রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ১২:২৮ অপরাহ্ন

মুজিব ফুটপাতে খেলেন ফুচকা-চটপটি

অজয় দাশগুপ্ত
আপডেট : মঙ্গলবার, ৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

জীবন নিবেদিত তাঁর বাংলার মানুষের মুক্তির সংগ্রামে। দাঁড়াবার ফুসরৎ যে নেই। মানুষকে পাকিস্তানি দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জাগিয়ে তুলতে ছুটে চলেছেন উল্কার মত, এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে, শহর-বন্দর-গ্রামে। গোয়েন্দারা সর্বক্ষণ লেগে রয়েছে তাঁর পেছনে। আর জেলে থাকার সময়ে পরিবারের সঙ্গে দেখা করার সময়েও সর্বক্ষণ গোয়েন্দারা বসে থাকে। ডায়েরীতে দুঃখ করে তিনি লিখেছেন, নিষ্ঠুর সরকারি অফিসাররা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য মাত্র ২০ মিনিট সময় বরাদ্দ করেন। চিঠিপত্র সেন্সর করা হয়, এমনকি স্ত্রীর চিঠিও বাদ যায় না। [গোয়েন্দা প্রতিবেদন, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৬-৫৭]

এর মধ্যেও তিনি বই পড়া, সিনেমা দেখা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সময় বের করেন। ২৩ এপ্রিল (১৯৬০) এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ মুজিব সেগুনবাগিচার বাসায় আসেন বিকেল ছয়টার দিকে। পৌনে ৮ টার দিকে রিকশায় যান মোহামেডান স্পোর্র্টিং ক্লাবে [সে সময়ে পল্টনের স্টেডিয়াম ও দৈনিক বাংলার মোড়ের মাঝামাঝি ছিল মোহামেডান স্পেটিংয়ের ক্লাব ঘর)। সঙ্গে একজন- যিনি গোয়েন্দাদের অচেনা। ক্লাব সংক্রান্ত এক সভায় তিনি অংশ নেন। রাত সাড়ে আটটার দিকে তিনি সঙ্গীকে নিয়ে পায়ে হেঁটে জিন্নাহ এভিনিউ-এ (বর্তমান বঙ্গবন্ধু এভিনিউ) যান এবং ফুটপাতের পাশের ছোট দোকান থেকে ফুচকা ও চটপটি খান। রাত নয়টায় রিকশায় বাসায় ফেরেন। এর পর রাতে তাকে বের হতে দেখা যায়নি।

 

বয়স তখন ৪০ বছর। ১৭ ডিসেম্বর (১৯৫৯) ১৫ মাস জেল খেটে কেবল ছাড়া পেয়েছেন। মুক্তির সময় সরকার শর্ত দিয়েছে রাজনীতি করা যাবে না। আমজনতার সঙ্গে মেশা যাবে না। তিনি কৌশল বের করলেন। যুক্ত হলেন আলফা ইন্সুরেন্স কোম্পানির কন্ট্রোলার অব এজন্সি পদে। এ দায়িত্ব পালনেও তিনি আন্তরিক।

১১ জুলাই গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, ২ জুলাই শেখ মুজিব ট্রেনে চট্টগ্রাম আসেন। একই রাতে ঢাকা ফেরেন। চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতা ও আলফা ইন্সুরেন্সের চট্টগ্রাম প্রতিনিধি এমএ আজিজ তাকে স্বাগত জানান। এম এ আজিজকে আলফা ইন্সুরেন্সের প্রধান সংগঠক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সে সময়ের রাজনীতির যারা খবর রাখেন, তারা জানেন এই এম এ আজিজ ছিলেন চট্টগ্রাম অঞ্চলে বঙ্গবন্ধুর ডান হাত।

