1. [email protected] : অনলাইন ডেস্ক : অনলাইন ডেস্ক
  2. [email protected] : নিজস্ব প্রতিবেদক : নিজস্ব প্রতিবেদক
  3. [email protected] : নিউজ এডিটর : নিউজ এডিটর
থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে || বিয়ের আগেই হোক রক্ত পরীক্ষা - ebarta24.com
  1. [email protected] : অনলাইন ডেস্ক : অনলাইন ডেস্ক
  2. [email protected] : নিজস্ব প্রতিবেদক : নিজস্ব প্রতিবেদক
  3. [email protected] : নিউজ এডিটর : নিউজ এডিটর
থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে || বিয়ের আগেই হোক রক্ত পরীক্ষা - ebarta24.com
রবিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ১২:৩৯ পূর্বাহ্ন

থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে || বিয়ের আগেই হোক রক্ত পরীক্ষা

সম্পাদনা:
  • সর্বশেষ আপডেট : বুধবার, ৮ মে, ২০১৯

থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে নিজে জানুনও জানতে সহায়তা করুন।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার জরিপ প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ৪ দশমিক ১ ভাগ মানুষ ‘বিটা থ্যালাসেমিয়া’র বাহক। ঢাকা শিশু হাসপাতালের গবেষণায় দেখা গেছে যে, আমাদের দেশে বিটা বাহক ৪.১% এবং হিমোগ্লোবিন-ই-বাহক ৬.১%। তাই এ রোগ প্রতিরোধে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
►থ্যালাসেমিয়া কী?
থ্যালাসেমিয়া (Thalassemia) একটি বংশগত রক্তের রোগ। হিমোগ্লোবিন রক্তের খুবই গুরত্বপূর্ণ উপাদান। আমরা নিশ্বাসের সঙ্গে যে অক্সিজেন বহন করি, হিমোগ্লোবিনের কাজ হলো তা শরীরের সমস্ত অংশে বহন করে নিয়ে যাওয়া। এ রোগে রক্তে অক্সিজেন পরিবহনকারী এই হিমোগ্লোবিন কণার উৎপাদনে ত্রুটি হয়। হিমোগ্লোবিন তৈরী হয় দুটি আলফা প্রোটিন ও দুটি বিটা প্রোটিন দিয়ে। যদি এই প্রোটিন গুলোর উৎপাদন শরীরে কমে যায়, তবে শরীরের হিমোগ্লোবিনের উৎপাদনও কমে যায় এবং থ্যালাসেমিয়া দেখা দেয়। আলফা ও বিটা প্রোটিন তৈরী হয় জীন হতে। দুই গ্রুপের হিমোগ্লোবিন চেইনের সংশ্লেষণ মূলত জেনেটিক্যালি নিয়ন্ত্রিত হয়। কেউ যখন কোন ত্রুটিপূর্ণ জীন তার বাবা-মায়ের কাছ হতে বংশানুক্রমে পায়, তখনই মূলত থ্যালাসেমিয়া দেখা দেয়। সুতরাং থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রোগ। এর ফলে রক্তশূন্যতাও দেখা দিতে পারে। থ্যালাসেমিয়া ধারণকারী মানুষ সাধারণত রক্তে অক্সিজেন স্বল্পতা বা অ্যানিমিয়ার ফলে অবসাদগ্রস্ততা থেকে শুরু করে অঙ্গহানি পর্যন্ত ঘটতে পারে। থ্যালাসেমিয়ার রকমফের থ্যালাসেমিয়া দুটি প্রধান ধরনের হতে পারেঃ-
০১. আলফা থ্যালাসেমিয়া (Alpha-thalassemia) : চারটি জিন দিয়ে আলফা থ্যালাসেমিয়া ধারা (Chain) গঠিত হয়। আমরা বাবা-মা প্রত্যেকের কাছ থেকে দুটি করে এই জিন পাই। এই জিনগুলোর মধ্যে এক বা তার অধিক ত্রুটিপূর্ণ হলে Alpha-thalassemia হয়। যত বেশি জিন ত্রুটিপূর্ণ হবে তত বেশি মারাত্মক সমস্যা দেখা দিবে। সাধারনত একটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে থ্যালাসেমিয়ার কোন লক্ষণ ও উপসর্গ দেখা যাবে না। তবে আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমে তার সন্তানের মধ্যে এই রোগ ছড়াবে। দুইটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে হালকা উপসর্গ দেখা যাবে। এই অবস্থাকে বলে আলফা থ্যালাসেমিয়া মাইনর (Alpha-thalassemia