রবিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২০, ০২:১২ পূর্বাহ্ন

বিএনপি যে অতল গহব্বরে হারিয়ে যাচ্ছে তা কি টের পাচ্ছেন

ইবার্তা ডেস্ক
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ২৮ জুন, ২০১৮

গাজীপুরে বিএনপির তৃণমূলে ক্ষোভ, আত্মসমালোচনা

বিএনপির বেশির ভাগ নেতাকর্মীরা মনে করেন আওয়ামী লীগের মূল শক্তি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আবেগ এবং শেখ হাসিনার ইতিবাচক ভাবমূর্তি। তাই প্রার্থী যেই হোক শেখ হাসিনার ব্যক্তিত্ব, নেতৃত্ব ও দেশ পরিচালনার অসাধারণ যোগ্যতার কারণে আ’লীগ প্রার্থীর জয় সহজ হয়।

গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়র পদপ্রার্থীর পরাজয়ে নেতাকর্মীরা বলছে, বিএনপির জাতীয় নীতির কারণেই পরাজয় ঘটেছে। খুলনা থেকে আওয়ামী লীগের যে জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে তাতে অতীতের অভিজ্ঞতায় বলা যায়, আগামী স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে এর ব্যাপক প্রভাব পড়বে। খালেদা জিয়ার কারাদণ্ডের পর অনেকে ভেবেছিল বিএনপি ইচ্ছা করেই শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি দিয়ে রাজনীতি করতে চায়। কিন্তু তখনো অনেকে প্রশ্ন তুলেছিল যে সাংগঠনিক ব্যর্থতা এবং জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণেই সরকার বিরোধী জনমত গড়ে তুলতে পারে নি।

বিএনপির নেতাকর্মীরা মনে করেন খালেদা জিয়াকে পরোক্ষভাবে মাইনাস করে তারেক রহমান যখন থেকে বিএনপির দায়িত্বভার নেন তখন থেকেই দলের অধঃপতন শুরু হতে থাকে। তারেক রহমানকে নেতাকর্মীরা বাধ্যবাধকতার কারণে মেনে নিলেও বেশিরভাগ নেতাকর্মীর তারেকের প্রতি আস্থা বা ভালোবাসা নেই। এছাড়া তার উগ্র আচরণও নেতাবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করেছে। প্রায় প্রতি পদেই তার অদূরদর্শিতা ও ভুল সিদ্ধান্তের কারণে দলকে মূল্য দিতে হয়েছে। আর জনগণের কাছে তারেক রহমানের ভাবমূর্তি খুবই নেতিবাচক। এসব কারণকেই গাজীপুর ও খুলনাবাসীরা পরাজয়ের কারণ মনে করছেন।

আজ প্রশ্ন উঠেছে, ‘গাজীপুরে বিএনপির নেতা-কর্মী-সমর্থকদের সাহস আর শক্তি গেল কই? যেখানে দলের চেয়ারম্যান পর্যন্ত জেল খাটছেন সেখানে পুলিশ ভয় দেখালেও তো আপনাআপনি মাঠ ছেড়ে যাওয়া ঠিক হয়নি। ধানের শীষের প্রার্থী হাসান উদ্দীন সরকারের মতো এত বয়স্ক আর ভদ্র একজন মুরব্বিরে একলা ভোটের মাঠে রাইখ্যা সব এই রহম পালাইয়া যাওয়া কি ঠিক অইছে?’ গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে ফিরদাউসুর রহমান নামের একজন ভোটার এভাবেই প্রতিক্রিয়া জানান দলের মেয়র পদপ্রার্থীর পরাজয়ে।

জয়দেবপুর রেলস্টেশনে রেলের জন্য অপেক্ষা করার ফাঁকে তিনি বলেন, ‘রাজনীতি করবো, প্রার্থীর কাছ থেইক্যা টাকা খাইবো—ভোটকেন্দ্র থেইক্যা কেউ বাইর হইয়া যাইতে কইলেও চুপচাপ মাথা নিচু কইর্যা বাইর হইয়া বাড়ি যাইয়া ঘুমাইবো—এইডা কোনো রজনীতি অইতে পারে না। কোনো কেন্দ্রেই তো প্রতিবাদ দেখলাম না, গণ্ডগোল-মারামারি দেখলাম না।’

সালনা এলাকার বিএনপি সমর্থক একজন কলেজ শিক্ষক বলেন, ‘বিএনপি ও ছাত্রদলের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা নিজেরা কাউন্সিলর পদে ভোট করে জয়ী হয়েছেন, তাঁদের এজেন্টরাও তো মাঠে ছিলেন, প্রার্থীরা নিজেরা কেন্দ্রে ঘুরেছেন। তাঁরা কিভাবে কেন্দ্রে থাকলেন, ভোটে জিতলেন?’ তিনি দবি করেন, বিজয়ী কাউন্সিলররা মেয়র পদপ্রার্থীর জন্য কে কী ভূমিকা রেখেছেন সেটা খতিয়ে দেখা দরকার।

