শনিবার, ০৬ মার্চ ২০২১, ০১:২০ অপরাহ্ন
শীর্ষ সংবাদ

বঙ্গবন্ধুর জেলজীবন ও পরিবারের বিরাট আত্মত্যাগ

ইবার্তা সম্পাদনা পর্ষদ
আপডেট : রবিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

প্রায় চব্বিশ বছর পাকিস্তানের শাসনাধীন ছিল বাংলাদেশ। এর মধ্যে প্রায় ১৩ বছর (দিনের হিসেব করলে ৪৬৮২ দিন) বঙ্গবন্ধু ছিলেন জেলে। অথচ তারও একটি সংসার ছিল; পিতা-মাতা-স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ভর-ভরন্ত একটি সংসার। তাহলে সেসময় বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে কেমন ছিল তার পরিবারের অবস্থা, তাকে জেলে রেখে কীভাবে তাদের দিনগুলো অতিবাহিত হতো?

কিশোর বয়স থেকেই বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমান বুঝেছিলেন, তার এই সন্তান অন্য আর দশটি মানুষের মতো নয়। বিশেষ করে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে পড়ার সময় থেকে তরুণ শেখ মুজিব যেভাবে গোপালগঞ্জের স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছিলেন, তাতে তার বাবা বুঝতে পেরেছিলেন- এই ছেলের জন্য তার জীবনে অনেক হাঙ্গামা পোহাতে হবে।

মাত্র ২৩ বছর বয়সে শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভার সদস্য ও কলকাতার অনেক নেতাকে গোপালগঞ্জে নিয়ে এসে এক বিরাট সম্মেলন করেছিলেন। ফলে তার যেমন একদল সমর্থক তৈরি হয়েছিল, তেমনি একদল শত্রুও তৈরি হয়েছিল। এদের মধ্যে গোপালগঞ্জের স্থানীয় মুসলিম লীগের কিছু নেতাও ছিলেন। সেই কারণে তার জন্য নানাবিধ ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছিলো তখন। সবচেয়ে বড়ো ঝুঁকিটি ছিল মামলা ও জেল-জুলুম। বিষয়টি গোপালগঞ্জের কিছু লোক বঙ্গবন্ধুর পিতাকে বলেছিলেন, ‘আপনার ছেলে যা আরম্ভ করেছে, তাতে তার জেল খাটতে হবে। তার জীবনটা নষ্ট হয়ে যাবে, তাকে এখনই বাধা দেন।’

 

বঙ্গবন্ধু তখন বিবাহিত। ছেলেবেলা থেকে বেশ কয়েকবার নানা শারীরিক অসুস্থতার ভেতর দিয়েও যেতে হয়েছে। পরিবারের বড় ছেলে, কলকাতায় লেখাপড়া করছেন। এরকম অবস্থায় বাঙালি পিতারা সাধারণত চান না যে, ছেলে অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ রাজনৈতিক জীবন বেছে নিক। কিন্তু শেখ লুৎফর রহমান ছিলেন অন্য ধাতুতে গড়া। তিনি বললেন, ‘মুজিব দেশের কাজ করছে, অন্যায় তো করছে না; যদি জেল খাটতে হয়, খাটবে; তাতে আমি দুঃখ পাব না। জীবনটা নষ্ট নাও তো হতে পারে, আমি ওর কাজে বাধা দেবো না।’

তবে পিতার মনেও মাঝে মাঝে সংশয় তৈরি হতো। আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হওয়ার মাস খানেক পরে ১৯৪৯ সালের জুলাইয়ে বঙ্গবন্ধু বাড়িতে গিয়েছিলেন। তখন ছেলেকে তিনি বললেন, ‘আমাদের জন্য কিছু করতে হৰে না। তুমি বিবাহ করেছ, তোমার মেয়ে হয়েছে, তাদের জন্য তো কিছু একটা করা দরকার।’ স্ত্রী ফজিলাতুন্নেছাও বললেন, ‘এভাবে তোমার কতকাল চলবে?’ স্ত্রীর এই দুরহ প্রশ্নের কী উত্তর দেবেন তিনি! তার পথ যে অন্য আর দশ জনের মতো নয়, তা তিনি ততদিনে জেনে গেছেন।

বঙ্গবন্ধু যখন জেলে থাকতেন, তখন পরিবারের সঙ্গে তার দেখা হতো জেলের গেটে। এছাড়া যখন কোর্টে হাজিরা দিতে আসতেন, তখন একাকী কথা বলার সুযোগ মিলতো। কখনও কখনও এই সাক্ষাতের স্মৃতি হতো খুবই হৃদয়বিদারক। একবার সালগঞ্জের কোর্ট শুনানির দিন ফরিদপুর জেলে থেকে তাকে নিয়ে আসা হয়। তাকে দেখতে বাড়ি থেকেও সবাই চলে আসেন নৌকায় চড়ে। এর আগে একদিন মুক্ত হয়েও তিনি বাড়ি যেতে পারেননি। পরে আরও একদিন শরীর খারাপ থাকায় বঙ্গবন্ধু কোর্টে আসেননি। এই দুবারই পুরো পরিবার তাকে একনজর দেখার জন্য অপেক্ষা করে থেকেছে। কিন্তু দেখা হয়নি। দীর্ঘশ্বাসের দীর্ঘপ্রহর প্রতীক্ষায় কেটেছে তাদের।

