শনিবার, ১৯ জুন ২০২১, ০২:১৫ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ সংবাদ

গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বাঙালি জাতি রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটান বঙ্গবন্ধু

ইবার্তা সম্পাদনা পর্ষদ
আপডেট : বুধবার, ৯ জুন, ২০২১

পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তান মিলে অখণ্ড পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর, ১৯৭০ সালের আগ পর্যন্ত দীর্ঘ ২৩ বছরেও কোনো জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। খুবই আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো, ইংরেজদের করে যাওয়া ভারতশাসন আইনেই ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত পরিচালিত হয়েছে পাকিস্তান রাষ্ট্র। এমনকি, স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা জেঁকে বসায় দেশ প্রতিষ্ঠার দুই যুগ পরেও একটি শাসনতন্ত্র পর্যন্ত প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি। পুরোটা সময় সামরিক জান্তাদের অধীনেই ছিল এই রাষ্ট্র। শুরুতেই তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জাতিকে দাবিয়ে রাখার জন্য সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক শোষণ শুরু করে। যে কারণে শুরু হয় ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।

এই নির্বাচনে, বাংলার সাত কোটি মানুষ তাদের ‘অধিকার প্রয়োগের অধিকার’ অর্জনের জন্য নৌকা মার্কায় ব্যালট বিপ্লব ঘটায়। জাতীয় পরিষদে মোট ১৬৭ আসন জিতে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে আওয়ামী লীগ। প্রাদেশিক নির্বাচনেও ২৮৮ আসন লাভ করে দলটি। দীর্ঘ দুই যুগ ধরে, বহুমুখী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে জাতিকে অধিকার আদায়ের জন্য প্রস্তুত করে তুলে, নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

অভ্যন্তরীণভাবে আরও অনেক আগে থেকেই তিনি বাঙালি জাতির একক নেতা হিসেবে জায়গা করে নিলেও এই নির্বাচনের বিজয় পুরো বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। নির্বাচনের আগে তিনি জনগণের কাছে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার অন্যতম হলো—ছয় দফা ভিত্তিক শাসনতন্ত্র প্রণয়ন ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সামাজিক বিপ্লব। তাই নির্বাচনে জেতার পর, তিনি প্রথমেই রাষ্ট্রকে গণতন্ত্রায়ণের পথে ধাবিত করার উদ্যোগ নেন।

কিন্তু পাকিস্তানি স্বৈরাচারেরা গণতান্ত্রিক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে রাতের আঁধারে শুরু করল হত্যাযজ্ঞ। ফলে নির্বাচনে বিজয়ী সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে স্বাধীনতার ঘোষণা করেন বঙ্গবন্ধু। এরপর দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধের পর অর্জিত হয় মহান স্বাধীনতা। হানাদারমুক্ত বাংলাদেশে এক বছরের মধ্যেই একটি শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করেন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা ও জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। আর সেই সংবিধানের চারটি স্তম্ভের প্রধানতম একটি মূলনীতি হিসেবে ঠিক করা হয়—গণতন্ত্র।

 

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের পথপরিক্রমা

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের বিকাশ ঘটে যাদের মাধ্যমে, তাদের অন্যতম একজন হলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। যাকে বলা হয় গণতন্ত্রের মানসপুত্র। ১৯৩৮ সালে কিশোর মুজিব তখন গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলের ছাত্র, সেসময় স্কুল পরিদর্শনে যান তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী (প্রধানমন্ত্রী) শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। এসময় তাদের কাছে স্কুলের সমস্যার কথা বলেন কিশোর মুজিব। তখনই তার নাম-ঠিকানা লিখে নেন সোহরাওয়ার্দী। এরপর মেট্রিক পাস করে সোহরাওয়ার্দীর পরামর্শে কলকাতায় ভর্তি হন এবং সক্রিয়ভাবে রাজনীতি শুরু করেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৯ সালে জেলে থাকা অবস্থাতেও আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হয় তাকে। পরে ১৯৫৩ সালের ৯ জুলাই আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন শেষে দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

নির্বাচনের মাধ্যমে দলের দ্বিতীয় শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান তার বক্তব্যে বলেন, ‘১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ গঠন হলেও আজ পর্যন্ত কোনো কাউন্সিল সভা হতে পারে নাই। আমি সমস্ত জেলা ও মহকুমা আওয়ামী লীগকে নির্দেশ দিলাম তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন শেষ করতে হবে। তারপর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ কাউন্সিল সংগঠনের কর্মকর্তা নির্বাচন করবে এবং গঠনতন্ত্র ও ম্যানিফেস্টো গ্রহণ করবে।’