minor) অথবা, আলফা থ্যালাসেমিয়া ট্রেইট ( Alpha-thalassemia trait) অথবা, কুলিস এ্যানিমিয়া (Cooley’s anemia)। তিনটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে এর উপসর্গগুলো মাঝারি থেকে মারাত্মক আকার ধারণ করে। এই অবস্থাকে বলে হিমোগ্লোবিন এইচ ডিজিজ। চারটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে একে বলে আলফা থ্যালাসেমিয়া মেজর (Alpha thalassemia major) অথবা হাইড্রপস ফিটেইলস (Hydrops fetalis)। এর ফলে প্রসবের (delivery) পূর্বে অথবা জিনের পরপর ভ্রূণ নষ্ট হয়ে যায়। নবজাতক যেসব শিশুর এই সমস্যা থাকে তারা জন্মের সময় বেশ স্বাস্থ্যবান থাকে। তবে জন্মের প্রথম দুই বছরের মধ্যেই এর উপসর্গ দেখা যায়।
০২. বিটা থ্যালাসেমিয়া (Beta-thalassemia) : Beta-thalassemia ধারা (Chain) গঠিত হয় দুইটি জিন দিয়ে। বাবা-মা প্রত্যেকের কাছ থেকে একটি করে মোট দুইটি জিন আমরা পেয়ে থাকি। একটি অথবা উভয় জিনই ত্রুটিপূর্ণ হলে Beta-thalassemia দেখা দেয়।
সাধারণভাবে আলফা থ্যালাসেমিয়া কম তীব্র। আলফা থ্যালাসেমিয়া বিশিষ্ট ব্যক্তির ক্ষেত্রে রোগের উপসর্গ মৃদু বা মাঝারি প্রকৃতির হয়। অন্যদিকে বিটা থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে রোগের তীব্রতা বা প্রকোপ অনেক বেশি; এক-দুই বছরের শিশুর ক্ষেত্রে ঠিকমত চিকিত্সা না করলে এটি শিশুর মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তবে বিশ্বে বিটা থ্যালাসেমিয়ার চেয়ে আলফা থ্যালাসেমিয়ার প্রাদুর্ভাব বেশি।
►থ্যালাসেমিয়ার লক্ষণ ও উপসর্গঃ-
থ্যালাসেমিয়া হলে সাধারণত যেসব লক্ষণ ও উপসর্গগুলো দেখা যায় তার মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হলেঃ-
➊ অবসাদ অনুভব,
➋ দুর্বলতা,
➌ শ্বাসকষ্ট,
➍ মুখমণ্ডল ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া,
➎ অস্বস্তি,
➏ ত্বক হলদে হয়ে যাওয়া (জন্ডিস),
➐ মুখের হাড়ের বিকৃতি,
➑ ধীরগতিতে শারীরিক বৃদ্ধি,
➒ পেট বাইরের দিকে প্রসারিত হওয়া বা বৃদ্ধি পাওয়া,
➓ গাঢ় রঙের প্রস্রাব।
►রোগ নির্ণয়ঃ-
শরীরে যদি কারও অ্যানিমিয়া বা রক্তে হিমোগ্লোবিন পরিমাণ কম থাকে তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তের পরীক্ষা করিয়ে নিশ্চিত হতে হবে যে এটা থ্যালাসেমিয়া কিনা, যদি থ্যালাসেমিয়া হয়ে থাকে তবে স্বল্প নাকি মেজর সেটাও নিশ্চিত হতে হবে। এর উপর ভিত্তি করেই চিকিৎসকরা এর চিকিৎসার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। থ্যালাসেমিয়া মাইনর বা বাহক শনাক্তকরণের জন্য যে রক্ত পরীক্ষা সবচেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য, তাকে বলা হয় ”হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস”। এ পরীক্ষার সুযোগ সব ল্যাবরেটরিতে নেই, বাংলাদেশের ঢাকায় অবস্থিত বারডেমে, সি.এম.এইচ, পিজি, ঢাকা শিশু হসপিটাল, কেয়ার হসপিটাল, পদ্মা ডায়াগনোস্টিক ও আই.সি.ডি.ডি.আর.বিতে এ পরীক্ষা করানো হয়, খরচ পরবে ৮০০-৯০০ টাকা। তবে এর বিকল্প কিছু পরীক্ষার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই ধারণা করা সম্ভব কারও থ্যালাসেমিয়া মাইনর হওয়ার আশঙ্কা আছে কি না। তাই বিয়ের আগে পাত্র এবং পাত্রী উভয়কে থ্যালাসেমিয়ার বাহক কিনা সেটা পরীক্ষা করাতে হবে। বিয়ের পর যদি জানা যায় যে, কারও থ্যালাসেমিয়া মাইনর রয়েছে তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে, এতে করে সন্তানের থ্যালাসেমিয়া হলে কি করণীয় তা জানা যাবে।
