শুক্রবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ০৯:৩৮ অপরাহ্ন

আল জাজিরা ফিল্মের সন্ত্রাসী ফ্রিডম মোস্তফার আন্ডারওয়ার্ল্ডের অপরাধ অধ্যায়!

সুভাষ হিকমত
আপডেট : সোমবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

‘ফ্রিডম মোস্তফা’। মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফারই আরেক নাম। ছিলেন ফ্রিডম পার্টির ধানমন্ডি-মোহাম্মদপুর-মিরপুর থানার কো-অর্ডিনেটর। চাপাতির সঙ্গে ছোট-বড় অস্ত্র চালানো বা বোমা চার্জ-সবকিছুতেই একেবারে সিদ্ধহস্ত। বড় ভাই হাবিবুর ওরফে পাগলা মিজানের সঙ্গে লিবিয়ায় গাদ্দাফির তত্ত্বাবধানে নিয়েছিলেন বিশেষ গেরিলা প্রশিক্ষণ। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সর্বহারা গ্রুপগুলোর সঙ্গেও ছিল তাঁর ‘মধুর’ সম্পর্ক।

‘দেহরক্ষী’ ছিলেন বঙ্গবন্ধুর খুনি কর্নেল খন্দকার আবদুর রশিদ ও সৈয়দ ফারুক রহমানের। দুই ভয়ঙ্কর অপরাধীর  সুরক্ষায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের নিয়ে গড়েছিলেন ‘নিরাপত্তা বুহ্য’। নব্বইয়ের দশকে আরও আগে রাজধানীর ‘বেস্ট ফিফটি’র এ দুর্ধর্ষ কিলার গ্রুপকে নিয়ন্ত্রণ করতেন এক হাতেই। পান থেকে চুন খসার ঠুনকো অজুহাতে মুড়ি মুড়কির মতোই খুন-জখম করেছেন।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় চুরি, ছিনতাই, দখলদারিত্বসহ নানা অপরাধের মাধ্যমে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ হিসেবে নামডাক কামিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ১৯৮৯ সালের ১০ আগস্ট ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে হত্যা প্রচেষ্টার মিশনে সম্মুখভাগে নেতৃত্ব দিয়ে ওই সময় বিএনপি-জাপাসহ বিভিন্ন মহলে বিশেষ সমীহও পেতেন। এ কারণেই সরকারের পুরস্কার ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় নাম উঠেনি তাঁর।

 

এমনকি নিজের মৃত্যুর মাস তিনেক আগেও গুলি করে হত্যা করেছিলেন ভিডিও গেমস খেলারত এক নিরাপরাধ কিশোরকে। অন্ধকার জগতে পর্বতের মতোই পাপের বোঝা ভারী করতে করতেই দুষ্কৃতিকারীদের গুলিতে মারা পড়ার মধ্য দিয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডে আরেকটি কালো অধ্যায়ের যবনিকাপাত ঘটে ২৬ বছর আগে, ১৯৯৬ সালে।

সেই সময় মৃত্যুর আগে মোস্তফা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে স্বীকার করেছিলেন, ‘কোমরে পিস্তল ঝুঁলিয়েই প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াতেন।’ অথচ কাতারভিত্তিক প্রোপাগান্ডা চ্যানেল আলজাজিরার সিনেমাটিক কল্পকাহিনীতে এই ভয়ানক-অভিশপ্ত খুনিকে রীতিমতো ‘দুধে ধোয়া তুলসী পাতা’ এবং কুড়াল প্রতীকের ফ্রিডম পার্টিকে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল হিসেবে উপস্থাপনের মাধ্যমে নির্লজ্জ মিথ্যাচারের সম্পূর্ণ অসৎ প্রচারণা চালানো হয়েছে।

