1. অন্যরকম
  2. অপরাধ বার্তা
  3. অভিমত
  4. আন্তর্জাতিক সংবাদ
  5. ইতিহাস
  6. এডিটরস' পিক
  7. খেলাধুলা
  8. জাতীয় সংবাদ
  9. টেকসই উন্নয়ন
  10. তথ্য প্রযুক্তি
  11. নির্বাচন বার্তা
  12. প্রতিবেদন
  13. প্রবাস বার্তা
  14. ফিচার
  15. বাণিজ্য ও অর্থনীতি

কোটি টাকার ‘বংশ মর্যাদাপূর্ণ’ গরু বিক্রির নেপথ্যে!

নিউজ এডিটর : ইবার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকম
বৃহস্পতিবার, ৬ জুন, ২০২৪

কোরবানির বাজারে রাজধানীর সাদিক এগ্রো লিমিটেড থেকে তিনটি গরু ২ কোটি ৬০ লাখ টাকায় কিনেছেন ঢাকার এক ক্রেতা। ফেসবুক আর ইউটিউবে ‘বংশ মর্যাদাপূর্ণ’ কোটি টাকার সেই গরু নিয়ে আলোচনার রেশ এখনও কাটেনি। এরই মধ্যে সাদিক এগ্রো কোরবানির বাজারে এক কোটি টাকার আরও একটি গরু তুললেও তা প্রচারে ছিল না। অবশেষে গত সোমবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাহমা জাতের তিনটি গরুই বিক্রি হয়ে গেছে বলে জানা যায়। এক কোটি টাকায় বিক্রি হওয়া বিশেষ গরুটি এখন পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে দামি গরু।

গরুটি দেড় কোটি টাকা চাওয়া হলেও বিক্রি হয়েছে এক কোটি টাকায়। এ নিয়ে এখন আলোচনা হচ্ছে সর্বমহলেই। এক কোটি টাকার গরুটির ওজন ১৪০০ কেজি বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু গরুর দাম কোটি টাকা কেন?

জানতে চাইলে সাদিক এগ্রো লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ইমরান হোসেন বলেন, এই জাতের গরুর মাংস খেলে কোলেস্টেরল কম হবে। মাংসগুলো খুবই উন্নত মানের। এই গরুটা বংশ মর্যাদাপূর্ণ গরু। এর জন্য দাম বেশি। গরুটির গায়ে থাকা রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিয়ে গুগলে সার্চ দিলে তার ১১০ বছরের ইতিহাস চলে আসবে। বাংলাদেশেও যে দামি গরুর ক্রেতা আছে তা কোটি টাকার গরু বিক্রির মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে।

গরুর পাশাপাশি সাদিক এগ্রো এবার ১৮০ কেজি ওজনের একটি ছাগল বিক্রি করেছে ১৫ লাখ টাকায়। পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি উচ্চতার খাসিটি নিয়ে হইচই পড়ে যায়। রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকার এক ক্রেতা কিনে নিয়েছেন ধূসর বাদামি রঙের পশুটি। এটিই বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় খাসি বলে প্রতিষ্ঠানটির দাবি।

তবে পশুগুলোর এমন অযৌক্তিক ও অতিরিক্ত দাম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন নাগরিকরা। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন ক্রেতাদের আয়ের উৎস নিয়েও। সাদিক এগ্রোর ইমরান হোসেনের দাবি করা ‘রেজিস্ট্রেশন নম্বর গুগলে সার্চ দিলে ১১০ বছরের ইতিহাস’ সংক্রান্ত তথ্য আসলে পাওয়া যায়না। এই দাবিটিও যাচাই করে মিথ্যা প্রমাণ পেয়েছে এই প্রতিবেদক। এর মধ্যে আবার আলোচনায় এসেছে ব্রাহমা জাতের এসব গরু দেশে আনতে সাদিক এগ্রো লিমিটেডের জালিয়াতির ‘পুরনো’ সংবাদ।

অবৈধভাবে ব্রাহমা আমদানি 

জানা যায়, ২০২১ সালে করোনা মহামারীর মধ্যে কোনো ধরনের আইন না মেনেই নিষিদ্ধ ‘ব্রাহমা’ জাতের গরু আমদানি করেছে সাদিক এগ্রো লিমিটেড। ‘লাইভ ক্যাটেল’ ঘোষণা দিয়ে ৫ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা হয় ১৮টি ব্রাহমা জাতের গরু। এসব গরু আমদানির প্রতিটি ক্ষেত্রেই জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। গরু ছাড়করণে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের জাল প্রত্যয়নপত্র দেয়া হয়েছে। রপ্তানিকারক দেশকে পাঠানো চিঠিও জাল। আইন অমান্য করে আমদানি করা এসব গরু রাষ্ট্রের অনুকূলে তখন বাজেয়াপ্ত করা হয়। জালিয়াতির আশ্রয় নেয়ায় প্রতিষ্ঠানটিকে দেয়া হয় অর্থদণ্ডও।