বিএনপি নিজেরাই কেন মাঠ ছেড়ে দিল তা মাথায় আসছে না উল্লেখ করে সাবেক সরকারি কর্মকর্তা আইয়ূব হোসেন বলেন, ‘পরাজিত হলেও বিএনপির মেয়র প্রার্থী প্রায় দুই লাখ ভোট পেয়েছেন। বিএনপির রাজনীতির যে অবস্থা তাতে তাদের ভোট ক্রমেই কমতে থাকবে।’

জেলা বিএনপির একজন দায়িত্বশীল নেতা মনে করছেন, খুলনায় বিএনপির মেয়ার পদপ্রার্থীর হারার পর গাজীপুরে বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকরা ভেতরে ভেতরে নিজেদের গুটিয়ে নেয়। তাদের কেউ কেউ সরকারি দলের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, কেউ বা বাণিজ্যিক কারণে নিষ্ক্রিয় ছিল বলেও তিনি মনে করছেন। বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘অনেককে আমরা এজেন্ট বানাতে রাজি করাতে পারিনি। তারা ভয়ের অজুহাত দেখায়। আবার যাদেরকে কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে তারাও ভয়ের অজুহাত দেখায়। রাজনীতি কি এত সহজ যে ফুলের টোকাও পড়বে না!’

নিজেকে বিএনপি সমর্থক দাবি করা আরেক ব্যবসায়ী চার শর বেশি কেন্দ্র থেকে এজেন্ট বের করে দেওয়ার দলীয় অভিযোগ বিষয়ে বলেন, ‘একেকটি কেন্দ্রে পাঁচ-ছয়জনের এজেন্ট থাকার কথা। সে হিসাবে সরকারের চাপে দুই হাজার এজেন্ট চুপচাপ বেরিয়ে আসবে এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আসলে বিএনপির দিন বোধহয় আর ফিরবে না।’

আ. লীগে ঐক্যের জয় : ২০১৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামী প্রার্থী ছিলেন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমত উল্লা খান। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন এবার নির্বাচিত মেয়র অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম। ওই নির্বাচনের কয়েক দিন আগে নেত্রীর নির্দেশে মাঠ থেকে সরে দাঁড়ান তিনি। কিন্তু আজমত উল্লা খান হেরে বসেন বিএনপির প্রার্থী আবদুল মান্নানের কাছে লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে। সেবার অনৈক্যের মাসুলই কি দিতে হয়েছিল আওয়ামী লীগকে—গতকাল কালের কণ্ঠ’র তরফে প্রশ্নটি করা হলে আজমত উল্লা খান উত্তর দিতে চাননি। তিনি বলেন, ‘ঐক্যবদ্ধ হয়ে নির্বাচনের মাঠে থাকার কারণেই এবার আওয়ামী লীগ জিতেছে।’ টঙ্গী থানা আওয়ামী লীগের একজন নেতা বলেন, এবার ঐক্যবদ্ধ নির্বাচনের কারণেই জাহাঙ্গীর আলম বিপুল ভোটের বিজয় পেয়েছেন।

বিএনপির বেশির ভাগ নেতাকর্মীরা মনে করেন আওয়ামী লীগের মূল শক্তি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আবেগ এবং শেখ হাসিনার ইতিবাচক ভাবমূর্তি। তাই প্রার্থী যেই হোক শেখ হাসিনার ব্যক্তিত্ব, নেতৃত্ব ও দেশ পরিচালনার অসাধারণ যোগ্যতার কারণে আ’লীগ প্রার্থীর জয় সহজ হয়।

দলের জন্য কাজ না করার কথা জানলেই দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা সবসময় ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে নামার নির্দেশ দেন। নির্দেশে কাজ হয় এবং এরই সুফল প্রার্থীরা ভোগ করে। কিন্তু খালেদা ও তারেক রহমান বিভিন্ন ব্যক্তির পরামর্শে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে যার ফল দলের বিরুদ্ধেই যায়।

তৌফিক মারুফ, হায়দার আলী ও শরীফ আহমেদ শামীম, গাজীপুর থেকে: গাজীপুর মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক কামরুল আহসান সরকার রাসেল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নেত্রীর মুখে হাসি ফোটাতেই কোনো ব্যক্তি আর কোন্দল বোঝেনি। নগরের প্রতিটি ওয়ার্ডেও নেতাকর্মী, সমর্থকরা নিরলসভাবে মাঠে কাজ করেছে।
বলা হয় ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগকে কখনো কেউ পারাজিত করতে পারে না, সেটা আরো একবার দেখিয়ে দিল গাজীপুরবাসী। কিন্তু বিএনপি যে অতল গহব্বরে হারিয়ে যাচ্ছে তা কি টের পাচ্ছেন তাদের নেতাকর্মীরা?


আরও সংবাদ