প্রতিহিংসার কল্পকাহিনির চিত্রনাট্যে কথিত ‘ব্যবসায়ী’ অভিধায় কিলার মোস্তফাকে পরিচিত করার পর বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা ঘুরে মিলেছে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য। মোস্তফার পরিচয় গোপনের কসরতের পাশাপাশি তথ্য-প্রমাণহীন পূর্ণ মিথ্যাচারের এ চিত্রায়ণের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছেন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের নানা শ্রেণি পেশার মানুষ।

 

টোকাই থেকে ফ্রিডম পার্টিতেঃ
এক সময় টোকাই ছিলেন। দেশের শীর্ষ স্থানীয় সন্ত্রাসী আর সর্বহারাদের নিয়ে কর্নেল ফারুক-রশীদ ফ্রিডম পার্টির কার্যক্রম পুরো মাত্রায় শুরু করলে সন্ত্রাসী এ দলটিতে যোগ দেন মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা। নতুন অস্ত্র আর নগদ অর্থের লোভ দেখিয়ে স্বল্প সময়ের মধ্যেই মোহাম্মদপুর এলাকায় দলীয় অবস্থান সুসংহত করেন। পুরস্কারও পান হাতেনাতে।

লিবিয়ায় তাকেসহ শতাধিক তরুণ-যুবককে পাঠানো হয় বিশেষ প্রশিক্ষণ নিতে। দেশে ফিরে পুরোদমে বেপরোয়া হয়ে উঠেন। ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর এলাকায় অপরাধের নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠার পর নিজ গোত্রেই তাকে দেওয়া হয় ‘ফ্রিডম মোস্তফা’ নাম।

বরিশালের নলসিটিতে মোস্তফার সর্বহারা পার্টির দুর্ধর্ষ  টিম ছিলো। এই টিমের অন্যতম সদস্য ছিলেন বাহার ও স্বাধীন। এছাড়া খুনোখুনি, দখলবাজি, চাঁদাবাজিসহ অনেক অপরাধেও যুক্ত ছিলেন এ মোস্তফা। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় ধানমন্ডি মোহাম্মদপুর এলাকার কেউ তার ভয়ে মুখ খুলতে সাহস করতো না।

মোস্তফার সাথে সব সময় থাকতো মিরপুরের ল্যাংড়া তাসগীর, ধানমন্ডির ফ্রিডম টিপ্পন, ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর অন্যতম শুভ্রতো বাইন (বর্তমানে কলকাতার আলীপুর জেলে বন্দী), সায়েদাবাদ-ফুলবাড়িয়ার কালা লিয়াকত, যিনি পরবর্তীতে নিজ দলের সন্ত্রাসীদের হাতেই প্রাণ হারিয়েছেন।

 

অনেক অপকর্মের নায়কঃ
আলজাজিরা সিরিয়ালের কথিত ‘ব্যবসায়ী’ চরিত্র মোস্তফা আদতে অনেক অপকর্মের নায়ক। বহুবার অবৈধ অস্ত্র নিয়ে গ্রেফতার হয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে মিরপুর থানাতেও ওই সময় খুন, জখম, চাঁদাবাজিসহ প্রায় একডজন মামলা ছিল।

মোস্তফা মারা যাওয়ার দুই থেকে তিনমাস আগে ১৯৯৬ সালে লালমাটিয়া ভিডিও ক্লাবে আজাদ নামে জনৈক ব্যবসায়ীর কাছে চাঁদাদাবি করেন। কিন্তু কাঙ্খিত চাঁদা না পেয়ে গুলি ছুঁড়েন। এতে ক্লাবের ভেতরে ভিডিও গেমস খেলারত এক কিশোর গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। এ ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানায় মোস্তফার বিরুদ্ধে মামলা হয়। এরকম আরও অনেকের রক্তে নিজের হাত রাঙিয়েছেন মোস্তফা।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর সরকারি কলেজের ভিপি সাঈদ আহমেদ টিপুকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় সরাসরি অভিযুক্ত সরকারের পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজেদুল ইসলাম ইমন ওরফে ক্যাপ্টেন ইমনের গুরুও ছিলেন ফ্রিডম মোস্তফা। ইমনকে মোস্তফাই ফ্রিডম পার্টির পদে আনেন। মোস্তফার প্রতিপক্ষ গ্রুপ ছিলো শীর্ষ সন্ত্রাসী বিকাশ ও প্রকাশ।