►থ্যালাসেমিয়ার ভয়াবহতাঃ-
আমাদের শরীরে রক্তের লোহিত কণিকার আয়ুষ্কাল তিন মাস। লোহিত কণিকা অস্থিমজ্জায় অনবরত তৈরি হচ্ছে এবং তিন মাস শেষ হলেই প্লীহা এ লোহিত কণিকাকে রক্ত থেকে সরিয়ে নিচ্ছে। থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত রোগীর লোহিত কণিকার আয়ুষ্কাল অনেক কমে যায়। তাদের হিমোগ্লোবিন ঠিকমতো তৈরি না হওয়ায় লোহিত কণিকাগুলো সহজেই ভেঙে যায় এবং অস্থিমজ্জার পক্ষে একই হারে লোহিত কণিকা তৈরি সম্ভব হয়ে ওঠে না। ফলে একদিকে যেমন রক্তশূন্যতা সৃষ্টি হয়, অস্থিমজ্জা প্রসারিত হয়ে যায় এবং এর ফলে হাড় পাতলা ও ভঙ্গুর হয়ে যায়। এতে মেরুদন্ডের হাড় ভেঙ্গে যাবার সম্ভাবনা বেশি থাকে। অন্যদিকে ত্রুটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিন পরিষ্কারের কাজে নিয়োযিত থাকে প্লীহা, ফলে প্লীহার (Spleen) কার্যকারিতার উপর অতিরিক্ত চাপ পরে এবং প্লীহা আয়তনে বড় হয়ে যায় (Spleen Enlargement)। থ্যালাসেমিয়ার রোগীকে বাঁচিয়ে রাখতে দিনের পর দিন রক্ত দিয়ে যেতে হয়। সারা বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় নয় লাখ শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে। বাংলাদেশে এর সংখ্যা হচ্ছে আনুমানিক ১০ হাজার। এসব শিশুর অধিকাংশই বেঁচে থাকে রক্ত পরিসঞ্চালনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে। রক্ত না নিয়ে যেমন এরা বেঁচে থাকতে পারে না একসমুদ্র রক্ত দিলেও যেন এই রোগীর তৃষ্ণা মিটে না। উপরন্তু পানিবাহিত রোগের মতো নানা রক্তবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়; যেমন—জন্ডিস, এইচআইভি, হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’, ভাইরাসজনিত রোগ। এছাড়া প্রতি ব্যাগ রক্তের সঙ্গে জমা হচ্ছে ২০০ মিলিগ্রাম করে আয়রন। প্রতি ব্যাগ রক্তের সঙ্গে ২০০ মিলিগ্রাম আয়রন জমা হলে ৫০ ব্যাগ রক্তের সঙ্গে ১০ গ্রাম আয়রন শরীরে জমা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে এই অতিরিক্ত আয়রন আস্তে আস্তে লিভার প্যানক্রিয়াসের প্রতিটি কোষ ধ্বংস করে দেয় এবং হৃৎপিন্ড, প্যানক্রিয়াস, যকৃত, অণ্ডকোষ ইত্যাদি অঙ্গের কার্যক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয়। ফলে ডায়াবেটিস, লিভার সিরোসিস রোগের উৎপত্তি হয়। এছারাও এই রোগীকে প্রচন্ড সাবধানে চলাফেরা করতে হয় নয়ত যে কোন মুহুর্তে অন্য যে কোন রোগের জীবানু দ্বারা আক্রান্ত হয়ে যেতে পারে। তবে মৃদু থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে লক্ষণ ও উপসর্গ খুবই কম থাকে এবং এক্ষেত্রে খুবই অল্প চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। বিশেষ ক্ষেত্রে যেমন-কোন অপারেশন হলে বা প্রসবের পর অথবা কোন সংক্রমণ হলে প্রয়োজন বোধে রক্ত দেয়া (Blood transfusion) লাগতে পারে। মাঝারি থেকে মারাত্মক থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে, বছরে বেশ কয়েকবার প্রয়োজনবোধে ৮ থেকে ১০ বার রক্ত দেয়া লাগতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন (Bone Marrow transplant) করার প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষধ সেবন করতে হবে।