ঢাকা কাস্টম হাউস সূত্রমতে, ২০২১ সালের ৫ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা ব্রাহমা জাতের ১৮টি গরু জব্দ করে ঢাকা কাস্টম হাউস। টার্কিশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে ঢাকায় আসে গরুগুলো। বাংলাদেশে ব্রাহমা জাতের গরু আমদানির অনুমতি না থাকা এবং গরুর আমদানিকারককে খুঁজে না পাওয়ায় সেগুলো জব্দ করা হয়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জব্দ করা ১৩ মাস থেকে ৬০ মাস বয়সী এসব গরু আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার সাদিক এগ্রো লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি এসব গরু ছাড়াতে কোনো বিল অব এন্ট্রি দাখিল করেনি। আমদানি নিষিদ্ধ হওয়ায় এবং আমদানিকারককে খুঁজে না পাওয়ায় গরুগুলো সাময়িকভাবে সংরক্ষণের জন্য সাভারের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয় (১৭টি জীবিত, একটি মৃত)।

সূত্র আরও জানায়, বিল অব এন্ট্রিতে গরুর মূল্য ধরা হয় ৪০ হাজার ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। সাদিক এগ্রো ব্রাহমা গরু আমদানির জন্য প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে কোনো প্রত্যয়নপত্র নেয়নি। কোনো ধরনের বিল অব এন্ট্রি দাখিল ছাড়াই ২০২১ সালের ৭, ১১ ও ১৪ জুলাই প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে গরু ছাড়করণে ঢাকা কাস্টম হাউসে আবেদন করা হয়। ১৫ জুলাই আমদানি নীতি অনুসরণ করে বিল অব এন্ট্রিসহ সব কাগজপত্র দাখিল করতে প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ দেয় কাস্টমস হাউস। ২১ দিন পর ২৬ জুলাই কোয়ারেন্টাইন শর্ত ও ক্লিয়ারেন্স পারমিট (সিপি) ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটি বিল অব এন্ট্রি দাখিল করে। প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র দিয়ে গরুগুলো খালাস নিতে ২৯ জুলাই প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শ দেয় কাস্টমস হাউস। এর মধ্যে সাদিক এগ্রো গরুগুলো ছাড়াতে উচ্চ আদালতে রিট দাখিল করে। আদালত আইন অনুযায়ী বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে কাস্টমসকে নির্দেশ দেয়। তবে প্রোফর্মা ইনভয়েস, এলসি, ইনভয়েস ও প্যাকিং লিস্ট ছাড়া শুল্কায়ন ও খালাস করা সম্ভব নয় বলে কাস্টম হাউস প্রতিষ্ঠানটিকে জানিয়ে দেয়।

সূত্র জানায়, ২০২১ সালের ৮ আগস্ট প্রতিষ্ঠানটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে সিপি নিয়ে পণ্যচালানটি খালাস করতে আবারও আবেদন করে। ১০ আগস্ট প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করে কাস্টম হাউস। ৩১ আগস্ট শুনানিতে সাদিক এগ্রো কর্তৃপক্ষ ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা হাজির হন। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা শুনানিতে বলেন, প্রতিষ্ঠানটি কোনো আইন না মেনেই ব্রাহমা গরু আমদানি করেছে। প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, বিমানবন্দরের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কোয়ারেন্টাইন স্টেশন থেকে পশু আমদানির জন্য ‘ক্যাটেল ইমপোর্ট অথরাইজেশন’ পত্র দেয়া হয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে দিয়েছে। এই পত্র কোয়ারেন্টাইন স্টেশন ইস্যু করেনি। প্রতিষ্ঠানটি এক্ষেত্রে বড় জালিয়াতি করেছে।

প্রতিষ্ঠানটির সব যুক্তি আর দাখিল করা কাগজপত্র পর্যালোচনা করেন কাস্টম হাউস কমিশনার। যাতে প্রতিষ্ঠানটির সব ক্ষেত্রে আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পায়। আইন লঙ্ঘন করায় গরুগুলো রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত এবং প্রতিষ্ঠানটিকে ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের রায় দিয়ে ৯ সেপ্টেম্বর আদেশ জারি করেন কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান। ১৫ দিনের মধ্যে এই অর্থদণ্ড জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হলেও প্রতিষ্ঠানটি তা জমা দেয়নি। গরুগুলোর বিষয়ে কী ব্যবস্থা নিতে হবে- সে বিষয়ে নির্দেশনা চেয়ে ৫ অক্টোবর এনবিআরকে চিঠি দেয় কমিশনার।

