বৃহস্পতিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ০১:০৪ অপরাহ্ন

জামায়াতের ভণ্ডামির আরেক প্রমাণ বার্মার ৯৬৯ গ্রুপের রকি বড়ুয়া!

ইবার্তা ডেস্ক
আপডেট : বুধবার, ১৩ মে, ২০২০

ভারতে ভান্তে, বাংলাদেশে শার্ট প্যান্ট পরা সন্তানের জনক ভিক্ষু রকি বড়ুয়া!

এসএসসিতে ২ বার ফেল করলেও প্রতারণার কলাকৌশল রপ্ত করতে রকি বড়ুয়ার সময় লাগে নি। দু হাতে অর্থবিত্ত আদায় করতে পারলেও অতিরিক্ত উচ্চাশার কারণে ভারত তাকে কালো তালিকাভুক্ত করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। বাজেয়াপ্ত করে পাসপোর্ট। এবার র্যাবের হাতে আটক। রকি বড়ুয়ার জীবন যেন ফিল্মের প্রতারকদের কাহিনীকেও হার মানায়।
 
সাঈদী পুত্র ও জামায়াত নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করা এবং মদ ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রসহ গ্রেফতার হওয়া রকি বড়ুয়া ২০০১ সালে চরম্বা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হয়। ফেলের হতাশায় বার্মার বৌদ্ধ ভিক্ষু আশ্বিন উইরাথুর অনুসারী হন রকি। আশ্বিন উইরাথুর নেতৃত্ব গঠিত বার্মার মুসলিম বিরোধী ৯৬৯ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন রকি বড়ুয়া। ২০০৩ সালে বার্মায় আশ্বিনের কারাদণ্ড হলে ঢাকা চলে আসেন রকি। নিউ মার্কেটের একটি ভিডিওর দোকানে চাকরি নেন। এরপর বৌদ্ধ ভিক্ষু হিসেবে তার পথচলা শুরু হয়। ২০০৭ সালে এক আত্মীয়ের মাধ্যমে ভারত চলে যান।
 
ভিক্ষু সেজে দিল্লীতে জগৎজ্যোতি বিহারে আশ্রয় নেন তিনি। ২০১০ সালে বার্মায় কয়েকজন রাজবন্দির সঙ্গে আশ্বিন উইরাথু মুক্তি পেলে রকি বাংলাদেশে ফিরে আসেন। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অশ্বিনের পক্ষে বেশ সক্রিয়ভাবে কাজ করেন রকি। বার্মা থেকে মুসলিম নিধন ও রোহিঙ্গা উৎখাতের ডাক দিয়ে আন্তর্জাতিক মিডিয়ার খবরের শিরোনামও হন আশ্বিন। তার শিষ্য হিসেবে রকিও নিজেকে অদৃশ্য ক্ষমতাধারী হিসেবে পরিচয় দেয়া শুরু করেন। দুই বছর ভারতে থাকার সুবাদে নিজেকে দাবি করেন ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার র এজেন্ট হিসেবে। কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তোলা কিছু ছবিকে পুঁজি করে জামায়াতে ইসলামীর কাছে ত্রাণকর্তা হিসেবে বিবেচিত হয়ে ওঠেন রকি।

টাইম ম্যাগাজিনে স্থান পাওয়া আশ্বিন উইরাথুর শিষ্য রকি বড়ুয়া

একদিকে রোহিঙ্গা বিরোধী, আরেক দিকে ভারতের এজেন্ট দাবি করা রকি বড়ুয়ার দ্বারস্থ হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও কথিত আলেমরা। সাঈদী পুত্রও বৈঠক করলেন তারই সাথে। অতপর জামায়াত শিবির কোন মুখে ইসলামের কথা বলবে? জামায়াত শিবিরের নেতাকর্মিরা স্বীকার না করলেও, এ বিষয়ে সকলেই অবগত যে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামের নাম ব্যবহার করা ইসলাম বিরোধী একটি শক্তি। যুগে যুগে তারা দলীয় স্বার্থে ইসলাম বিরোধী বিভিন্ন শক্তি ও গোষ্ঠীর সঙ্গে আঁতাত করেছে। এবারও কি জামায়াতের নেতাকর্মীদের মনে প্রশ্ন জাগবে না? এত কিছুর পর কোন মুখে তারা আদর্শ ও নীতির কথা বলবে? সাঈদীর চরিত্র কি রকি বড়ুয়ার চেয়ে উত্তম?
আসুন আমরা আরেক সাঈদীর চরিত্র উন্মোচন করি।
 
