শনিবার, ১৯ জুন ২০২১, ০৪:০৬ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ সংবাদ

৬ দফায় চূড়ান্ত পাকিস্তানের দফারফা

হামজা রহমান অন্তর
আপডেট : সোমবার, ৭ জুন, ২০২১

আজ ৭ জুন ঐতিহাসিক ৬ দফা দিবস। বাঙালি জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জানতে হলে ৬ দফা পড়তে হবে, এবং এর প্রভাবে পরবর্তী আন্দোলনগুলো সম্পর্কে জানতে হবে।

১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে সম্মিলিত বিরোধী দলের সভায় পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী এমনকি পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় সকল বিরোধী দলও এই ৬ দফা প্রত্যাখ্যান করেছিলো, কারন সবার আশংকা ছিলো এই ৬ দফা আসলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ১ দফাই, তা হলো মুজিবের দীর্ঘকালের পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্র। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের কারিশমেটিক দিক এখানেই, তিনি জানতেন জনগণের সামনে এই ৬ দফা নিয়ে একবার দাঁড়াতে পারলে সকল বিরোধিতাকে প্রতিহত করতে পারবেন প্রলয়ঙ্করী গতিতে। এ প্রসঙ্গে কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করা প্রয়োজন।

 

পশ্চিম পাকিস্তানের জনপ্রিয় নেতা এবং তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো ৬ দফা নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে এক বির্তকের আহবান জানালেন ১৯৬৬ সালের ১৭ এপ্রিল পল্টন ময়দানে। মুজিবের ৬ দফা ভুট্টো কিভাবে দফারফা করে তা দেখতে হাজার হাজার জনতা এসে উপস্থিত হলো সেখানে। কিন্তু ভুট্টো সাহেব তার কথা রাখলেন না, জনগণের উপর বঙ্গবন্ধুর অসীম মেন্ডেট দেখে ধুরন্ধর ভুট্টো পালিয়ে গেলো।

পাকিস্তানের জান্তা সরকারের নিপীড়ন উৎপীড়নে এক সময় মৌলবাদীরাও মুখ খুলেছিলো। ৬ দফা আন্দোলনের সময়ে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ নেতাদের মুক্তির দাবী করেছিলো জামায়াতে ইসলামীও। যদিও তাদের নেতারা ৬ দফাকে বরাবরই ইসলাম ও পাকিস্তান বিরোধী এবং বঙ্গবন্ধুকে ইসলাম ও পাকিস্তানের শত্রু বলে সাব্যস্ত করে গেছে।

 

তবে এই ৬ দফা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সবচাইতে ভয়ের জায়গা ছিল আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটি। নিজের ঘরেই যদি দাবী পাশ না হয়, জনগণের মেন্ডেট নিয়ে ‘৬ দফা’ নামক কুঠারে পাকিস্তানের মূলে আঘাত করবেন কিভাবে? ১৯৬৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভা ডাকলেন ৩২ নম্বরে। উপস্থিত আওয়ামী লীগের সভাপতিসহ অনেক নেতাই ৬ দফা সমর্থনে রাজী ছিলেন না। ঠিক সেই মুহূর্তেই সকলে টের পায় ৬ দফার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থনে সভাকক্ষের বাইরে দলবল সমেত মহড়া দিচ্ছেন ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল আলম খান। সবার হাতেই চেলা কাঠ। ৬ দফা বিরোধী আওয়ামী লীগ নেতারা ভয়ে পালিয়ে গেলেন, বাকীরা যারা ছিলেন তারা ৬ দফার পক্ষে হাত তুলে সভায় পাশ করালেন। বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা প্রধান বিরোধী দল আওয়ামীলীগের অন্যতম কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হলো। এই ছিলো বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া ছাত্রলীগ, যারা তাঁর চলার পথ এভাবেই মসৃণ রাখতো ছায়ার মতো সঙ্গী হয়ে।

মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে বিপুল ভোটে সভাপতি নির্বাচিত হলেন, সাধারণ সম্পাদক হলেন দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত তাজউদ্দিন আহমদ। এবার আর তাকে আটকায় কে? আন্দোলন শুরু হল ৬ দফার। ৭ জুন হরতাল ডাকা হল, “৬ দফা কায়েম কর” এই শ্লোগানকে কেন্দ্র করে। ১৯৬৬ সালের ৭ জুন এ দেশের রাজনীতিতে ঐতিহাসিক যুগান্তকারী দিন। স্বাধীনতার বীজ বপন হয়েছিল এই দিনে। শেখ মুজিবসহ আওয়ামীলীগের অন্যান্য রাজবন্দীদের মুক্তির দাবীতে ৭ জুন হরতালে পুলিশের হামলায় ১০ জন এবং পরে আহত অবস্থায় হাসপাতালে ১ জনসহ মোট ১১ জন শ্রমিক ও সাধারন মানুষ নিহত হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে মনু মিয়া, সফিক, শামসুল হক, আবুল হোসেনসহ মাত্র ৪ জনের নাম জানা যায়।

 

১৯৬৭-৬৮ সালের দিকের ঘটনা। টগবগে যুবক কবি সৈয়দ শামসুল হক গেলেন ধানমণ্ডি ৩২ নাম্বারের পূর্ববাংলা তথা গোটা পাকিস্তানের সবচাইতে জনপ্রিয় নেতার সাথে দেখা করতে। হঠাৎ কথা প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন,
– “নেতা, ৬ দফা আপনি কেন দিলেন?”
বঙ্গবন্ধুর সোজাসাপ্টা উত্তর,
– “৬ দফা তো কাগজেকলমে। দফা তো আসলে ৩ টা!
কি নিলি? কি দিলি? কবে যাবি?”

অসম্ভব দূরদর্শী নেতৃত্বের অধিকারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান খুব ভাল করেই জানতেন ‘বাঙালির মুক্তির সনদ’ এই ৬ দফা পশ্চিমাদের গলার কাঁটা হয়ে থাকবে। না পারবে গিলতে, না পারবে ফেলতে। এই আন্দোলন ধাবিত করে ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০ এর নিরঙ্কুশ বিজয় এবং ৭১ এর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের দিকে। এদেশের নাগরিক হিসেবে এই গৌরবময় ইতিহাস আমাদের সকলের জানা কর্তব্য। যে ৬ দফা জানেনা, সে বঙ্গবন্ধুকেও জানেনা। আর বঙ্গবন্ধুকে না জানলে এই দেশের জন্মের ইতিহাস জানা অসম্ভব। বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। ঐতিহাসিক এই দিনে সকল শহীদদের আবারও স্মরণ করছি অবনত মস্তকে।

 

