1. অন্যরকম
  2. অপরাধ বার্তা
  3. অভিমত
  4. আন্তর্জাতিক সংবাদ
  5. ইতিহাস
  6. এডিটরস' পিক
  7. খেলাধুলা
  8. জাতীয় সংবাদ
  9. টেকসই উন্নয়ন
  10. তথ্য প্রযুক্তি
  11. নির্বাচন বার্তা
  12. প্রতিবেদন
  13. প্রবাস বার্তা
  14. ফিচার
  15. বাণিজ্য ও অর্থনীতি

সুস্থ শরীর ও অক্সিজেনের জন্য প্রয়োজন সমৃদ্ধ বন

ধরিত্রী সরকার সবুজ : ইবার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকম
মঙ্গলবার, ২১ মার্চ, ২০২৩

যখন আমরা এক গ্লাস পানি পান করি, একটি নোটবুকে কিছু লিখি, জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ওষুধ খাই অথবা বসবাসের জন্য একটি ঘর তৈরি করি—এসবের সঙ্গে বনের কী সম্পর্ক আছে, তা সব সময় চিন্তাও করি না। এগুলোসহ জীবনের আরো অনেক কিছুর সঙ্গেই কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে আছে বন-বনানী, গাছপালার নিবিড় সম্পর্ক।

বনের টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং বনজ সম্পদের সঠিক ব্যবহার জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভালো থাকা এবং সমৃদ্ধির জন্য বন-বনানীর অবদান অনেক। দারিদ্র্য বিমোচন এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জনের জন্যও বন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। তবে প্রতিবেশগত, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং স্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও মানুষের অতিরিক্ত ব্যবহার, আগুন, পোকামাকড় এবং খরার কারণে পৃথিবীব্যাপী বন বিপদাপন্ন হয়ে পড়ছে।

আমাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বনের ভূমিকা ব্যাপক। বন পানি ও বাতাস পরিষ্কার করে, জীবনধারণের জন্য খাদ্য এবং জীবন সুরক্ষার জন্য ওষুধ দেয়। জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করার জন্য বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিয়ে নেয়। ঝড়-ঝঞ্ঝা থেকে আমাদের রক্ষা করে। শ্রান্তি বিনোদন এবং মনের প্রশান্তি অর্জনের জন্যও মানুষ প্রকৃতির কাছেই ফিরে যায়।

আজ আন্তর্জাতিক বন দিবস। পৃথিবীব্যাপী বনের গুরুত্ব মানুষের সামনে তুলে ধরা এবং বন সংরক্ষণে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দিবসটি উদযাপন করা হয়। এবারের আন্তর্জাতিক বন দিবসের প্রতিপাদ্য

‘Forests and Health ’, যার বাংলা ভাবার্থ করা হয়েছে ‘সুস্থ শরীর সুস্থ মন, যদি থাকে সমৃদ্ধ বন’। এবারের আন্তর্জাতিক বন দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চায়, মানুষের সুস্বাস্থ্যের জন্য একটি সমৃদ্ধ বনের প্রয়োজন আর বনকে ভালো রাখার দায়িত্ব আমাদের ওপর বর্তায়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০১২ সালে ২১ মার্চকে আন্তর্জাতিক বন দিবস ঘোষণা করে। এই দিনটিকে বিভিন্ন দেশে স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বন, গাছপালা এবং বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে উদযাপন করা হয়। বনের প্রয়োজনীয়তা এবং এর সংরক্ষণ বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি দিনটি পালনের একটি উল্লেখযোগ্য উদ্দেশ্য।

ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ুর তারতম্যের কারণে বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের বনাঞ্চল রয়েছে। পাহাড়ি বন, প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বন, শালবন, জলাভূমির বন বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতিতে সৌন্দর্যের ডালি সাজিয়েছে আপন মহিমায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো একটি ভূখণ্ডে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় থাকার জন্য প্রয়োজন ২৫ শতাংশ বনভূমির। আমাদের দেশে বনভূমির পরিমাণ তার চেয়ে বেশ কম। বাংলাদেশের আয়তন এক লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটার এবং বনভূমির পরিমাণ প্রায় ২৩ লাখ হেক্টর, যা দেশের মোট আয়তনের প্রায় ১৫.৫৮ শতাংশ। বাংলাদেশের বৃক্ষ আচ্ছাদিত ভূমির পরিমাণ দেশের মোট আয়তনের ২২.৩৭ শতাংশ।

