সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৪:৪৯ অপরাহ্ন

শেখ কামাল ও বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন

ইবার্তা ডেস্ক
আপডেট : মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২০

অঘোর মন্ডল: বয়স নিছক একটা সংখ্যা, যা দিয়ে মানুষের জীবনকে মাপা যায় না। শুধু তাঁর আয়ুটা বোঝা যায়। সংখ্যাটা কখনো মানুষের জীবনের ব্যাপ্তি আর প্রভাবকে বোঝা এবং বোঝানোর জন্য যথেষ্ট নয়। তবে যে মানুষটার জীবনের দৈর্ঘ্য মাত্র ২৬, তাঁকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে আজকের সমাজ, নতুন এই প্রজন্ম?

নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি তো অজানা! কারণ, তাদের আগের প্রজন্ম তাঁকে রেখেছে বিভ্রান্তির কুয়াশায় মুড়ে। পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে গোটা দুয়েক প্রজন্মের কাছে শেখ কামালকে উপস্থাপনই করা হয়েছে ভুলভাবে ও উদ্দেশ্য নিয়ে। এবং যাঁরা এই কাজটি করেছেন, তাঁরা শেখ কামালের খুব অপরিচতি ছিলেন, তা নয়। দু-একজন ছিলেন শেখ কামালের খুব কাছের, ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আর পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট যাদের গুলি শেখ কামালের বুককে ঝাঁঝরা করেছিল, তারাও তাঁর অপরিচিত নয়। রাইফেল হাতে কালো পোশাক পরা সেই লোকগুলোকে শেখ কামাল খুব ভালোভাবে চিনতেন। তাদের অনেকে মুক্তিযুদ্ধের শেষভাগে পাকিস্তান থেকে এসে শেখ কামালদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে শরিক হতে চেয়েছিলেন। আপাত দৃষ্টিতে হয়েছিলেন। কিন্তু তারা ভেতরে ভেতরে পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য বজায় রেখে শুধু মুক্তিযোদ্ধার মুখোশটা পরেছিলেন, যা পঁচাত্তরের সেই ঘটনার পর খসে পড়েছিল।

১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু পরিবারের প্রথম শহীদের নাম- শেখ কামাল। বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে। এই পরিচয়ের গণ্ডিতে অনেকে তাঁকে আটকে রাখার অপচেষ্টা এখনো করেন। কিন্তু বদলে যাওয়া সময়ে, পরিবর্তিত পরিপ্রেক্ষিতে শেখ কামালের অন্য পরিচয়গুলো সামনে আনা বেশি জরুরি। কারণ, এখন এমন একসময়, যখন ২৫-২৬ বছরের যুবক সন্ত্রাসী মন্ত্রে দীক্ষিত হচ্ছে। আত্মঘাতী হচ্ছে। তাদের হিতাহিত জ্ঞান লোপ পাচ্ছে। যাচ্ছে প্রাণ বির্সজনের অভিসারে! এই বাংলার বুকেও তাদের একই অভিসার। গুলশান-শোলাকিয়ায় মানুষ সেটা দেখেছে। গুলশান-শোলাকিয়ায় জঙ্গিরা মারো আর মরো মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে যেভাবে সন্ত্রাসী হামলা চালাল, তাতে সামাজিক অবক্ষয় আর মূল্যবোধের যে চরম অভাব দেখা দিয়েছে আমাদের তারুণ্যের- ওটাও এক রূপ।

