আজ রোল মডেল। সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসেবে সেনাবাহিনীর সুনাম বেশ উঁচুতে। জাতীয় যে কোনো দুর্যোগে বুক পেতে দেয় আমাদের গর্বিত সৈনিকরা। শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গৌরবগাথা বিশ্বময় নজির হয়ে আছে। দেশ প্রতিষ্ঠার পর থেকে সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আর নানা দুর্যোগে এই সেনারা দেশের নিবেদিতপ্রাণ। সেই বাহিনীকেই বিশ্বের চোখে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপনের হীন চেষ্টা চালাচ্ছে আল-জাজিরা। আইএসপিআর অবশ্য কড়া ভাষায় আল জাজিরাকে নিন্দা জানিয়েছে।

 

৩. আল জাজিরার ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টারস ম্যান’ প্রতিবেদনের প্রধান তিন চরিত্র- ‘ডেভিড বার্গম্যান’, ‘সামি’ ও ‘তাসনিম খলিল’। এই তিনজনই বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সব ইস্যুতে বিতর্কিত। ডেভিড বার্গম্যান অনেক আগে থেকেই স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের পেইড সাংবাদিক হিসেবে কাজ করে চলেছেন। পেইড সাংবাদিকতার এই মিশন তিনি শুরু করেছিলেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ার সময়। সেসময়ে তার তিনটি প্রতিবেদন অপ-সাংবাদিকতার নজির হয়ে আছে।

বার্গম্যানের সেই প্রতিবেদনগুলো হলো- ‘আযাদ জাজমেন্ট এনালাইসিস ১: ইন অ্যাবসেন্সিয়া ট্রায়ালস অ্যান্ড ডিফেন্স ইনএডেকোয়েসি’, ‘আযাদ জাজমেন্ট এনালাইসিস ২: ট্রাইব্যুনাল অ্যাসাম্পশন’ এবং ‘সাঈদী ইনডাইক্টমেন্ট: ১৯৭১ ডেথস’।

বার্গম্যানই একমাত্র সাংবাদিক যিনি মুক্তিযুদ্ধের মতো বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা চালিয়েছিলেন। তার তিনটি লেখায় মুক্তিযুদ্ধ ব্যাপক অবমাননাকর তথ্য উপস্থাপন করেন।

‘সাঈদী ইনডাইক্টমেন্ট: ১৯৭১ ডেথস’ লেখায় মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে বার্গম্যান প্রশ্ন তোলেন। শুধু তাই নয় সাঈদী এবং সাকা চৌধুরীর বিচার প্রক্রিয়া থামাতে তিনি কোনো সূত্র ছাড়াই মনগড়া তথ্য দিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেন। এমনকি ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেন।

 

মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির একটি আবেগের জায়গা। ঐতিহাসিকভাবে মীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে ভবিষ্যতে আর কোনো সমালোচনা না করার জন্য সেসময় বার্গম্যানকে সতর্ক করেন ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনাল তাকে সতর্ক করে বলেছিলেন, তার লেখায় আদালত অবমাননাকর উপাদান রয়েছে। যে পদ্ধতিতে ও বিদ্রুপপূর্ণ ভাষায় বার্গম্যান তার লেখায় মন্তব্য করেছেন, তা ট্রাইব্যুনালের কর্তৃত্বকে খাটো করেছে। পেশায় সাংবাদিক হয়ে তিনি বরং সেই সব ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মুখপাত্রের মতো কাজ করছেন, যারা এই বিচারপ্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে অযৌক্তিক, পক্ষপাতমূলক ও কুরুচিপূর্ণ প্রচারণা চালাচ্ছে।

ট্রাইব্যুনাল পর্যবেক্ষণে বলেন, জাতির গর্ব মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে বার্গম্যান যে ন্যায়ভ্রষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন, তা তার মানসিকতা পরীক্ষা করলেই বোঝা যায়। এ জন্য বার্গম্যানের অন্য একটি লেখা পরীক্ষা করেছেন ট্রাইব্যুনাল। ইন্টারন্যাশনাল জাস্টিস ট্রিবিউন সাময়িকীর ২০১২ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় তার ‘আইসিটি: ক্যান ওয়ান সাইডেড ট্রায়ালস বি ফেয়ার?’ শিরোনামে ওই নিবন্ধে লেখা ছিল, ‘ঢাকার ট্রাইব্যুনাল কাজ করছে একাত্তরের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সেই সব ঘটনা নিয়ে, যখন সত্তরের নির্বাচনে জেতার পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তা প্রতিহত করতে বল প্রয়োগ করে।

