শুক্রবার, ১৮ জুন ২০২১, ১১:২১ অপরাহ্ন
সর্বশেষ সংবাদ

আমাদের রাজনৈতিক কালচারকে ধর্মান্ধতার কবলমুক্ত করা প্রয়োজন

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী
আপডেট : বুধবার, ৫ মে, ২০২১

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিখ্যাত ফরাসি দার্শনিক অঁদ্রে মালরো ঢাকায় এসেছিলেন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ দেখার জন্য। তিনি শওকত ওসমান, কবীর চৌধুরী, আবু জাফর শামসুদ্দীন প্রমুখ শিল্পী-সাহিত্যিকের সঙ্গে ঘরোয়া বৈঠকে একটি মন্তব্যও করেছিলেন। সে মন্তব্যটি মিডিয়ায় প্রকাশিত হলেও তখন সেই মন্তব্যের তাৎপর্যটি আমরা অনেকেই অনুধাবন করতে পারিনি। এখন অনুধাবন করতে পারছি।
মালরো বলেছিলেন, ‘আপনাদের দেশটাকে পাকিস্তানের হানাদাররা ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে গেছে। এই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আপনারা শিগগিরই নতুন দেশ গড়ে তুলতে পারবেন। কিন্তু পাকিস্তানের শাসকরা তাদের ২৪ বছরের শাসনে আপনাদের রাজনৈতিক কালচারে যে সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতার বিষ ঢুকিয়ে গেছে তার দ্রুত উচ্ছেদ ঘটাতে না পারলে আপনাদের স্বাধীনতার চেহারা পাল্টে যাবে। আপনাদের সমাজজীবন ও মানসিকতায় বিনা যুদ্ধে শত্রুরা অনুপ্রবেশ করবে, রাষ্ট্রব্যবস্থা আবার দখল করতে চাইবে।’
মালরো নিজের দেশ থেকে এর উদাহরণ টেনেছিলেন। বলেছিলেন, ‘ফরাসি বিপ্লবের মূল কথা ছিল সাম্য, মৈত্রী, ভ্রাতৃত্বের আদর্শ শুধু ফ্রান্সে প্রতিষ্ঠা করা নয়, সারা বিশ্বে তা প্রতিষ্ঠা করা। ফরাসি বিপ্লবের আদর্শ আমেরিকার স্বাধীনতাযুদ্ধকেও অনুপ্রাণিত করেছিল। প্রেসিডেন্ট লিংকনের গেটিসবার্গ ভাষণের মূল কথাটি ছিল রুশো ভলতেয়ারের দর্শন দ্বারা অনুপ্রাণিত। কিন্তু তাতে কী হলো? ফরাসিরা রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করেছে। কিন্তু রাজাদের সাম্রাজ্য-ক্ষুধা ও শোষণ-শাসনের মনোবৃত্তি মন থেকে তাড়াতে পারেনি। তাই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ফ্যাসিস্ট হিটলারকে পরাজিত করার পরও তারা ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের লক্ষ্য ও নীতির কাছে পরাজিত হয়েছিল। ফরাসি প্রজাতন্ত্র হয়ে উঠেছিল ব্রিটেনের পর দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। ফ্রান্সে সবাইকে চমকে দিয়ে নাৎসিবাদী, হিটলারপন্থী দল গড়ে উঠছে। আমরা রুশো ভলতেয়ারকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগারের আলমারিতে সম্মানের সঙ্গে তুলে রেখেছি, প্যারিসে তাঁদের ভাস্কর্য প্রতিষ্ঠা করেছি। ফরাসি জাতিকে তাদের বাণী দ্বারা শিক্ষিত ও অনুপ্রাণিত করে তুলতে পারিনি। এই ভুলটি তোমরা কোরো না। টেগোর থেকে আরম্ভ করে বহু মনীষী তোমাদের দেশে জন্মেছেন। শেখ মুজিবের মতো নেতা তোমরা পেয়েছ। এখন জাতির মন ও মানসিকতা তাদের অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ দ্বারা দ্রুত পুনর্গঠন করতে হবে। নইলে এই বিজয়, এই আত্মদান ব্যর্থ হয়ে যাবে।’
 