বেয়াড়া-বিপথগামী তারুণ্যের আজকের এই ফ্রেমটা চশমা পরা শেখ কামাল হয়তো দেখতে পেয়েছিলেন একটু আগেভাগে। তাই মুক্তিযুদ্ধ শেষ করে, যুবসমাজ যাতে বিপথগামী না হয়, সেদিকেই নজর দিয়েছিলেন তিনি। যুবক, তরুণ, কিশোর, বাচ্চাদের মননের গঠন যাতে সঠিক হয়, সে কারণে তিনি তাঁদের ফেরাতে চেয়েছিলেন মাঠে। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। যুদ্ধবিধ্বস্ত এক দেশে মাত্র সাড়ে তিন বছরে তিনি সফল ছিলেন। সেই দাবি করলে তাকে অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। শেখ কামাল নিজে খেলোয়াড় ছিলেন। ক্রিকেট-বাস্কেটবল- ফুটবল। খেলেছেন সবই। ধানমণ্ডি ক্লাবের হয়ে খেলেছেন ফুটবল। উদিতি, আজাদ বয়েজের হয়ে খেলেছেন ক্রিকেট। মোহামেডানের হয়ে বাস্কেটবল। তাঁর ভেতরে একটা ক্রীড়াসত্তা ছিল। তাই দেশ স্বাধীনের পরই গড়ে তুললেন আবাহনী ক্রীড়াচক্র। যে আবাহনী আর শেখ কামাল সমার্থক। এখনকার প্রজন্ম হয়তো তাঁকে একটু মনে রাখছেন তাঁর নিজের হাতে গড়া আবাহনীর কারণে। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে আধুনিকতার ছোঁয়া তো আবাহনীর হাত ধরেই। এবং সেটা অবশ্যই শেখ কামালের মস্কিষ্কজাত।

শেখ কামাল ক্রীড়া সংগঠক। আবাহনীর প্রতিষ্ঠাতা। সবই ঠিক আছে। কিন্তু তিনি তো ক্রীড়াবিদও। যিনি খেলাধুলার স্পিরিটে বিশ্বাসী ছিলেন। তাই তাঁর নিজের হাতে গড়া আবাহনীর হয়ে ক্রিকেট খেলতে নামলেও মাঠে ক্যাপ্টেন আলিউল ইসলামই ছিলেন তাঁর ‘স্কিপার’। লিডার। আর তাই আবাহনীর পেসার শেখ কামাল এক ম্যাচে প্রথম দুই ওভারে লাইন-লেংথ ঠিক রেখে বল করতে না পারায় তাঁর ক্যাপ্টেন আলিউল ইসলাম কাছে গিয়ে বলেছিলেন, ‘যার ম্যাচ ফিটনেসে ঘাটতি আছে, আমার দলে আজ তাঁকে দরকার নেই। যাও, ড্রেসিংরুমে যাও। রেস্ট নাও। টুয়েলভথ ম্যানকে পাঠাও।’ বিনাবাক্য ব্যয়ে অধিনায়কের কথাকে শেষ কথা ধরে নিয়ে মাঠ ছেড়ে গিয়েছিলেন শেখ কামাল। ক্রিকেট শুধু একটা খেলা না। ক্রিকেট একটা স্পিরিট। একটা দর্শন। সেটায় বিশ্বাস ছিল বলেই ক্লাব সভাপতি হয়েও তিনি মাঠ ছেড়ে যেতে পারেন। দেশের প্রেসিডেন্টের ছেলে হয়েও কোনো শব্দ খরচ করেননি তিনি। কারণ শেখ কামাল ক্লাব সভাপতি হওয়া কিংবা দেশের প্রেসিডেন্টের ছেলে হওয়ার আগেই ছিলেন ক্রিকেটার। তাই খেলাটার স্পিরিটের প্রতি ছিল তাঁর প্রগাঢ় বিশ্বাস। একই ভাবে জয়-পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিকতায়ও সামান্য চিড় ধরেনি কখনো তাঁর। সেটা তাঁর টিমের ফুটবলার-ক্রিকেটারদের মুখ থেকে শুনেছি বহুবার। এবং সেটা তাঁরা বলেছেন কাউকে খুশি করার জন্য নয়। অথবা পাঁচ ফুট সাড়ে ১০ ইঞ্চির শেখ কামালকে টেনে বড় করার জন্যও নয়।