পথ চেয়ে পরিবার বসে আছে, অথচ বঙ্গবন্ধু আসতে পারেননি, এরকম অনেক বার হয়েছে। এমনও হয়েছে, তিনি কোন জেলে আছেন, সেই খবরটি পর্যন্ত পরিবার জানতে পারেনি। ১৯৫২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি যখন ফরিদপুর জেলে অনশন করছেন, তখন তার স্ত্রী, সন্তান ও মাকে সঙ্গে নিয়ে পিতা লুৎফর রহমান ঢাকায় গিয়েছিলেন সন্তানের (বঙ্গবন্ধু) সঙ্গে দেখা করতে। জেলে খবর নিয়ে জানতে পারেন, শেখ মুজিব সেখানে নেই। কোথায় আছে, সেই খবরটি পর্যন্ত তাকে ঠিকমতো কেউ দেয়নি। এরপর নানা জনের কাছে খোঁজ নিয়ে জানলেন যে, তিনি তখন ফরিদপুর জেলে অনশন করছেন। অবশেষে পরিবারের সবাইকে ম্লানমুখে ঢাকা থেকে ফিরে যেতে হয়েছে।

 

১৯৫২ সালে অনশন ধর্মঘটের ফলে সরকার বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিল। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি যখন বাড়িতে পৌঁছান, তখন এক আবেগঘন মুহূর্তের সৃষ্টি হয়। শিশু শেখ হাসিনা দৌড়ে গিয়ে বাবার গলা জড়িয়ে ধরেন। আর শেখ কামাল, সে তখনও বুঝতে পারছে না- কে এই মানুষটা! বেশ কয়েকদিন তার এই অবস্থা ছিল, আব্বার কাছে সে আসতো না, দূর থেকে চেয়ে চেয়ে দেখতো। একদিন সকালে বঙ্গবন্ধু ও বেগম ফজিলাতুন্নেছা বসে বসে গল্প করছিলেন। বঙ্গবন্ধুর তখন হাঁটাহাঁটি করাও নিষেধ, শরীর তখনও ঠিক হয়নি। দুজনে বসে বসে দেখলেন: ছোট দুটি সন্তান (শেখ হাসিনা ও শেখ কামাল) মনের আনন্দে খেলা করছে। এমন সুখের সকাল তাদের দাম্পত্য জীবনে তো খুব বেশি আসেনি।

ছোট্ট হাসিনা খেলছে আর মাঝে মাঝে পিতার কাছে এসে ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ বলে ডাকছে। কামাল দূর থেকে তা দেখছে। হঠাৎ কামাল হাসিনাকে বললো, ‘হাচু আপা, হাচু আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি।’ বঙ্গবন্ধু আর নিজেকে সংবরণ করতে পারলেন না। বিছানা থেকে আস্তে আস্তে উঠে গিয়ে কামালকে কোলে তুলে নিলেন। বললেন, ‘আমি তো তোমারো আব্বা।’ পিতার কোলের উষ্ণতায় শিশু কামাল তখন বিহ্বল। আর আগে, বঙ্গবন্ধুর জেলে যাওয়ার সময় কামালের বয়স ছিল মাত্র কয়েক মাস। এরপর দুই বছরেরও বেশি সময় চলে গেছে। ছোট্ট কামালের মুখেও আধো আধো বুলি এসেছে, কিছুটা বুঝতেও শিখেছে। বুঝতে শেখা অবধি পিতার আদর কী, তা জানার সুযোগও হয়নি তার। বাবার কোলে ওঠার পর তাই সে গলা জড়িয়ে ধরে রইলো।

বেগম ফজিলাতুন্নেছাও তখন দীর্ঘদিন পরে স্বামীকে কাছে পেয়েছেন। যখন একান্তে তাকে পেলেন, কেঁদে ফেললেন। বললেন, ‘তোমার চিঠি পেয়ে আমি বুঝেছিলাম, তুমি কিছু একটা করে ফেলবা। … কেন তুমি অনশন করতে গিয়েছিলে? এদের কী দয়া মায়া আছে? আমাদের কারও কথা তোমার মনে ছিল না? কিছু একটা হলে কী উপায় হতো? আমি এই দুধের দুই বাচ্চা নিয়ে কী করে বাঁচতাম? হাচিনা, কামালের অবস্থা কী হতো?’ বঙ্গবন্ধু নীরবে সব কথা শুনে গেলেন। তিনি তো জানেন, তার জীবন অন্য আর দশটা পিতা বা স্বামীর মতো নয়। শুধু বললেন, ‘উপায় ছিল না।’