 

মোস্তফা হত্যা মামলার পরস্পর বিরোধী এফআইআর-অভিযোগপত্রঃ
আন্ডারওয়ার্ল্ডের সিরিয়াল কিলার মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা ওরফে ফ্রিডম মোস্তফার মৃত্যু নিয়ে রয়েছে অনেক প্রশ্ন। চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলার এফআইআর (প্রাথমিক তথ্য বিবরণী) ও অভিযোগপত্রই একেবারে পরস্পর বিরোধী। মামলার এফআইআর’এ উল্লেখ করা হয়েছে- ‘জোসেফ মোস্তফার দুই উরুতে এবং ডান পায়ে পিস্তল দিয়ে গুলি করেন।

আর মাসুদ তার (মোস্তফা) বুকের দু’পাশে দু’টি গুলি করেন।’ অথচ মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রলীগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট তোফায়েল আহমেদ জোসেফকে ফাঁসাতে মামলার অভিযোগপত্রের তথ্য সম্পূর্ণ বিপরীতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

ফ্রিডম মোস্তফার ডায়িং ডিক্লেয়ারেশনের ভিত্তিতেই বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শাসনামলে জোসেফ এবং অন্যদের সাজা দেওয়া হয়েছিলো। সেই জবানবন্দিতে মোস্তফার স্বাক্ষর ছিলো না। এমনকি হাতের ছাপও ছিলো না। কিন্তু বিএনপি সরকারের ম্যাজিস্ট্রেট জোড়াতালি দিয়েই সেই জবানবন্দি তৈরি করেছিলেন বলেই ঘটনা ঘটেছিল এক জায়গায় অথচ মামলায় দেখানো হয়েছে অন্য স্থানের একটি ঘটনা।

মূলত রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই সেই সময়কার প্রতিবাদী তারুণ্য ছাত্রলীগ নেতা জোসেফকে ‘খুনি’ এবং ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’র তকমা দিয়েছিল হাওয়া ভবন নিয়ন্ত্রিত সেই সময়কার সরকার।

 

প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার অন্যতম পরিকল্পনাকারীঃ
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা চেস্টার অন্যতম পরিকল্পনাকারী ছিলেন এই মোস্তফা। ১৯৮৯ সালের ১০ আগস্ট ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়িতে শেখ হাসিনার ওপরে ফ্রিডম পার্টির ১০ থেকে ১২ জনের যে দলটি গুলি চালায়, সেটাতে নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা। ফ্রিডম পার্টির সদস্য কাজল ও কবিরও ছিলেন এ কিলিং মিশনে।

পরবর্তীতে এ ঘটনায় ধানমন্ডি থানায় একটি মামলা হয়। মামলা নম্বর : ২৪, ১১/০৮/৮৯। ১৯৯৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মামলার অভিযোগপত্র দেয়। এতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব:) সৈয়দ ফারুক, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব:) আবদুর রশিদ ও মেজর (অব:) বজলুল হুদা এবং নাজমুল মাকসুদ মুরাদসহ বেশ কয়েকজনকে আসামি করা হয়। অভিযোগপত্রে ১৮ নম্বর আসামি মোস্তফা।

পরবর্তীতে ২১ বছর আগে আদালতে স্বাক্ষী হিসেবেই তার বড় ভাই পাগলা মিজানও প্রকারান্তরে জবানবন্দিতে স্বীকার করেন শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টায় নিজের ছোট ভাই মোস্তফার কাপুরুষোচিত মিশনের কথা আগে থেকেই তিনি জানতেন।


আরও সংবাদ