অতীতে অবশ্য অনেকে শেখ কামালকে খাটো করার ব্যর্থ চেষ্টা করেছেন। এখন আবার অনেকে তাঁকে নিয়ে বেশি বলতে গিয়ে ভদ্রলোকের মেধা-মনন-যোগ্যতা-দূরদর্শিতাকে ছোট করছেন নিজেদের অজান্তে। শেখ কামাল-শেখ জামালের ক্রীড়ানুরাগী হয়ে ওঠা সেটা তাঁদের পারিবারিক উত্তরাধিকার। ইতিহাসবিদ এবং সমাজতাত্ত্বিকরা সে কথাই বলবেন। কারণ, বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর বাবা নিজেরাও ক্রীড়ানুরাগী ছিলেন। সুতরাং তাঁদের উত্তরাধিকারীদের রক্তে ক্রীড়া নামক ‘হিমোগ্লোবিন’-শূন্যতা দেখা দেবে কীভাবে? বরং শেখ কামালের ক্রীড়াপ্রেম কোন পর্যায়ে ছিল সেটা বোঝা যায় তাঁর জীবনসঙ্গিনীকে বেছে নেওয়া দেখেও। সুলতানা খুকু। দেশবরণ্য নারী অ্যাথলেটকেই বিয়ে করেছিলেন শেখ কামাল। নারীদের খেলাধুলা যাতে কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত না হয় সে কারণে, ধানমণ্ডির মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সের জায়গাটাও খুঁজে বের করলেন শেখ কামাল। খেলাধুলা ছিল তাঁদের পরিবারের মানুষগুলোর হৃদয়ের বড় একটা অংশজুড়ে।

বছর খানেক আগে ভারতের সাবেক ক্রিকেট অধিনায়ক রবি শাস্ত্রী ঢাকায় এসে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে। সেখানে দেখলেন একটা ক্রিকেট বল। গোটা তিনেক ব্যাট। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে থমকে যাচ্ছিলেন শাস্ত্রী। রক্তমাখা বাড়িটা দেখে বাকরুদ্ধ ছিলেন কিছুক্ষণ। কিন্তু তিনতলার একটা ঘরে তিনটা ব্যাট দেখে বলে উঠলেন, ‘এই বাড়িতে তাহলে ক্রিকেটারও ছিলেন?’ হ্যাঁ, ছিলেন। যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে খেলেছেন। খেলছেন দেশের সেই সময়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ের লিগে প্রতিষ্ঠিত ক্লাবগুলোর হয়ে। বঙ্গবন্ধু জাদুঘর পরিদর্শন শেষে শাস্ত্রী পরিদর্শন বইয়ে লিখে গেছেন, ‘বাংলাদেশে কেউ এলে এই বাড়িটা ঘুরে যাওয়া উচিত।’ কেন? তার ব্যাখ্যা দেওয়ার দরকার পড়ে না। তবুও শাস্ত্রী এই লেখককে একটা কথা বলেছিলেন, ‘শুধু ইতিহাসমনস্ক মানুষ বাংলাদেশের ইতিহাস জানতে পারবেন এ বাড়িতে এলে তা নয়। ষাট আর সত্তর দশকে এপারের মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের যাপিত জীবনের চিত্রটাও খুঁজে পাবেন তাঁরা। খুঁজে পাবেন বাঙালির অফুরান ফুটবল আবেগের মধ্যেও কিছু ক্রিকেটীয় ভালোবাসার নমুনা।’

