1. অন্যরকম
  2. অপরাধ বার্তা
  3. অভিমত
  4. আন্তর্জাতিক সংবাদ
  5. ইতিহাস
  6. এডিটরস' পিক
  7. খেলাধুলা
  8. জাতীয় সংবাদ
  9. টেকসই উন্নয়ন
  10. তথ্য প্রযুক্তি
  11. নির্বাচন বার্তা
  12. প্রতিবেদন
  13. প্রবাস বার্তা
  14. ফিচার
  15. বাণিজ্য ও অর্থনীতি

আওয়ামী লীগ: বাংলাদেশের ইতিহাসে অনন্য এক অধ্যায়

নিউজ এডিটর : ইবার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকম
রবিবার, ২৩ জুন, ২০২৪

২৩ জুন বাঙালির ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন। পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে পরাজিত করে বিজয়ীর বেশে মুর্শিদাবাদে প্রবেশ করে ব্রিটিশরা। বাঙালি হারায় তাদের স্বাধীনতা। প্রকৃত অর্থে বাঙালি কোনো দিনই স্বাধীন ছিল না। পরের ১৯০ বছর ব্রিটিশরা গোটা উপমহাদেশকে শোষণ-নিপীড়ন করেছে। বাংলা দখলের প্রথম তিন বছরে যে পরিমাণ সম্পদ ব্রিটিশরা আহরণ করে তা দিয়েই প্রথম শিল্পবিপ্লব ঘটানো হয়েছিল। এই সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১২ ট্রিলিয়র ডলারের সমপরিমাণ। আবার এই ২৩ জুনেই বাঙালির প্রথম রাষ্ট্র পাওয়ার সূচনা ঘটে। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার পর বাঙালির নিজস্ব রাষ্ট্র ও স্বাধীনতার পথ নিশ্চিত হয়।

ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে বিচ্ছিন্নভাবে বহু রাজা বাংলা অঞ্চল শাসন করেছেন। পাল ও সেন শাসনামলের কথা তো আমাদের জানাই। নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের ফলে বাঙালিকে ১৯০ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন মেনে নিতে হয়। ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটার পর তারা অখণ্ড ভারত উপমহাদেশকে দুটো স্বাধীন রাষ্ট্রে ভাগ করে যায়। ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটো স্বাধীন দেশ গড়ে তোলা হয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রে পূর্ব পাকিস্তান বলে পরিচিত অংশটিই আজকের বাংলাদেশ। পাকিস্তানের ৫৬ শতাংশ মানুষ এই পূর্ব পাকিস্তানে বাস করত। অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ পূর্ব পাকিস্তানেই বাস করত এবং তারা বাংলা ভাষায় কথা বলত। পাকিস্তান সৃষ্টির অব্যবহিত পরেই, বস্তুত পাকিস্তান সৃষ্টির আগেই আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু।’ তখন পূর্ব পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবীরা এই মন্তব্যের ব্যাপক সমালোচনা করেন। পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার আগমন উপলক্ষে বিশেষ সমাবর্তনের আয়োজন করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তো বটেই, অন্য আরেকটি জনসভায় তিনি দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।’ অথচ পাকিস্তানের ৫৬ শতাংশ মানুষই বাংলা ভাষায় কথা বলত। তখন বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ১৯৪৮ সালে ছাত্রাবস্থায় তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, বাঙালি প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতা পায়নি। পাকিস্তানের সবকিছুই পশ্চিম পাকিস্তানে করা হয়। যেমন- পাকিস্তানের প্রথম রাজধানী করাচি। পরবর্তীকালে রাজধানী স্থানান্তর করে রাওয়ালপিন্ডিতে নেওয়া হয়। আরও পরে ইসলামাবাদকে রাজধানী করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার পরও সবকিছু পশ্চিম পাকিস্তানকে ঘিরে করা হয়। পার্লামেন্টারি আসন ছেড়ে দিয়ে বাঙালিরা বিভিন্ন সময়ে উদারতা ও রাজনৈতিক সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন- ‘পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের নানাভাবে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করেও বাঙালির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয়নি।’ গ্রামীণ পঞ্চায়েত ব্যবস্থা থাকায় এ ধরনের অঞ্চলের মানুষেরা অতটা অসন্তুষ্ট ছিলেন না। সরকারও তাদের নিয়ে মাথা ঘামাত না। রাজস্ব ঠিকঠাক পেলেই সরকার তাতে খুশি ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো পাকিস্তানি শাসনামলে বাঙালির পরাধীনতা আরও প্রকট আকার ধারণ করেছিল।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ১৬ ডিসেম্বর কাঙ্ক্ষিত জয়ের মাধ্যমে বাঙালি স্বাধীনতা পায়। এর আগে তারা কখনই স্বাধীন হতে পারেনি। এই স্বাধীনতা অর্জনের নেপথ্যে থাকা মূল রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। আর আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব দিয়েছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ইতিহাসে ব্যাপৃত বঙ্গবন্ধু শুধু আমাদের জাতির পিতা এবং একটি স্বাধীন দেশের জন্মদাতাই নন, তিনি বিশ্ব ইতিহাসের উজ্জ্বল অধ্যায়। পঞ্চান্ন বছরের জীবনে তিনি জেলে কাটিয়েছেন প্রায় ১৩ বছর। তার পুরো জীবনই লড়াই আর সংগ্রামের। শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী শেখ মুজিবুর রহমান কীভাবে বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠলেন- এ ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। বাঙালির ইতিহাসে পুরো অধ্যায়জুড়ে এবং বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের ইতিহাসেও তিনি অনন্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্বাপর গণতান্ত্রিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসে সব অধ্যায়ে তিনি উজ্জ্বল-ভাস্বর। দেশভাগের পরই বঙ্গবন্ধু তার এক ভাষণে বলেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তান মূলত পশ্চিম পাকিস্তানিদের জন্য একটি উপনিবেশ মাত্র। অথচ ওই সময় পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল বেশি। জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় মাথাপিছু আয়ের হিসাবে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আমাদের মাথাপিছু আয় সামান্য কম ছিল। ২৩ বছর পর পশ্চিম পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় ৭০ শতাংশ বেড়ে যায়। বৈষম্যের বিষয় ভালোভাবেই বুঝেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি তখন যুবক। কলকাতায় কিছুদিন রাজনীতি করেছেন। লেখাপড়াও করেছেন। পূর্ব পাকিস্তানে ফেরার পর তিনি প্রথম উপলব্ধি করলেন, পূর্ব পাকিস্তানকে এক ধরনের উপনিবেশ বানিয়ে রেখেছে পশ্চিম পাকিস্তানিরা। এ ভাবনা থেকেই তিনি সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়াতে চেয়েছিলেন। ১৯৪৮ সালে নিজ উদ্যোগে পূর্ব বাংলা মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন করেন। পূর্ব বাংলা মুসলিম ছাত্রলীগই সর্বপ্রথম রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে আন্দোলন শুরু করে। ওই বছরই বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তারা একটি ধর্মঘট করে। ধর্মঘটে পিকেটিং করার সময় বঙ্গবন্ধুসহ তার কয়েকজন সহকর্মী গ্রেপ্তার হন।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির সময় পূর্ব পাকিস্তানের জিডিপি পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বেশি ছিল। ১৯৬৯-৭০ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের জিডিপি পূর্ব পাকিস্তানের জিডিপির তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ বেশি ছিল। এমনকি পশ্চিম পাকিস্তানের মাথাপিছু আয়ও পূর্ব পাকিস্তানের তুলনায় ৭০ শতাংশ বেশি ছিল। আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় পাকিস্তান থেকে ৪৫ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টি না হলে এমনটি কোনোদিনই সম্ভব হতো না। বঙ্গবন্ধু আমাদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র দিয়েছেন। আর তাঁর এই বিশাল কর্মযজ্ঞে সহযোগী শক্তি হিসেবে কাজ করেছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ এখন শুধু উপমহাদেশই নয়, বিশ্বের সবচেয়ে প্রবীণ রাজনৈতিক দলগুলোর একটি। আওয়ামী লীগ, সাধারণ মানুষ ও ছাত্রসমাজের নেতৃত্বে বায়ান্নতে হয় ভাষা আন্দোলন। বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে আইনগত স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট বিপুল ভোটে জয়ী হয়। মুসলিম লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রাখতে পারেনি। মাত্র ৭-৮ বছরের ব্যবধানে একটি নতুন রাজনৈতিক দল দেশের মানুষের ভালোবাসা অর্জন করতে সক্ষম হয়। পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন, তৎকালীন সমাজের নিরিখেই তাকে আওয়ামী মুসলিম লীগ নামকরণ করতে হয়েছিল। পরে দলটির নামকরণ করা হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। প্রতিষ্ঠার লগ্ন থেকেই আওয়ামী লীগ পূর্ব বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ে একের পর এক সংগ্রাম করে যেতে থাকে।

