1. অন্যরকম
  2. অপরাধ বার্তা
  3. অভিমত
  4. আন্তর্জাতিক সংবাদ
  5. ইতিহাস
  6. এডিটরস' পিক
  7. খেলাধুলা
  8. জাতীয় সংবাদ
  9. টেকসই উন্নয়ন
  10. তথ্য প্রযুক্তি
  11. নির্বাচন বার্তা
  12. প্রতিবেদন
  13. প্রবাস বার্তা
  14. ফিচার
  15. বাণিজ্য ও অর্থনীতি

কৃষিনির্ভর অপার সম্ভাবনার বাংলাদেশ

ডেস্ক রিপোর্ট : ইবার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকম
সোমবার, ২৭ মে, ২০২৪

বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর অপার সম্ভাবনার দেশ। এ দেশের জনসংখ্যার ৪০ শতাংশের বেশি মানুষ কৃষির ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। স্বাধীনতাপরবর্তী দেশের কৃষি ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। কৃষি সম্প্রসারণ, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, কৃষি অর্থনীতি, বাজারব্যবস্থাপনা, সারব্যবস্থাপনা, উচ্চফলনশীল জাত, কৃষি গবেষণার মাধ্যমে বদলে যাচ্ছে কৃষি খাত। আর এই কৃষির মূল কারিগর আমাদের দেশের কৃষক।

দেশের কৃষির উন্নতি হলেও আশানুরূপ কোনো উন্নতি হয়নি আমাদের কৃষকদের। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে যেসব কৃষক ফসল ফলায়, দিন শেষে তাদের চুলাতেই আগুন জ্বলে না। বর্তমানে কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কৃষি ঋণ, কৃষি প্রণোদনা, প্রশিক্ষণ, ফসল বীমাসহ বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের সহায়তা প্রদান করছে। সেই সঙ্গে কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নে এনজিও এবং বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। তারপরেও কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নে তেমন কোনো পরিবর্তন আসছে না। এর কারণ কি? কৃষকরা কি এসব সুবিধা ঠিকমতো পাচ্ছেন না? নাকি এই পেশাটাই অলাভজনক?

আমাদের দেশের বেশিরভাগ কৃষক বাস করেন গ্রামে। কৃষি পণ্য উৎপাদন কাজে সরাসরি যারা নিয়োজিত তাদের বড় একটি অংশ হলো প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক এবং ভূমিহীন বা বর্গাচাষি। যাদের ১০ থেকে ১৫ বিঘা জমি রয়েছে তারা খুব একটা কৃষি কাজ করেন না; জমি বর্গা দিয়ে অন্য পেশায় জীবিকা নির্বাহ করেন। আর সেই জমিতে প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকরা অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে ফলায় সোনার ফসল।

ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গা চাষিদের সংখ্যা আমাদের দেশে বেশি। আবার অনেকটা অবহেলিত এই চাষিরায়। কৃষি সুবিধা নিতে গেলে তাদের পড়তে হয় ভোগান্তিতে, কৃষি ঋণ পেতেও তাদের নানা বেগ পেতে হয়। সরকারি সুবিধাও ঠিকমতো পৌঁছায় না তাদের পর্যন্ত। গবেষণার মাধ্যমে উচ্চফলনশীল বীজেও ভেজাল মেশানো, সারের মান নষ্ট আর ডিলারের কারসাজিতে পদে পদে ঠকছেন কৃষকরা। মাঠে যখন চাষ করার সময় হয়- বর্গা ও প্রান্তিক চাষিদের কাছ থেকে বেশি দামে জমির লিজ খরচ ধরে জমির মালিক। বর্গামূল্য নির্ধারিত না হওয়ার কারণে প্রতি বছরই প্রায় বাড়তি টাকা দিতে হয়। এ বছর যে টাকায় বর্গা নিয়েছে জমি, আগামী বছর তার চেয়ে বেশি টাকা দিয়ে জমি বর্গা নিতে হয়। এতে চাষের শুরুতেই চাপে পড়ে কৃষক।

