1. অন্যরকম
  2. অপরাধ বার্তা
  3. অভিমত
  4. আন্তর্জাতিক সংবাদ
  5. ইতিহাস
  6. এডিটরস' পিক
  7. খেলাধুলা
  8. জাতীয় সংবাদ
  9. টেকসই উন্নয়ন
  10. তথ্য প্রযুক্তি
  11. নির্বাচন বার্তা
  12. প্রতিবেদন
  13. প্রবাস বার্তা
  14. ফিচার
  15. বাণিজ্য ও অর্থনীতি

‘কোটার মেধা’ এবং ‘মেধার কোটা’ প্রসঙ্গে

নিউজ এডিটর : ইবার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকম
বুধবার, ১০ জুলাই, ২০২৪

হাইকোর্টের হাত ধরে সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি পুনর্বহাল হয়েছে। সেই সঙ্গে আবারও রাজপথে আন্দোলনে নেমেছেন আমাদের ছাত্র-ছাত্রীরা। ২০১৮ সালে সন্তানতুল্য এসব ছেলেমেয়েকে বোঝাতে লিখেছিলাম। ২০২৪-এ এসে আবারও কলম ধরতে হলো। কারণ মেধা নিয়ে এই ‘মেধাহীন’ বিতর্ক এবং মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের প্রতি অসহনীয় অসম্মান প্রদর্শন থামা দরকার। আমাদের প্রিয় তরুণ মেধাবী প্রজন্মের বোঝা দরকার, তারা যে আন্দোলনটা করছেন, সেটা কতোটা অযৌক্তিক।

জানি আমার লেখা অনেকেরই পছন্দ হবে না। তবু কোটা নিয়ে আরেকবার দুটো কথা বলতে চাই। আপনাদের ভাবনার খোরাক জোগাতে চাই। আমি চাই বিষয়টা পরিষ্কারভাবে বুঝে তারপর মাঠে নামুন, সত্যিকারের মেধার পরিচয় দিন।

সবার আগে আসুন সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি কীভাবে কাজ করে­ সেটা বোঝার চেষ্টা করি। বোঝার সুবিধার্থে ৪৩তম বিসিএস পরীক্ষা, যেটার সর্বশেষ ধাপ মৌখিক পরীক্ষা ২০২৩-এর নভেম্বরে শেষ হয়েছে, সেটার একটা পরিসংখ্যান আলোচনা করি।

– ৪৩তম বিসিএস পরীক্ষায় মোট আবেদনকারীর সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৩২ জন। আবেদন করার ক্ষেত্রে কোনও কোটা নেই।

– প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিল ৩ লাখ ২১ হাজার ৫৭২ জন। এই পরীক্ষাতে অংশগ্রহণের জন্যও কোনও কোটা নেই।

– প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় পাস করেছে মাত্র ১৫ হাজার ২২৯ জন। মনে রাখবেন, এখানেও কোনও কোটা নেই। এই ১৫ হাজার ২২৯ জনের সবাই লিখিত পরীক্ষা দিতে পারবেন।

– কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, লিখিত পরীক্ষায় সবাই অংশগ্রহণ করতে আসেন না। ৪৩তম বিসিএস পরীক্ষায় লিখিত পরীক্ষা দিয়েছিলেন মোট ১৩ হাজার ৬৭১ জন। দয়া করে মনে রাখবেন, এখানেও কোনও কোটা নেই।

– লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পেরেছেন মাত্র ৯ হাজার ৮৪০ জন।

এখন লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এই ৯ হাজার ৮৪০ জন থেকে (যদিও সবাই অংশগ্রহণ করেন না) মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ পাবে মাত্র ২ হাজার ১৬৩ জন। এবং ঠিক এখানেই কোটা হিসাব করা হবে।

আবেদনকারীর সংখ্যা বাদ দিলাম। প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা প্রায় সাড়ে তিন লাখ থেকে ৯ হাজারে ঠাঁই করে নেওয়া এই তালিকার কাকে কাকে আপনি মেধাহীন বলবেন? নারী-পুরুষ, প্রতিবন্ধী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী-বাঙালি, মুক্তিযোদ্ধা, সাধারণ- পরিবার নির্বিশেষে এরা প্রত্যেকেই মেধাবী এবং চাকরি পাওয়ার যোগ্য নয় কি? আমি জোর দিয়ে বলতে পারি, লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এই ৯ হাজার ৮৪০ জনের একজনও কম মেধাবী বা অযোগ্য নয়। সে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের হোক বা না হোক, নারী হোক বা না হোক, প্রতিবন্ধী হোক বা না হোক, আদিবাসী হোক বা না হোক।

