শনিবার, ১৯ জুন ২০২১, ০১:৫৫ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ সংবাদ

তিনি ফিরেছিলেন দেশ ও মানুষের জন্য

ড. মিল্টন বিশ্বাস
আপডেট : শনিবার, ৮ মে, ২০২১

‘এ দেশ আমার। আমার পিতা এদেশকে স্বাধীন করেছেন। আমি আমার দেশে ফিরব। কারো অনুমতি নিতে হবে না।’ এ কথা বলে ২০০৭ সালের ৭ মে ফিরে এলেন দীপ্ত পদচারণায়। তারপর শুরু হলো গণতন্ত্রের অভিযাত্রা। ২০০৭ সালের ৭ মে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারঘোষিত জরুরি অবস্থা চলাকালে শত বাধা ও হুমকি উপেক্ষা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা শেষে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে আসেন। সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষের অভিনন্দনে সেদিন পুনরায় আপ্লুত হন তিনি। দেশে ফিরে জনগণের হারানো গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় শুরু করেন নতুন সংগ্রাম।
২০০৭ সালের এই দিনে তিনি ফিরে না এলে এদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হতো না। আর ২০০৯ থেকে ২০২০ সালের মুজিববর্ষ পর্যন্ত তার নেতৃত্বের মহিমান্বিত রূপ দেখা যেত না। বাঙালির চিরঞ্জীব আশা ও অনন্ত অনুপ্রেরণার উৎস শেখ হাসিনা বর্তমানে করোনা ভাইরাসের মহামারি থেকে দেশের মানুষকে ভ্যাকসিন ও খাদ্য সহায়তা দিয়ে রক্ষার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রমে দিনযাপন করছেন।
১৯৮১ সালের ১৭ মে তিনি দেশে ফিরেছিলেন ৬ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে। এরপর ১৯৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০০৭ সালের সামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল পর্যন্ত একাধিকবার বন্দি অবস্থায় নিঃসঙ্গ মুহূর্ত কাটাতে হয়েছে তাকে। তিনি লিখেছেন- ‘দেশ ও জনগণের জন্য কিছু মানুষকে আত্মত্যাগ করতেই হয়, এ শিক্ষাদীক্ষা তো আমার রক্তে প্রবাহিত। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এর পর প্রবাসে থাকা অবস্থায় আমার জীবনের অনিশ্চয়তা ভরা সময়গুলোয় আমি তো দেশের কথা ভুলে থাকতে পারিনি? ঘাতকদের ভাষণ, সহযোগীদের কুকীর্তি সবই তো জানা যেত।’ (নূর হোসেন, ওরা টোকাই কেন, পৃ. ৫৩)
২০০৬ থেকে ২০০৭ সালে দেশে তখন শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে ‘মাইনাস’ করার চেষ্টা চলছিল। দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল, রাজনীতিবিদদের বিশেষ আইনে কারান্তরীণ করে রাখা হয়। এমন এক পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের পথ সুগম হয় শেখ হাসিনার আগমনে। আসলে ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশ ও জনগণের কাছে প্রত্যাবর্তনের মতো শেখ হাসিনার ২০০৭ সালের ৭ মে আমেরিকা থেকে দ্বিতীয় প্রত্যাবর্তনও ছিল আমাদের জন্য মঙ্গলকর। ২০০৭ সালে ১১ জানুয়ারির পর তার দেশে ফেরার ওপর বিধিনিষেধ জারি করে সামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেয়ার সেই চক্রান্ত ব্যর্থ হয়।
তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। কিন্তু ১৬ জুলাই যৌথবাহিনী তাকে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করে ৩৩১ দিন কারাগারে বন্দি করে রাখে। সেসময় গণমানুষ তার অনুপস্থিতি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছে। তার সাব-জেলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের উদ্বেগ, গ্রেপ্তারের সংবাদ শুনে দেশের বিভিন্ন স্থানে চারজনের মৃত্যুবরণ, বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের উৎকণ্ঠা আপামর জনগোষ্ঠীকে স্পর্শ করেছিল। কারণ সে সময় আদালতের চৌকাঠে শেখ হাসিনা ছিলেন সাহসী ও দৃঢ়চেতা; দেশ ও মানুষের জন্য উৎকণ্ঠিত; বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে সত্যকথা উচ্চারণে বড় বেশি সপ্রতিভ। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার সন্ত্রাস, দুর্নীতি, ধর্ষণ ও লুটপাটের মাধ্যমে এদেশকে নরকে পরিণত করেছিল। নেত্রীকে গ্রেনেড, বুলেট, বোমায় শেষ করতে চেয়েছিল। কিন্তু তিনি ছিলেন নির্ভীক; এখনও তেমনটাই আছেন।
২০০৭ সালের ৭ মে হাসিনা ফিরে এসেছিলেন মাটি ও মানুষের কাছে। এজন্য ‘আমার বাংলাদেশ, আমার ভালোবাসা’ এই অমৃতবাণী তার কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে। তিনি নানা বিশেষণে বিশেষায়িত। সততা, নিষ্ঠা, রাজনৈতিক দৃঢ়তা; গণতন্ত্র, শান্তি, সম্প্রীতি ও বিশ্বভ্রাতৃত্বের অনন্য রূপকার আর মানব কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ- তার চেয়েও আরও অনেক কিছু তিনি। এই দরদি নেতা দুঃখী মানুষের আপনজন; নির্যাতিত জনগণের সহমর্মী তথা ঘরের লোক। তিনি বলেছেন, ‘বাবার মতো আমাকে যদি জীবন উৎসর্গ করতে হয়, আমি তা করতে প্রস্তুত।’
সমৃদ্ধশালী এক বাংলাদেশের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার পথে তিনি এগিয়ে চলেছেন নির্ভীকভাবে। আর এসব কিছুই হতো না যদি তিনি ২০০৭ সালের ৭ মে নিজের দেশে ফিরে না আসতেন। হুমকি ও ষড়যন্ত্রের সকল জাল ছিন্ন করে তিনি এসেছিলেন বলেই আজ দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার হয়েছে। ফাঁসি হয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের মূল হোতাদের। আর জামায়াত-হেফাজতে ইসলামীসহ সকল জঙ্গিবাদী সংগঠন নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে।
এমনকি ২০২০ সালে শুরু হওয়া করোনা মহামারি সত্ত্বেও বাংলাদেশ এশিয়া মহাদেশের সর্বোচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এই অগ্রগতিতে দেশবাসী গর্বিত। কারণ বাংলাদেশের শক্তিশালী অর্থনীতি গড়তে শেখ হাসিনার অবদান অন্য দেশের জন্যও প্রেরণাদায়ক। এজন্যই বলা হয় ২০০৭ সালের ৭ মে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। ২০০৭ সালে কবি বেলাল চৌধুরী কবিতায় লেখেন-
‘‘শেখ হাসিনাই গণতন্ত্রের শেষ ভরসা,/তাই তো কোটি কণ্ঠে আওয়াজ/ ‘মুক্ত করে আনতে হবে তাকে সহসা’।/ এত কিছুর পরও জানি আমরা/ শেষ হাসিটি হাসবেন শেখ হাসিনাই।’’(কোটি কণ্ঠে এক আওয়াজ)
 
লেখক: ড. মিল্টন বিশ্বাস, অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, নির্বাহী সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদশ, কলাম লেখক।


এ বিভাগের আরও সংবাদ