এসবের পরেও গরুগুলো কীভাবে সাদিক এগ্রো ফিরে পেলো এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। এই সংক্রান্ত সংবাদটি চাপা পড়ে যায় দীর্ঘদিন। তবে কোরবানির হাট উপলক্ষ্যে আবারও আলোচনায় চলে আসে।

এ বিষয়ে ঢাকা কাস্টম হাউসের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সাদিক এগ্রো লিমিটেডের ১৮টি ব্রাহমা জাতের গরুর ক্ষেত্রে আগে থেকেই আমাদের কাছে তথ্য ছিল। সেজন্য আটক করা সম্ভব হয়েছে। আমরা ধারণা করছি, এর আগে হয়তো দু-একটি চালান মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি হতে পারে।’

আগে ব্রাহমা প্রজাতির গরু অবৈধভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করেছে এরকম অন্য একটি এগ্রো ফার্মের মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তিনি প্রতিটি গরুর পেছনে প্রায় ৫৮ হাজার টাকা খরচ করেছেন।

সূত্র জানায়, আটক হবার আগেও সাদিক এগ্রো পাঁচটি চালানে প্রায় ২০০টি ব্রাহমা প্রজাতির গরু আমদানি করেছে। তবে ফার্মটির মালিক এই অভিযোগ অস্বীকার করেন।

মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ এলাকায় প্রায় দুই একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত সাদিক এগ্রোতে বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় তিন হাজারেরও বেশি গরু আছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, খামারটির বেশ কিছু অংশ একটি খালকে দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে।

আমদানি নিষিদ্ধ কেন?

ব্রাহমার জাত আমাদের উপমহাদেশেরই জাত। ১১০ বছর আগে এই অঞ্চলের তিনটি গরু আমেরিকানরা নিয়ে গিয়ে ‘ব্রাহমা’ জাত তৈরি করেছে। দেশে যেসব পশু কুরবানি হয়, এক সময় এর একটা বড় অংশ আসতো ভারত থেকে। কিন্তু ২০১৪ সালে বাংলাদেশে গরু আসা বন্ধে সীমান্তে কড়াকড়ি করা হয়। যে কারণে এক পর্যায়ে দেশীয় পর্যায়ে গোশতের চাহিদা পূরণ নিয়ে সংশয় তৈরি হয়।

প্রাণীসম্পদ অধিদফতরের উপ পরিচালক ডা. সরকার বলেছেন, সে সময় দেশিয় মাংসের চাহিদা পূরণে সরকার ব্যাপকভাবে ব্রাহমা গরু উৎপাদনের দিকে যায়।

তিনি বলেন, ব্রাহমা জাতের গরু পালন খামারিদের জন্য সহজ ও লাভজনক হওয়ায় এবং রোগ-বালাই অন্যান্য জাতের গরুর চেয়ে কম হওয়ায় স্থানীয় খামারিদের কাছে এই গরু পালন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ২০১৬ সালে সরকারের কৃত্রিম প্রজনন নীতিমালার অধীনে বেসরকারিভাবে ও ব্যক্তি উদ্যোগে খামারিদের মাধ্যমে ব্রাহমা গরু আমদানি নিষিদ্ধ করে।

কারণ ব্যাখ্যা করে ডা. ভবতোষ কান্তি বলেন, এখন খামারিরা সরকারের কাছ থেকে সিমেন নিয়ে প্রজনন করছে। কিন্তু আমদানির অনুমতি পেলে খামারিরা ব্যাপক হারে এই গরু উৎপাদন করবে। কিন্তু এই জাতের গাভী তার আকৃতি অনুযায়ী দুধ দেয় না। এখন খামারিরা যদি ব্যাপক হারে ব্রাহমা উৎপাদন করে তাহলে দেশে গরুর দুধের উৎপাদন একেবারেই কমে যাবে। মূলত এ জন্যই বেসরকারি পর্যায়ে ব্রাহমা গরু আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

সরকারের আশঙ্কা ব্যাপক হারে ব্রাহমা গরু উৎপাদন হলে হোলস্টেইন জাতের বা ফ্রিজিয়ান জাতের গরুর উৎপাদনে আগ্রহ হারাবে খামারিরা। এই জাতের গরু দুধের উৎপাদনের জন্য খ্যাত। দেশে দুগ্ধ উৎপাদন খাতকে সুরক্ষা দেয়ার জন্যই মূলত নিষিদ্ধ করা হয়েছে ব্রাহমা জাতের গরুর আমদানি।


সর্বশেষ - জাতীয় সংবাদ