মনে রাখবেন, একজনকেও যদি কোটায় নিয়োগ দেওয়া নাও হয়, তবু প্রায় ১০ হাজারের এই তালিকা থেকে মেধাবী ৭ হাজার ৬৭৭ যোগ্য প্রার্থী সরকারি চাকরি পাবে না। আপনারা যারা কোটাভুক্তদের অযোগ্য বলে, মেধাহীন বলে অসম্মান করছেন, তারা ঠিক বুঝে বলছেন তো? নাকি মেধার অন্ধ অহংকার আর অন্যকে অসম্মান করার অদম্য স্পৃহা থেকে করছেন? আপনার-আমার মতো অনেক মেধাবীর চেয়ে অবশ্যই এই কোটাধারীরা অনেক বেশি মেধাবী ও যোগ্য। বিষয়টি ভেবে দেখবেন।

এবার আসি আপনাদের দাবির অস্বচ্ছতা বা দুর্বলতা নিয়ে। ২০১৮ সালে আন্দোলনে ৫ দফা দাবি ছিল– যেগুলোর প্রত্যেকটির ক্লারিফিকেশনের অভাব ছিল। ২০২৪-এ আপনারা চার দফা দাবি আনলেন, কিন্তু সমস্যা দূর হলো না। সেই একই ক্ল্যারিটির অভাব। কাল আপনারা এক দফায় নেমে এসেছেন। আপনাদের সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘সব গ্রেডে অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাতিল করে সংবিধানে উল্লিখিত অনগ্রসর গোষ্ঠীর জন্য কোটাকে ন্যূনতম পর্যায়ে এনে সংসদে আইন পাস করতে হবে।’

এখন আপনারা এই ‘অযৌক্তিক’, ‘বৈষম্যমূলক’ এবং ‘ন্যূনতম’ বলতে কী বোঝাতে চাইছেন, তার কোনও ব্যাখ্যা আপনারা দেননি। কেমন পুনর্বিন্যাস চান, কেন চান, কোন তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে চান, সেটাও তো পরিষ্কার করে বলতে পারতে হবে। ২০১৮ সালের চেয়ে এবার অবশ্য আপনাদের সামান্য উন্নতি হয়েছে। অন্তত সংবিধানে উল্লেখিত ‘অনগ্রসর’ শব্দটা মুখস্থ করতে পেরেছেন।

যাহোক, এবার আপনাদের একটু অনগ্রসরতার ধারণা দেই। বাংলাদেশের সর্বশেষ জনশুমারি অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার ৫০.৪৩ শতাংশ নারী এবং ৪৯.৫১ শতাংশ পুরুষ। মানে নারীদের সংখ্যা কিঞ্চিত বেশি। তার বিপরীতে, বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তিতে (শুধু সরকারি না) নারীর অংশগ্রহণ ৪২.৫ শতাংশ এবং পুরুষের ৮১.৩ শতাংশ, মানে নারীরা পিছিয়ে আছে। এমনকি, বেকারত্বের হিসাবেও গ্রাম-শহর, বয়স, প্রতিবন্ধী ইত্যাদি নির্বিশেষে নারীরা অনেক পিছিয়ে আছে। শহরে নারীর বেকারত্বের হার ৯.৬ শতাংশ, গ্রামে ৪.৭ শতাংশ, যেখানে পুরুষের বেকারত্বের হার যথাক্রমে ৩.৮ শতাংশ এবং ২.৪ শতাংশ। আপনাদের সুবিধার জন্য বিশ্বব্যাংকের একটা গ্রাফ তুলে দিলাম। (তথ্যসূত্র: HIES 2022, গ্রাফ: World Bank Blog )