রকি বড়ুয়া চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া উপজেলার চরম্বা ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের বিবিবিলা গ্রামের বড়ুয়া পাড়ার অধিবাসী জয়সেন বড়ুয়ার ছেলে। তাঁর বয়স (৩৭)। তাঁর মায়ের নাম রেনেকা বড়ুয়া। রেনেকা ও জয়সেন বড়ুয়ার এক ছেলে এক মেয়ে সন্তানের মধ্যে রকি সবার বড়। বোন হ্যাপি বড়ুয়া। ভিক্ষুর জীবন বেছে নিলেও ধর্মীয় রীতি ও ভান্তের ধর্মীয় শপথ ভেঙে ২০১৩ সালের ১৩ মার্চ বিয়ে করে ফেলেন রকি বড়ুয়া। বর্তমানে সে এক কন্যা ও এক ছেলে সন্তানের জনক। সাংসারিক জীবনে চলে গেলে বৌদ্ধ ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু ভিক্ষুত্ব পরিচয় না থাকলেও রকি বড়ুয়া ঠিকই নিজেকে আজ পর্যন্তও ধর্মীয় গুরু ভিক্ষু দাবি করে চলেছেন।
 
তিনি প্রতিবারই বাংলাদেশ থেকে ভারত যাওয়ার সময় গায়ে লাল কাপড় লাগিয়ে ভিক্ষু সাজেন, আর বাংলাদেশে প্রবেশ করতেই লাল কাপড় খুলে প্যান্টশার্ট পরেন। ভারত-বাংলাদেশ এভাবেই চলে তার প্রতারণা। ভারতের দিল্লীতে রকি বড়ুয়ার আশ্রিত বিহারটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় গুরু ধর্মবীর পাল (রাজ্যের সংসদ সদস্য) এর সাহচর্যে থাকার সুবাধে ভারতের বিজেপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, মন্ত্রী-এমপির সাথে ছবি তোলার সুযোগ হয় তার। সেই ছবিগুলোকে পুঁজি করে প্রচার করতে থাকেন যে, দিল্লীর রাজ্য সরকার থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় সরকারের সবার তার সাথে দহরম-মহরম ও অন্তরঙ্গতা। সেগুলো শুনে এবং দেখে এলাকার লোকজন ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ থেকে শুরু করে বাংলাদেশের অনেকেই সমীহ করতে থাকেন রকি বড়ুয়াকে। এসব ছবি প্রদর্শন করে বাংলাদেশের অনেক রাজনৈতিক নেতাদের সাথেও গড়ে উঠেছে তার সুসম্পর্ক। তাদের সহযোগিতায় ছবি তোলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তিবর্গের সাথে। যে ছবিগুলো ভারতে প্রদর্শিত হওয়ার পর সেখানকার মানুষও রকি বড়ুয়াকে ক্ষমতাধর মানুষ হিসেবে ভাবতে থাকে।
 
তিনি এলাকায় বলে বেড়ান, ভারত তাকে বাংলাদেশ পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশ সরকার কি করতে চায়, মিয়ানমার থেকে কেন মানুষ এখানে চলে এলো, মিয়ানমার কি করতে চায় এসব দেখভালের দায়িত্ব নাকি ভারত তাকে দিয়েছে। এছাড়াও সবচেয়ে আর্শ্চয্যের বিষয় যে, সে লাল কাপড়টি ক্ষণে ক্ষণে খোলেন আর পরেন।
 
বাংলাদেশে থাকলে সে প্যান্টশার্ট পরেন আর ভারতে গেলে লাল কাপড় গায়ে লাগান। দিল্লিতে রকি যে আশ্রমের বড় ভান্তের তত্ত্বাবধানে থাকতেন ওই ভান্তে মারা যাওয়ার পর সেই আশ্রমটিও রকি দখল করে নেন। সে আশ্রমে বাংলদেশ থেকে লোকজন নিয়ে গিয়ে তাদেরকে লাল কাপড় পরিয়ে জাপান, চীন, থাইল্যান্ড ও আমেরিকাসহ বিভিন্ন উন্নত রাষ্ট্রে পাঠাতে থাকেন।
 
