মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৭:৫৭ পূর্বাহ্ন
শীর্ষ সংবাদ
শেখ হাসিনাকে জন্মদিনে মোদী পাঠালেন ফুল, চীনের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন পঁচাত্তরের খুনিদের দায়মুক্তি অধ্যাদেশ “ধর্ষিত” মামুনের স্ক্রিনশপ জালিয়াতি ফাঁস : ইলিয়াস সহ সুশীলদের কটাক্ষ জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ : বিশ্ব সভায় বাংলা ভাষার প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্ব গার্ডিয়ানে প্রকাশিত শেখ হাসিনার নিবন্ধ: ‘আ থার্ড অফ মাই কান্ট্রি ওয়াজ জাস্ট আন্ডারওয়াটার। দ্য ওয়ার্ল্ড মাস্ট অ্যাক্ট অন ক্লাইমেট’ হেফাজতের কর্তৃত্ব যাচ্ছে দেওবন্দের কাফের ঘোষিত জামায়াতের কব্জায় ! অনলাইনে মিলছে টিসিবির পেঁয়াজ আজ টিউলিপ সিদ্দিকের জন্মদিন বাংলাদেশের সঙ্গে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়াতে চায় যুক্তরাষ্ট্র প্রধানমন্ত্রীকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ফোন

দলের শীর্ষ ও তৃণমূলের ভাবনায় চার দশকের কঠিন সময়ে বিএনপি !

ইবার্তা ডেস্ক
আপডেট : শুক্রবার, ৩১ আগস্ট, ২০১৮

দলের শীর্ষ ও তৃণমূলের ভাবনায় চার দশকের কঠিন সময়ে বিএনপি !

☮ বঙ্গবন্ধুকে অনুসরণ হবে, আমাদের প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। – সাবেক সেনা প্রধান মাহাবুবুর রহমান
☮ “উদ্ভট ইতিহাস এনে ও বেয়াদবি করে রাজনীতির শেষ আশাটুকু ধ্বংস করেছে তারেক রহমান!” – মেজর (অবঃ) আখতারুজ্জামান
☮ “আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কথা বলছি কিন্তু দেখাতে পারছি না প্রমাণ।”
☮ “ক্ষমতায় এসে টানা পাঁচ বার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হলাম।”
☮ “বিএনপি অকৃতজ্ঞ ও বেইমান বলে ভুলে গেছে আমরাই জিয়া ও খালেদাকে ক্ষমতায় এনেছিলাম।” – জামাত
☮ “জামাত শিবির গিলে খাচ্ছে দলকে।” – আশরাফি পাপিয়া
☮ “তারেক গঠনমূলক রাজনীতির পরিবর্তে এমন সব প্রচারণা চালায় যার সত‍্যতা পাওয়া যায় না, ফলে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অভিযোগ শুধু মুখেই সীমাবদ্ধ থাকে।”

প্রতিষ্ঠার চার দশকে এসে সবচেয়ে খারাপ সময় পার করছে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি। পাঁচ বছর সংসদের বাইরে থেকে নির্বাচনের বছরে এসে দলের চেয়ারপারসনের কারাবন্দী হওয়া, সিনিয়র ভাইস চেয়ারপারসন (বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন) তারেক রহমানের দেশে না ফেরা, শীর্ষ কয়েক নেতার বিরুদ্ধে মামলার রায়, জন্মলগ্ন থেকে মিত্র জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পর্ক, অন্তর্দলীয় কোন্দল, শীর্ষ নেতাদের পলায়ন বা নিষ্ক্রিয় থাকাসহ নানাবিধ কারণে গভীর বিপদে রয়েছে সাবেক সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের হাতে প্রতিষ্ঠিত দলটি।

বিএনপি সবচেয়ে বিব্রতকর অবস্থায় রয়েছে জামায়াতে ইসলামী নিয়ে। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক মহল জামাত সম্পর্কে নেতিবাচক। একই অবস্থান সুশীল ও সম্ভাব্য জোটের অংশীদারদেরও।

এদিকে, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মনোনয়ন নিয়ে বিএনপিকে অকৃতজ্ঞ বলে উল্লেখ করে সাবেক শিবির নেতা ও বর্তমানে জামাতের সিলেট মহানগর শাখার নেতা শামসুর রহমান লিখেছিলেন, “৭৫ এর পর অধ‍্যাপক গোলাম আযমকে দয়া করে দেশে আনা হয় নি, আমীরে জামায়াতের কারণেই অখ‍্যাত জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা দখল পাকিস্তান ও সৌদি আরব সহ অন্যান্য দেশের সমর্থন পেয়েছিল। … আমাদের সাংগঠনিক তৎপরতার কারণেই জিয়া ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করলেও তৃণমূলে প্রতিবাদ গড়ে ওঠেনি।”

খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেও বিএনপির ক্ষমতায় আসা সম্ভব হয়েছে জামায়াতের সহযোগিতার কারণে বলে উল্লেখ করে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন, জামায়াতকে ২০ দলীয় জোট থেকে বাহির করলে বিএনপি জাদুঘরে স্থান পাবে।”

