1. [email protected] : ডেস্ক রিপোর্ট : ডেস্ক রিপোর্ট
  2. [email protected] : অনলাইন ডেস্ক : অনলাইন ডেস্ক
  3. [email protected] : নিজস্ব প্রতিবেদক : নিজস্ব প্রতিবেদক
  4. [email protected] : নিউজ এডিটর : নিউজ এডিটর
ইবনে বতুতার চোখে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ - ebarta24.com
  1. [email protected] : ডেস্ক রিপোর্ট : ডেস্ক রিপোর্ট
  2. [email protected] : অনলাইন ডেস্ক : অনলাইন ডেস্ক
  3. [email protected] : নিজস্ব প্রতিবেদক : নিজস্ব প্রতিবেদক
  4. [email protected] : নিউজ এডিটর : নিউজ এডিটর
ইবনে বতুতার চোখে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ - ebarta24.com
শনিবার, ২১ মে ২০২২, ০৩:৪৩ অপরাহ্ন

ইবনে বতুতার চোখে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ

মো. তাহমিদ হাসান
  • সর্বশেষ আপডেট : শুক্রবার, ১৩ মে, ২০২২

মরক্কোর বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা যে সব জায়গায় সফর করেছিল তা বেশিভাগই মুসলিম অধ্যুষিত ছিল। ইবনে বতুতা ‘আর রিহলা’ নামক গ্রন্থে তার ভ্রমণকাহিনীগুলো লিপিবদ্ধ করেন। রিহলা একটি আরবি শব্দ, যার বাংলা অর্থ ভ্রমণকাহিনী। তার এই বইয়ের সম্পাদক ছিলেন ইবনে জুজারী। ‘আর রিহলা’ গ্রন্থে বতুতার বাংলাদেশ ভ্রমণের কথা পাওয়া যায়। তার ঐতিহাসিক বইয়ে তৎকালীন বাংলার সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, আবহাওয়া, জলবায়ু ও প্রাকৃতিক অবস্থার সম্পর্কে জানা যায়।

ইবনে জুজারী লিখেছেন, ‘১৩০৪ খ্রিস্টাব্দের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইবনে বতুতা তানজিয়ারে জন্মগ্রহণ করেন এবং পরলোকগমন করেন ১৩৬৮ খ্রিস্টাব্দ অথবা পরবর্তী বছরে।’ ইবনে বতুতার প্রকৃত নাম ছিল শেখ আবু মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে বতুতা। ইবনে বতুতা ছিল তার বংশগত পদবী যা আজও মরক্কোর প্রচলিত দেখা যায়৷ এ সম্প্রাদায়ের নাম প্রথমে স্থান পায় সাইরেনাইকা ও মিসরের সীমান্তবর্তী একটি যাযাবর জাতি হিসেবে। তাদের এ বংশ কয়েক পুরুষ পূর্ব থেকেই তানজিয়ারে বসবাস করছিল এবং তারা লুবাতার সম্প্রাদায় ভুক্ত ছিল।

ইবনে বতুতা নিজে একজন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি ছিলেন এবং ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিদের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করতেন। মাত্র ২১ বছর বয়সেই তিনি বিশ্বভ্রমণের জন্য বের হয়ে যায় এবং ২২ বছর বয়সে মক্কায় হজ্ব পালন করেন। জানা যায় তিনি ১৩২৫-১৩৫৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালে বিশ্ব ভ্রমণ করেন। তিনি ১৩৩৩ খ্রিস্টাব্দে দিল্লিতে আসেন এবং সুলতান মুহম্মদ বিন তুঘলকের অধীনে দীর্ঘ প্রায় আট বছর কাজীর পদে নিয়োজিত ছিলেন। এরপরেই তিনি ১৩৪৫ অথবা ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে ফখর উদ্দীন মোবারক শাহের শাসনকালে বাংলায় আসেন।

ইবনে বতুতা তার ‘আর রিহলা’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘দীর্ঘ তেতাল্লিশ রাত্রি সমুদ্রের বুকে কাটিয়ে আমরা বাঙ্গালা (বাংলা) দেশে পৌঁছলাম। এ বিশাল দেশে প্রচুর চাল উৎপন্ন হয়। সারা পৃথিবীতে আমি এমন কোনো দেশ দেখিনি যেখানে জিনিসপত্রের মূল্য বাংলার চেয়ে কম। খোরাসানের লোকেরা বলে, বাংলা ভাল জিনিসে পরিপূর্ণ একটি নরক (A Hell Full Of Good Things)।

