সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০২:২৫ অপরাহ্ন

কোটি মুজিবের জন্মক্ষণ রক্তঝরা আগস্ট

ইবার্তা ডেস্ক
আপডেট : শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২০

মোসাঃ সেলিনা আকতার: যে মানুষটি শারীরিকভাবে উপস্থিত নেই; অথচ তাঁর নামে পরিচালিত হচ্ছে একটি জাতির মুক্তির সংগ্রাম বা স্বাধীনতা যুদ্ধ। তাঁরই সম্মোহনী ডাকে সাড়া দিয়ে লাখ লাখ মানুষ অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিচ্ছে হাসিমুখে, এসব দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে বিরল। পৃথিবীর সুদীর্ঘ ইতিহাসে এমন মহান নেতাই বা ক’জন আছেন? তিনি জন্মেছিলেন বাংলা মায়ের কোলে। টুঙ্গিপাড়ার অজপাড়াগাঁয়ে। বাংলার কাদা জলে তাঁর বেড়ে ওঠা। বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র ব্রত। তিনি আমাদের মহান স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালী জাতির ইতিহাসে এমনই একটি বেদনাবিধূর দিন যা কখনও ভুলবার নয়। শ্রাবণের সেই রাতে আকাশে ভয়াল কালো মেঘের গর্জন হয়েছিল। কিন্তু বৃষ্টি নয় ঝরেছিল রক্ত। ঘাতকের বুলেটের আঘাতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের মতো বিশাল বুক থেকে রক্ত ঝরেছিল। রক্ত ঝরেছিল তাঁর পরিবারের প্রাণপ্রিয় সদস্যদের বুক থেকে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সেই রক্ত যেন রক্তজবার মতো ফুটে আছে প্রতিটি বাঙালীর হৃদয়ে।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। এর কারণও ছিল বটে- তার রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তিই ছিল ন্যায় ও সাম্য। দেশপ্রেম ও সরলতা ছিল তার চরিত্রের ভূষণ, নমনীয়তা, বিনয়, শিষ্টাচার ও চারিত্র্যিক দৃঢ়তা বঙ্গবন্ধুকে করেছে অসম্ভব জনপ্রিয়। জীবন-যাপনে বঙ্গবন্ধুকে অন্য দশজন সাধারণ বাঙালী থেকে আলাদা করা কঠিন ছিল। চলনে বলনে, পোশাকে পরিচ্ছদে, ভাবনায়-কল্পনায় তিনি ছিলেন একজন পুরোদস্তুর বাঙালী। বিলাসবহুল বাড়ি, গাড়ি তাকে কখনও আকর্ষণ করেনি। সুরম্য সুরক্ষিত বঙ্গভবন ছেড়ে তিনি নেমে এসেছিলেন বত্রিশ নম্বর ধানম-ির নিজস্ব বাড়িতে। বঙ্গবন্ধুর বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার পিছনে কাজ করেছিল দুর্লভ চারিত্র্যিক দৃঢ়তা। শৈশব-কৈশোর থেকে তিনি লক্ষ্য স্থির করে নিয়েছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল বাংলার স্বাধীনতা ও বাঙালী জাতিসত্তা প্রতিষ্ঠা। তিনি অন্য কারও সাহায্যে নয় নিজেই নিজেকে প্রস্তুত করে তোলেন। অথচ আমরা দেখি কি অমুক ভাই তমুককে নেতা বানিয়েছে। অমুক তমুককে পোস্ট পাইয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ নিজগুণে নয় ভাইয়ের তোষামোদি করে নেতা। তাহলে ঐ নেতা পরবর্তীতে ভাইয়ের পা চাটা ছাড়া কোন উপায় আছে বলে তো আমার মনে হয় না।

