শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২০, ০১:৩৬ অপরাহ্ন

কোভিড টেস্ট এবং কিছু সতর্কতা

ইবার্তা ডেস্ক
আপডেট : রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২০

ডা. জিয়াউদ্দিন হায়দার: বিগত মার্চ মাসের ১১ তারিখে যখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কোভিড-১৯ পরিস্থিতিকে বৈশ্বিক মহামারি হিসেবে ঘোষণা করে, তখন থেকেই এই রোগটি শনাক্ত করতে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। তবুও আজ পর্যন্ত পৃথিবীব্যাপী ব্যবহারকৃত কোভিড টেস্টের সব পদ্ধতির সুবিধা এবং অসুবিধাগুলো স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছে পরিষ্কার নয়। কিন্তু মহামারিটির ব্যাপক বিস্তার রোধে শনাক্তকারী সব পরীক্ষার সঠিক ব্যাখ্যা জানা অতীব প্রয়োজন। আজকের এই লেখার মাধ্যমে আমি চেষ্টা করবো, বর্তমানে ব্যবহৃত কোভিড শনাক্তকারী বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-পদ্ধতির একটি সহজ বর্ণনা উপস্থাপন করতে, যা আমাদের সবার সচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

কোভিড-১৯ শনাক্তের জন্য প্রধানত তিনটি পদ্ধতি আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত আছে এবং সেগুলো হলো: (ক) মলিকুলার শনাক্তকরণ পদ্ধতি অথবা RT-PCR; (খ) অ্যান্টিজেন-অ্যান্টিবডি শনাক্তকরণ পদ্ধতি; এবং (গ) কালচার পদ্ধতি। সর্বশেষে উল্লিখিত পদ্ধতিটি গোল্ডেন স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে পরিচিত হলেও তা অনেক সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল বিধায় এটির ব্যবহার সব সময়ই সীমিত পর্যায়ে থেকে গেছে। তাই আজকের লেখাটিকে সংক্ষিপ্ত করার জন্য এই টেস্টটির বর্ণনা করছি না।

মলিকুলার শনাক্তকরণ পদ্ধতি অথবা RT-PCR:

RT-PCR পদ্ধতির আবার দুইটি ধরন আছে: (১) প্যানকরোনাভাইরাস RT-PCR; এবং (২) রিয়েলটাইম RT-PCR।
প্যানকরোনাভাইরাস RT-PCR: এই পদ্ধতিটি কোভিড-১৯ ছাড়াও অন্য যেকোনও ধরনের করোনাভাইরাসের উপস্থিতি সর্বপ্রথমে নির্ণয় করে। পরীক্ষার প্রথম ধাপে যদি করোনাভাইরাস পরিবারের যেকোনও একটির উপস্থিতি পাওয়া যায়, তাহলে জিনোম সিকোয়েন্সিং নামক অন্য একটি টেস্টের মাধ্যমে ভাইরাসটি কোভিড-১৯ কিনা তা শনাক্ত করা হয়। এ কারণে টেস্টটির ফল পেতে প্রায় ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। অতিরিক্ত প্রচেষ্টা, সময়, বা অর্থ খরচের কারণে প্যানকরোনাভাইরাস RT-PCR আমাদের দেশসহ কোনও দেশেই ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় না।

রিয়েলটাইম RT-PCR: বর্তমানে এই পদ্ধতিটি সর্বাধিক ব্যবহৃত এবং বহুল আলোচিত কোভিড শনাক্তকরণ পদ্ধতি। তবে এই পদ্ধতিতে সঠিকভাবে ফলাফল ব্যাখ্যা করতে হলে পরীক্ষাগারে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীদের অবশ্যই কোভিডের অণুজীববিজ্ঞানের ব্যাপারে বিশদ জ্ঞান থাকতে হবে। এই পরীক্ষাটি প্রথমেই টার্গেট প্রোটিন থেকে SARS-COVID ভাইরাসের ২-৩টি সুনির্দিষ্ট জিন শনাক্ত করে। তাই অপেক্ষাকৃত স্বল্প সময়ে এই পরীক্ষার ফল পাওয়া যায়। তবে যেহেতু ঘন ঘন SARS-COVID ভাইরাসের মিউটেশন হয়, বা ভাইরাসটির স্বরূপ পরিবর্তন হয়, তাই একজন ব্যক্তির কোভিড পজিটিভ হওয়া সত্ত্বেও মিথ্যা নেগেটিভ হিসেবে শনাক্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। এই ঝুঁকি কমানোর জন্য একই ব্যক্তির ক্ষেত্রে একই সঙ্গে দুই বা ততোধিক RT-PCR টেস্ট কিট ব্যবহার করে নমুনা পরীক্ষার পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে, যাতে করে জিনের ভিন্নতা শনাক্ত করে কোভিড-১৯ নিশ্চিত হওয়া যায়।