আওয়ামী লীগের সমর্থকরা ছিল পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমানে বাংলাদেশ) বসবাসকারী বাঙালি। পাকিস্তানি সেনা এবং আওয়ামী লীগের সমর্থক ও অন্যদের মধ্যে যুদ্ধ তখন শেষ হয়, যখন ভারতীয় সেনারা বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে এতে হস্তক্ষেপ করে।’ প্রথমত, লেখার শিরোনামে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়াকে বার্গম্যান ‘একপক্ষীয় বিচার’ বলে উল্লেখ করেছেন। দ্বিতীয়ত, বাঙালির আত্মপরিচয়ের যুদ্ধ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে তিনি ‘পাকিস্তানি সেনা ও আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মধ্যে যুদ্ধ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘আমরা বিস্মিত এই দেখে যে কীভাবে ও কিসের ভিত্তিতে বিদেশি নাগরিক ডেভিড বার্গম্যান মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে এ ধরনের ন্যায়ভ্রষ্ট মানসিকতা নিয়ে বাংলাদেশে কাজ করছেন। এটা আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়। তবে এটা আমাদের বিষয় নয়। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব বিষয়ের আইনগত দিক খতিয়ে দেখতে পারে।’

 

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের প্রক্রিয়া নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করার দায়ে ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানকে সেসময় কারাদণ্ডও দিয়েছিলেন আদালত।

এর আগে ২০১১ সালের ১ অক্টোবর নিউ এজ-এ ‘অ্যা ক্রুসিয়াল পিরিয়ড ফর আইসিটি’ শিরোনামের মন্তব্য প্রতিবেদনের জন্য বার্গম্যান, পত্রিকাটির সম্পাদক নুরুল কবির ও প্রকাশক আ স ম শহীদুল্লাহ খানের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগে রুল দেন ট্রাইব্যুনাল-১। ২০১২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ওই রুল নিষ্পত্তি করে আদেশের সময় ট্রাইব্যুনাল বার্গম্যানকে ‘সর্বোচ্চ সতর্ক’ করে বলেন, ওই প্রতিবেদনের একটি অংশ ‘অত্যন্ত অবমাননাকর।’

আদেশের পর প্রতিক্রিয়ায় বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, ট্রাইব্যুনালের এই রায়ের পর আর কেউ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করার ধৃষ্টতা দেখাতে পারবে না। এর পরপরই দেশ ত্যাগ করেন বার্গম্যান। তবে বিদেশে বসে নতুন করে ষড়যন্ত্র আঁটতে থাকেন। যার ধারাবাহিক অংশ ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টারস মেন’ প্রতিবেদন।

৪. প্রতিবেদনটির আরেক কুশীলব সাংবাদিক তাসনিম খলিল নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে অধ্যয়নরত অবস্থায় শিক্ষানবিশ হিসেবে ডেইলি স্টারে কাজ শুরু করেন। কিন্তু অপ-সাংবাদিকতার কারণে বেশিদিন কাজ করতে পারেননি তিনি। সেনাবাহিনীর কার্যক্রম নিয়ে একটি বিতর্কিত প্রতিবেদনের কারণে জরুরি অবস্থার সময় ২০০৭ সালের ১১ মে তাকে আটক করে যৌথবাহিনী।

বহুপক্ষীয় অনুরোধে ছাড়া পেয়ে দেশ ছেড়ে সুইডেন চলে যান তিনি। তাসনিম খলিলের বাড়ি সিলেটের বিশ্বনাথে। সিলেট নগরের পৌরবিপণি মার্কেটে কিংশুক মুদ্রায়ন নামে তাদের একটি পারিবারিক প্রেসের ব্যবসা ছিল। জামায়াত অনুসারি কবি সাহিত্যিক সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত তাসনিমের বাবা কাসেমি মুক্তিযুদ্ধের সময় আলবদর ছিলেন।

