বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২০, ০৪:৫৯ পূর্বাহ্ন

গাছ বলদের ভ্রান্তিবিলাস – শেখ মহিউদ্দিনের ভুয়া ডিগ্রী, মিথ্যাচার ও প্রতারণা

বিশেষ প্রতিবেদক
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২০

ভণ্ড ও দেশদ্রোহীদের মুখোশ উন্মোচনে আমাদের ধারাবাহিক আয়োজন – গাছ বলদের ভ্রান্তিবিলাস। আজ প্রকাশিত হচ্ছে প্রথম পর্ব: শেখ মহিউদ্দিনের ভুয়া ডিগ্রী, মিথ্যাচার ও প্রতারণা

সাংবাদিকতা আয়ত্ত করতে না পারলেও তিনি সাংবাদিক। সম্বল শেখ নিউজ ডট কম। নিজের নাম ব্যবহার করে যিনি নিউজ পোর্টালের নামকরণ করেন, তার বুদ্ধিবৃত্তিক উচ্চতা কতটুকু তা সহজেই অনুমেয়। সুদানের রুগ্ন পশুর ছবি দিয়ে বাংলাদেশের চিড়িয়াখানার অভুক্ত পশু হিসেবে দাবি করার মতো বস্তুনিষ্ঠতা যার, তার প্রকাশনা কমিক রচনার চেয়ে কম হাস্যকর হবে না – এটাই স্বাভাবিক।
স্কুলের গণ্ডি পার হয়ে কলেজে যাওয়ার সুযোগ হয় নি, কিন্তু নিজেকে দাবি করেন আইনজীবী, রাজনীতিক ও সাংবাদিক হিসেবে। ইংরেজি জ্ঞান কোন স্তরের সেটা বিনোদনের পর্যায়ে পড়ে। মন খুলে হাসতে চাইলে ঘুরে আসুন: https://twitter.com/lpbpresident

যার কথা বলছি তিনি শেখ মহিউদ্দিন আহমেদ। মহিউদ্দিন আহমেদ নামে কয়েকজন নেতা, গবেষক ও সমাজসেবী থাকার সুবাদে নিজেকে জনপ্রিয় নেতা হিসেবে দাবি করেন। (লন্ডনে মহিউদ্দিন আহমেদ নামে একজন রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবী থাকায় অনেকে এই মহিউদ্দিন ভেবে বসে।)

তিনি স্ট্যাটাস/লেখায় প্রায় একশ জনকে ট্যাগ করে হাহা রিয়েকশন সহ ৩০ থেকে ৪০টি প্রতিক্রিয়া পান এবং এতে অপমান বোধ না করে এই ধারা যিনি অব্যাহত রাখেন তার আত্মসম্মান নিয়ে না বললেও চলে। কিন্তু ক্রমাগত মিথ্যাচার করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করায় যে নিয়োজিত তার মুখোশ কিঞ্চিত উন্মোচন করা উচিত।

সকল পোস্টেই তিনি শ-খানেক মানুষকে ট্যাগ করেন

একশ “ট্যাগী” থেকে রিএকশন দেন ৩০-৪০ জন, তবে এতে তিনি অপমান বোধ করেন না; কারণ মানির মান নাকি প্লাস্টিকের চপ্পল দিয়ে মারলেও যায় না!

কে এই মহিউদ্দিন:
জন্ম পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠিতে। বাবা ওয়ারিশ আলী ছিলেন পুলিশের হাবিলদার। পড়াশোনায় মন না থাকায় বাবা চেয়েছিলেন মহিউদ্দিনকে কারখানায় কাজ শেখাতে পাঠাবেন। কিন্তু মা সখিনা খাতুন অনেক আশা নিয়ে, মানুষের বাড়িতে ঝি এর কাজ করে ছেলের হাতে টাকা তুলে দিতেন যেন পড়াশোনা করে মানুষ হয়। কিন্তু আশায় গুঁড়ে বালি। গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি থেকে ফলমূল, হাঁস-মুরগী চুরি ও মারামারি করা সহ নানা অপকর্মে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে এলাকাবাসী। গ্রামের মানুষের অভিযোগ পেয়ে শর্ষিনার পীর, মহিউদ্দিনকে বেদম প্রহার করে এবং গ্রাম থেকে বের করে দেয়ার জন্য তার বাবাকে পরামর্শ দেয়। প্রায় একঘরে অবস্থায় মহিউদ্দিন পুলিশের তালিকাভুক্ত ডাকাত মোশারফের হাত ধরে যোগ দেয় সিরাজ শিকদারের সর্বহারা পার্টিতে। হাবিলদার পিতা পুত্র হিসেবে অস্বীকার করায় নিজের পরিচিতি বেছে নেন ভূমিপুত্র হিসেবে। ক্রমেই মহিউদ্দিন হয়ে ওঠে এক মূর্তিমান আতঙ্ক।