বিশেষভাবে উল্লেখ্য, এই পদ্ধতির মাধ্যমে কোভিডের উপস্থিতি আছে কিনা তা নির্ণয় করা হয় ‘সাইকেল থ্রেশোল্ড (CT)’-এর ফলাফলের ভিত্তিতে। আর এই সাইকেল থ্রেশোল্ড বা CT হলো ঘূর্ণন সংখ্যার মান। CT-এর মান, নমুনায় উপস্থিত ভাইরাসের পরিমাণের সঙ্গে বিপরীতভাবে সম্পর্কযুক্ত। অর্থাৎ CT কম থাকা মানে পরীক্ষাকৃত নমুনায় ভাইরাসের অধিক উপস্থিতি, আবার CT বেশি থাকার মানে হলো ভাইরাসের কম উপস্থিতি। এখন এই CT ভিত্তিক শনাক্তকরণের মূল সমস্যাটি হচ্ছে—পজিটিভ বা নেগেটিভ হিসেবে ফল প্রকাশের জন্য CT-এর মানের কোনও ধ্রুব বা নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই। সাধারণত CT-এর মান ৩৫-এর ওপরে হলে কোভিড নেগেটিভ হিসেবে শনাক্ত করা হয়, এবং CT ৩৪-এর নিচে হলে কোভিড পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হয়। তবে RT-PCR পরীক্ষা পদ্ধতিটি কোভিড নির্ণয়ের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সঠিক হলেও CT-এর মান দুই থেকে একবার এদিক-ওদিক হওয়া অস্বাভাবিক নয়, যা নির্ভর করে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। যেমন—পরীক্ষকের দক্ষতা, রিএজেন্টের ব্যবহার, নমুনা সংগ্রহের সময়, সংগৃহীত নমুনার গুণগত মান, ইত্যাদি। যেমন, সংক্রমণের প্রাথমিক ধাপে টেস্ট করানো হলে নমুনায় ভাইরাসের পরিমাণ কম থাকবে বিধায় CT মান বেশি হবে এবং একজন রোগীকে মিথ্যা নেগেটিভ হিসেবে শনাক্তকরণের ঝুঁকি বেশি থাকে। অতএব, যখন একটি পরীক্ষাকৃত নমুনায় CT-এর মান ৩৪ থেকে ৩৬-এর মধ্যে থাকবে তখন ফলাফলের ব্যাখ্যা ‘মিথ্যা পজিটিভ’ অথবা ‘মিথ্যা নেগেটিভ’ এই দুইভাবেই নির্ণিত হতে পারে। সবার জ্ঞাতার্থে বলে রাখা ভালো, চীনে পরিচালিত একটি গবেষণায় ‘মিথ্যা নেগেটিভের’ হার ছিল ৫০ শতাংশ। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেলো মিথ্যা নেগেটিভের এই উচ্চ হার পাওয়া গিয়েছিল প্রধানত CT মানের ভুল ব্যাখ্যার কারণে, ভিন্ন ভিন্ন রিএজেন্ট ব্যবহারের কারণে, এবং নমুনা সংগ্রহের অদক্ষতার কারণে।

উল্লিখিত RT-PCR সম্পর্কিত জটিলতাগুলোকে সহনীয় মাত্রায় রাখার জন্য কিছু কৌশল গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রথমত, RT-PCR ও রিএজেন্টের সঠিক ব্যবহার সহ ফলাফলের সঠিক বিশ্লেষণ করার জন্য জাতীয় পর্যায়ের কয়েকজন বিশেষজ্ঞের বিজ্ঞানপ্রসূত মতামতের ভিত্তিতে একটি ব্যবহারিক নির্দেশিকা তৈরি করতে হবে। একটিমাত্র নির্দেশিকার ভিত্তিতে কোভিড শনাক্তকরণের জন্য নির্দিষ্ট গবেষণাগারের সকল টেকনিশিয়ানকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, নমুনা প্রদানকারী প্রত্যেক ব্যক্তির শরীরের দুই বা ততোধিক জায়গা থেকে (নাক ও গলা) একাধিকবার নমুনা সংগ্রহ করতে হবে, যাতে করে মিথ্যা নেগেটিভ ফলাফলের সংখ্যা কমানো যায়। সর্বশেষে, নমুনা প্রদানকারী যে ব্যক্তির প্রথম পরীক্ষার ফলাফল নেগেটিভ আসে তাকে অন্তত দুই বা ততোধিকবার কোভিড পরীক্ষা করা প্রয়োজন রয়েছে, যাতে করে মিথ্যা নেগেটিভের ঝুঁকি কমানো যায়।