গণতন্ত্র চর্চার ব্রত নিয়ে গড়ে উঠা এই দলের নেতৃত্বেই ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয় হয়। এরপর ১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগে যে কাউন্সিল হয়, সেখানে সবার মতামত নিয়েই দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শেখ মুজিব দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি প্রত্যাহারের প্রস্তাব পেশ করলে আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। কাউন্সিল অধিবেশনে তিনি পুনরায় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় কাগমারিতে। একই বছর দলে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, একই ব্যক্তি একসঙ্গে সরকার ও সংগঠনের দুটো পদে থাকতে পারবেন না। এরপর শেখ মুজিব দলকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। অর্থাৎ সংগঠনকে সুসংগঠিত করার উদ্দেশ্যে দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নেন।

উল্লেখ্য যে, ১৯৫৩ সাল থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত প্রতিবারই সরাসরি ভোটের মাধ্যমে দলের সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৪ পর্যন্ত নিয়মিত নির্বাচনের মাধ্যমে দলের সভাপতি হয়েছেন বঙ্গবন্ধু। এমনকি দল তথা পুরো জাতির মহীরূহে পরিণত হওয়ার পরেও তিনি কখনোই গণতান্ত্রিক চর্চা থেকে বিচ্যুত হননি। তার হাত ধরেই বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। তারপরও তিনি শাসনতন্ত্র প্রণয়ন শেষ করেই ১৯৭৩ সালে জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করেন। তিনি সবসময় মনে করতেন, জনগণই শক্তির উৎস।

 

পাকিস্তানি জান্তাদের নিপীড়ন ও বাঙালির গণতান্ত্রিক আন্দোলন

১৯৭১ সালে, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত পশ্চিম পাকিস্তানের শোষকগোষ্ঠী অগণতান্ত্রিক শাসন ও অন্যায় আধিপত্য চালায়। এসবের বিরুদ্ধে একটানা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালির সুপ্ত জাতিসত্তার বিকাশ ঘটে। সময়ের বিভিন্ন ধাপে পাকিস্তানিদের স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের বিপরীতে আওয়ামী লীগকে একটি গণতান্ত্রিক দল হিসেবে গড়ে তোলেন শেখ মুজিব। তাই এই দল ক্রমান্বয়ে সাধারণ মানুষের হৃদয় জয় করে এবং জনতার অধিকার আদায়ের প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়।

পাকিস্তানিদের স্বৈরতান্ত্রিকতার বিষয়ে বঙ্গবন্ধু পরবর্তীতে তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘পাকিস্তানে যে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু হয়ে গেছে, তাতেই আমাদের ভয় হলো। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে গুলি করে হত্যা করা যে কত বড় জঘন্য কাজ, তা ভাষায় প্রকাশ করা কষ্টকর। আমরা যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি, তারা এই সমস্ত জঘন্য কাজকে ঘৃণা করি।’

এমনকি আওয়ামী লীগের হাত ধরে বাংলার মানুষের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার অভিমুখ বদলে দেওয়ার ষড়যন্ত্রও করেছে পাকিস্তানি জান্তা এবং তাদের দোসররা। তবে বাংলার মানুষকে তারা আর সাম্প্রদায়িকতার দিকে ধাবিত করতে পারেনি। উল্টো ধর্মকে ব্যবহার করার চেষ্টায় মত্ত দলগুলোই বিলীন হয়ে গেছে। মানুষ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পেতে আস্থা রেখেছে নিয়মিত গণতন্ত্রের চর্চার মাধ্যমে গড়ে ওঠা দল আওয়ামী লীগের প্রতি। কুচক্রীদের নানাবিধ অপচেষ্টার বিষয়ে বঙ্গবন্ধু তার আত্মজীবনীতে আরও লিখেছেন, ‘পাকিস্তান হবে (হতে পারতো অর্থে) একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এখানে প্রত্যেক ধর্মাবলম্বী বা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষের সমান নাগরিক অধিকার থাকবে (থাকতে পারতো অর্থে)। দুঃখের বিষয়, পাকিস্তান আন্দোলনের যারা বিরুদ্ধাচরণ করেছিল, এখন পাকিস্তানকে ইসলামিক রাষ্ট্র করার ধুয়া তুলে রাজনীতিকে তারাই বিষাক্ত করে তুলেছে। মুসলিম লীগ নেতারাও কোনোরকম অর্থনৈতিক ও সমাজনৈতিক প্রোগ্রাম না দিয়ে একসঙ্গে যে স্লোগান দিয়ে ব্যস্ত রইল- তা হল ইসলাম।’