একসময় পার্বত্য চট্টগ্রামের পুরোটাই ছিল পাহাড়ি বনভূমি। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার, বান্দরবানের অরণ্যভূমি এ দেশকে দিয়েছে হাজারো প্রজাতির গাছপালা ও অনেক বন্য প্রাণী। সিলেট, মৌলভীবাজার এবং হবিগঞ্জ জেলায়ও বেশ পাহাড়ি বনাঞ্চল রয়েছে। পাহাড়ি বনের পরিমাণ প্রায় ১৩ লাখ ৭৭ হাজার হেক্টর এবং এই বনে গর্জন, চাপালিশ, তেলসুর, উড়িআম, ঢাকিজাম, সিভিট, সেগুন, গামার, চম্পা, জারুল, বৈলাম প্রভৃতি গাছ পাওয়া যায়। এ ছাড়া এই বনাঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে বাঁশ ও বেত পাওয়া যায়। পাহাড়ি বনে বন্য প্রাণীর মধ্যে হাতি, চিতা বাঘ, বন্য শূকর, হরিণ, হনুমান, বানর, উল্লুক, শজারু, বনরুই, ধনেশ, বনমোরগ, শকুন, অজগর, টিয়া, ময়না ইত্যাদির বসবাস রয়েছে।

গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ ও শেরপুর জেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে শালবনের অবস্থান। তা ছাড়া দেশের উত্তরাঞ্চলের দিনাজপুর, রংপুর, লালমনিরহাট, নওগাঁ, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলায় অল্প কিছু শালবন রয়েছে। শালবনের মূল প্রজাতি শাল, যা অনেকেই গজারি বলে জানে। শুষ্ক মৌসুমে অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে শালগাছের পাতা ঝরে যায় বলে একে পত্রঝরা বনও বলা হয়। এই বনে হরীতকী, বহেড়া, কড়ই, শিমুল, অর্জুন ইত্যাদি প্রজাতির বৃক্ষ রয়েছে। শালবনের উল্লেখযোগ্য বন্য প্রাণীর মধ্যে রয়েছে মেছো বাঘ, বনবিড়াল, বানর, শিয়াল, সাপ, পাখি ইত্যাদি।

বাংলাদেশের গর্ব হিসেবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণজুড়ে বিস্তৃত রয়েছে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। এই বনের অবস্থান খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায়। বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে এই বন অবস্থিত। এই বনের আয়তন প্রায় ছয় লাখ এক হাজার ৭০০ হেক্টর, যা দেশের আয়তনের ৪.০৭ শতাংশ। সুন্দরী, গেওয়া, গরান, কেওড়া, পশুর, বাইন ইত্যাদি এই বনের প্রধান বৃক্ষ প্রজাতি। সুন্দরবনের উল্লেখযোগ্য বন্য প্রাণী হচ্ছে বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, বানর, শূকর, কুমির, অজগর ইত্যাদি। এই বনের মধ্য দিয়ে পশুর, শিবসা, বলেশ্বর, রায়মঙ্গল ইত্যাদি নদ-নদী প্রবাহিত হয়েছে। তা ছাড়া শত শত খাল এই বনের মধ্যে জালের মতো ছড়িয়ে আছে।

সুন্দরবন শুধু বৃক্ষসম্পদ নয়, এই বন মৎস্যসম্পদেরও এক বিরাট আধার। এই বনে ইলিশ, লইট্যা, ছুরি, পোয়া, রূপচাঁদা, ভেটকি, পারসে, চিংড়ি, চিত্রা ইত্যাদি মাছ ও কাঁকড়া পাওয়া যায়। সুন্দরবনের তিনটি বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য নিয়ে গঠিত এক লাখ ৩৯ হাজার ৭০০ হেক্টর বনাঞ্চলকে ইউনেসকো ১৯৯৭ সালে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে।

