বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২০, ০৫:৫৭ পূর্বাহ্ন

অতীতের লুটতরাজ বনাম সফল রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা

ইবার্তা ডেস্ক
আপডেট : শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

নিজাম চৌধুরী: এটা একটি বিশাল কালজয়ী ইতিহাস রচনার মতো কাজ। ছোটখাটো কোনো লেখনীর মাধ্যমে এর বর্ণনা সম্ভব নয়। বাঙালি জাতির মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় স্বাধীনতার শত্রুরা সপরিবারে হত্যা করেই শুধু ক্ষান্ত হয়নি, এ জঘন্য হত্যার বিচার যেন কোনো দিন হতে না পারে সে জন্য তারা জাতীয় সংসদে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের নামে কালো আইন পাস করেছিল। সেনাছাউনি থেকে বেরিয়ে এসে রাতারাতি রাজনৈতিক নেতা বনে গিয়ে দীর্ঘ একুশ বছর যাবত্ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে পর্যায়ক্রমে দখল করে রাখার উন্মত্ত খেলায় মেতে ওঠা জিয়া-খালেদা-এরশাদ গং এ দেশের রাজনীতিকে শুধু ধ্বংসই করেনি; বরং পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশের সুনাম, অবকাঠামো ও অর্থনীতিকে এতই দুর্বল করে দিয়েছিল যে সেটা যে আজকের এ পর্যায়ে আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে সে সময় কেউ কখনো কল্পনাও করতে পারেনি। আর এ উন্নয়নের মূল রূপকার, স্বপ্নদ্রষ্টা ও বাস্তবায়নকারী হচ্ছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। স্বাধীনতাবিরোধীরা আমাদের জাতীয় চার নেতাকে জেলখানার অভ্যন্তরে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে খুন করে ক্ষান্ত হয়নি। জাতীয় চার নেতা বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে বাংলাদেশকে পরিচালিত করতে পারেন—এমনটা ভেবেই এই চার নেতাকে জেলখানার অভ্যন্তরে অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় খুন করে।

২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত তারা আওয়ামী লীগের একুশ হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করেছে, পঙ্গু করে দিয়েছে সারা দেশের লক্ষাধিক নেতাকর্মীকে। সামরিক ছাউনি থেকে জন্ম নেওয়া এসব রাজনৈতিক অপশক্তি নিজেদের শক্তি বৃদ্ধির জন্য এ দেশের স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের, রাজাকার, আলবদর এদের শুধু রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করেনি, তারা নিজেদের আখের গোছানোর সঙ্গে ওদের অর্থনৈতিকভাবেও মজবুত ভিত্তির ওপরে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটতরাজ করে সৃষ্টি করছে একটি নব্য ধনিক শ্রেণি, যাদের অধিকাংশই ছিল এ দেশের স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ও যুদ্ধাপরাধীদের পরিবার। সেনাবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও জোয়ানদের জিয়ার আমলে ঘটে যাওয়া ১৯ বারের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সময়কালে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনে নির্বিচারে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে হত্যা করেছে। শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের আদলে জিয়া একজন সেক্টর কমান্ডার হয়েও অবৈধভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের, মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের প্রতিটি মানুষকে বেছে বেছে হত্যা করেছে এমনকি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের করেছে পুরস্কৃত। হত্যাকারীদের পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দূতাবাসগুলোতে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত ও প্রতিষ্ঠিত করার জিয়ার এ জঘন্য কাজটি এ দেশের সব সচেতন নাগরিককে সে সময় বিস্মিত ও হতবাক করেছিল। কিন্ত প্রতিবাদ করার কোনো সুযোগ ছিল না। পাকিস্তানিরা যেভাবে ২৪টি বছর এ দেশের জনগণকে শোষণ-নির্যাতন করেছিল, অনুরূপভাবে জিয়া ও তাঁর দোসররা মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বাংলাদেশের সর্বপ্রাচীন ও এশিয়ার সর্ববৃহত্ রাজনৈতিক দল, যে দলটির নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, ফলে বাংলাদেশ আজ পৃথিবীর মানচিত্রে মাথা উঁচু করে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধিশালী জাতি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে সে দলটিকেও চিরতরে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে শেষ করে দেওয়ার নোংরা খেলায় মেতে ছিল।

পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের একজন কর্মী হিসেবে জিয়ার এসব কুকর্মের চাক্ষুষ সাক্ষী হিসেবে আমি ও আমার মতো হাজার হাজার আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এখন জীবিত আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ওপর মধ্যযুগীয় বর্বতার আদলে নির্যাতন চালানো হতো।

১৯৮১ সালের ১৭ মে ছিল বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জন্য একটা ঐতিহাসিক দিন ও টার্নিং পয়েন্ট। বঙ্গবন্ধুর কন্যা আজকের পৃথিবীর অন্যতম একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক মাদার অব হিউম্যানিটি জননেত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য কত যে জরুরি ছিল সেটা বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণের মাধ্যমে আজ সহজেই অনুমেয়। ৩৯ বছর আগের সেদিনের জননেত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ, যা বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার এক ঐতিহাসিক পটভূমি তৈরি করেছিল। স্বাধীনতাবিরোধী ও তাদের দোসররা বিগত ৩৯ বছর যাবত্ জননেত্রী শেখ হাসিনাকে ২১ বার হত্যা করার অপচেষ্টা করেছিল। এরা আবার সুযোগ পেলে সেই পুরনো খেলায় যে মেতে উঠবে এ ব্যাপারে আমার কোনো সন্দেহ নেই। আমরা বাঙালিরা অ্যাপ্রিশিয়েট করতে জানি না। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মহান স্বাধীনতা অর্জন, এর পরও অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা। এত বড় ধাক্কা সামলে জননেত্রী শেখ হাসিনা বিগত ৩৯ বছর যাবত্ অমানবিক পরিশ্রম করে, প্রতি মুহূর্তে মৃত্যু অবজ্ঞা করে বাংলাদেশকে আজ পৃথিবীর বুকে একটি ইমার্জিং টাইগারের অর্থনীতির দেশ, আধুনিক ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে দিচ্ছেন সেটা কি এ দেশের জনগণ মূল্যায়ন করার ক্ষমতা রাখে? এ প্রশ্নের উত্তরের জন্য আমাদের আরো অনেক দিন বেঁচে থাকতে হবে। কভিড-১৯ সারা পৃথিবীর জন্য এক বৈশ্বিক সমস্যা। মহামারির ভয়াবহ এই পরিস্থিতিতে যখন আমেরিকাসহ উন্নত বিশ্বের সব দেশ দিশাহারা, উন্নত দেশগুলোতে ভয়ানক মৃত্যুর মিছিল, সেখানে বাংলাদেশ তার বাইরে নয়। কিন্তু শেখ হাসিনা সীমিত সুযোগ ও সামর্থ্যের মধ্য থেকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পেনডামিক মোকাবেলা করছেন। ছয় কোটি নাগরিককে নগদ অর্থ সহায়তা এবং খাদ্যসামগ্রী বিতরণের আওতায় নিয়ে এসে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। তাঁর অনুরোধে বেসরকারি খাতের ছোট থেকে বড় সব ব্যবসায়ী, বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি ব্যাংক, ধনাঢ্য ব্যক্তিরা সারা দেশে ব্যাপক ত্রাণ বিতরণ করে যাচ্ছেন। ব্যবসায়ীরা মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে দেশের ভাবমূর্তি বিশ্বব্যাপী অনেক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার ত্রাণ তহবিলে ব্যবসায়ী, সরকারি ও বেসরকারি খাতের কর্মজীবীরাসহ সকল স্তরের জনগণ উদার হস্তে অনুদান দিয়েছেন। নেত্রীর একক নেতৃত্বে এত সব করার পরও একটা শ্রেণি সব সময় বিভিন সামাজিক ও গণমাধ্যমে ন্যক্কারজনকভাবে নোংরা সমালোচনা করেই যাচ্ছে। আজ পর্যন্ত তারা শেখ হাসিনা সরকারের কোনো অর্জনকেই সাধুবাদ করেনি। তার কারণ হলো একটাই, আর সেটা আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার বিরোধিতা করাই তাদের একমাত্র কাজ। আওয়ামী লীগবিরোধী শক্তিগুলো এক প্ল্যাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাংলাদেশকে একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করাই হলো তাদের প্রপাগান্ডার মূল উদ্দেশ্য।