ভান্তে সাজিয়ে আদম পাচারের বিষয়টি ধরা পড়লে ভারত সরকার তাকে কালো তালিকাভুক্ত করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। বাতিল করে দেয় ভান্তে পরিচয়ে করা পাসপোর্টটি। সেই থেকে বাংলাদেশে অবস্থান করে বিলাসী জীবন-যাপন করছেন রকি বড়ুয়া। চট্টগ্রাম শহরে তার রয়েছে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও ঢাকায় এপার্টমেন্ট। দুই সন্তানসহ স্ত্রীকে রেখেছেন কক্সবাজারের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে।
 
ভারত সরকারের সাথে কথিত সম্পর্কের গালগল্প ছড়িয়ে চরম্বাসহ লোহাগাড়ায় গড়ে তুলেছেন বিশাল ক্যাড়ার বাহিনী, ত্রাসের রাজত্ব, একচ্ছত্র আধিপত্য। যত্রতত্র মৎস্যনিধন, বালু মহাল দখল ও জমি দখলসহ এমন কোন অপকর্ম নেই যা তিনি করছেন না।
 
মৎস্যনিধন, বৌদ্ধ বিহার ভাংচুর ও সাঈদীপুত্রের সাথে পোপন বৈঠক একই সূত্রে গাথা? এছাড়াও রকি বড়ুয়ার সাথে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে নিষিদ্ধ দল জামায়াতে ইসলামীর কানেকশান অনেক পুরানো। এলাকায় স্থানীয় জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী ও ক্যাড়ারদের গোপনে আশ্রয় দেয়ার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে অনেক পুরনো।
 
বিভিন্ন সময়ে চরম্বা বিবিবিলাস্থ তার গড়া বৌদ্ধ বিহারে জামায়াতের সাবেক সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীসহ জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের যাতায়াত রযেছে। সর্বশেষ গত ১ এপ্রিল বিশেষ গোপন মিশন নিয়ে চরম্বা বিবিবিলাস্থ তার বাড়ীতে আসেন যুদ্ধাপরাধের দায়ে কারাগারে আটক যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ প্রাপ্ত মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীপুত্র মাসুদ সাঈদী ও সাঈদীর শীর্ষ মাওলানা তারেক মনোয়ারসহ ১০/১২ জন জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা।
 
প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে চলমান করোনার সংকটময় মুহুর্তেও বিএমডব্লিউ ব্র্যান্ডের দামি গাড়ী নিয়ে লোহাগাড়ায় অজপাড়াগাঁ বিবিবিলাস্থ রকি বড়ুয়ার বাড়ীতে এসে সাঈদীপুত্রের এমন রাতভর গোপন বৈঠক এবং বৈঠক শেষে সকালে প্রকাশ্যে বৌদ্ধ্য বিহার পরিদর্শন ও ফটোসেশন করে ঢাকায় ফিরে যাওয়া নিয়ে লোহাগাড়াবাসীর কাছে নানান প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
 
এদিকে রকি বড়ুয়ার বাড়িতে মধ্যরাতে জামায়াতের শীর্ষ নেতা মাওলানা সাঈদীর পুত্র মাসুদ সাঈদী ও মাওলানা তারেক মনোয়ারসহ জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সাথে গোপন বৈঠকের ছবি, কৃষক মহিউদ্দিনের পুকুরের মাছ লুট করে তাদের ওপর হামলার ঘটনায় ফেঁসে যাওয়ায় নিজেকে রক্ষা করতে বৌদ্ধ বিহার ভাংচুর ঘটনার চক্রান্তের ফোনালাপের অডিও রেকর্ডিং এলাকায় ভাইরাল হওয়ায় জনরোষের ভয়ে তার ক্যাডার বাহিনী বর্তমানে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে।
 
এছাড়াও গোপন বৈঠকের ছবি ও বৌদ্ধ বিহার ভাংচুরের পূর্বে কয়েকজনের সাথে রকির ফোনালাপের অডিও রেকর্ডই প্রশাসন ও দেশবাসীর কাছে প্রমাণিত হয় যে রকি নিজেই বিহারটি ভাঙচুর করে নাটক সাজিয়ে বিএনপি জামায়াতের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছেন।


আরও সংবাদ