সর্বহারা পার্টির সন্ত্রাস এখনো অনেকে ভুলে যান নি। পিরোজপুরের মধ্যবিত্ত ও সচ্ছল পরিবারের কাছে চিঠি দিয়ে টাকা দাবি, অন্যথায় হত্যা, প্রহার ইত্যাদি অভিযোগে পুলিশের তালিকাভুক্ত ডাকাত হিসেবে স্থান পায় মহিউদ্দিন। মারামারি, ডাকাতি, হত্যা চেষ্টা, নাবালিকা ধর্ষণ, ডাকাতি কালে গৃহবধূ ধর্ষণ ও হত্যা সহ প্রায় ২৩টি মামলার আসামী ছিল মহিউদ্দিন। ১৯৮৪ সালে যোগ দেয় ফ্রিডম পার্টিতে। যুব কমান্ডের শীর্ষ ক্যাডারদের একজন হিসেবে খুনি ফারুক-রশিদের আশীর্বাদে লিবিয়ায় সশস্ত্র প্রশিক্ষণও গ্রহণ করে।

১৯৯২/৯৩ সালে তোফায়েল আহমেদ, আমীর হোসেন আমু সহ শীর্ষ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে মামলা করে বিএনপির সুনজরে আসার চেষ্টা করে। ৯৬ সালে বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র নির্বাচন করে। শতাধিক ক্যাডার নিয়ে গঠিত সন্ত্রাসী বাহিনী থাকলেও ভোট পায় ১৩টি। অত:পর আবার শুরু করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। লজ্জাশরমের অভাব থাকায় ‘লিবারেল পার্টি বাংলাদেশ’ নামে দল গঠন করে ২০০১ সালে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এবং যথারীতি জামানত হারায় মহিউদ্দিন।

দেশত্যাগ:
২০০৫ সালে ক্রসফায়ারের তালিকায় ওঠে এই ডাকাত মহিউদ্দিনের নাম। কট্টর আওয়ামী লীগ বিরোধী হওয়ায় দেশত্যাগের লিখিত অঙ্গীকার করে ছাড়া পায় সে। পাড়ি জমান আয়ারল্যান্ডে। একটি বারের কর্মী হিসেবে কাজ করে সেখানেও রাজনীতি তথা নির্বাচন করার খায়েশ জেগে ওঠে। “আইরিশ মাইনরিটি কাউন্সিল” নামে স্বঘোষিত সংগঠনের স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট হন। ২০০৯ সালে শেখনিউজ ডটকম নামে পোর্টালের মাধ্যমে শুরু করেন খয়রাতের ব্যবসা, স্থান হয় লন্ডনে।

শিক্ষাগত যোগ্যতা, কথিত সাংবাদিকতা ও ব্যারিস্টারির গোঁমড়!

লিবারেল পার্টি, আইরিশ মাইনরিটি কাউন্সিল, সেন্টার ফর রিসার্চ এন্ড স্ট্র্যাটেজি ইত্যাদি গালভরা নামগুলো শুধু সোশ্যাল মিডিয়াতেই সীমাবদ্ধ, বাস্তব কোনও অস্তিত্ব নেই। এগুলোর নাম বিক্রি করে ও শেখনিউজে ভর করেই জীবিকা নির্বাহ করেন মহিউদ্দিন। শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রেও প্রতারণাই সম্বল।

মহিউদ্দিন আহমেদের দাবি, সে ডাবলিন সিটি ইউনিভার্সিটি থেকে গ্রাজুয়েশন করেছে Bachelor (Honorary) Legal Studies with Business এ এবং মাস্টার্স করেছে International Journalism Studies এ।

অনারারি ব্যাচেলর কি সেটা সর্বহারা মহিউদ্দিনই ভালো জানেন। তবে ডাবলিন সিটি ইউনিভার্সিটিতে তার উল্লেখিত কোনো ডিগ্রীর অস্তিত্ব নেই। সূত্র ১: https://www.dcu.ie/arts_education_movement/index.shtml