সর্বোপরি কোভিড-১৯ শনাক্তকরণের প্রত্যয়নপত্রে CT-এর মান লিখে দিলে একজন ব্যক্তি পজিটিভ বা নেগেটিভ যাই হন না কেন তিনি সংক্রমণের কোন পর্যায়ে আছেন সেটা সম্পর্কে রোগী নিজে এবং দায়িত্বরত চিকিৎসক ধারণা পাবেন।

অ্যান্টিজেন-অ্যান্টিবডি শনাক্তকরণ পদ্ধতি:

অ্যান্টিজেন-অ্যান্টিবডি টেস্টের মূল ভিত্তি হলো ইমিউনোক্রোম্যাটোগ্রাফি অর্থাৎ একটি সাধারণ ডিভাইসের মাধ্যমে তরল নমুনায় লক্ষ্যবস্তুর উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া। পৃথিবীব্যাপী যে সকল আন্টিজেন-অ্যান্টিবডি পরীক্ষার উদ্ভাবন হয়েছে তাদের সেনসিটিভিটি এবং স্পেসিফিসিটি ৫০ থেকে ৭০ শতাংশের মধ্যে। যদিও এই ধরনের পরীক্ষা পদ্ধতির নানাবিধ অসুবিধা চিহ্নিত করা হয়েছে, তবে অনেক ক্ষেত্রে টেস্টগুলোর কিছু সুবিধাও আছে। যেমন, এই পরীক্ষাগুলো সাধারণত সহজসাধ্য, কম সময়ে সম্পাদনযোগ্য, এবং অল্প প্রশিক্ষিত একজন স্বাস্থ্যকর্মীর দ্বারা শুধু কয়েক ফোঁটা রক্তের নমুনা প্রদানের মাধ্যমেই পরীক্ষাটি সম্পন্ন করা যায়। কাজেই বিস্তৃত পরিসরে ব্যবহারের জন্য এই পরীক্ষাটি অর্থ, সময়, এবং পদ্ধতি বিবেচনায় অপেক্ষাকৃত সহজ ও সাশ্রয়ী। তবে, টেস্টটির ফলাফল সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করতে হলে নিম্নের বিষয়গুলোকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হবে।

প্রথমত, এই পরীক্ষার মাধ্যমে কোভিড সংক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা খুবই কঠিন। কারণ প্রথম ৫ থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত কোভিড-১৯ দ্বারা আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে IgM এবং IgG অ্যান্টিবডি তৈরি হয় না। সুতরাং যারা সবেমাত্র আক্রান্ত হয়েছেন তাদের ওপর চালানো অ্যান্টিজেন-অ্যান্টিবডি পরীক্ষার ফল খুবই সাবধানে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন রয়েছে। দ্বিতীয়ত, যেহেতু ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ অন্য ভাইরাল সংক্রমণের সঙ্গে কোভিডের পার্থক্য করা কিছুটা হলেও দুরূহ, তাই অ্যান্টিজেন-অ্যান্টিবডি পরীক্ষার ফল অন্য কোনও আণবিক (মলিকুলার) পরীক্ষার সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করাই শ্রেয়। এই কারণেই স্বাস্থ্যকর্মীদের কোভিড শনাক্তের কাজে শুধুমাত্র অ্যান্টিজেন-অ্যান্টিবডি টেস্টের ওপর নির্ভর না করে এটিকে কোভিড শনাক্তে RT-PCR-এর পরিপূরক হিসেবে বিবেচনা করার জন্য বলা হয়েছে। অ্যান্টিজেন-অ্যান্টিবডি টেস্টের কার্যকরী প্রয়োগ বিশ্লেষণে দেখা যায়, এটি প্রধানত ব্যবহৃত হয়—যখন কোভিড শনাক্তে RT-PCR মিথ্যা নেগেটিভ ফলাফল দেয়, যখন কমিউনিটিতে কোভিডের সংক্রমণের মাত্রা নিরূপণ করতে হয়, এবং যখন কমিউনিটিতে কোভিডের অ্যান্টিবডির মাত্রা পরীক্ষা করা প্রয়োজন হয়। এতে দেখা যাচ্ছে কোভিডের বিরুদ্ধে প্রতিকার যেমন, শনাক্তকরণ, আইসোলেশন, চিকিৎসা, ইত্যাদি ক্ষেত্রে অ্যান্টিজেন-অ্যান্টিবডি টেস্টের উল্লেখযোগ্য কোনও কার্যকর ভূমিকা নেই।

লেখক: স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা বিষয়ক কর্মকর্তা, বিশ্বব্যাংক


আরও সংবাদ