আর সরকারি চাকরিতে কতজন নারী কাজ করেন জানেন? ৩০ শতাংশেরও কম। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রকাশিত ২০২২ সালের সরকারি কর্মচারীদের পরিসংখ্যান মতে, সরকারি চাকরিতে বর্তমানে ১৩ লাখ ৯৬ হাজার ৮১৮ জন কর্মরত আছেন। এর মধ্যে ৯ লাখ ৮৭ হাজার ৬৭৯ জন পুরুষ এবং ৪ লাখ ৯ হাজার ১৩৯ জন নারী। মানে, বর্তমান সরকারি চাকরির বিভিন্ন পদে ২৯.২৯ শতাংশ নারী কাজ করছেন। আশা করি আপনারা এবার এটা দাবি করবেন না যে বাংলাদেশে নারীদের তুলনায় পুরুষদের মেধা বেশি। বরং কেন কম সেটা ভাবার, বোঝার চেষ্টা করুন।

আপনাদের আরও বোঝার সুবিধার্থে ৩৩তম বিসিএস থেকে ৪৩তম বিসিএস পর্যন্ত নারী-পুরুষের একটা পরিসংখ্যান দিলাম (সূত্র: BPSC Annual Report 2023)।

একইরকম পরিসংখ্যান আপনারা পাবেন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, শারীরিক প্রতিবন্ধী কিংবা মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে। যেটা দেখলে সহজেই বোঝা যায় ‘অনগ্রসরতা’ বা পিছিয়ে পড়ার বোঝাটা কার ওপর কতটা বেশি।

আর আলাদা করে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কোটার কথা বলছেন? স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত কতজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা বা তাদের পরিবার কী কী সুবিধা নিয়েছেন, তার হিসাব কি আপনারা দিতে পারবেন? পারবেন না। ৭৫-এর পর থেকে তো শুধু মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের পরিবার নিগৃহীত ছিল। যুদ্ধে বাবা-মা-ভাই-বোনকে হারিয়ে অসংখ্য সম্ভাবনাময় সন্তান, যারা আপনাদের মতো কিংবা আপনাদের চেয়েও মেধার স্বাক্ষর রাখতে পারতেন, তারা হারিয়ে গেছেন। জীবনে অনেকেই কোথাও দাঁড়াতে পারেননি। মুক্তিযোদ্ধা এবং তাঁদের পরিবারদের সম্মান করতে যদি নাও পারেন, অন্তত অসম্মান করবেন না।

মনে রাখতে হবে, কোটা ব্যবস্থা শুধু সাংবিধানিকভাবেই সুরক্ষিত নয়, বরং জাতিসংঘের মানবাধিকারের সর্বজনীন যে ঘোষণাপত্র আছে তার দ্বারাও স্বীকৃত। এবং যেকোনও কোটা ব্যবস্থা চালুর আগে পরিসংখ্যানভিত্তিক পর্যালোচনা করা হয়। সেটা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্যই হোক কিংবা কোন জেলা বা বিভাগের জন্যই হোক কিংবা মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জন্যই হোক।

আন্দোলন করতে চান করুন, কিন্তু সেটা নিয়ে আগে একটু বিশ্লেষণ করুন। সঠিক তথ্য জানার চেষ্টা করুন এবং কোন বিশেষ ব্যবস্থা কেন নেওয়া হয় সেটাও একটু পর্যালোচনা করতে শিখুন। তারপর দাবি তৈরি করুন। অকারণে কাউকে অযোগ্য, মেধাহীন বলে ‘গালি’ দেওয়ার আগে ভাবুন। কোটাহীনভাবে সব ধাপ পার হয়ে যারা মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন, তারা কেউ কোনোভাবেই মেধাহীন নন।

সবশেষে অনুরোধ রইলো, আন্দোলন যদি করতেই হয়, মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকা তৈরির জন্য আন্দোলন করুন। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সনদ নিয়ে অন্যায় সুবিধাভোগীদের শাস্তির দাবি জানান। বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদ করুন। সরকারের জবাবদিহি দাবি করুন। যাদের ত্যাগের বিনিময়ে আমরা এই দেশটা পেয়েছি, তাদের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা আমরা অস্বীকার করতে পারি না।

লেখক: শাশ্বতী বিপ্লব – অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট


সর্বশেষ - অভিমত