ইবনে বতুতা জানান, ‘এক দেরহামে আটটি মোটাতাজা মুরগি, দুই দেরহামে একটি মোটাতাজা ভেড়া এখানে বিক্রি হতে আমি দেখেছি। তাছাড়া ত্রিশ হাত লম্বা উৎকৃষ্ট ধরনের সূতী কাপড় মাত্র দুই দিনারে এখানে বিক্রি হতে দেখেছি। এক স্বর্ণ দিনারে অর্থাৎ মরক্কোর আড়াই স্বর্ণ দিনারে এখানে সুন্দরী ত্রুীতদাসী বালিকা বিক্রি হয়। সমুদ্রোপকুলে আমরা যে বৃহৎ শহরে প্রবেশ করি তার নাম সাদকাওয়ান।”

ইবনে বতুতা দক্ষিণ ভারত থেকে সমুদ্র পথে বাংলাদেশে এসেছিলেন এবং তিনি সদকাওয়ান নামক জায়গায় পদার্পণ করেছিলেন। তার গ্রন্থ ‘আর রিহলা’র মতে বিশেষজ্ঞরা সদকাওয়ান জায়গাটিকে চট্টগ্রাম বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, বাংলার আবহাওয়া আফ্রিকা ও মধ্য এশিয়ার মানুষের জন্য ছিল প্রচন্ড প্রতিকূল। তার কারণ বৃষ্টির পানি ও শীতের কুয়াশা এখানে অসহনীয়। তার উপর এই অঞ্চলে রয়েছে নদীর প্রাধান্য। এই জন্য সেই সময় বাংলায় আসাকে অনেকেই ভয় করতো অথচ বাংলার ভূমি ছিল উর্বর। ফলে বাংলাকে ‘দোজখ-ই-পুর-নিয়ামত’ বা ভাল জিনিসে পরিপূর্ণ একটি নরক (A Hell Full Of Good Things) বলার কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা এইসব মনে করেন। ইবনে বতুতার বর্ণনায় পাওয়া যায় মাত্র ১ দিরহামে ৮ টি মোটাতাজা মুরগি এবং ২ দিরহামে ১টি মোটাতাজা ভেড়া পাওয়া যেত। ইবনে বতুতার আশুরা নামে এক সুন্দরী ক্রীতদাসী বালিকা ক্রয় করেন এবং তার এক সঙ্গী লুলু (মুক্তা) নামে অল্প বয়সী দাসী কিনার কথাও তার বর্ণনায় পাওয়া যায়।

ইবনে বতুতা যখন বাংলায় আসেন তখন বাংলার শাসক ছিল ফখরউদ্দীন। শাসনকর্তা হিসেবে তিনি উৎকৃষ্ট ছিলেন। ফখরউদ্দীন দরবেশ ও সুফিদের প্রতি বিশেষ অনুরাগ প্রদর্শন করতেন। ফখরউদ্দীন দিল্লির সুলতানের আনুগত ছিলেন না। কারণ দিল্লির সুলতান তার এক পুত্রকে কারারুদ্ধ করেন এবং সিংহাসন ও রাজত্ব নিয়ে দ্বন্দ্বে লিপ্তে হন। ইবনে বতুতা সাদকাওয়ান (চট্টগ্রাম) থেকে কামারু পর্বতের দিকে রওনা হন। সেখান থেকে কামারুর পথ ছিল এক মাসের। ইবনে বতুতা কামারু নামক যে স্থানটি পরিদর্শন করেন সেটি সম্ভবত ছিল খাসিয়া, জৈন্তিয়া ও ত্রিপুরার পাহাড় বেষ্টিত আসামের অন্তর্গত শ্রীহট্ট (সিলেট)। ইবনে বতুতার বাংলাদেশে আসার মূল উদ্দ্যেশ ছিল সিলেটের শেখ জালালুদ্দিন নামক এক প্রসিদ্ধ ধর্মপ্রাণ সাধু ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ করা। জালালুদ্দিনের বাসস্থান থেকে দুইদিনের পথ দূরে থাকতেই ইবনে বতুতা শেখের দুইজন শিষ্যের সাথে দেখা হয়। শেখ জালালুদ্দিন তার শিষ্যদের ইবনে বতুতাকে অভর্থনা জানানোর জন্য পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু ইবনে বতুতা তার সম্পর্কে কোনো কিছুই জালালুদ্দিনকে আগে থেকে জ্ঞাত করেননি। তবুও শেখ জালালুদ্দিন তার ব্যাপারে অবগত ছিলেন। এ থেকেই ইবনে বতুতার শেখ জালালুদ্দিনের আধ্যাত্মিক ক্ষমতার ব্যাপারে ইঙ্গিত পান।

