মঙ্গলবার, ০২ মার্চ ২০২১, ০২:০৭ পূর্বাহ্ন
শীর্ষ সংবাদ
স্বৈরাচার জিয়ার নির্দেশে ঢাকা, কুমিল্লা ও বগুড়া কারাগারে ২০৯ জনের ফাঁসির তালিকা মুশতাক-সামি-তাসনিম খলিল গংদের বাকস্বাধীনতার নমুনা বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজড়িত ১ মার্চ জাতীয় বীমা দিবসে প্রধানমন্ত্রী যা বললেন ঐতিহাসিক ‘৭ মার্চ’ উদযাপনে হঠাৎ বিএনপির বোধদয় কেন? শিক্ষার উন্নয়ন ও প্রসারে বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়নশীল দেশের কাতারে বাংলাদেশ এবং চ্যালেঞ্জ দেশ-বিরোধী চক্রান্ত ও বাক স্বাধীনতার সীমারেখা কিশোর-মুশতাকের জামিন নাকচ যে কারনে : একই চক্রে তাসনিম খলিল-সামি স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ বাংলাদেশের মার্কিন দূতাবাস এবং ঢাকাস্থ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের বিবৃতি লিখে দিলো কে?

’৮৯ সালের ১০ আগস্ট গ্রেনেড গুলিতে কেঁপে ওঠে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর

ইবার্তা সম্পাদনা পর্ষদ
আপডেট : বুধবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

যেভাবে ফ্রিডম পার্টির ভয়ঙ্কর হামলা
ধানমন্ডি থানায় দুটি মামলায় ২৮ বছর পর ২০১৭ সালের ২৯ অক্টোবর রায়ে ১১ জনের সাজা হয়। চারজন এখনো পলাতক..

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই কালরাতের মতোই ১৯৮৯ সালে খুনির দল ফ্রিডম পার্টি হামলা চালিয়েছিল ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের বঙ্গবন্ধু ভবনে। গ্রেনেড বোমা আর বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণে ১৪ বছর পর মধ্যরাতে আবারও কেঁপে উঠেছিল পুরো ধানমন্ডি এলাকা। ’৭৫-এ বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া বঙ্গবন্ধুকন্যা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ছিলেন খুনিদের টার্গেটে। বঙ্গবন্ধু ভবনের ভিতরে শেখ হাসিনা রয়েছেন, তা নিশ্চিত হয়েই ফ্রিডম পার্টির খুনিরা ওই হামলা চালায়।

 

কিন্তু নিরাপত্তারক্ষী হাবিলদার জহিরুল হক ও কনস্টেবল জাকির হোসেন সেই হামলা প্রতিহত করে রক্ষা করেন বঙ্গবন্ধুকন্যাকে। তাদের পাল্টা গুলিবর্ষণে অস্ত্রধারীরা কর্নেল ফারুক জিন্দাবাদ ফ্রিডম পার্টি জিন্দাবাদ স্লোগান দিতে দিতে পালিয়ে যায় তাদের ধানমন্ডি ২৬ নম্বর সড়কের অফিসের দিকে। এ ঘটনায় ধানমন্ডি থানায় হাবিলদার জহিরুল হক বাদী হয়ে দুটি পৃথক মামলা দায়ের করেন। ২৮ বছর পর ২০১৭ সালের ২৯ অক্টোবর মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। এ মামলায় ফ্রিডম পার্টির ১১ জনের সাজা হয়। চারজন এখনো পলাতক। তারা প্রত্যেকেই ফ্রিডম পার্টির নেতা-কর্মী এবং লিবিয়ায় অস্ত্র ও গ্রেনেড নিক্ষেপে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।

ঘটনার সেই রাতে বঙ্গবন্ধু ভবনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বর্তমানে আওয়ামী লীগের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস। তিনি বলেন, ’৭৫-এর আগস্টের কালরাতে নজিরবিহীন হামলার ঘটনায় বেঁচে গেলেও বুলেট তাড়া করছিল তাকে সব সময়। খুনিচক্র সেই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই ’৭৫-এর হামলার ১৪ বছর পর সেই আগস্টেই বঙ্গবন্ধু ভবনে হামলা চালিয়েছিল। তিনি বলেন, আগস্টে খুনিচক্র বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার আবহ তৈরি করে। সে কারণে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ নেতা-কর্মীরা এ সময় সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকার চেষ্টা করে। ১৯৮৯ সালের ১০ আগস্টেও বঙ্গবন্ধু ভবনে নেতা-কর্মীরা ছিলেন। ভবনের বাগান, বারান্দায় মাদুর পেতে ঘুমাতেন। জননেত্রীর নিরাপত্তায় এভাবেই পাহারায় থাকতেন সবাই। লেকপাড় থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধু ভবনের ভিতরে-বাইরে নেতা-কর্মীরা অবস্থান করতেন। মৃণাল কান্তি দাস বলেন, ‘সেই রাতেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি।