অনেক নামে তাঁকে ডাকা হতো। বাংলার নয়নমণি, বঙ্গশার্দুল, অবিসংবাদিত নেতা, বাঙালীর মুক্তিদাতা। বিভিন্ন নামে ভূষিত করা হলেও অপূর্ণ ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের উপাধি। সে অপূর্ণতা পূরণ হয় ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯। আর ঐতিহাসিক হয়ে গেল সেদিনের তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আয়োজিত গণসংবর্ধনা সমাবেশ। সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমানকে নতুন উপাধিতে ভূষিত করার। ডাকসু ভিপি সেদিন গণমাধ্যমে বলেছিলেন ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটির অর্থ সে কি বিশাল! তিনিই বঙ্গবন্ধু যিনি ভালবাসেন, শুধু ভালবাসেন না; ভালবাসার জন্য আপোসহীন আমৃত্যু সংগ্রাম করেন। যার ভালবাসা নির্লোভ-নিঃস্বার্থ। তিনি বাঙালী জাতীয়তাবাদের বন্ধু, বাঙালীর মুক্তি সংগ্রামের বন্ধু। সুতরাং তিনিই আমাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আগুনে পুড়ে পুড়ে যেমন সোনা খাঁটি হয় তেমনি আন্দোলন-সংগ্রামে পুড়ে পুড়ে ইস্পাত কঠিন হয়েছিলেন শেখ মুজিব। আমরা দেখতে পাই অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অর্জিত রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতায়ও তিনি সমসাময়িক অনেকের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। দক্ষ সংগঠক ও তরুণ নেতা হিসেবে খ্যাত শেখ মুজিব তাঁর চেয়ে বয়সে প্রবীণ, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় অগ্রসর কিংবা জেল জুলুম খাটা ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় পোড় খাওয়া সব নেতাকে ছাপিয়ে পূর্ব বাংলার জনগণের অবিসংবাদিত নেতা হয়ে উঠেছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মকে কেবল ইতিহাসের পটে রেখে স্মরণ করলে তাঁকে আংশিক পাওয়া যাবে। তাঁকে পাওয়া ও বোঝা পূর্ণতা পাবে তাঁর অর্জন ও অবদানকে একই সঙ্গে বর্তমান প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করলে। ইতিহাস চলে তার আপন গতিতে। সময় নির্ধারণ করে দেয় ইতিহাসের গতিপ্রবাহ। তবে পৃথিবীতে কিছু মহা মানব তাঁদের কর্ম ও দর্শনের মাধ্যমে সেই সময়কে দেয় নতুন মাত্রা। তাঁরা নির্মাণ করেন সমাজ, সংস্কৃতি আর অর্থনৈতিক মুক্তির পথ। স্থান কালের সীমানা পেরিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তাঁরা থাকেন আমাদের কোটি কোটি হৃদয়ের অন্তঃস্থলে অনুপ্রেরণা আর ভরসার সমোহনী শক্তি হিসেবে।

১৫ আগস্ট পৃথিবীর ইতিহাসে বর্বরতম হত্যাকা-ের সাক্ষী। অনেকে বলেন এটি নিছক হত্যাকা- ছিল। কিছু মানুষ বঙ্গবন্ধুর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল সেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ হত্যাকা-। এই ব্যাখ্যা ভুল। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পিছনে দেশী বিদেশী ষড়যন্ত্র হয়েছে যার রূপায়ণ ঘটেছে বিপথগামী একদল সেনা অফিসারদের মাধ্যমে। বঙ্গবন্ধু ছিলেন একটি আদর্শের প্রতীক। তাঁকে সপরিবারে হত্যা করা ছিল সেই আদর্শকে সমূলে বিনাশ করা। কিন্তু নির্বোধ আর মূর্খের দুঃসাহস বরাবরই বেশি থাকে। মূর্খতা ও মূঢ়তার বশবর্তী হয়েই খুনীরা সেদিন বাঙালীদের হৃদয় থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলার এক দুঃস্বপ্ন দেখেছিল। এ কূপম-ুকতার কি কোন জবাব আছে! বরেণ্য সাংবাদিক সন্তোষ গুপ্ত অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলেন বঙ্গবন্ধুর মর্মস্পর্শী মৃত্যু, এ যেন কোটি হৃদয়ে বঙ্গবন্ধুর নতুন করে দ্বিগুণ শক্তিতে জেগে ওঠা। তার সাহিত্যের ভাষার সরল অর্থ এই যে, একি সম্ভব যে, জোনাকি পোকা চাঁদের দ্যুতি হরণ করে নেবে? সিংহের বিক্রমে বনে দাপিয়ে বেড়াবে ছাগল? মেঘও কদাচিৎ সূর্যের মুখ ঢেকে দিতে পারে বটে তবে তা সাময়িক। কিন্তু সূর্য পুরো দিবসের। তাকে ঢেকে রাখার যত অপচেষ্টাই করা হোক না কেন তা আপন রূপে উদ্ভাসিত হবেই। বাংলার ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি মধ্যাহ্নের মার্ত-ের মতো। তাঁকে ঢেকে রাখার বা অস্বীকার করার সাধ্য কারও নেই। কিন্তু মূর্খদের তো তা জানার কথা নয়।