মাঠে চাষ করবেন কিন্তু সে সময় জমিতে পানি নেই। শ্যালো ইঞ্জিন চালিত পাম্প ব্যবহার করবে কিন্তু জ্বালানির দাম বেশি। যেসব এলাকায় প্রাকৃতিক উৎস, কিংবা সেচ প্রকল্প চলমান রয়েছে সেখানেও সমস্যা। বেশিরভাগ এলাকা অবৈধ দখলদারদের কাছে জিম্মি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, ধান উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটা মৌসুম হলো রবি মৌসুম। অথচ এই মৌসুমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় তামাক চাষের ফলে সেচ সুবিধা ঠিকমতো মাঠে পায় না চাষিরা। কারণ রবি মৌসুমের বোরো ধানের জমিতে পানি নিতে চাইলে পার্শ্ববর্তী তামাক চাষির অসুবিধা। ফলে, অধিক তামাক চাষ প্রবণ এলাকার বোরো ধান চাষিরা ঠিকমতো পানি পায় না। এছাড়া, শস্য পর্যায় এবং মাঠের ‘ক্রপ প্যাটার্ন’ ঠিকমতো না করার কারণেও যত্রতত্র ফসল আবাদ করেন কৃষকরা। এতে নানা সময় ফলন কমে যায়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কৃষক পর্যায়ে কৃষি সেবা দিয়ে থাকেন। কৃষকরা যাতে ন্যায্যমূল্যে সার ও বীজ কিনতে পারে এজন্য মনিটরিং করে কৃষি বিভাগ। কিন্তু মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার না হওয়ায় সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দামে সার ও বীজ কিনতে হয় কৃষকদের। মাঠ পর্যায়ে কর্মরত কর্মকর্তাদের মনিটরিংয়ের অভাবে বিভিন্ন এলাকায় বীজ কিনে প্রতারিত হয় কৃষক। আবার কোথাও কোথাও ভেজাল সার ও বীজ কিনেও ক্ষতিগ্রস্ত্থ হয় তারা। কৃষকের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এসব অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেও তেমন কোনো লাভ হয় না। যার ঠকার, সেই কৃষকই দিনশেষে ঠকে। এছাড়া, কৃষি শ্রমিকের তুলনায় অকৃষি শ্রমিকের মুজুরি বেশি। এ কারণে ফসল রোপণ, পরিচর্যা, কর্তন, মাড়াই, সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনার সময় কৃষকরা প্রতি মৌসুমে ক্ষতিগ্রস্ত। সরকার কৃষি যান্ত্রিকীকরণে নানা প্রদক্ষেপ গ্রহণ করলেও যন্ত্রপাতি সহজলভ্য না হওয়ায় অনেকটায় সুফল পায় না তারা। এলাকা ও ফসল ভেদে কৃষি শ্রমিকের নির্ধারিত মূল্য নির্ধারিত না থাকার ফলে কৃষককে বাড়তি টাকা দিতে হয়। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। আবার ফসল চাষাবাদের ক্ষেত্রে আমাদের দেশের কৃষকদের অজ্ঞতাও রয়েছে।

কৃষকরা মাঠে ফসলের আবাদ করেন, কিন্তু ফসলের রোগবালাই ও পোকামাকড় সম্পর্কে অনেকটাই অজ্ঞ। যার কারণে শস্যহানির মতো ঘটনা ঘটে। সচারচর ধানের জমিতে পোকা নড়াচড়া করলেই কৃষকরা মনে করেন জমিতে পোকার আক্রমণ হয়েছে। এর পরে ছুটে যান স্থানীয় কিটনাশকের দোকানে। সেখান থেকে কিটনাশকের দোকানির পরামর্শেই পোকার উপস্থিতি না দেখেই কীটনাশক কিনে এনে যত্রতত্র জমিতে দেন। কিন্তু জমিতে উপকারী এবং অপকারী এই দুই ধরনের পোকা ও মাকড় থাকে। উপকারী এবং অপকারী পোকা শনাক্ত না করেই কৃষকরা কীটনাশক স্প্রে করে। এতে অপকারী পোকার পাশাপাশি উপকারী পোকা ধ্বংস হয়। ফলে ক্ষতি আরো বেশি হয়। এছাড়া সার বা কীটনাশকের সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে কৃষকরা অভিজ্ঞ না। মাত্রা, কার্যকারিতা এবং প্রয়োগ পদ্ধতি সঠিকভাবে জানেন না। ফলে, একদিকে যেমন সার ও কীটনাশক ব্যবহারে অপচয় হয় ঠিক অন্যদিকে, উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। এদিকে মাঠ পর্যায়ে ফসলের রোগবলাই ও পোকা দমনের ক্ষেত্রে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকরা বেশিরভাগই কীটনাশক বিক্রেতার ওপর নির্ভর করে। জমিতে কখন কোন কীটনাশক প্রয়োগ করবেন তার পরামর্শ বেশিরভাগই দেন ওইসব দোকানিরা। এদিক থেকে কীটনাশকের এসব দোকানিদের কাছেও জিম্মি থাকে কৃষকরা। অনেক ক্ষেত্রে মেয়াদ উত্তীর্ণ কীটনাশক ব্যবহারের ফলে ঠিকমতো রোগ ও পোকা দমন হয় না। এক্ষেত্রে বাড়তি টাকা খরচ করতে হয় কৃষকদের। অনেক কৃষক আছেন যারা চাষের পরে ফসল বিক্রি করে সার ও কীটনাশকের মূল্য পরিশোধ করে। যার কারণে ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ করে নেয়। এক্ষেত্রে কৃষকরা যাতে ন্যায্যমূল্যে কীটনাশক ও সার কিনতে পারে সেদিকে মনিটরিং ব্যবস্থা আরো জোরদার করা প্রয়োজন। মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের পরামর্শদাতা কর্মকর্তাদের আরো আন্তরিক হয়ে কৃষকদের পরামর্শ প্রদানের ব্যবস্থা করা জরুরি।