এদিকে, কোটি কোটি বাঙালির মধ্যে জাগরণের প্রাণ সঞ্চারণা বুঝতে পেরে একটা পর্যায়ে এসে আঁতকে উঠে পাকিস্তানিরা। পথে-প্রান্তরে ছয় দফা’র ব্যাপক প্রচারণা ও মানুষের সাড়া দেখে বারবার গ্রেফতার করে জান্তারা। একপর্যায়ে তাকে কারাগারে আটকে রাখা হয়। এমনকি সেই অবস্থাতেই তার নামে আরেও একটি রাষ্ট্রদ্রোহ (আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা) মামলা দেওয়া হয়। শেখ মুজিবকে ফাঁসি দিয়ে বাঙালির আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে চেয়েছিল তারা। কিন্তু বাধ সাধে আপামর জনতা। জনগণের তীব্র আন্দোলনের মুখে অবশেষে শেখ মুজিবকে ছাড়তে বাধ্য হয় পাকিস্তান। জেল থেকে বের হয়ে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে উপস্থিত হন তিনি। এসময় লাখো জনতার উপস্থিতিতে তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। জাতির সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে প্রত্যেক জনগণের মানবিক জীবন নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। এরপর তার দুর্বার নেতৃত্বে স্বৈরাচার আইয়ুব খানের পতন ঘটে। এসময় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সরকার গঠন ও শানসতন্ত্র প্রণয়নের জন্য নির্বাচনের দাবি জানান তিনি।

এই সময়ের একপর্যায়ে ব্রিটেন সফর করেন বঙ্গবন্ধু। সেসময় বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গণতন্ত্রের ব্যাপারে স্পষ্টভাবে তিনি বলেন, ‘কোনো ব্যক্তির ক্ষমতা নাই শাসনতন্ত্র দেওয়ার। জনসাধারণের প্রতিনিধিরই এই ক্ষমতা রয়েছে, তারাই শাসনতন্ত্র দিতে পারে। জনসাধারণের ইলেকশন হওয়ার পরে, যদি অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন হয়, জনসাধারণের প্রতিনিধিরাই একটা শাসনতন্ত্র তৈরি করতে পারে এবং সেই শাসনতন্ত্র জনগণ গ্রহণ করবে। আমি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। মেজরিটির অপিনিয়ন যেটা হবে সেটা মেনে নিতে রাজি আছি। আমার কোনো ব্যক্তিগত ক্ষমতা নাই। আমি কাকে রিপ্রেজেন্ট করি? আমি তো নিজেকে লিডার বলতে পারি না, যে পর্যন্ত না আই হ্যাভ লিগ্যাল অ্যান্ড মরাল রাইট টু সে: আই অ্যাম রিপ্রেজেন্টেটিভ অব দ্যা পিপল।’

 

স্বাধীনতার সুফল নিশ্চিত করতে প্রকৃত গণতন্ত্রের অন্বেষণ

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতার পর, প্রথমেই একটি শাসনতন্ত্র প্রণয়নে গুরুত্ব দেন বঙ্গবন্ধু। ফলে স্বাধীনতার এক বছর পূর্তির আগেই, বাংলাদেশের সংবিধান রচনা করা হয়। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদের অধিবেশনে এই সংবিধান গৃহীত হওয়ার সময় বঙ্গবন্ধু একটি ভাষণ দেন, যেখানে তার রাষ্ট্রচিন্তা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। এই ভাষণে বঙ্গবন্ধু ‘গণতন্ত্র’, ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, যা প্রচলিত ধারণার থেকে কিছুটা আলাদা। গণতন্ত্র সম্পর্কে এসময় বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। সেই গণতন্ত্র, যা সাধারণ মানুষের কল্যাণ সাধন করে থাকে। মানুষের একটা ধারণা আছে এবং আগেও আমরা দেখেছি যে, গণতন্ত্র যেসব দেশে চলেছে, দেখা যায় সেসব দেশে গণতন্ত্র পুঁজিপতিদের প্রটেকশন দেওয়ার জন্য কাজ করে এবং শোষকদের রক্ষা করার জন্যই গণতন্ত্রের ব্যবহার হয়। সেই গণতন্ত্রে আমরা বিশ্বাস করি না। আমরা চাই, শোষিতের গণতন্ত্র। ’ এই শোষিতের গণতন্ত্র প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেছেন, ‘এর ফলে এ দেশের দুঃখী মানুষরা রক্ষা পাবে, শোষকদের রক্ষার ব্যবস্থা নাই এখানে।’

নির্বাচনের উপর গুরুত্বারোপ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন, ‘জনগণের মতামতের উপর আমরা বিশ্বাস করি। জনগণ যাদের নির্বাচিত করবে, তারাই সরকার চালাবে। শক্তির উৎস হল জনগণ।’