যা ছিলো ৬ দফায়ঃ-
১) প্রথম দফা : শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ও রাষ্ট্রের প্রকৃতি:
১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে সরকারের বৈশিষ্ট্য হবে ফেডারাল বা যুক্তরাষ্ট্রীয় ও সংসদীয় পদ্ধতির; তাতে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলো থেকে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক সভার নির্বাচন হবে প্রত্যক্ষ এবং সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে। প্রদেশ গুলোকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক সভার প্রতিনিধি নির্বাচন জনসংখ্যার ভিত্তিতে হবে।
২) দ্বিতীয় দফা : কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা:
কেন্দ্রীয় বা যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের দায়িত্ব থাকবে কেবল প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক বিষয়ে সীমাবদ্ধ। অবশিষ্ঠ সকল বিষয়ে অঙ্গরাজ্যগুলোর পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে।
৩) তৃতীয় দফা : মুদ্রা ও অর্থ বিষয়ক ক্ষমতা:
পুর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য দু’টি পৃথক মুদ্রা-ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যা পারস্পরিকভাবে কিংবা অবাধে উভয় অঞ্চলে বিনিময়যোগ্য। এ ক্ষেত্রে দুই অঞ্চলে স্বতন্ত্র বা পৃথক পৃথক ষ্টেট ব্যাংক থাকবে এবং মুদ্রার পরিচালনা ক্ষমতা থাকবে আঞ্চলিক সরকারের হাতে। অথবা, এর বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে একটি মুদ্রা-ব্যবস্থা চালু থাকতে পারে এই শর্তে যে, একটি কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যার অধীনে দুই অঞ্চলে দুটি রিজার্ভ ব্যাংক থাকবে। তাতে এমন বিধান থাকতে হবে যেন এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে সম্পদ হস্তান্তর কিংবা মূলধন পাচার হতে না পারে। বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্থান থেকে পশ্চিম পাকিস্থানে মূলধন পাচার বন্ধ করার জন্য সংবিধানে কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে।
৪) চতুর্থ দফা : রাজস্ব কর ও শুল্ক বিষয়ক ক্ষমতা:
সকল প্রকার রাজস্ব ধার্য ও আদায়ের ক্ষমতা থাকবে অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে। কেন্দ্রীয় তথা প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক বিষয়ের ব্যয় নির্বাহের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রয়োজনীয় রাজস্বের যোগান আঞ্চলিক তহবিল হতে সরবরাহ করা হবে। সংবিধানে নির্দেশিত বিধানের বলে রাজস্বের এই নির্ধারিত অংশ স্বাভাবিকভাবেই ফেডারেল তহবিলে জমা হয়ে যাবে। এহেন সাংবিধানিক বিধানে এমন নিশ্চয়তা থাকবে যে, কেন্দ্রীয় সরকারের রাজস্বের প্রয়োজন মেটানোর ব্যাপারটি এমন একটি লক্ষ্যের সাথে সংগতিপূর্ণ হতে হবে যেন রাজস্বনীতির উপর নিয়ন্ত্রন ক্ষমতাটা নিশ্চিতভাবে প্রাদেশিক সরকারের হাতে থাকে।
৫) পঞ্চম দফা : বৈদেশিক বাণিজ্য বিষয়ক ক্ষমতা:
পঞ্চম দফায় বৈদেশিক বাণিজ্য বিষয়ে নিম্নরূপ সাংবিধানিক বিধানের সুপারিশ করা হয়:
(ক) ফেডারেশনভুক্ত প্রত্যেকটি অঙ্গরাজ্যের বহির্বাণিজ্যের পৃথক পৃথক হিসাব রক্ষা করতে হবে।
(খ) বহির্বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা অঙ্গরাজ্যগুলোর এখতিয়ারে থাকবে এবং অঙ্গরাজ্যের প্রয়োজনে অঙ্গরাজ্য কর্তৃক ব্যবহৃত হবে।
(গ) কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা সমান হারে অথবা সর্বসম্মত নির্দিষ্ট হারে অঙ্গরাজ্যগুলোই মিটাবে।
(ঘ) অঙ্গরাজ্যের মধ্যে দেশজ দ্রব্য চলাচলের ক্ষেত্রে শুল্ক বা কর সদৃশ কোন বাধা থাকবে না।
(ঙ) সংবিধানে অঙ্গরাজ্যগুলোকে বিদেশে নিজ নিজ বাণিজ্য প্রতিনিধি দল প্রেরণের এবং স্ব স্ব স্বার্থে বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা দিতে হবে।
৬) ষষ্ঠ দফা : আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা:
(ক) আঞ্চলিক সংহতি ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার জন্য সংবিধানে অঙ্গরাজ্যগুলোকে স্বীয় কর্তৃত্বাধীনে আধা-সামরিক বাহিনী বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা দিতে হবে।
(খ) কেন্দ্রীয় সরকারের সকল শাখায় বা চাকরি ক্ষেত্রে প্রতিটি ইউনিট থেকে জনসংখ্যার ভিত্তিতে জনবল নিয়োগ করতে হবে।
(গ) নৌ-বাহিনীর সদর দপ্তর করাচি থেকে চট্টগ্রামে স্থানান্তর করতে হবে।

 

লেখক- হামজা রহমান অন্তর, কলামিস্ট ও ছাত্রনেতা। 


এ বিভাগের আরও সংবাদ