৬ জুলাইয়ের (১৯৬০) এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, ৪ জুলাই নারায়ণগঞ্জ আলফা ইন্সুরেন্সের এজেন্ট সামসুজ্জোহা (নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ-এর মহকুমা সভাপতি) তাঁর বাসভবন ও ইন্সুরেন্সের উত্তর চাষাঢ়াস্থ অফিস ‘হীরা মহলে’ সংবর্ধনা প্রদান করেন। উপলক্ষ ছিল ‘হীরা মহলের’ নিচ তলায় আলফা ইন্সুরেন্সের অফিস উদ্বোধন। প্রধানত পাট ব্যবসায়ে জড়িত বিষ্টি বড় ব্যসায়ী ও আওয়ামী লীগ নেতারা অনুষ্ঠানে যোগ দেন। আমন্ত্রিত অতিথি ব্যতিরেকে কাউকে অনুষ্ঠান চলাকালে ‘হীরা মহলে’ প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। ব্যবসার আড়ালে রাজনীতি- এটা বুঝতে সমস্যা হয় না।

১৮ জুলাই (১৯৬০) গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৬ জুলাই একজন অপরিচিত লোকের সঙ্গে শেখ মুজিব আলোচনা করেন। আলোচনায় তিনি বলেন বর্তমান সরকার (প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান) আগুন নিয়ে খেলছে।

২৭ জুলাই গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, ২৩ জুলাই শেখ মুজিব পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জিপে করে নারায়ণগঞ্জ স্টিমার ঘাটে আসেন। তিনি গ্রামের বাড়িতে গেছেন। এই সফর সম্পর্কে তিনি ডিআইবির এসপিকে অবহিত করেন এভাবে- ২৪ জুলাই রাতে ঘোপেরডাঙ্গা কিংবা পাটগাতি স্টেশনে পৌঁছাব। ২৫-২৬ জুলাই টুঙ্গিপাড়া থাকব। ২৬ জুলাই রাতে বরিশাল স্টিমারে খুলনা রওনা দেব। ২৭ জুলাই সকালে খুলনা পৌঁছাব। ২৭, ২৮ বা ২৯ জুলাই খুলনা থাকব। ২৮ বা ২৯ জুলাই স্টিমারে খুলনা ত্যাগ করব। ২৯, ৩০, ৩১ জুলাই ও ১ আগস্ট টুঙ্গিপাড়া থাকব। ২৯ জুলাই থেকে ১ আগস্টের মধ্যে গোপালগঞ্জ মহকুমা শহরে যেতে পারি। ২ আগস্ট বরিশালের পথে খুলনা মেইলে নারায়ণগঞ্জ রওনা দেব এবং ৩ আগস্ট পৌঁছাব।

সফরসূচিতে কোন পরিবর্তন আসলে স্থানীয় ডিআইবি অফিসে অবহিত করা হবে।

 

৩ আগস্ট গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয় শেখ মুজিব ২৫ জুলাই সকাল সাড়ে ছয়টায় স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে টুঙ্গিপাড়া বাড়িতে পৌঁছান। এ সময়ে তিনি গোয়েন্দা নজরদারিতে ছিলেন। ২৬ জুলাই তিনি খুলনা রওনা হয়ে যান। ২৯ জুলাই পর্যন্ত খুলনা থাকেন। খুলনা অবস্থানকালে তিনি আলফা ইন্সুরেন্সের কাজ করেন। ২৯ জুলাই রাতে খুলনা থেকে টুঙ্গিপাড়া রওনা দেন এবং সকালে পৌঁছান। ৩১ জুলাই গোপালগঞ্জ শহরে আসেন। সেখানে কয়েক ব্যক্তি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। টুঙ্গিপাড়া থাকাকালে আশপাশের গ্রাম থেকে কেউ কেউ তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। গোয়েন্দা সূত্র রিপোর্ট দিয়েছে- তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন, এমন প্রমাণ পাওয়া যায় নাই। ২ আগস্ট স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে তিনি ঢাকার পথে রওনা হয়ে যান।

১৫ আগস্ট (১৯৬০) এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, ডিআইজি আইবি চাচ্ছেন; শেখ মুজিব, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি ও তোফাজ্জেল হোসেন মানিক মিয়ার গতিবিধির ওপর ঘনিষ্ঠ নজর রাখা হোক। তারা কাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন এবং কী কাজ করছেন, সব জানাতে হবে। তারা গোপনে কী আলোচনা করছেন, সেটা সোর্সের মাধ্যমে জানতে হবে।