বাঙালি এখন ক্রিকেটপাগল জাতি। ক্রিকেটীয় আবেগে ভাসে তারা। ক্রিকেটারদের জাতীয় বীরের বেদিতে বসিয়ে দিতেও তারা দ্বিতীয়বার ভাবে না। কিন্তু যে লোকটা নিজে ক্রিকেট খেলেছেন। যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশে ক্রিকেটের মতো ব্যয়বহুল খেলাকে প্রাধান্য দেওয়া ঠিক হবে কি হবে না, এই প্রশ্নে সরকারপ্রধান থেকে দেশের অর্থমন্ত্রীকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন, খেলাটা রাজার নয়। বরং খেলার রাজা। এর চর্চা কেন থাকবে না আমাদের দেশে? সেই লোকটাকে এ দেশের ক্রিকেটকর্তা থেকে ক্রিকেটার, কিংবা সামগ্রিকভাবে ক্রিকেট সমাজ কখনো কি তাঁকে সেভাবে মনে করেছেন? শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন? এমনকি বঙ্গবন্ধুর প্রতিও কি আমাদের খেলোয়াড়রা যথেষ্ট শ্রদ্ধা দেখাতে পারছেন? বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকার সময় কোনো জাতীয় দল কোনো টুর্নামেন্ট খেলতে গেলে তাঁর সঙ্গে দেখা করে যেতেন। সেটা প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাঁরা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আশীর্বাদপ্রার্থী। এখন খেলোয়াড়রা একটু কিছু অর্জন করলেই প্রধানমন্ত্রী ভবনে ছুটে যান। সঙ্গে যান একদল কর্মকর্তা। এবং তার প্রায় পুরোটাই থাকে সাফল্যের ভাগাভাগির চিত্র ক্যামেরাবন্দির জন্য। শেখ কামালের ক্রীড়া দর্শনে এই সাফল্য ভাগাভাগির অধ্যায়টি ছিল না।

বেঁচে থাকলে শেখ কামালের বয়স হতো ৬৭। তাঁর ২৬ বছরের জীবনের ইমেজারি রিওয়াইন্ড করলে অনেক কিছু হয়তো দেখা যাবে। যেটা ঠিক অক্ষরে অক্ষরে শব্দমালা দিয়ে পরিষ্কার বোঝানো কঠিন। তবে কল্পিত তাঁর জীবনের বাকি ৪১ বছর নিয়ে ভাবলে একটা কথাই মনে হতে পারে, ‘ইস! লোকটা যদি বেঁচে থাকতেন! হয় তো তাঁর আবাহনী এই চেহারা নিয়ে এখনো দাঁড়িয়ে থাকত না! বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের চেহারাটাও বোধহয় এতটা রুগণ থাকত না!’

ওপারে বসে শেখ কামাল কী ভাবছেন জানি না। তবে এপারে বসে এক ক্রীড়া সাংবাদিক সত্তর দশকের গোড়ার দিকের বিভিন্ন দৈনিকের খেলার খবরের পাতা ওল্টাতে গিয়ে দেখছেন, ‘৭৪ সালে শেখ কামাল বলেছিলেন, খেলাধুলার মাধ্যমেই বিশ্বে একদিন বাংলাদেশের পতাকা উড়বে অনেক উঁচুতে। সিদ্দিকুর রিও অলিম্পিকে বাংলাদেশের পতাকা বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। ক্রিকেটে বাংলাদেশ টেস্ট খেলছে। বিশ্বকাপ খেলছে। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ভারতের মতো বড় দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ টক্কর দিচ্ছে। বিদেশের মাটিতে অজস্র বাঙালি ‘বাংলাদেশ’ বলে স্লোগান দিচ্ছেন বাংলাদেশের ক্রিকেট ম্যাচ দেখার সময়। খেলার মাঠে শেখ কামাল তো এরকম এক বাংলাদেশেরই স্বপ্ন দেখেছিলেন।

২৬ বছর বয়সে আজকের বাংলাদেশেই বা ওই স্বপ্ন দেখতে পারেন কজন? ওখানেই ছিলেন শেখ কামাল স্বতন্ত্র। যে স্বাতন্ত্র্যের ছাপ ছিল তাঁর জীবনধারায়। জীবনচর্চায়।


আরও সংবাদ