জিয়া-এরশাদের কথা আপাতত আলোচনায় না-ইবা আনলাম, খালেদা জিয়া তাঁর সোয়া তিন মেয়াদে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিলেন। সারা বাংলাদেশের উন্নয়নের কথা না-ইবা বললাম, শুধু তাঁর নির্বাচনী এলাকা ফেনী-১সহ সারা ফেনী জেলায় উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নয়নের ছোঁয়া রেখে যেতে পারেননি। ফেনীতে একটি আধুনিক হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করে যেতে পারতেন। তা না করে বরং সারাক্ষণ ব্যস্ত ছিলেন জামায়াতসহ মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে শক্তিশালী করে নিজেদের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার কাজে।

জিয়া ও খালেদা জিয়ার আমলে সবচেয়ে বড় জাতীয়তাবাদিতার গুণাবলি ছিল আওয়ামী লীগ বিরোধিতা, মহান মুক্তিসংগ্রামের বিরোধিতা করা, আর এসব গোষ্ঠীকে সকল স্তরে প্রতিষ্ঠিত করাই ছিল তাঁদের প্রধান উদ্দেশ্য। দেশকে বারবার দুর্নীতিতে শীর্ষ তালিকায় নিতে কখনো কিন্তু পিছপা হননি বেগম জিয়া। এসব ব্যাপারে পারদর্শিতার জন্য যদি তাঁকে আপসহীন নেত্রী বলতে হয় তা তো বলাই যেতে পারে। পঁচাত্তর-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেসব নোংরা খেলা জিয়া-বেগম জিয়া ও এরশাদ গং খেলেছেন সেসব বিষয় নিয়ে অন্য সময়ে বিস্তারিত লেখার ইচ্ছা রইল। আজকের বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, অবকাঠামো, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এক অনন্য উচ্চতায়। নিম্নমধ্যবিত্ত আয়ের দেশে থেকে এখন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার মহাযজ্ঞ চলমান। সর্বোপরি ২০৪১ সালে বাংলাদেশকে একটি উন্নত সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করার লক্ষ্য সামনে নিয়ে অবিরাম পরিশ্রম করে যাচ্ছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। যত দিন তিনি বেঁচে থাকবেন তত দিন তিনি এ দেশের উন্নয়নের জন্য কাজ করে যবেন। আমরা জানি তিনি ২১০০ সাল পর্যন্ত জীবিত থাকবেন না। কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মের কথা চিন্তা করে ২১০০ সালের জন্য ডেল্টা প্ল্যানের ঘোষণা এবং তা বাস্তবায়নের সব কার্যক্রমের পরিকল্পনা করে বিশ্বের বুকে একজন দূরদর্শী নেত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হয়েছেন। শেখ হাসিনার জন্য আজ আমরা জাতি হিসেবে গর্বিত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে অর্জিত হয়েছে। আজকের বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে একটি উন্নত সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করার মহান দায়িত্ব তাঁরই সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাই করে যাচ্ছেন। মাঝখানে যারা অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছিল তারা বাংলাদেশের উন্নয়নে কোনো অবদানই রাখেনি। বরং দেশের সম্পদ লুটতরাজ করে বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়ে, সেগুলো এখন বিদেশে বসে বসে ভোগ করছে আর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।

পরিশেষে জাতি আজ মুজিব শতবর্ষ পালন করছে এবং অতীতের সব গ্লানি ধুয়ে-মুছে নতুন দিগন্তের দিকে যখন এগিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই কভিড-১৯-এর বিশ্ব মহামারি সাময়িকভাবে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাকেও থমকে দিয়েছে। কিন্ত বাঙালি দমে যাবার জাতি নয়, পূর্ব দিগন্তে আবার নুতন সূর্য উদিত হবে আর বাঙালিরা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আবারও নতুন উদ্যমে ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক আধুনিক, সুখী বাংলাদেশ গড়ে তুলবে, যেটা ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজীবনের লালিত স্বপ্ন।

লেখক: রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক


আরও সংবাদ