মঙ্গলবার, ০২ মার্চ ২০২১, ০১:০৭ পূর্বাহ্ন
শীর্ষ সংবাদ
স্বৈরাচার জিয়ার নির্দেশে ঢাকা, কুমিল্লা ও বগুড়া কারাগারে ২০৯ জনের ফাঁসির তালিকা মুশতাক-সামি-তাসনিম খলিল গংদের বাকস্বাধীনতার নমুনা বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজড়িত ১ মার্চ জাতীয় বীমা দিবসে প্রধানমন্ত্রী যা বললেন ঐতিহাসিক ‘৭ মার্চ’ উদযাপনে হঠাৎ বিএনপির বোধদয় কেন? শিক্ষার উন্নয়ন ও প্রসারে বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়নশীল দেশের কাতারে বাংলাদেশ এবং চ্যালেঞ্জ দেশ-বিরোধী চক্রান্ত ও বাক স্বাধীনতার সীমারেখা কিশোর-মুশতাকের জামিন নাকচ যে কারনে : একই চক্রে তাসনিম খলিল-সামি স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ বাংলাদেশের মার্কিন দূতাবাস এবং ঢাকাস্থ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের বিবৃতি লিখে দিলো কে?

ফেসবুকে ‘গুজব’ পেজের অ্যাডমিন ছিল সেই সামি : সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই মামলা র‌্যাবের

সুভাষ হিকমত
আপডেট : বুধবার, ১০ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

বছর খানেক আগেই র‌্যাবের সাইবার অপরাধ তদারকি দলের কাছে একটি তথ্য আসে। নানা তথ্য-উপাত্ত বিশ্নেষণ করে র‌্যাব জানতে পারে, একটি চক্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, সরকারবিরোধী পোস্ট ও করোনাভাইরাস সম্পর্কে অপপ্রচার চালিয়ে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। এরপর ভার্চুয়াল জগতে সাইবার টহল আরও জোরদার করে র‌্যাব। তাদের তদন্তে বেরিয়ে আসে- ‘আই এম বাংলাদেশি’ নামে একটি ফেসবুক পেজ থেকে নানা ধরনের কুৎসা রটানো পোস্ট দেওয়া হয়েছে। পেজটি পর্যালোচনা করে র‌্যাব জানতে পারে, এর অ্যাডমিন হলেন ‘সায়ের জুলকারনাইন’। কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর, আশিক ইমরান, ফিলিপ শুমাখার, স্বপন ওয়াহিদ ও লেখক মুস্তাক আহমেদ পেজ এডিটর হিসেবে পরস্পর যোগসাজশের মাধ্যমে দীর্ঘদিন এটি পরিচালনা করে আসছেন।

র‌্যাব বলছে, ষড়যন্ত্রের ওই চক্রে ছিলেন নেত্র নিউজের সাংবাদিক তাসনীম খলিল, সাহেদ আলম, ব্লগার আসিফ মহিউদ্দীন, রাষ্ট্র চিন্তার কর্মী দিদারুল ইসলাম ভূঁঁইয়া ও মিনহাজ মান্নান। সাইবার জগতে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে গত বছরই সায়ের জুলকারনাইনসহ ১১ জনকে আসামি করে রমনা থানায় মামলা করেছিল র‌্যাব। তবে প্রকৃত পরিচয় ও নাম-ঠিকানা বের করতে না পারায় এডমিন জুলকারনাইনসহ আটজনকে অব্যাহতি দিয়ে ওই মামলায় চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দেওয়া হয়। এই চার্জশিটে তিনজনকে আসামি করা হয়। তারা হলেন আহমেদ কবির কিশোর, মুস্তাক আহমেদ ও দিদারুল ভূঁঁইয়া। পুলিশ তদন্তে পেজটির অ্যাডমিনের পরিচয় বের করতে না পারলেও সম্প্রতি আলজাজিরায় বাংলাদেশ সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদন প্রচারের পর বেরিয়ে আসে- ‘আই এম বাংলাদেশি’ পেজের অ্যাডমিন সায়ের জুলকারনাইনের প্রকৃত নাম সামিউল আহমেদ খান ওরফে সামি। বহু বছর ধরেই তিনি একজন বহুরূপী প্রতারক। র‌্যাব কর্মকর্তা পরিচয়ে আর্থিক প্রতারণায় জড়িত থাকার ঘটনায় ২০০৬ সালে গ্রেপ্তারও হন তিনি। বর্তমানে সামি হাঙ্গেরিতে বসবাস করছেন।

 

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে র‌্যাবের সাইবার টিমের তীক্ষষ্ট নজর থাকে। কেউ গুজব ও কুৎসা রটিয়ে পরিস্থিতি ঘোলা করার চেষ্টা করলে র‌্যাব তাদের আইনি ব্যবস্থার আওতায় নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে। গত বছর ‘আই এম বাংলাদেশি’ পেজ থেকে বেশ কিছু অপকর্মের ঘটনা ঘটছে- এটা জানার পর মামলা করা হয়। আগামীতেও ভার্চুয়াল জগতের যে কোনো বেআইনি কাজ রুখে দেবে র‌্যাবের সাইবার ওয়ার্ল্ড।