সিলেট নগরে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী পরিবার হিসেবে তারা চিহ্নিত। তাছাড়া মাওলানা সাঈদীসহ কেন্দ্রীয় জামায়াত নেতারা সিলেট সফরে গেলে তাসনিমদের বাড়িতে নিয়মিত যেতেন। কবি আল মাহমুদ সিলেটে গেলে তাসনিমদের উপশহরের বাসায় থাকতেন। তাসনিম বর্তমানে সুইডেনের আরেব্রোতে বসবাস করছেন। জানা গেছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় এমন নানা ভুল তথ্য দিয়ে তিনি সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন।

৫. আল জাজিরার বিতর্কিত প্রতিবেদনের প্রধান কুশীলব বলা যায় সামি নামের চরিত্রকে। যার আসল নাম জুলকারনাইন সের খান। সবাই ডাকে সামি নামে। এই সামি নামেই বন্ধুমহলে সে বেশি পরিচিত। মাদকাসক্তির অভিযোগে মিলিটারি একাডেমি থেকে বহিষ্কার হয়েছিলেন প্রাক্তন এই ক্যাডেট জুলকারনাইন সের খান। যার জীবনের পেছনের পাতা উল্টালেই বেরিয়ে আসবে একের পর এক কেলেঙ্কারি কার্যকলাপের চিত্র। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে এই সামির বিতর্কিত বিভিন্ন ভবনে অবাধ যাতায়াত ছিল। সামি গত দুই বছর ধরে কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরার পেইড এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন হাঙ্গেরিতে।

 

সামি আল জাজিরার ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টারস মেন’ শিরোনামের প্রতিবেদনটিতে যা যা বলেছেন সব ভ্রান্ত ও ভিত্তিহীন কল্পকাহিনী ছাড়া আর কিছু নয়। কাতারভিত্তিক এই গণমাধ্যমটি একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যাচারে লিপ্ত রয়েছে। বিশেষ করে দেশবিরোধী কুচক্রী মহলের সঙ্গে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের বিনিময়ে মিথ্যাচার প্রচারের চুক্তি করেছে আল-জাজিরা।

৬. বাংলাদেশ ইস্যুতে সংবাদ পরিবেশনে বরাবরই আল জাজিরার বস্তুনিষ্ঠটা প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, নিরাপদ সড়ক, কোটা আন্দোলন, রোহিঙ্গার মতো ইস্যুতে খবর প্রচারের ক্ষেত্রে সবসময় বাড়াবাড়ি আশ্রয় নিয়েছে আল-জাজিরা। বাংলাদেশকে হেয় করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে জামায়াতের এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে সংবাদমাধ্যমটির বিরুদ্ধে। আবারো বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুণœ করতে নতুন এজেন্ডা নিয়ে মাঠে নেমেছে আল-জাজিরা।

সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক বাংলাদেশের যে কোনো আন্দোলন, ইস্যু ও সংকট নিয়ে কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন সবসময় প্রশ্নবিদ্ধ। রাজনৈতিক রঙ লাগিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করা কিংবা সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করাই তাদের লক্ষ্য বলে মনে করেন অনেকে।

৬ বছর আগে যুদ্ধাপরাধ মামলায় জামায়াত নেতা মীর কাশেম আলীর ফাঁসির রায়ের পর মরিয়া হয়ে ওঠে আল জাজিরা। পরদিনই জামায়াতের নিয়োগ করা লবিস্ট টবি ক্যাডম্যান ও ডেভিড বার্গম্যানকে নিয়ে আয়োজন করা হয় এক অনুষ্ঠানের। হোয়াটস বিহাইন্ড বাংলাদেশ ওয়ার ক্রাইমস ট্রায়াল নামক ওই অনুষ্ঠানে যুদ্ধাপরাধের বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে নানা বক্তব্য দেন টবি ও বার্গম্যান। যুদ্ধাপরাধের বিচারে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা সমান সুযোগ পেলেও একতরফা বিচার বলে প্রচার করেছে তারা।