থ্যালাসেমিয়ার রোগীর জীবনকাল ২০-৩০ বছর পর্যন্ত। এই স্বল্পকালীন জীবনে রোগীর নিজের ও পরিবারের যে মানসিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। থ্যালাসেমিয়ার রোগীর স্বীকৃত মৌলিক অধিকারের মধ্যে স্বাস্থ্য বা চিকিৎসা হচ্ছে অন্যতম।
►থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত রোগীর জীবন-যাপন পদ্ধতিঃ-
থ্যালাসেমিয়া মেজর হলে ক্রমাগত মাসিক রক্ত নিতে হবে। প্রতি ব্যাগ রক্তের সঙ্গে শরীরে জমা হয় আয়রন। ঘরে বসে কীভাবে প্রতি রাতে আয়রন চিলেশন করা যায় সেটা শিখে নিতে হবে। তাহলে ক্রমাগত রক্ত গ্রহণের ফলে ত্বকে বা বিভিন্ন অঙ্গে আয়রন জমা হয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারবে না। পরে অস্থিমজ্জা পরিবর্তন এবং জেনেটিক কাউন্সিলিং করতে হবে। জীবনযাপন পদ্ধতি ডাক্তারের নির্দেশনা ছাড়া আয়রনযুক্ত ওষুধ, ভিটামিন বা অন্য কোনো ওষুধ খাওয়া যাবে না। সুষম ও পুষ্টিকর খাবার বিশেষ করে ক্যালসিয়াম, জিঙ্ক, ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। সংক্রমণ এড়ানোর জন্য বারবার হাত পরিষ্কার করতে হবে এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের থেকে দূরে থাকতে হবে। বিভিন্ন সংক্রমণ এড়াবার জন্য বিভিন্ন রোগের টিকা নি্যে রাখতে হবে।
►থ্যালাসেমিয়ার বাহকের করনীয়ঃ-
থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে করণীয়গুলার মধ্যে প্রথম কথা হচ্ছে চিকিৎসা অপেক্ষা প্রতিরোধই উত্তম। বিশ্বের কয়েকটি দেশ যেখানে থ্যালাসেমিয়ার প্রকোপ বাংলাদেশ থেকে মোটেও কম ছিল না, সেখানে সমন্বিত স্বাস্থ্য কর্মসূচির মাধ্যমে এ রোগে আক্রান্ত শিশুর জন্ম হার এখন প্রায় শূন্য, নতুবা শূন্যের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে তারা। উদাহরণস্বরূপ সাইপ্রাসের কথা ধরা যাক। ১৯৭০ সালে সেখানে প্রতি ১৫৮ জন শিশুর মধ্যে একটি শিশু জন্ম নিত থ্যালাসেমিয়া নিয়ে, আজ সেখানে থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্ম নেওয়ার সংখ্যা শূন্যের কোঠায়। গ্রিস, ইতালি সহ অনেক দেশই থ্যালাসেমিয়া নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট অগ্রগতি সাধন করেছে। থ্যালাসেমিয়ার মহামারি হতে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য প্রথম প্রয়োজন থ্যালাসেমিয়া বহনকারী ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ। থ্যালাসেমিয়া রোগটি বংশানুক্রমিক, মানে রোগটা আসে মা ও বাবার জিন থেকে। মা ও বাবা উভয়কেই থ্যালাসেমিয়া বাহক হতে হবে, শুধু একজন বাহক হলে হবে না। বাহককে বলা হয় থ্যালাসেমিয়া মাইনর বা ট্রেইট। যদিও নাম হচ্ছে থ্যালাসেমিয়া মাইনর, আসলে এটা সত্যিকার অর্থে কোনো অসুস্থতাই নয়। টেনিসের কিংবদন্তি পিট সাম্প্রাস, ফুটবলের জাদুকর জিনেদিন জিদান আর চলচ্চিত্রের মহানায়ক অমিতাভ বচ্চন—তাঁরা সবাই থ্যালাসেমিয়ার বাহক। যারা বাহক তারা কোনো রোগী নয়। কিন্তু যেহেতু তাঁদের সহধর্মিণীদের কেউই বাহক (থ্যালাসেমিয়া মাইনর) নন, তাঁদের সন্তানেরা সবাই সম্পূর্ণ সুস্থ, থ্যালাসেমিয়া মুক্ত। দুজন বাহক যদি একে অন্যকে বিয়ে না করে তাহলে সন্তান থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্ম নেয়া সম্ভব নয়। মা-বাবা দু’জনই বাহক হলে তাদের সন্তানরা থ্যালাসেমিয়া রোগী হয়ে জন্মানোর সম্ভাবনা শতকরা ৭৫ ভাগ। যদি কোনো কারণে দুজন বাহকের বিয়ে হয়েও যায়, তাহলে সন্তান গর্ভধারণের অনতিবিলম্বে গর্ভস্থিত সন্তানের পরীক্ষা করা সম্ভব এবং পরীক্ষায় যদি প্রমাণিত হয় যে ভ্রূণটি থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত, সেক্ষেত্রে চিকিত্সকের পরামর্শ অনুযায়ী এবং বাবা-মায়ের ইচ্ছায় গর্ভপাত ঘটানো যায়। এই ক্ষেত্রে যে পরীক্ষা গুলো করা হয় সেগুলো হলো:-