বঙ্গবন্ধু জেলে থাকলে পুরো পরিবারের সব দায়িত্ব সামলাতেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা। জেলের বাইরে থাকলেও অবস্থার খুব হেরফের হতো না। কারণ, বঙ্গবন্ধু ছিলেন খুবই ব্যস্ত একজন মানুষ। বাড়িতে সব সময় লোক গমগম করতো। তাই সংসারের সবকিছু সামলাতে হতো বেগম ফজিলাতুন্নেছাকেই। বঙ্গবন্ধুর ছোট কন্যা শেখ রেহানা তার মায়ের এই ভূমিকা সম্পর্কে বলেন, ‘গ্রামে জন্ম হওয়া একজন সাধারণ নারী আমার মা, ক্লাস ফোর-ফাইভ পর্যন্ত পড়েছেন মিশনারি স্কুলে। কিন্তু কী যে প্রজ্ঞা, কী যে তার ধৈর্য। আমার মায়ের কাছ থেকে আমাদের যে জিনিসটা সবার আগে শেখা উচিত, তা হলো ধৈর্য আর সাহস। সবাইকে এক করে রাখা। এতগুলো  লোক বাড়িতে খাচ্ছে-দাচ্ছে, আমাদের গ্রামে কোনো মেয়ে ম্যাট্রিক পাস করেছে, তাকে এনে ঢাকায় কলেজে ভর্তি করে দাও, কাকে বিয়ে দিতে হবে! সব সামলাচ্ছেন। এর মধ্যে সকালে আমাদের কোরআন শরিফ পড়া শেখাতে মৌলভি সাহেব আসছেন, তারপর নাচ শিখছি, সেতার শিখছি, বেহালা শিখছি—সব কিন্তু মায়ের সিদ্ধান্ত।’

 

বঙ্গবন্ধুর সংসার ছিল বাঙালি গৃহস্থের সংসার। সংসারের কাজের লোক থেকে শুরু করে সবাই সেই পরিবারের সদস্য। আত্মীয়-অনাত্মীয়, পাড়ার লোক, ফেরিওয়ালা, রাজনীতির লোক সবাই সেখানে পরিবারের মানুষের মতো। তিন বেলা অসংখ্য লোক আসছে-যাচ্ছে, আলাপ করছে, খাচ্ছে, এই ছিল বঙ্গবন্ধুর বাড়ির নিত্য দিনের চিত্র। বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরেও এই চিত্র প্রায় একই ছিল। কিন্তু ১৯৭৫ সালের পরে বাঙালির এই মহত্তম গৃহী যেদিন তার প্রায় পুরো পরিবারসহ নির্মম খুনের শিকার হলেন, সেদিন থেকে বাড়িটিতে নেমে আসে এক অনিঃশেষ নীরবতা। বঙ্গবন্ধুর আদরের কন্যা রেহানা আজও সেই স্মৃতিতে ফিরে ফিরে যান: ‘আমাদের ভর-ভরন্ত একটা পৃথিবী ছিল। হঠাৎ করে একদিন সব শূন্য হয়ে গেল। আমরা তো আগে কোনো দিন একা একা ভাত খাইনি। এখন একা একা ভাত খেতে হয়।’

মহান নেতারা অবিশ্বাস্য মানসিক শক্তি, ত্যাগ ও দক্ষতার অধিকারী হন। কিন্তু তিনি যে পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন, তাদেরও বিরাট ত্যাগ শিকার করতে হয়। পরিবারের সদস্যদেরও থাকতে হয় নেতার মহত্ব ও প্রতিভাকে ধারণ করার উপযুক্ত ধৈর্য, মনন ও শক্তি। এর জন্য সমাজ সংসারের অনেক আমোদ প্রমোদ ত্যাগ করতে হয় তাদের। বঙ্গবন্ধুর পরিবারের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটেছিল। পাকিস্তান আমলের প্রায় চব্বিশটা বছর বঙ্গবন্ধুর পরিবার কখনও সাংসারিক প্রশান্তি নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেননি। তার বৃদ্ধ পিতামাতা তাকে নিয়ে সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকতেন। স্ত্রী ফজিলাতুন্নেছাও কখনও স্বামী-সন্তান নিয়ে নিশ্চিন্ত সংসার গুছিয়ে নিতে পারেননি। আর তার শিশু সন্তানেরা পায়নি পিতার নিরন্তর সান্নিধ্য। মূলত পুরো পাকিস্তান আমলটাই বঙ্গবন্ধুর পরিবারের জন্য ছিল একটি ধারাবাহিক দুঃখের গল্প। বাঙালির এই মহান নেতার মহত্বের পাশাপাশি তার পরিবারের বিরাট আত্মত্যাগও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

 


আরও সংবাদ