 

মধ্যরাতে আকস্মিক গোলাগুলির শব্দে বঙ্গবন্ধু ভবনসহ ধানম-ি এলাকা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। আমরা বঙ্গবন্ধু ভবনের গেটের দিকে দেখতে পাই ১৫/২০ জনের অস্ত্রধারীকে। তারা বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ করতে থাকে। আর গ্রেনেড ও বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। একপর্যায়ে ভবনের নিরাপত্তারক্ষীরা পাল্টা গুলি চালায়। নেতা-কর্মীরাও একজোট হয়ে তাদের ধাওয়া দিতে শুরু করি। অস্ত্রধারীরা সেসময় গুলি করতে করতে পালিয়ে যেতে থাকে। তারা বঙ্গবন্ধুর খুনি কর্নেল ফারুক, রশীদ আর ফ্রিডম পার্টির নামে স্লোগান দিতে দিতে পালাতে থাকে ধানম-ির ফ্রিডম পার্টির অফিসের দিকে। ’ তিনি বলেন, সেই রাতে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ছাড়াও অসীম কুমার উকিল, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, নজিব আহমেদ, শেখ আকরাম, ইকবাল হাসান অপু, খিজির হায়াত, মানু মজুমদার, নকিব আহমেদ, আ ন ম সেন্টু ছাড়াও অনেক নেতা ছিলেন।
যা ঘটেছিল সেই রাতে : ১৯৮৯ সাল। ১০ আগস্ট দিবাগত মধ্যরাত। ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের বঙ্গবন্ধু ভবন। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা তখন দোতলার কক্ষে অবস্থান করছেন। ভবনের বারান্দা, নিচতলার বিভিন্ন কামরা ও বাগানে অসংখ্য নেতা-কর্মী। কেউ ঘুমিয়ে আছেন। কেউ কেউ রাজনৈতিক আলাপে ব্যস্ত। এরশাদ আমলের সেই সময়ের রাজনীতির মাঠও গরম। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছিল চারদিকে। হঠাৎ বোমার বিকট শব্দ। বঙ্গবন্ধু ভবনের মূল ফটকের সামনেই ধোঁয়ার কু-লী। এরপরই মুহুর্মুহু গুলির শব্দ। বঙ্গবন্ধু ভবনের ভিতরে তখন আতঙ্ক। আবারও কি সেই ’৭৫-এর কালরাত ফিরে এলো! এমন আশঙ্কা প্রথমে নেতা-কর্মীদের মাঝে। গুলির শব্দ বন্ধ হচ্ছে না। ভবনের ভিতর থেকে দেখা যাচ্ছিল সামনের সড়কটি। সেখানে ১৫/২০ জন অস্ত্রধারী। প্রত্যেকের হাতেই চকচকে অস্ত্র। অত্যাধুনিক। বুঝতে বাকি রইল না কারা। এরা ফ্রিডম পার্টির অস্ত্রবাজ। ততক্ষণে বঙ্গবন্ধু ভবনের নিরাপত্তা রক্ষীরাও প্রাণপণ যুদ্ধ শুরু করেছে। সন্ত্রাসীদের গুলির জবাবে তারা পাল্টা জবাব দিচ্ছিল। ভবনের ভিতরের নেতা-কর্মীরা একজোট হয়ে ধাওয়া দিতে শুরু করে। নিরাপত্তারক্ষীদের পাল্টা গুলি আর নেতা-কর্মীদের ধাওয়ায় পালাতে থাকে ফ্রিডম পার্টির অস্ত্রবাজরা। তারা গুলি করতে করতে পালাতে থাকে। আশ্রয় নেয় ধানমন্ডি ফ্রিডম পার্টির অফিসে। এভাবেই সেদিন প্রাণে রক্ষা পেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা।

 

ধানমন্ডি থানায় মামলা দায়েরের পর ১৯৯৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি সিআইডির তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার খালেক উজ্জামান ১৬ জনকে আসামি করে চার্জশিট দাখিল করেন। এ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়।