এছাড়া বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরতে একের পর এক বিতর্কিত প্রতিবেদন করেছে আল জাজিরা। যার অধিকাংশেই বিতর্কিত সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান।

এ ছাড়াও বিভিন্ন সময় পুলিশ-র‌্যাবকে জড়িয়ে বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের গুম ও খুনের বিভ্রান্তিকর প্রতিবেদনও প্রচার করে আসছে গণমাধ্যমটি। এই প্রতিবেদনেও পুলিশকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করে পুলিশ সার্ভিস এসোসিয়েশন বলেছে, প্রতিবেদনে মনগড়া, উদ্দেশ্যমূলক ও মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে।

৭. আল জাজিরার প্রতিবেদন যে পরিকল্পিত তা স্পষ্ট হয় ৪ ফেব্রæয়ারি জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক-এর নিয়মিত ব্রিফিংয়ে। ব্রিফিংয়ের একদম শেষ পর্যায়ে সেখানে থাকা বাংলাদেশি একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন- বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে দুর্নীতির অভিযোগ ও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের জন্য গুপ্তচরবৃত্তির সরঞ্জাম কেনার বিষয়ে আল-জাজিরার প্রতিবেদনের বিষয়ে তার মন্তব্য কী? জবাবে ডুজারিক বলেন, এই প্রতিবেদন সম্পর্কে জাতিসংঘ অবগত।

 

তিনি বলেন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশ সবচেয়ে বড় অংশগ্রহণকারী। আল জাজিরার তথ্যচিত্রে যেসব ইলেকট্রনিক সরঞ্জামের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনের বাংলাদেশ কনটিনজেন্টসে এ ধরনের সরঞ্জাম রাখা হয়নি।

একাধিক সূত্র দাবি করেছে, শুধু জাতিসংঘ নয়, পশ্চিমা দেশগুলোয় সরকারবিরোধী একটি মহল সুপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের কাছে আল জাজিরার এই প্রতিবেদন সরবরাহ করে সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত এবং বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে হেয় করার তৎপরতা চালাচ্ছে। এই মহল জাতিসংঘে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টায় লিপ্ত।

অবশ্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন গতকাল শনিবার রাজধানীর বনানী আর্মি স্টেডিয়ামে এক অনুষ্ঠানের পর সাংবাদিকদের বলেছেন, মিথ্য প্রতিবেদন করায় আল জাজিরার বিরুদ্ধে সরকার মামলা করার কথা ভাবছে। তিনি বলেছেন, ‘পাবলিক বুঝেছে যে এটা মিথ্যা তথ্য। সেটা আমরা দেখব। যেখানে তথ্যগত ভুল আছে, সেগুলো আমরা তুলে ধরব। আর আমরা মামলা করব। আমরা সেটার জন্য কাজ করছি।’

 

তিনি বলেন, আমরা আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চিনি। এখন এসএসএফ গার্ড দেয়। উনার ৪৫ বছরের রাজনৈতিক জীবনে কোনোদিন কোনো বডিগার্ড ছিল না। উনার বডিগার্ড উনারই সব নেতা-কর্মী। কোনোদিন আমরা দেখিনি পয়সা দিয়ে বডিগার্ড রাখতে। ওখানে লিখেছে উনার দুই বডিগার্ড!’

মন্ত্রী তার চারপাশে উপস্থিত লোকজনকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘এখন ধরেন আমার পেছনে অনেকেই দাঁড়িয়েছেন। আমরা তাদের সবাইকে চিনি না। নেত্রী যখন বক্তৃতা দেন, তখন পেছনে অনেকেই দাঁড়ান। আমাদের গণতান্ত্রিক দেশ। আমিও যখন বক্তৃতা দিই, আমার পেছনেও অনেকেই দাঁড়ান। আমি তার খুব কম লোককেই চিনি।

কিন্তু ওখানে একজনের ছবি দিয়ে বলছে কী, ওটা উনার বডিগার্ড। এ রকমের মিথ্যা তথ্য দিয়ে ওরা বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে। আল জাজিরা এ ধরনের বানোয়াট, টেকনিক্যালি জোড়াতালি দিয়ে যা করেছে, তাতে বাংলাদেশে তাদের গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে।’


আরও সংবাদ