১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার সেই হৃদয়বিদারক সংবাদটি শোনার পর তাৎক্ষণিকভাবে সাহিত্যিক-সাংবাদিক আবু জাফর শামসুদ্দিন তার ডায়েরিতে লিখেছিলেন, মৃত মুজিব জীবিত মুজিবের চেয়ে বেশি শক্তিশালী রূপে আবির্ভূত হবেন। দ্য টাইমস অব লন্ডনের ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট সংখ্যায় উল্লেখ করা হয়, ‘সবকিছু সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুকে সব সময় স্মরণ করা হবে। কারণ তাঁকে ছাড়া বাংলাদেশের বাস্তব কোনও অস্তিত্ব নেই। তাদের এ ভবিষ্যদ্বানীর আমোঘতা প্রত্যক্ষ করার জন্য জাতিকে খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। জাতির বিবেকই সেদিন কথা বলে উঠেছিল। কেঁদে উঠেছিল মুজিবময় লক্ষ কোটি হৃদয়। আর তা যথারীতি মূর্ত হয়ে উঠেছিল কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীদের লেখায়, রেখায় ও তুলিতে। বাদ যায়নি রাখালের বাঁশি কিংবা বাউলের একতারাও। সাধারণ মানুষের কোটি হৃদয়ের জমিনে অতি সযতনে মুজিব হত্যার শোক মুজিব আদর্শের দানা বেঁধে পরিণত হয়েছিল এক একটি বীজে। সেই প্রতিটি বীজে শিশু মুজিব ভ্রƒণ হয়ে সুপ্ত অবস্থায় লুকিয়েছিল কোটি বাঙালীর হৃদয়ে আর অপেক্ষায় ছিল অনুকূল পরিবেশে অঙ্কুরোদগমের। আজ বঙ্গবন্ধুকন্যা সরকারপ্রধান। সমগ্র বাংলায় মুজিব চর্চার অনুকূল পরিবেশ বিদ্যমান। এই অনুকূল পরিবেশে মুজিব আদর্শের সেই ত্রাণ অঙ্কুরিত হয়ে পত্র- পল্লবে, ফুলে-ফলে সু-শোভিত হয়ে সমগ্র বাংলায় বিস্তৃতি লাভ করবে। একদিন মুজিব আদর্শের এই সু-শোভিত বৃক্ষগুলো শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে মহীরুহে পরিণত হয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় ছায়া দান করবে আর ছড়িয়ে দিবে মুজিব আদর্শের নব নব সম্ভাবনা। এই বিশ্বাসই হোক আমাদের শোককে শক্তিতে রূপান্তরের শপথ। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, দেশীয় ও বৈশি^ক ভাবনার ক্ষেত্রে আমরা ভীষণ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছি দিনকে দিন। সে কারণেই সৃষ্টি হয়নি নতুন করে বড় কোন ধরনের তরুণ বুদ্ধিজীবী সমাজ। এই আত্মকেন্দ্রিকতার কারণেই আমরা লক্ষ্যচ্যুত হয়ে পড়েছি শোককে শক্তিতে রূপান্তরের শপথ থেকে।

তাই জাতীয় শোক দিবসের এই দিনে আসুন কণ্ঠস্বর তুলি- আর নয় সুপ্ততা! এবার জেগে উঠি মুজিব আদর্শে উদ্দীপ্ত কোটি প্রাণ। এইতো সঠিক সময় নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার পিতার আদর্শের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার মননে ও কর্মে। যে বাংলায় থাকবে না কোন সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, আত্মকেন্দ্রিকতা, জঙ্গীবাদ, ভোগসর্বস্বতা, মাদক ও নেশার করাল গ্রাস। বঙ্গবন্ধু এদেশের প্রতিটি মানুষের অন্তরে চির ভাস্বর, চির অম্লান হয়ে আছেন, থাকবেন অপার ভালবাসা ও শ্রদ্ধায়। মুজিব আদর্শ ছড়িয়ে পড়বে কোটি হৃদয় থেকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। এভাবেই প্রতিবছর রক্তঝরা আগস্ট আসবে বাংলার ইতিহাসে দেশ গড়ার সুদৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে আগামী প্রজন্মের কাছে কোটি মুজিবের জন্মক্ষণ রূপে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক


আরও সংবাদ