শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০, ০৬:৩২ পূর্বাহ্ন

বিচারপতিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ! সুপ্রীমকোর্টের বাধায় প্রশ্নবিদ্ধ সুশাসন!

ইবার্তা ডেস্ক
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ২৪ আগস্ট, ২০১৭

গত ২ এপ্রিল. ২০১৭ সুপ্রিম কোর্টের প্রেরিত একটি চিঠিতে বলা হয়: কোনো বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অসদাচরণ, দুর্নীতি বা অন্য কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হলে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ ছাড়া তার প্রাথমিক তদন্ত বা অনুসন্ধান না করার জন্য আইন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সকলকে নির্দেশ দেওয়া হল।

যাঁদের ওপর মানুষের প্রত্যাশা আকাশচুম্বি, যারা দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রাখবেন সেই বিচারকদেরই কেউ যদি দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন, তাহলে ভাগ্য বিড়ম্বিত মানুষেরা কোথায় যাবে! আর দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত বিচারকদের যদি দায়মুক্তি দেয়া হয় তাহলে আইনের শাসন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া খুব স্বাভাবিক।

দুর্নীতির টাকায় বিচারকরা সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। হত্যা, ধর্ষণ, মাদকদ্রব্য, চোরাচালান মামলায় জামিন, অস্বাভাবিক গতিতে বিচারকাজ সম্পন্ন, ভয়ংকর আসামিদের খালাস, বিচারিক কার্যক্রমের স্বাভাবিক নিয়মনীতি উপেক্ষা করা, আদালতে হাজির না করেই মামলার বিচারকাজ শেষ করা ইত্যাদি অভিযোগ থেকে শুরু করে অর্থ পাচার এমনকি জমি দখলের অভিযোগও রয়েছে কয়েকজন বিচারকের বিরুদ্ধে। তাদের দুর্নীতিতে সহায়ক হয়েছে পরিবারও।

দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) এমন কয়েকজন বিচারকের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন, জ্ঞাত বহির্ভূত আয় ও বিদেশে অর্থপাচারের সত্যতা ও তথ্য-প্রমাণ মিলেছে বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে।

ফজলুল হক

২০০৮ সালের ২ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ফজলুল হকের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রমাণ পাওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় দুদক। ফজলুল হকের ছেলে ও মেয়ের জামাইয়ের বিরুদ্ধেও মামলা করেছিল দুদক।

জয়নুল আবেদীন

২০১০ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ পেয়ে অনুসন্ধান চালায় দুদক।

২০০৪ এর ২১ আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার পর তৎকালীন বিএনপি সরকার বিচারপতি জয়নাল আবেদীনের নেতৃত্বে এক সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। বিচারপতি জয়নাল আবেদীন ২ অক্টোবর, ২০০৪ এ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। হামলা সম্পর্কে এই বিচারপতি ডেইলি স্টারকে বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশ বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারকে উচ্ছেদ করে পুতুল সরকার বসানোর লক্ষ্যে এ হামলা করিয়েছে।

২১শে আগস্টের ঘটনায় ড. কামাল হোসেনকে প্রধান করে গঠিত জাতীয় তদন্ত কমিটিও জয়নাল আবেদীনের প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি তদন্ত ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

তার বিরুদ্ধে আমেরিকার অর্থ পাচার ও জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সত্যতা পাওয়ায় ২০১০ সালের ১৮ জুলাই দুদক থেকে তাঁকে সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ দেয়া হয়েছিল।

সুপ্রীম কোর্ট থেকে দায়মুক্তি

তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি না করলেও উচ্চ আদালত থেকে আগাম জামিন নেন তিনি। এ বছর ২ মার্চ সুপ্রীমকোর্টের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চেয়ে চিঠি দেয় দুর্নীতি দমন কমিশন। জবাবে গত ২৮ এপ্রিল আপীল বিভাগ থেকে এই মর্মে চিঠি দেয়া হয় যে, “সর্বোচ্চ আদালতের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির বিরুদ্ধে দুদক কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করলে তার দেয়া রায়সমূহ প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং জনমনে বিভ্রান্তির উদ্রেক ঘটবে।”

চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, সাবেক এই বিচারপতির বিরুদ্ধে কোনরকম ব্যবস্থা গ্রহণ করা সমীচীন হবে না বলে সুপ্রীমকোর্ট মনে করে।

প্রধান বিচারপতির সমালোচনা করে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, ওই চিঠি দেওয়ার মাধ্যমে বিচারপতি এস কে সিনহা ‘ন্যায় বিচারের প্রতিবন্ধকতা’ তৈরি করেছেন।

তিনি বলেন, “…যা দণ্ডবিধির অধীনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তিনি সুপ্রিম কোর্টের নাম শুধু ব্যবহারই করেননি, তিনি সুপ্রিম কোর্টের প্যাড ব্যবহার করেছেন, যদিও এটা ছিল তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত।”