✔ কোরিওনিক ভিলিয়াস স্যাম্পলিং (Chorionic villus sampling)
✔ এ্যামনিওসেনটিসিস (Amniocentesis)
✔ ফিটাল ব্লাড স্যাম্পলিং (Fetal blood sampling)
ডি.এন.এ সলিশন লিমিটেড (পান্থপথ) এ, আপনি গর্ভবস্থায় পরীক্ষার মাধ্যমে শিশুর থ্যালাসেমিয়া নির্ণয় করতে পারবেন। গর্ভাবস্থার ১৬ থেকে ১৮ সপ্তাহের মধ্যে পরীক্ষাটি করালে ভালো হয়য়। খরচ পরে প্রায় ১৫ হাজার টাকা। এছারাও ”ঢাকা শিশু হসপিটালে” শ্যমলীতে “Prenatal Teast” নামক একটি টেষ্ট গর্ভবস্থায় পরীক্ষার মাধ্যমে অপেহ্মাকৃত কম খরচে শিশুর থ্যালাসেমিয়া নির্ণয় করতে পারবেন। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, থ্যালাসেমিয়া অনেক ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব। উন্নত দেশগুলোতে ম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশন বা অস্থিমজ্জা সংযোজনের মাধ্যমে এ রোগকে নিরাময় করা হচ্ছে এবং রোগী ব্লাড ট্রান্সফিউশন (পরিসঞ্চালন) নির্ভরশীল থাকছে না। চিকিৎসার অপর পদ্ধতি হচ্ছে প্রতি তিন অথবা চার সপ্তাহ পর নিয়মিত রক্ত পরিসঞ্চালন চালিয়ে যাওয়া এবং প্রতিদিন আয়রন নিষ্কাশনের ওষুধ ব্যবহার করা। চিকিৎসার উপরিউক্ত উভয় পদ্ধতিই হচ্ছে ব্যয়বহুল এবং যথেষ্ট ঝামেলাপূর্ণ। বিশেষ করে, সব সময় পরিশুদ্ধ রক্ত সংগ্রহ করা অধিকাংশ রোগীর পক্ষে এক প্রকার অসম্ভব কাজ হয়ে দাঁড়ায়। এসব বিবেচনায় থ্যালাসেমিয়া চিকিৎসার তুলনায় এর প্রতিরোধই হওয়া উচিত আমাদের মূল লক্ষ্য।
►আর নয় থ্যালাসেমিয়ার রোগী, প্রতিরোধ এখনইঃ-
থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করে তুলতে প্রতি বছর ০৮ মে বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস হিসাবে পালন করা হয়। আর এ দিনটি প্রতি বছর বিভিন্ন কর্মসূচিতে পালন করে সারা বিশ্বের দেশগুলো ও থ্যালাসেমিয়া সংগঠনগুলো। দিবসটিতে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা নতুন আশা ও সম্ভাবনা নিয়ে আসেন এ রোগের প্রতিকারের চেষ্টায়, আর প্রতিবছর এ দিনটি সমাজের খুব কমসংখ্যক মানুষকে সচেতন করে দিয়ে বিদায় নেয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা আরও অনেক পশ্চাতে পড়ে আছি।
বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা কিংবা প্রতিরোধ, উভয় দিকের চিত্রই অত্যন্ত করুণ। থ্যালাসেমিয়া রোগের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা পদ্ধতি— বোন ম্যারো প্রতিস্থাপন অথবা নিয়মিত পরিশুদ্ধ রক্ত পরিসঞ্চালন, কোনোটাই এখানে এখনো সহজলভ্য নয়। রোগটি প্রতিরোধের কোনো সুষ্ঠু কার্যক্রমও সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। অথচ প্রতিবেশী প্রতিটি দেশই এ ব্যাপারে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর এ চেষ্টার সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্ সংস্থাও সহযোগিতা করছে। আমাদের দেশের হাজার হাজার থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীর পক্ষ থেকে এ দেশেই উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য একটি ‘থ্যালাসেমিয়া চিকিৎসা কেন্দ্র’ এখন সময়ের দাবি। থ্যালাসেমিয়া এ দেশে নতুন কোনো রোগ নয়। কিন্তু এ রোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা যেমন নেই, তেমনি এখানে এ রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য কোনো সুযোগ- সুবিধা এখনও নেই। থ্যালাসেমিয়া বাংলাদেশে প্রাণঘাতী রোগ হিসেবেই আতংকের কারণ হয়ে আছে। জন্মগত ও বংশগত রোগের তালিকায় থ্যালাসেমিয়া এখনও ভারি না হলেও কম নয়। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এক রিপোর্ট অনুসারে পৃথিবীতে পাঁচ শতাংশ মানুষ থ্যালাসেমিয়া রোগের ‘বাহক’। আমাদের দেশে এখনও পর্যন্ত চিকিৎসার ক্ষেত্রে ‘থ্যালাসেমিয়া’র কোনো বিশেষ অগ্রগতি না থাকায় উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে বিভিন্ন হাসপাতালে যাচ্ছে আর্থিক সামর্থ্যবান রোগীরা। আর যাদের আর্থিক সামর্থ্য নেই, তারা রোগ লালন করছে। রোগ যন্ত্রণায় অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টে দিনাতিপাত করছে এবং অকালে ঝরেও পড়ছে অনেক জীবন। কিন্তু আমরা যদি আমাদের দেশ থেকে থ্যালাসেমিয়া উচ্ছেদে দৃঢ়সংকল্প হই, তাহলে যে কাজগুলো আমাদের হাতে নিতে হবে, তা হচ্ছেঃ-
☞ থ্যালাসেমিয়ার ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টি।
☞ দেশেই একটি সর্বাধুনিক থ্যালাসেমিয়া চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তোলা।
☞ থ্যালাসেমিয়া বাহক শনাক্তকরণের পদ্ধতি সহজলভ্য করা।
☞ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক থ্যালাসেমিয়াকে একটা প্রধান স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিতকরণ।
☞ বিভিন্ন স্বাস্থ্যবিষয়ক এনজিওগুলোকে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে উদ্বুদ্ধকরণ।
☞ চিকিত্সক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীকে এ অসুস্থতার ব্যাপারে যথাযথভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া।
☞ সমাজের সর্বস্তরে সচেতনতা বৃদ্ধির ব্যাপারে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সভা-সমিতি আয়োজনের পদক্ষেপ নিতে হবে।
☞ স্বল্পব্যয়ে থ্যালাসেমিয়া রক্ত পরীক্ষা দেশের বিভিন্ন মেডিকেল ল্যাবরেটরিতে করানোর সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকার ও এনজিওগুলোকে দায়িত্ব নিতে হবে।
☞ মেডিকেল শিক্ষা কারিকুলামে থ্যালাসেমিয়াকে এমনভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে প্রত্যেক চিকিৎসকই থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করতে পারে।
☞ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কেই এ ব্যাপারে সর্বদা নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা দিতে হবে।
☞ সর্বোপরি থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে সমন্বিত কর্মসূচি প্রণয়নে জাতীয় পর্যায়ে কনসালটেটিভ বৈঠকের আয়োজন করা এবং জাতীয় থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ কর্মসূচি প্রণয়ন করা।
আর এই কাজগুলা বাস্তবায়নে দেশের সুশীল ও তরুন সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরির মাধ্যমেই একমাত্র এ রোগ প্রতিরোধ সম্ভব। তাই থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে নিজে জানুন এবং অন্যকেও জানতে সহায়তা করুন।





সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরও সংবাদ





ebarta24.com © All rights reserved. 2021