স্বাধীনতার পরও বঙ্গবন্ধুর সহায়ক শক্তি ছিল এই আওয়ামী লীগ। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর বাঙালি নিজের সংবিধান পেয়েছিল। পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান তৈরি হয় ১৯৫৬ সালে। স্বাধীনতার পর তাদের প্রায় নয় বছর লেগেছে সংবিধান রচনার জন্য। অথচ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরবর্তী দশ মাসে বাঙালি নিজের সংবিধান উপহার পায়। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে বাঙালির জন্য প্রথম সংবিধান উপস্থাপন করেন বঙ্গবন্ধু। তিনি দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, এটিই বাঙালির প্রথম সংবিধান। এই সংবিধানে উল্লেখ রয়েছে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ক্ষমতার উৎস থাকবে জনগণের হাতে। বঙ্গবন্ধু বাঙালির রাষ্ট্রটিকে গড়ে তুলছিলেন। তার সকল কর্মকাণ্ডে ও কৌশলে আওয়ামী লীগ নেতাদের ছিল স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। তাই আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অনন্য অধ্যায় অবশ্যই।

টানা চতুর্থবারসহ পঞ্চমবারের মতো আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা-দূরদর্শিতায় বাংলাদেশ আজ বিশ্বে উন্নয়নের এক বিস্ময়। অবকাঠামোগত উন্নয়নে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে গেছে। পদ্মা সেতুর মতো মেগা প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চ্যালেঞ্জ জয়ী হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের সক্ষমতারও জানান দিয়েছেন। যোগাযোগে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। কর্ণফুলী টানেলসহ দৃষ্টান্তযোগ্য এমন কত কিছুই তো আজ দৃশ্যমান। দেশের এই অভূতপূর্ব উন্নয়ন যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই আমরা আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছে যাব- এই প্রত্যাশাও অমূলক নয়। বাংলাদেশ উন্নত রাষ্ট্রের মর্যাদায় অভিষিক্ত হবে- এটি এখন আর শুধু স্বপ্ন নয়, এর পক্ষে আজ অনেক অনুষঙ্গই দৃশ্যমান। এর মধ্য দিয়েই বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্ন পূর্ণতা পাবে। জীবনযাপনের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের চর্চা করলে নিজেদেরই শানিত করা যাবে, প্রজন্মের মধ্যে এই বোধ পুষ্ট হোক।

লেখক: অনুপম সেন – সমাজবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ


সর্বশেষ - অভিমত