ইবনে বতুতা শেখ জালালুদ্দিনের কাছে তিনদিনের আতিথ্যে ছিলেন। ইবনে বতুতার শেখ জালালুদ্দিনের একটি ছাগলের লোমের তৈরি আলখেল্লা পছন্দ হয়। ইবনে বতুতা তার গ্রন্থে লিখেছেন, ‘শেখের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে দেখলাম, তিনি ছাগলের লোমের তৈরি আলখাল্লা পরিধান করে আছেন। আলখাল্লাটি দেখে আমার পছন্দ হলে মনে মনে বললাম, আহা, শেখ যদি এটি আমাকে দান করতেন। পরে তার কাছে যখন বিদায় নিতে গেলাম, তিনি উঠে গুহার এক কোণে গিয়ে আলখাল্লাটি খুলে এসে আমার গায়ে পরিয়ে দিলেন এবং নিজের মাথার গোলটুপিটিও আমার মাথায় দিলেন। নিজে এলেন তালি লাগানো একটি পোষাকে।’

ইবনে বতুতা শেখের শিষ্যদের কাছ থেকে জানতে পেরে ছিলেন এই আলখাল্লা শুধু তিনি আসলেই শেখ পরিধান করতেন। শেখ জালালুদ্দিন তার আধ্যাত্মিক শক্তির মাধ্যমেই জেনে গিয়েছিলেন মরক্কোর এক পর্যটক এই আলখাল্লা চেয়ে নিবেন এবং সেই পর্যটকের থেকে এক বিধর্মী সুলতান সেই আলখাল্লাটি নিবেন। পরিশেষে সেই বিধর্মী সুলতান শেখের ভাই বোরাউদ্দিনকে সেই আলখাল্লাটি দিবেন। শেখ জালালুদ্দিন এই আলখাল্লাটি মূলত তার ভাই সাঘার্জের বোরাউদ্দিনের জন্য তৈরি করেছিল। ইবনে বতুতা ‘আর রিহলা’ গ্রন্থে এইসব বিবরণের কিছু কিছু বৃত্তান্ত বর্ণনা করেছেন।

শেখ জালালুদ্দিনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ইবনে বতুতা আন-নহর উল-আজরাক (মেঘনা নদী) মধ্যে পনেরো দিনের পথ পাড়ি দিয়ে সোনারকাওয়ানে (সোনারগাঁও) পৌঁছান। এই পনেরো দিনের নদী পথের যাত্রায় বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাকে মনোমুগ্ধকর করে তুলেছিল। তার এই যাত্রাপথে নদীর দুইধারে ফলের বাগান ও গ্রামাগুলো দেখতে পেয়েছিল, যা তিনি বাজারের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার তুলনা করেছেন। অসংখ্য নৌকা এই নদীপথে যাত্রা করতো, কিন্তু যখন একটি নৌকা অপর নৌকার সঙ্গে দেখা হতো তখন উভয়ে নিজেদের ঢাক পিটিয়ে অভিবাদন জানাত। সুলতান ফখরউদ্দীন সুফি দরবেশদের চলাচলের জন্য এই নদীতে কোনো ধরণের কর নিতেন না। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ফলজ উপাদান এবং অর্থনৈতিক অবস্থা দেখে আন-নহর উল-আজরাক অর্থাৎ মেঘনা নদীকে তিনি মিশরের নীল নদের সাথে তুলনা করেছিলেন।

মধ্যযুগের বাংলা কত সমৃদ্ধ ছিল তা প্রখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতার ভ্রমণ বিবরণে স্পষ্ট। তা থেকে বাংলার অতীত গৌরব সম্পর্কেও আঁচ করা যায়। তদুপরি, বাংলার এই ঐশ্বর্যশালী অবস্থানের কারণেই যে পরবর্তীতে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো এখানে হানা দিয়েছিল তা অনুধাবন করতে কষ্ট হয় না।

তথ্যসূত্র – ইবনে বতুতার ‘আর রিহলা’ গ্রন্থ

লেখক : মো. তাহমিদ হাসান – শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরও সংবাদ

ebarta24.com © All rights reserved. 2021