মোতাহার হোসেন

সাবেক বিচারক মোতাহার হোসেন গত বছরের ১৭ নভেম্বর পুরো মামলা চলাকালে উপস্থিত না থাকলেও তারেক রহমানকে অর্থ পাচার মামলা থেকে খালাস দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থপাচার, অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন ও ঘুষ নিয়ে আসামিদের খালাস দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক এ বিচারকের লন্ডনে বাড়ি, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা না মেনে বিদেশে অর্থ পাঠানো, বেনামে অবৈধ সম্পদ অর্জন, ঢাকায় দুটি স্থানে ফ্লাট, নিজ জেলা পাবনায় জমি ক্রয়, বিভিন্ন ব্যাংকে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে বড় অংকের টাকা থাকা ইত্যাদির প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিচারক থাকা কালে বড় বড় কয়েকটি মামলায় ঘুষ নিয়ে আসামিদের খালাস দিয়েছেন। বেশ কয়েকটি মামলায় ঘুষ নিয়ে আসামির সাজা কম দেওয়া ও খালাস দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

আবুল হোসেন

যুগ্ম জেলা জজ আবুল হোসেন খন্দকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি সম্পত্তি আত্মসাৎ ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। আবুলের ভাই বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য। তিন ভাই মিলে ঢাকার নবাবগঞ্জের কলাকোপায় ইছামতি নদীর তীরে চার একর ৫৭ শতক জমির ওপর দেড় শ বছর আগের ব্রিটিশ শাসনামলে কারুকার্যময় নির্মিত বাড়ি জালিয়াতি করে নিজের নামে লিখিয়ে নিয়ে দখল করে রেখেছেন। ‘ব্রজ নিকেতন’ এখন ‘জজবাড়ি’ নামে পরিচিত। জাল দলিল দিয়ে দখরে রাখতে ব্যবহার করা হয় আদালতের ক্ষমতা।

ফারুক আহাম্মদ

ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তি করে আসামিদের খালাস দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে সাবেক বিচারক ফারুক আহাম্মদের বিরুদ্ধে। অবসরে যাওয়ার আগে মাদকদ্রব্যসহ বিভিন্ন চোরাচালান মামলায় অস্বাভাবিক গতিতে বিচারকাজ শেষ করে বহুসংখ্যক আসামিকে বেকসুর খালাস দেন এই বিচারক। অভিযোগ আছে, এসব মামলার রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে বিচারিক কার্যক্রমের স্বাভাবিক নিয়মনীতি উপেক্ষা করা হয়। তার বদৌলতে খালাস পেয়েছে ভয়ংকর আসামি। অবসরে যাওয়ার আগে তিন মাদক চোরাচালান মামলায় ১১ আসামিকে খালাস দেন এই বিচারক। মামলা খালাসের রেকর্ড করে ১৮ কার্যদিবসে ২৪ মামলার আসামিদের খালাস দিয়েছেন।

আরও যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ:

গত বছর ফেনসিডিলসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন সিনিয়র সহকারী জজ জাভেদ ইমাম। তিনি যশোরে কর্মরত থাকা অবস্থায় দুর্নীতির মাধ্যমে আসামিদের খালাস ও জামিন দিয়ে অবৈধ সম্পদ অর্জন করেন বলে সুপ্রিম কোর্টে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় আইনজীবীরা।

সাতক্ষীরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সাবেক এক বিচারকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিচারকের অপসারণ দাবি জানিয়ে স্থানীয় আইনজীবী সমিতি আদালত বর্জন করার পর তাঁকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে।

এ ছাড়া সম্প্রতি বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর জন্য প্রস্তাবিত ইশতিয়াক আহমেদের বিরুদ্ধে শ্রম আদালতের বিচারক থাকাকালে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধেও। দুই বিচারকের বিরুদ্ধে দুদক মাঠে নামবে বলে জানা গেছে।

গত বছর কুষ্টিয়ার দুই বিচারকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে আইনজীবী সমিতি আইনমন্ত্রীর কাছে চিঠি দেয়। তাঁদের বিরুদ্ধেও দুদক অনুসন্ধানে নামবে বলে জানা গেছে।

আদালতে মামলাজট অগণিত। জরীপে জানা যায়, নতুন কোনো মামলা না হলেও জমে থাকা মামলার কার্যক্রম শেষ করতে দশ বছর লাগবে। এসব দৃষ্টান্তের পর আমরা যদি দেখি দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত বিচারপতিকে আদালতের সম্মান রক্ষায় দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে, উপরন্তু বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনতে যদি আদলতের অনুমতি গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয় তাহলে নিশ্চিতভাবেই বিতর্কিত হবে আদালত ও আইনের শাসন। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, বিচারপতিরা কি ডিভিনিটি দাবি করছে!


আরও সংবাদ