চার্জশিটভুক্ত ১৬ আসামি হলেন- ফারুক রহমান (বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় ফাঁসি কার্যকর), আবদুর রশীদ, বজলুল হুদা (বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় ফাঁসি কার্যকর), রেজাউল ইসলাম খান ওরফে ফারুক ওরফে ফারুক রেজা, হুমাউন কবীর (জামিনে মুক্ত), গাজী লিয়াকত ওরফে কালা লিয়াকত, মিজানুর রহমান (জামিনে মুক্ত), জর্জ, শাজাহান ওরফে বালু (জামিনে মুক্ত), গোলাম সারোয়ার ওরফে মামুন, সোহেল ওরফে ফ্রিডম সোহেল (পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসী), জাফর আহমেদ মানিক (পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসী, পলাতক), নাজমুল মাকসুদ মুরাদ, গাজী ইমাম হোসেন ওরফে ইমাম (পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসী), হুমায়ুন কবীর (জামিনে মুক্ত) ও খন্দকার আমিরুল ইসলাম ওরফে কাজল (জামিনে মুক্ত)। আসামিদের মধ্যে জর্জ, গোলাম সারোয়ার ওরফে মামুন ও ফ্রিডম সোহেল কারাগারে আটক রয়েছেন।

দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার পর ২০০৯ সালের ৫ জুলাই আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। ২৭ আগস্ট শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ। পরে মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম আবারও ঝুলে যায়। মুরাদ ১৯৯৬ সালের প্রথম দিকে গ্রেফতার হওয়ার পর ওই বছরের ৩ অক্টোবর জামিনে মুক্তি পেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান। যুক্তরাষ্ট্রে সপরিবারে বসবাস করে তিনি ব্যবসা করতেন। তাকে ধরিয়ে দিতে ইন্টারপোলের ‘রেড নোটিস’ জারি করা হয়। ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টা থেকে ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) সহায়তায় হোমল্যান্ড সিকিউরিটি আটক করে মুরাদকে। পরে ১৯১৪ সালের ১৯ মার্চ ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাকে দেশে ফেরত আনা হয়।

 

সিআইডির একটি সূত্র জানায়, মুরাদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামিদের যোগাযোগ থাকার ব্যাপারে নিশ্চিত হন গোয়েন্দারা। এ ব্যাপারে সিআইডির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামি আবদুর রশীদের সঙ্গে মুরাদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিল। তাদের মধ্যে একাধিকবার বৈঠক হয়েছে বলে তারা নিশ্চিত হয়েছেন। ফ্রিডম পার্টিও নেতা পরিচয় দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব নেওয়ার চেষ্টা করে মুরাদ। মুরাদের বাবার নাম মৃত তোফাজ্জল হোসেন। বাসা-২৮৭, উত্তর শাহজাহানপুর। গ্রামের বাড়ি হবিগঞ্জ। ’

বিচার : ধানম-ির ৩২ নম্বর বাড়িতে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার দুই মামলায় ফ্রিডম পার্টির ১১ নেতা-কর্মীর সাজা দেয় আদালত। এর মধ্যে হত্যাচেষ্টা মামলায় প্রত্যেককে ২০ বছর করে এবং বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের মামলায় যাবজ্জীবন কারাদ- দেওয়া হয়। ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. জাহিদুল কবির দুই দফায় ২০১৭ সালের ২৯ অক্টোবর এ রায় দেন। বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের মামলায় যাবজ্জীবন কারাদ-ের পাশাপাশি প্রত্যেক আসামির ২০ হাজার টাকা করে জরিমানা এবং অনাদায়ে ছয় মাসের করে কারাদ- দেওয়া হয়েছে।

দুই মামলায়ই আসামি মো. হুমাউন কবির ওরফে কবিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দিয়েছে আদালত। রায় ঘোষণার সময় ৮ আসামি উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে একজন খালাস পান। বাকি চার আসামি পলাতক।

 

সাজাপ্রাপ্তরা হলেন- বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদ- পাওয়া লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) খন্দকার আবদুর রশীদ (পলাতক), মো. মিজানুর রহমান, জর্জ মিয়া, গোলাম সারোয়ার ওরফে মামুন, মো. সোহেল ওরফে ফ্রিডম সোহেল, সৈয়দ নাজমুল মাকসুদ ওরফে মুরাদ, গাজী ইমাম হোসেন, খন্দকার আমিরুল ইসলাম ওরফে কাজল, জাফর আহমেদ ওরফে মানিক (পলাতক), মো. হুমায়ুন কবির ওরফে হুমায়ুন (পলাতক) ও মো. শাহজাহান ওরফে বালু (পলাতক)।

দুই রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার ঘটনা এবং শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রের সঙ্গে লিপ্তরাই শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ওই হামলা চালায়।

 

সুত্র- বাংলাদেশ প্রতিদিন


আরও সংবাদ