স্বাধীনতার পর, ১৯৭২ সালের ৭ ও ৮ এপ্রিল, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দুই দিনব্যাপী কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। অধিবেশনের উদ্বোধনী বক্তব্যে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘সরকারি কর্মচারীরা যদি জনস্বার্থের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে না পারেন, তাহলে প্রয়োজনবোধে খোল-নলচে সবই বদল করা হবে।’ গণতন্ত্র শুধু নামে নয়, বরং উপনিবেশিক আচরণ পরিবর্তন এবং সমাজের মধ্যে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সোচ্চার ছিলেন তিনি।

এর আগে, ১ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন দফতর, বিভাগ ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোর প্রধানদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেওয়ার সময় বলেন, ‘স্বাধীনতা সংগ্রামের ৯ মাসে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর হাতে এই দেশের লাখো জনতা অকথ্য নির্যাতনের শিকার হয়েছে। জনগণের আত্মত্যাগের কোনো তুলনা নেই। বর্বরদের নির্যাতন থেকে এদেশে একটি পরিবারও রেহাই পায়নি। বাংলাদেশের আদর্শকে রক্ষা করার জন্য জনগণ সর্বস্ব ত্যাগ করেছে, প্রাণ দিয়েছে। এতকিছুর পর অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতা। এই স্বাধীন জাতির প্রতি সরকারি কর্মচারীদের রয়েছে এক নতুন দায়িত্ব। সরকারি কর্মচারীদের অবশ্যই এই দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। অতীতের আমলাতান্ত্রিক মনোভাব পরিবর্তন করতে হবে।’

এমনকি ১৯৭৫ সালের এক বক্তব্যে বাংলার দুঃখী মানুষের প্রতি সদয় আচরণ করার আহ্বান জানিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘মনে রেখো, এটা ব্রিটিশ কলোনি নয়, পাকিস্তানি কলোনি নয়।’

 

তবে, তার হাত দিয়ে প্রতিষ্ঠিত বাকশাল নিয়ে অনেক অপপ্রচার চালানো হয়েছে বিভিন্ন সময়। কিন্তু এটি ছিল মূলত দ্বিতীয় বিপ্লব। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে শূন্য হাতে গড়ে তোলার জন্য সাড়ে তিন বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু আন্তর্জাতিক চক্র ও তাদের দেশীয় দোসরদের অব্যাহত ষড়যন্ত্রের কারণ বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছেন। তাই ১৯৭৫ সালে নিয়মতান্ত্রিকভাবে, জাতীয় সংসদ কর্তৃক সর্বসম্মত অনুমোদনের পর, বঙ্গবন্ধু সংবিধান সংশোধন করেন এবং সরকার ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনেন। এরপর দেশের স্বীকৃত রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে একটি জাতীয় দল তথা ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ বা বাকশাল গঠন করেন এবং এই দলে যোগদানের জন্য দেশের সব নাগরিকের প্রতি আহ্বান জানান।

দেশের নৈরাজ্যময় পরিস্থিতি উত্তরণের জন্য এই ব্যবস্থার মাধ্যমে তিনি সব দল-মতকে একসঙ্গে আনতে চেয়েছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি যে প্রশাসনিক ও সামাজিক সংস্কারের ছক এঁকেছিলেন, সেখানেও গণতন্ত্রের ছাপ রেখেছেন। জেলায় জেলায় নির্বাচিত প্রতিনিধিসহ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের গভর্নরের দায়িত্ব দিয়ে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করার পদক্ষেপ নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি চেয়েছিলেন গণতন্ত্রের বিকেন্দ্রীকরণ ও গণপ্রশাসন। এজন্য প্রতিটি গভর্নর কাউন্সিলে প্রশাসনসহ সবশ্রেণি-পেশার মানুষকে রেখেছিলেন।

আমৃত্যু দেশের মানুষ ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই কাজ করে গেছেন বাঙালি জাতির মহান পুরুষ শেখ মুজিবুর রহমান। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আন্দোলন সংগ্রাম পরিচালনার মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছেন তিনি, এটি বিশ্বের ইতিহাসে একটি বিস্ময়কর ঘটনা। এরপর, মানুষের ঘরে ঘরে স্বাধীনতার সুফল পৌঁছে দিতে শোষিতের গণতন্ত্র তথা দুঃখী মানুষের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য উদ্যোগ নিয়েছেন, যা ছিল একটি দুঃসাহসী ও যুগান্তকারী উদ্যোগ।


এ বিভাগের আরও সংবাদ