কৃষক ধান উৎপাদন করলে ধানের দাম, পাটের দাম, আঁখের দাম, আলুর দাম, ডাল, পেঁয়াজ, সবজিসহ সব কৃষি পণ্যের দাম নির্ধারণ কৃষকের হাতে নেই। বর্তমানে ধানের একটি সরকারি দাম নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু কৃষকরা সে নির্ধারিত দামে বিক্রি করতে পারে না সরকারের কাছে। প্রভাবশালী নেতাকর্মীরাই কৃষক ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ধান কম দামে কিনে সরকার নির্ধারিত দামে সরকারের কাছে বিক্রি করে। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি মূল্যের তুলনায় খোলাবাজারের দাম বেশি হয়, সেক্ষেত্রে ধানের প্রথম দাম নির্ধারণ করে চালকল মালিকরা, দ্বিতীয় দাম নির্ধারণ করে বড় ব্যবসীয়রা, তৃতীয় দাম নির্ধারণ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দালালরা, চতুর্থ দাম নির্ধারণ করে স্থানীয় সিন্ডিকেট। আর কৃষকদের বাধ্য হয়ে ওই স্থানীয় সিন্ডিকেটের কাছেই তাদের বেঁধে দেওয়া দামে ধান বিক্রি করতে হয়। কারণ কৃষকরা তাদের কাছে জিম্মি। পাটের ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা চালু রয়েছে। আঁখ উৎপাদন করে কৃষক, আর তার দাম নির্ধারণ করে আঁখ ব্যবসায়ী এবং মিলের অসাধু কর্মকর্তারা। যার কারণে সরকারি মূল্যে আঁখ বিক্রি করতে পারে না কৃষকরা। দাম দিলেও টাকা না পাওয়া, ঘুষ না দিলে আঁখের ওজন কমে যাওয়া, টাকার পরিবর্তে চিনি দেওয়াসহ বিভিন্ন কারণে আঁখ চাষে অনাগ্রহ কৃষকদের। তেমনি আলুর দাম নির্ধারণ করে বাজার সিন্ডিকেট। ডাল, সবজির দামও বাজারের সিন্ডিকেটের হাতে। পেঁয়াজ উৎপাদন করে কৃষক আর তা থেকে লাভবান হয় অসাধু ব্যবসায়ীরা। কারণ কৃষক নিরুপায়।

সাম্প্রতিক সময়ে তরমুজের দাম নিয়ে কৃষকদের ঠকার চিত্র সবার সামনে। মাঠের কৃষকদের থেকে তরমুজ পিস হিসেবে কিনে বাজারে ক্রেতাদের কাছে কেজি দরে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা তরমুজ ক্ষেতে গিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে পিস হিসেবে কিনছেন। তরমুজ চাষি এবং বাজাররের ক্রেতাদের মধ্যে বড় যোগাযোগ না থাকার সুবিধা নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরদের সিন্ডিকেট এই কাজ করছে। ব্যবসায়ীদের অতি লাভের মানসিকতা থেকে এটা হচ্ছে। দাবি উঠানোটা স্বাভাবিক। পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেওয়াটাই আধুনিক বাজার ব্যবস্থাপনার ধারণার মধ্যে পড়ে। মূলত ভুঁইফোড়দের দৌরাত্ম্য এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের যোগসাজশই কৃষকের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার প্রধান কারণ। এতে ক্রেতা যেমন ঠকছেন তেমনি উৎপাদনকারী কৃষকও ঠকছেন। ফলে কৃষক এবং ক্রেতার মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করা না হলে এই বাজার ব্যবস্থায় চলমান সিন্ডিকেট দমন সম্ভব নয়।

কৃষি পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রেও কৃষকদের নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। কৃষক তার উৎপাদিত পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রির পরিবর্তে বাইরের বাজারে নিতে গেলে পরিবহণের ভাড়া নিয়ে অসুবিধা হয়। একজন কৃষক ক্ষেত থেকে ৫০ কেজি বেগুন তুলে স্থানীয় বাজারে নিয়ে যায়। সেটা শহরের বাজারে নিয়ে গেলে দ্বিগুণ দাম পাবে জেনেও সেটা স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে বাধ্য হয় সে। কারণ কম পন্য পরিবহনের ক্ষেত্রে বেশি ভাড়া দিতে হয়। এক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের কাছে বিক্রি ছাড়া কোনো উপায় থাকে না কৃষকদের। আবার কৃষি পণ্য সংরক্ষণের সু-ব্যবস্থা এখনো আমাদের দেশে পর্যাপ্ত না। কৃষকরা যে বাড়িতে বা অল্প কিছুদিন ফসল সংরক্ষণ করবে, তারও অজ্ঞতা রয়েছে। এজন্য সবজি, ফল, লতাজাতীয় ফসল, দানা শস্য, পেঁয়াজ ইত্যাদিসহ দ্রম্নত পচনশীল পণ্য উৎপাদন করে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষক। মাঠ পর্যায়ের কৃষকরা ফসল সংগ্রহ, ওয়াশিং, সটিং, গ্রেডিং, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ, সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থানা ও বাজারজাতকরণের ওপরে সঠিক ধারণা এবং ব্যবস্থা না থাকার ফলে কৃষকরা ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হয়।

লেখক: ইমরান ছিদ্দিকি – লেখক ও কলামিস্ট।


সর্বশেষ - জাতীয় সংবাদ