মালরো ঢাকায় এসেছিলেন প্রায় ৫০ বছর আগে। আমাদের স্বাধীনতারও বয়স হলো ৫০ বছর। এই ৫০ বছরে ঢাকা আর যুদ্ধবিধ্বস্ত শহর নয়। একটি আকাশচুম্বী ভবনের পর ভবনের আধুনিক মহানগর। কিন্তু জাতি তার সমাজজীবনে যে চেহারা ধারণ করেছে তা কোনো স্বাধীন দেশের অসাম্প্রদায়িক নাগরিকের নয়। বরং এ চেহারা ধর্মান্ধতায় আচ্ছন্ন একটি সমাজ ও তার নাগরিকের চেহারা। কথাগুলো একটু কঠোর হয়ে গেল। কিন্তু কথাগুলো বাস্তব সত্য।
যে রাজনৈতিক কালচারের মধ্যে গান্ধী, নেহরু, আলী ভ্রাতৃদ্বয়, দেশবন্ধু, সুভাষ ও শেখ মুজিবের জন্ম—সেই রাজনৈতিক কালচার এখন আর নেই। ভারতে মধ্যযুগীয় হিন্দুত্ববাদ এবং বাংলাদেশে ইসলামের নাম ভাঙিয়ে গড়ে ওঠা ওয়াহাবিজম রাজনৈতিক কালচারকে গ্রাস করেছে। মুসলিম লীগ, জামায়াত, হেফাজত এগুলো বিভিন্ন নাম মাত্র। চরিত্রে তারা ওয়াহাবিজম তথা উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদের প্রবক্তা। একই লক্ষ্য অর্জন তাদের সবার। ১৯৭১ সালে রণাঙ্গনের যুদ্ধে তারা পরাজিত হয়েছে বটে; কিন্তু রাজনীতির যুদ্ধে পরাজিত হয়নি। কিছুদিন পলাতক অবস্থায় থাকার পর তারা আবার মাথা তুলছে। দেশের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির কালচারকে বদলে দিয়ে ধর্মান্ধতাকে রাজনৈতিক কালচারে পরিণত করেছে।
ফরাসি দার্শনিক অঁদ্রে মালরো বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঢাকায় এসে এই সতর্কবাণীই উচ্চারণ করেছিলেন যে আমরা ধর্মান্ধতার শক্তিকে রণক্ষেত্রে পরাজিত করেছি। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হয়নি। আমাদের সমাজজীবনে পর্দার আড়ালে এই ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার দানব লুকিয়ে রয়েছে। তারা যেন আবার মাথা তোলার সুযোগ না পায়। তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করতে না পারে। অসাম্প্রদায়িকতার রাজনৈতিক কালচারকে পরাজিত করে ধর্মান্ধতা যেন তার স্থান দখল করতে না পারে। ফরাসি দার্শনিকের এই সতর্কবাণীটি আমরা সময়মতো অনুধাবন করতে না পারাতেই বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির আজ এই অবস্থা।
আমাদের রাজনৈতিক কালচারের জন্ম ব্রিটিশ শাসনামলে। ব্রিটিশ শাসকরা আমাদের যতই ক্ষতি করুক, একটি সুস্থ ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক কালচার উপহার দিয়ে গিয়েছিল। গান্ধী এই কালচারকে হিন্দু আশ্রমিক রাজনৈতিক কালচারে পরিণত করার চেষ্টা করেছিলেন। ইয়াং সোশ্যালিস্ট জওয়াহেরলাল নেহরু এসে তাঁর সহযোগী হওয়ায় তিনি তা পারেননি। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রথম জীবনে লিংকনস ইনের ছাত্র এবং ব্যারিস্টার হিসেবে ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক কালচারের অনুসারী। তিনি খেলাফত আন্দোলনের পর্যন্ত বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু নেহরুর সঙ্গে নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে তিনি মধ্য বয়সে পৌঁছে রাজনৈতিক কালচারে ধর্মকে যোগ করেন এবং দেশটাকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করেন। কিন্তু তাঁর এই ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ বেশিদিন টেকেনি। মাত্র ২৪ বছরের মাথায় ধর্মের ভিত্তিতে গড়া পাকিস্তান ভেঙে যায় এবং অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
উপমহাদেশে ভারত এবং পাকিস্তান দুটি দেশই স্বাধীনতা লাভ করে বিদেশি শাসকদের সঙ্গে আপসের দ্বারা। একমাত্র বাংলাদেশই স্বাধীনতা অর্জন করে সশস্ত্র সংগ্রামের দ্বারা। যুদ্ধে পাকিস্তান পরাজিত হলেও তাদের অনুসারীদের সংখ্যা বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী, সিভিল সার্ভিস এবং রাজনীতিতেও কম ছিল না। বরং তাদের সংখ্যা ছিল প্রভাব বিস্তারের মতোই। বঙ্গবন্ধু এই বাস্তবতা বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন দ্রুত আওয়ামী লীগের পাতি বুর্জোয়া চরিত্র পাল্টাতে না পারলে এবং রাষ্ট্রযন্ত্রে পুরনো ঔপনিবেশিক মনোভাবের সামরিক ও অসামরিক আমলাদের আধিপত্য ভাঙতে না পারলে, সর্বোপরি পাকিস্তানিরা বাংলাদেশে ধর্মান্ধতাযুক্ত যে রাজনৈতিক কালচার রেখে গেছে, তা থেকে দেশের রাজনীতিকে মুক্ত করতে না পারলে এত শহীদের রক্তে অর্জিত স্বাধীনতার ফসল লুট হয়ে যাবে। তাই তিনি খুব দ্রুত এবং জীবন বাজি রেখে আওয়ামী লীগকে কৃষক-শ্রমিকের অসাম্প্রদায়িক শ্রেণি-চরিত্র দান এবং রাষ্ট্রযন্ত্রেও বাকশাল পদ্ধতির মাধ্যমে আমলা শাসনের উচ্ছেদ দ্বারা সাধারণ মানুষের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। দেশের ধর্মান্ধ প্রতিক্রিয়াশীল চক্র বুঝতে পেরেছিল এবারেও বঙ্গবন্ধু তাঁর লক্ষ্য অর্জনে সাফল্য পেলে একাত্তরের অসমাপ্ত যুদ্ধ সমাপ্ত হবে। বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক কালচার ফিরে আসবে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা সত্যি সত্যি গড়ে উঠবে। তাই দেশি-বিদেশি সব প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি মাত্র সাড়ে তিন মাসের বাকশাল—শিশু এবং তার পিতাকে সপরিবারে হত্যা করে। বাংলাদেশে পচনশীল পুঁজিবাদ ও ধর্মান্ধ রাজনৈতিক কালচার আবার ফিরে আসে।
 
বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বাংলাদেশে দুটি প্রধান ঘটনা ঘটে যায় সবার অলক্ষ্যে। আওয়ামী লীগ আবার তার আগের আওয়ামী মুসলিম লীগের চরিত্রে ফিরে যায়। গোটা বাম রাজনীতিতেও রাজনৈতিক কালচার বদলে গিয়ে ধর্মান্ধ রাজনীতির কালচার প্রভাব বিস্তার করে। আওয়ামী লীগ নেতারা দাড়ি ও টুপির জামায়াতি রাজনীতির কালচার অনুসরণ করেন। বামপন্থী নেতারা দল বেঁধে হজে যেতে শুরু করেন। আমাদের তরুণ প্রজন্মের কাছে অনুসরণ ও অনুকরণের আদর্শের স্থানটা শূন্য হয়ে যায়। একদল বামপন্থী যখন কার্ল মার্ক্সকে ছেড়ে কামাল হোসেনকে নেতৃত্বের আসনে বসায়, তখন এই শূন্যতাটা আরো স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। এই শূন্যতা আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকেও গ্রাস করেছে। ফলে বিভ্রান্ত তরুণসমাজ ব্যাপকভাবে বিপথগামী হতে শুরু করে।
শেখ হাসিনা আমাদের বিপথগামী রাজনৈতিক কালচারকে অনেকটা সংকটমুক্ত করেছেন তাঁর সাহস ও ধৈর্য দ্বারা। কিন্তু আওয়ামী লীগকে দুর্নীতির পূতি থেকে মুক্ত করা অথবা রাষ্ট্রযন্ত্রকে পচনশীল পুঁজিবাদের খপ্পর থেকে মুক্ত করতে এখনো সক্ষম হননি। এটা তাঁর পক্ষে হয়তো সম্ভবও নয়। পশ্চিমবঙ্গের প্রয়াত কমিউনিস্ট মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তাঁর কমিউনিস্ট পার্টি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা দখল করা সত্ত্বেও তাকে কেন কমিউনিস্ট দেশে পরিণত করতে পারছেন না? জ্যোতি বসু জবাব দিয়েছিলেন, ‘মাথার ওপর পুঁজিবাদী কেন্দ্রীয় সরকার, চারপাশে বিগ ক্যাপিটালিস্ট দেশ—এর মাঝখানে পশ্চিমবঙ্গকে কমিউনিস্ট দেশে পরিণত করা কি সম্ভব?’
এই জবাবটি শেখ হাসিনারও হতে পারে। বঙ্গবন্ধুর আমলে তবু সুপার পাওয়ার হিসেবে সমাজতন্ত্রী সোভিয়েত ইউনিয়ন টিকে ছিল। শেখ হাসিনার আমলে তা-ও নেই। সারা বিশ্ব পুঁজিবাদের দ্বারা আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। এর মাঝখানে শেখ হাসিনা একা কেমন করে পুঁজিবাদকে আঘাত করতে এগোবেন। তিনি নিজে কমিউনিস্ট না হলেও ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিশ্বাসী। সে জন্য তিনি অত্যন্ত কঠোর সংগ্রাম চালাচ্ছেন। বলতে গেলে শেখ হাসিনাই তো এখন আমাদের একমাত্র ভরসা, পতন স্খলন সত্ত্বেও যাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশকে অন্তত অসাম্প্রদায়িক দেশ রূপে টিকিয়ে রাখা যাবে। অন্য নেতৃত্বে তো দেশকে ঠেলে দেওয়া হবে বিপজ্জনক পতনের খাদের দিকে।
ধর্মান্ধতার রাজনীতির প্রতিনিধি হয়েই বাংলাদেশে কখনো মুসলিম লীগ, কখনো জামায়াত, কখনো বিএনপি এবং এখন হেফাজত ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির সুস্থ ধারাকে ধ্বংস করার জন্য অতীতে মাঠে নেমেছে এবং এখনো নামছে। শুধু নামের খোলস পাল্টেছে। শেখ হাসিনা এই অপশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে এখনো লিপ্ত। শেষ পর্যন্ত হেফাজতের বিরুদ্ধেও তিনি হার্ডলাইন নিয়েছেন। আমার কথা, শেখ হাসিনা যেন এই হার্ডলাইন অনুসরণে অটল থাকেন। শুধু কিছু ব্যক্তিবিশেষকে শাস্তি দিলেই এই গণশত্রুদের চক্রান্ত ব্যর্থ করা যাবে না। দেশের মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির আদর্শ ও লক্ষ্য ব্যাপকভাবে তুলে ধরা দরকার। বাংলাদেশের রাজনৈতিক কালচারকে যদি সুস্থ করে তোলা যায়, তাহলে সংস্কৃতির অঙ্গনেও সুস্থতা ফিরে আসবে। অন্যথায় জামায়াত গেছে, হয়তো হেফাজতও যাবে। কিন্তু সুস্থ রাজনৈতিক কালচারের পুরনো শত্রু আরেক নতুন নামে পুরনো উদ্দেশ্য নিয়ে আবার মাথাচাড়া দেবে।
 
লেখক- আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী, লন্ডন, সোমবার, ৩ মে ২০২১


এ বিভাগের আরও সংবাদ