বিএনপি বিপদ মোকাবিলায় বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও দৃশ্যপটে বাস্তবিক কোনো পরিবর্তন আনতে পুরোদস্তুর ব্যর্থ হয়েছে। ফলশ্রুতিতে বর্তমানে অনেকটা বিবৃতি-ব্রিফিংয়েই জীবিত আছে দলটি।

২০১৩-১৪ সালে সরকারবিরোধী আন্দোলনে নেমে ব্যর্থ হওয়ার পর চলতি বছরে দলীয় চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কারাদণ্ড হলেও জোরালো কোনো কর্মসূচির দিকে পা ফেলেনি বিএনপি। বিগত কয়েক মাস যাবৎ কাক ডাকা ভোর বা সকালে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে ঝটিকা মিছিল করতে দেখা গেছে রুহুল কবীর রিজভীকে।

বিএনপি নেতা মেজর (অবঃ) আখতারুজ্জামানের মতে, তারেক রহমান ইতিহাসের নামে উদ্ভট তত্ত্ব এনে শিক্ষিত ও সুশীল শ্রেণীর আস্থা হারিয়েছে এবং মায়ের বয়সী প্রধানমন্ত্রীকে নাম ধরে ও তুমি ডেকে ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে আমজনতার চক্ষুশূল হয়েছে।
তিনি বিএনপিকে ধ্বংসের জন্য তারেককেই দায়ী করে বলেন, “উদ্ভট ইতিহাস এনে ও বেয়াদবি করে রাজনীতির শেষ আশাটুকু ধ্বংস করে তারেক রহমান।”

বিএনপি নেত্রী আশরাফি পাপিয়ার মতে, জামাত শিবির ধর্মের নামে ভন্ডামি করার পাশাপাশি বিএনপিকেও গিলে খেয়েছে।

দলে ‘ঠোঁট কাঁটা’ হিসেবে পরিচিত বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আব্দুল আউয়াল খান এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘বিএনপি হলো উদার গণতান্ত্রিক মধ্যপন্থী দল। কিন্তু এ দল এখন সেই অবস্থানে নেই। আমরা অনেকটা আদর্শচ্যুত হয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠার চার দশকে এসে বিএনপি এখন হতাশাজনক পরিস্থিতিতে। দলের মধ্যে গঠনতন্ত্রের যে কাঠামো সেই চর্চা আমরা করতে পারছি না। কেন্দ্র থেকে কমিটি চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। জামায়াতের মতো কট্টরপন্থী দলের সঙ্গে আমাদের জোট বেঁধে চলতে হচ্ছে। ফলে ক্রমশই বিএনপিকে গ্রাস করছে তারা।’

তিনি আরও বলেন, ‘জিয়াউর রহমান নানা পথ-মতের অনুসারীদের নিয়ে দল গঠন করলেও তার সততা, দেশপ্রেম, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তন, বাক-স্বাধীনতাসহ যে নীতি-আদর্শ ছিল, সেগুলো ছিল জনমুখী। যার কারণে তার মৃত্যুর পরও এই দলকে এতোটা বেগ পোহাতে হয়নি, যেটা এখন পোহাতে হচ্ছে।’

ওই নেতা বলেন, ‘৯০-এ আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচার সরকার হটিয়ে খালেদা জিয়া আপসহীন নেত্রী হিসেবে ভূষিত হলেন এবং ’৯১তে আমরা সরকার গঠন করলাম। আমি মনে করি ৯১-৯৬ হচ্ছে সবচেয়ে সমৃদ্ধ সংসদ। এই সংসদে সব দলের বর্ষীয়ান নেতাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল। তারপর ৯৬ সালে ১১৬টা আসন নিয়ে আমরা বিরোধী দলে গেলাম, পরবর্তীতে (২০০১ সাল) ক্ষমতায় এসে টানা পাঁচ বার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হলাম। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কথা বলছি কিন্তু দেখাতে পারছি না প্রমাণ। নিজেদের আদর্শ থেকে দূরে সরে যাওয়ায় দলকে তার খেসারত এখন পর্যন্ত দিতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘তৎকালীন মহাসচিব প্রয়াত মান্নান ভূইয়াকে কোনঠাসা করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক একজন শিক্ষক তারেক রহমানকে সামনে এনে বিতর্কিত করে তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছেন। বিনিময়ে তিনি দলের প্রধান কার্যালয়ের জন্য নির্ধারিত জায়গায় নিজের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান করেছেন। এসব কেন? তারেক রহমানকে দলের সদস্য করে নির্বাচনের মাধ্যমে এমপি ও প্রধানমন্ত্রী বানালে আর বেগম খালেদা জিয়া দলীয় প্রধান থাকলে কী ক্ষতি হতো? ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার দায় খালেদা জিয়া বা বিএনপি এড়াতে পারে না। তিনি যতই বলেন ওই হামলার ঘটনা তিনি জানতেন না। কারণ এটা তার সরকারের সময় ঘটেছে। তিনি প্রশ্ন করেন লুৎফুজ্জমান বাবরকে মন্ত্রিসভা ও দল থেকে বহিষ্কার করলে বিএনপির কী এমন ক্ষতি হতো?’

বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, ‘আমাদের মনে রাখা উচিত বাংলাদেশের জনগণ সব সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়, আমরা রাজনৈতিক দলগুলো ভুল করি। গুটিকয়েক মানুষের ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে আজ দলকে মাশুল দিতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘বিএনপির ভীষণ রকমের জনসমর্থন রয়েছে। দলীয় কাঠামোর মধ্যে থেকে নেতৃত্ব যদি নেতাকর্মীদের ভাষা বুঝতে পারে তাহলে সাংগঠনিক অবস্থা আরও শক্তিশালী হবে, না হলে ভবিষ্যত অন্ধকার।’

বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন সময় দলটির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরামের সদস্য ছিলেন ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা, বর্তমানে তিনি আলাদা দল গঠন করছেন।

চার দশকে বিএনপির রাজনীতি প্রসঙ্গে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিএনপির কোনো স্তরে গণতান্ত্রিক চর্চা নেই, যার মাধ্যমে দলের নেতৃত্ব নির্বাচিত হয়। ওপর থেকে চাপিয়ে দেয়া কমিটি দিয়ে একটা বড় পার্টি চলতে পারে না, এটার পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন। ওয়ার্ড পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত কর্মীদের ইচ্ছার প্রতিফলনে পার্টির নেতৃত্ব নির্বাচিত হতে হবে। বিএনপিতে এখন পদ বাণিজ্য হচ্ছে টাকার বিনিময়ে। কমিটি চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। বিএনপির সবচেয়ে দুর্বল দিক হচ্ছে অভ্যন্তরীণ কোন্দল। এর কারণ হচ্ছে ওপর থেকে কমিটি চাপিয়ে দেয়া। নির্বাচনের মাধ্যমে কমিটি নির্বাচিত হলে এই কোন্দাল হতে পারতো না।’

চার দশকে বিএনপির রাজনীতি প্রসঙ্গে দলটির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক সেনা প্রধান লে. জে. (অব.) মাহাবুবুর রহমান বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু আমাদের দেশ স্বাধীন করেছেন সেখানে গণতন্ত্রের কথা বলা আছে। সেই ধারাটা যাতে অব্যাহত থাকে সেই চেষ্টা করতে হবে। বিএনপিকে একা নয় সবাইকে মিলে করতে হবে। আওয়ামী লীগকেও তার দলীয় রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আজকে দলীয় রাজনীতির নয়, জাতীয় গণতন্ত্র বাঁচানোর রাজনীতির কথা ভাবতে হবে।”

তিনি বলেন, আমাদের প্রয়োজন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। দেশ স্বাধীন করা যেমন বিরাট চ্যালেঞ্জ ছিল, তেমনি দেশের এই ক্রান্তিকাল উত্তরণে গণতন্ত্রের ওপর ভিত্তি করে এগিয়ে যেতে হবে।’

বিএনপির রাজনীতি সম্পর্কে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, তারেক গঠনমূলক রাজনীতির পরিবর্তে অর্ধশিক্ষিত কিছু সাংবাদিক ও উপদেষ্টা নিয়ে এমন সব প্রচারণা চালায় যা মিথ্যা প্রমাণ হয় কিংবা সত‍্যতা পাওয়া যায় না। যেমন পদ্মা সেতুতে দুর্নীতি মিথ্যা প্রমাণ হয়েছে।”
তিনি আরো বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা বা হলমার্ক কেলেঙ্কারির মত অভিযোগগুলো কিন্তু কোনোটাই আওয়ামী লীগ করেনি বা তাদের কেউ এতে জড়িত ছিল না তা সন্দেহাতীতভাবে সত‍্য। এক্ষেত্রে সমালোচনার গ্রাউন্ড হচ্ছে, সরকারে থাকার কারণে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ কেন্দ্রিক। ফলে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ আসুক তা শুধু মুখেই সীমাবদ্ধ থাকে। বিএনপিকে এটি বুঝেই প্রচারণা ও সাংগঠনিক কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। অন‍্যথায় সাফল্য আসবে না।”

বিএনপি নিয়ে দলের ভেতরে বাহিরে একটিই আলোচনা আর তা হচ্ছে আগামী কয়েক বছরে বিএনপির জন্য কোন ভালো সংবাদ নেই। তৃণমূল মোটেই রাজপথে নামতে ইচ্ছুক নয়, তার প্রমাণ খালেদার কারাদণ্ড। সবচেয়ে বড় কথা মূল দুই নেতা অর্থাৎ খালেদা ও তারেক যেখানে মাঠে নেই সেখানে মাঠের রাজনীতি চাঙ্গা হওয়ার কোনো সুযোগই নেই।


আরও সংবাদ