সূত্র ২: https://www.dcu.ie/law_and_government/index.shtml

সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে, ব্যারিস্টার দাবিদার মহিউদ্দিন বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে কথিত গবেষণা করলেও লিগ্যাল স্টাডিজ ও জার্নালিজম স্টাডিজে অধ্যয়ন করে কিভাবে বার-এট-ল এর সুযোগ পান – সেটা কখনো ভাবেন নি। ডাবলিন সিটি ইউনিভার্সিটির ডিগ্রী দাবি পুরোপুরি মিথ্যাচার ও হাস্যকর হলেও, বার-এট-ল এর ক্ষেত্রে সেই ডিগ্রীর মূল্যমান কি তা জানতে চাইলে যে জবাব আসে তা এমন:

তিনি International Bar Association এর সদস্য দাবি করেন । IBA-র সদস্য হওয়া কোনো যোগ্যতা নয়, যেকেউ চাইলে হতে পারেন, https://www.ibanet.org/Membership/Individual-membership.aspx

(তবে ২৭০ পাউন্ড প্রয়োজন হবে, বর্তমানে ডিসকাউন্ট অফার চলছে, মাত্র: ১৬২/বছর।)

মূল বিষয় হচ্ছে, এগুলো বোঝার জন্য যে বুদ্ধিবৃত্তিক লেভেল প্রয়োজন সেটিও তার নেই। এছাড়া তার অনুসারীদের জ্ঞান কোন পর্যায়ের তা নিশ্চয়ই বলার প্রয়োজন নেই।

একটি ঘটনা উল্লেখ না করলেই নয়। লন্ডন প্রবাসী আবু বকরের সূত্রে জানা যায়, মহিউদ্দিন উদ্ভট একটি পরিকল্পনা নিয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান বরাবর এই মর্মে আবেদন করেছিল যে, তাকে ১ হাজার নেতাকর্মী ও ১০ কোটি টাকা দেয়া হলে সে বাংলাদেশের সরকার পতন ঘটিয়ে দেখাবে। জবাবে তাকে বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার রাস্তা দেখানো হয়।

শেখ মহিউদ্দিনের ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ এনে মানহানির কোনো ইচ্ছা আমাদের ছিল না। কিন্তু প্রতারণার সীমা থাকে। যে মানুষটি ফেসবুক জুড়ে নীতিকথা বলছে, সে নিজেই দাঁড়িয়ে আছে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও প্রতারণার ওপর। সর্বহারা করার সময় কি করেছে সেটি বাদ দিলাম, কিন্তু যে নিজের পরিচয়ের ক্ষেত্রে সততার পরিচয় দিতে পারে না, তার মুখে নীতিকথা মানায় না। লজ্জা নামের কিছু তার আছে বলে মনে হয় না। তাই ২০১১ সাল থেকে শেখ নিউজের নামে একের পর এক মিথ্যাচার করে যাচ্ছে, একটি খবর মিথ্যা প্রমাণ হলে, নতুন করে আবার আরেকটি নিয়ে শুরু হয়। প্রতিদিন স্বপ্ন দেখছে অভ্যুত্থান হবে, যা স্বপ্নদোষে পরিণত হয়েছে।

শেখ মহিউদ্দিন আহমেদ নামের ভণ্ড, প্রতারক, মিথ্যাবাদী লোকটি যথাযথ জ্ঞানের অভাবে না হয় পাগলের প্রলাপের মতো কথিত রিপোর্ট/বিশ্লেষণ লিখছে, কিন্তু এগুলো গিলছে কারা? তার সার্কেলের কারও কি শিক্ষা, আইন বা রাজনীতি সম্পর্কে পরিমিত জ্ঞানও নেই? থাকলে এমন উন্মাদকে সহ্য করে কী করে? শুনেছি, খারাপ নারী যৌবন পেরিয়ে গেলে খিস্তি-খেউর করে, জবাবে মানুষ যখন গালি দেয়, তাতেই সে আনন্দ পায়। মহিউদ্দিনের অবস্থা ঠিক তেমনই।

কৃতজ্ঞতা:

১. মহিউদ্দিন আহমেদ, রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবী

২. পিরোজপুরের আশিষ কুমার বড়াল

৩. জন মিনিহান (যুক্তরাজ্যের রাজনীতিবিদ)

৪. হারুন অর রশীদ (বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত)


আরও সংবাদ