সে সময়টি ছিল আইয়ুবের মার্শাল ল’ দ্বিতীয় বছর। রাজনীতি বন্ধ। সংবাদপত্রে কঠার সেন্সরশিপ। রাজনীতিকদেও ‘দুর্নীতির’ মিথ্যা অভিযোগে দণ্ড দেওয়া হচ্ছে। যে কোনো পর্যায়ের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য ঘোষেণা করা হচ্ছে।

২৩ আগস্ট দৈনিক সংবাদ জানায়, ২২ আগস্ট শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে আনীত অসদাচারণের একটি মামলার শুনানী শুরু হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, শেখ মুজিবুর রহমান মন্ত্রী থাকাকালে পদমর্যাদার অপব্যবহার করেছেন। সংবাদ ১৩ সেপ্টেম্বর লিখেছে- অসদাচরণ ও উক্ত কাজে সহায়তার দায়ে শেখ মুজিবকে দুই বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার টাকা আদায় না হলে আরও ছয় মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। কিন্তু হাইকোর্টে আপীল সাপেক্ষে শেখ মুজিবুর রহমানকে আদালত অন্তর্বর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর করেছে। তাঁর পক্ষে সে সময়ে আদালতে লড়েছেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি। ১১ নভেম্বর দৈনিক আজাদ লিখেছে, ১০ নভেম্বর হাইকোর্ট শেখ মুজিবের আপীল আবেদন শুনানীর জন্য গ্রহণ করেন এবং জামিন মঞ্জুর করা হয়।

 

২৬ সেপ্টেম্বর এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আলফা ইন্সুরেন্স সম্পর্কে জানানো হয়। প্রতিষ্ঠানটি পশ্চিম পকিস্তানের মালিকানাধীন। বিজনেস ম্যাগনেট ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন এ কোম্পানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তারা পূর্ব পাকিস্তানে বীমা ব্যবসা বাড়াতে চায়। এ জন্য ১২ জিন্নাহ এভিনিউতে অফিস নেওয়া হয়েছে। ২৭ ফেব্র“য়ারি, ১৯৬১ সালে এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ মুজিবুর রহমান কন্ট্রোলার অব এজেন্সিজ হিসেবে যোগদানের পর কোম্পাটি প্রদেশব্যাপী ভাল ব্যবসা করছে। দ্রুত সাফল্যের কারণ ব্যক্তিগত সুনাম এবং একদল বিশ্বস্ত কর্মী তাঁর অধীনে কাজ করছে। এরা এক সময় আওয়ামী লীগে তাঁর সহকর্মী ছিল। আওয়ামী লীগের যারা আলফা ইন্সুরেন্সের হয়ে কাজ করছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন গাজী গোলাম মোস্তফা (ঢাকা), নুরুল ইসলাম (চাঁদপুর), আবদুল আজিজ (চট্টগ্রাম), রফিকউদ্দিন ভূইয়া (ময়মনসিংহ) এবং সামসুজ্জোহান (নারায়ণগঞ্জ)।

এ কোম্পানি কোনো রাজনৈতিক দল নিয়ন্ত্রণ করছে এমন প্রমাণ নেই। তবে শেখ মুজিবুর রহমানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কিছু প্রভাব অবশ্যই আছে। শেখ মুজিবুর রহমান সতর্কভাবে কাজ করছেন এবং কারও সঙ্গে প্রকাশ্যে রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করছেন না। তবে এটাও অস্বীকার করা যাবে না এই ব্যবসার মাধ্যমে তিনি সাবেক অনেক আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারছেন। যে যা বুঝার বুঝে নিন!

 

লেখকঃ অজয় দাশগুপ্ত, সাংবাদিক ও গবেষক
সূত্র : সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইন্টালিজেন্স ব্রাঞ্চ (আইবি) অন ফাদার অব দি নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ৫ম খণ্ড


আরও সংবাদ