আমাদের আছে রাতারগুলের জলাবন। রাতারগুল দেশের অন্যতম একটি দৃষ্টিনন্দন জলাভূমির বন। সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলায় এই বন অবস্থিত। রাতারগুলের আয়তন ২০৪.২৫ হেক্টর, যা দেশের আয়তনের ০.০১ শতাংশ। এই বনের প্রধান বৃক্ষ প্রজাতিগুলো হলো হিজল, করচ, পিটালী, বরুণ ইত্যাদি। বছরের প্রায় অর্ধেক সময় এই বনের গাছ পানিতে আংশিক ডুবে থাকে। বানর, মেছো বাঘ, ভোঁদড়, কাঠবিড়ালী, সাপ, পাখি ইত্যাদি বন্য প্রাণী এখানে বাস করে। এই বন মিঠা পানির মাছের আবাসস্থল ও প্রজননের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দেশের জনসংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে মানুষের চাহিদা। বর্ধিত জনসংখ্যার বর্ধিত চাহিদা মেটাতে গিয়ে অনেক সময় বন কাটা পড়ছে। মানুষের আবাসস্থল বাড়াতে, নতুন কৃষিজমি তৈরি করতে এবং ইমারত নির্মাণের সামগ্রী জোগাতে গিয়ে গাছপালা কেটে কাঠের জোগান দিতে হচ্ছে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং আজ বিশ্বব্যাপী আলোচিত শব্দ এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে যে কয়েকটি ভূখণ্ড সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে রয়েছে, তার প্রথম দিকেই রয়েছে বাংলাদেশ।

পৃথিবীব্যাপী শিল্পের প্রসারের ফলে অতিমাত্রায় কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস নিঃসরণের কারণেই এই গ্লোবাল ওয়ার্মিং। উদ্ভিদ তার খাদ্য তৈরির জন্য কার্বন ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করে বিধায় যত বেশি বৃক্ষরাজি থাকবে, কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ ততই কমবে। সে জন্য পরিবেশ ভালো রাখতে বনায়নের কোনো বিকল্প নেই।

দেশে এখনো যে পরিমাণ বনভূমি আছে, তা আর যাতে নষ্ট না হয়, সেটা নিশ্চিত করা দরকার। বনভূমিগুলোর যে অংশ থেকে গাছপালা এরই মধ্যে কাটা পড়েছে, সেখানে পর্যাপ্ত পরিমাণ নতুন গাছের চারা রোপণসহ তার সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে বড় করে তোলা প্রয়োজন।

অসংখ্য বন্য প্রাণীর আবাসস্থল আমাদের প্রাকৃতিক বন। প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে বনভূমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রায় প্রতিবছর উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপকভাবে বনায়ন কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রাকৃতিক বন রক্ষার পাশাপাশি বনের বাইরেও বেশি বেশি গাছ লাগানো হচ্ছে। উজাড় হওয়া বন এবং উপকূলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার ফাঁকা জমিতে পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ করা হচ্ছে এবং বনভূমি রক্ষায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ বনভূমি রক্ষায় ভালো প্রভাব রাখছে।

দেশব্যাপী সড়ক ও রেলপথের ধারে সরকার ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পারস্পরিক স্বার্থ সংরক্ষণের মাধ্যমে বড় ও দীর্ঘজীবী গাছ লাগানো দরকার। শহর ও গ্রামাঞ্চলের প্রত্যেক মানুষকে তার বাড়ির আশপাশের জায়গাগুলোতে যেকোনো ধরনের ফলদ বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করে তোলা প্রয়োজন। ব্যক্তির মধ্যে উৎসাহ, সৃজনশীলতা, বৃক্ষপ্রেম থাকলে শহরে বাড়ির ছাদেও সুন্দর বাগান গড়ে তোলা যায়। ফলে ছাদ বাগান থেকে বিভিন্ন ধরনের ফল পাওয়া যায়। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধবতার দৃষ্টিকোণ থেকেও পুরো বিশ্ব উপকৃত হতে পারে। আমরা নিজের জন্য, দেশের জন্য, সর্বোপরি সমগ্র বিশ্বের জন্য এই উপকারটুকু অবশ্যই করতে পারি।

লেখক: ধরিত্রী সরকার সবুজ – পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক লেখক।


সর্বশেষ - জাতীয় সংবাদ

নির্বাচিত