র‌্যাবের এক কর্মকর্তা জানান, ‘আই এম বাংলাদেশি’ ফেসবুক পেজের অন্যতম এডিটর ‘আমি কিশোর’। রমনা থানাধীন ১২২/১ নম্বর বাসার চতুর্থ তলার সিঁড়ির পূর্ব পাশের ফ্ল্যাটে বসে নানা ষড়যন্ত্র করছিলেন তিনি। গত বছরের ৫ মে সেখানে অভিযান চালিয়ে র‌্যাব ‘আমি কিশোর’ নামে এডিটরকে গ্রেপ্তার করে। এরপর জানা যায়, তার প্রকৃত নাম আহমেদ কবির কিশোর। এরপর তার হেফাজত থেকে মোবাইল ফোনসেট, কম্পিউটার ও বিভিন্ন ধরনের ২০০ সিডি জব্দ করা হয়। পরে তার ফেসবুক মেসেঞ্জার ও হোয়াটস অ্যাপের চ্যাটিং লিস্ট পরীক্ষা করে তাসনীম খলিল, সায়ের জুলকারনাইনসহ (সামি) কয়েকজনের ষড়যন্ত্রের তথ্য পাওয়া যায়। মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও তারা অপপ্রচার চালাচ্ছিলেন। সামিসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে র‌্যাব যে মামলা করেছিল, সেখানে সংযুক্তি হিসেবে ৬০ পাতার স্ট্ক্রিনশটও দেওয়া হয়েছিল।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, পাসপোর্ট তৈরিতে প্রতারণার আশ্রয় নেন সামি। পাসপোর্ট করেন ‘জুলকার সায়ের খান’ নামে। এমনকি পাসপোর্টে বাবার নামও বদলে ফেলেন সামি। তার বাবার প্রকৃত নাম আবদুল বাসেত খান। তিনি অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল। তবে পাসপোর্টে বাবার নাম বদলে সামি রেখেছেন ‘কর্নেল ওয়াসিত খান’।

একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, মূলত পাসপোর্টে কোনো সেনা কর্মকর্তা তার র‌্যাঙ্কব্যাজ ব্যবহার করেন না। অনৈতিক সুবিধা নিতেই সামি তার পাসপোর্টে বাবার ভুয়া র‌্যাঙ্ক ব্যাজের পরিচয় দেন। অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল মো. আবদুল বাসেত খানের চার সন্তানের মধ্যে সামিউল আহমেদ খান সবার বড়। তার জন্ম ১৯৮৪ সালে। শৈশব থেকে নানা অপকর্মে জড়ান সামি। ১৭ বছর বয়সের সময় একটি ট্র্যাকসুট চুরি করেছিলেন। ১৭ ইসিবিতে কর্মরত তৎকালীন মেজর ওয়াদুদের বিদেশ থেকে আনা ওই ট্র্যাকসুট চুরি করে ধরা খান তিনি। ২০০০ সালের জুলাই মাসে টাইগার অফিসার্স থেকে হাতির দাঁত চুরি করেন। এরপর তা চট্টগ্রামে নিউমার্কেটের অঙ্গনা জুয়েলার্সে বিক্রি করতে গিয়ে ধরা পড়েন। বাবার চাকরির সুবাদে নিজেকে কখনও সেনাবাহিনীর সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট, কখনও ক্যাপ্টেন হিসেবে পরিচয় দিতেন। নানা অপকর্মের জন্য সেনানিবাস এলাকায় অনেক আগে থেকেই নিষিদ্ধও ছিলেন সামি।

রমনা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জহিরুল ইসলাম বলেন, সঠিক নাম-পরিচয় ও ঠিকানা না পাওয়ায় জুলকার নাইনসহ ওই মামলার আটজনকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তিনজনকে আসামি করে চার্জশিট দাখিল করা হয় মাস খানেক আগে।

যে অপকর্মে সামি র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন : ২০০৬ সালের ২০ জুলাই র‌্যাব-১-এর একটি দল কাফরুল এলাকায় অভিযান চালিয়ে সামিকে গ্রেপ্তার করে। ভুয়া ক্যাপ্টেন পরিচয় দিয়ে প্রতারণার ঘটনায় ধরা পড়েন তিনি। ওই সময়ের নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গ্রেপ্তারের পর সামি নিজেকে তানভীর মো. সাদাত খান হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। গ্রেপ্তারের পর তার কাছ থেকে বেশ কিছু জিনিস জব্দ করা হয়। তার মধ্যে ছিল ‘র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন’ লেখা একটি আইডি কার্ড। সেখানে লেখা ছিল ‘তানভীর মো. সাদাত খান। র‌্যাঙ্ক ক্যাপ্টেন’। কার্ডের অপর পাশে র‌্যাবের মনোগ্রাম ছিল। ছিল কয়েকটি ব্যাংকের চেকের ফটোকপি। এসব চেকে র‌্যাব কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করা হয়। সামির কাছে আরেকটি কার্ড পাওয়া যায়। ‘প্র্রাইস ক্লাব হোলসেল মেম্বার’ পরিচয় দিয়ে সেটি তৈরি করেন তিনি। ঘটনার সময় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন পদমর্যাদার পোশাক পরিহিত অবস্থায় ছিলেন সামি। তার কাছে পাওয়া যায় চারটি পিতলের তৈরি নকল র‌্যাঙ্ক ব্যাজ। ছিল চারটি সোল্ডার টাইটেল, যাতে ইংরেজিতে ‘ইঞ্জিনিয়ার্স’ লেখা ছিল।


আরও সংবাদ