1. [email protected] : অনলাইন ডেস্ক : অনলাইন ডেস্ক
  2. [email protected] : নিজস্ব প্রতিবেদক : নিজস্ব প্রতিবেদক
  3. [email protected] : নিউজ এডিটর : নিউজ এডিটর
মোশতাক-জিয়ার পরিকল্পনাতেই আগস্ট হত্যাযজ্ঞ - ebarta24.com
  1. [email protected] : অনলাইন ডেস্ক : অনলাইন ডেস্ক
  2. [email protected] : নিজস্ব প্রতিবেদক : নিজস্ব প্রতিবেদক
  3. [email protected] : নিউজ এডিটর : নিউজ এডিটর
মোশতাক-জিয়ার পরিকল্পনাতেই আগস্ট হত্যাযজ্ঞ - ebarta24.com
বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৯:১৭ অপরাহ্ন

মোশতাক-জিয়ার পরিকল্পনাতেই আগস্ট হত্যাযজ্ঞ

সম্পাদনা:
  • সর্বশেষ আপডেট : শুক্রবার, ১৩ আগস্ট, ২০২১

কাওসার রহমান: ১৫ আগস্ট ভোরে ধানম-ির দুই বাসায় এবং ২৭ নম্বর মিন্টো রোডের এক বাসায় যা যা ঘটে, তার প্রস্তুতি শুরু হয় ১৪ আগস্ট বিকেল থেকে। অবসরপ্রাপ্ত মেজর শাহরিয়ার রশিদ খানের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে তাকে গাড়িতে উঠিয়ে খন্দকার মোশতাকের পুরান ঢাকার বাসায় যায় মেজর রশিদ ও মেজর নূর চৌধুরী। মোশতাক অনেক চিন্তিত। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দুপুর থেকে পানি ছাড়া আর কিছুই খাননি। কাদের অপেক্ষায় যেন সময় কাটছে না। মেজর রশিদরা আসতেই বসার ঘরের দরজা খুলে দিলেন মোশতাক। মেজর রশিদ ঠান্ডা মাথায় ঘরে ঢুকে নিজ হাতে বসার ঘরের দরজা আটকে দিল। খন্দকার মোশতাককে উদ্দেশ করে বলল, ‘ডোন্ট বি সো নার্ভাস, স্যার। ইউ হ্যাভ আ লট টু ডু ফ্রম টুমরো মর্নিং।’

এ কথা শুনে মোশতাক হঠাৎই খেপে গেল। উঠে দাঁড়িয়ে রশিদকে বকা ভাষায় বলল, ‘বিয়িং মাই রিলেটিভ, ইউ শুড হ্যাভ নোন মি বেটার। আই এ্যাম নট নার্ভাস, আই এ্যাম জাস্ট এ্যাংকশাস এ্যাবাউট হাউ মাচ ইফিশিয়েন্টলি ইউ কিডস আর ক্যাপাবল অব হ্যান্ডলিং অল দিস।’

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর খন্দকার মোশতাককে যে ক্ষমতায় নিয়ে আসা হবে তার পূর্ব প্রস্তুতি তো আগেই সেরে রাখা হয়েছে। শুধু চূড়ান্ত কিলিং মিশনের আগে ১৪ আগস্ট বিকেলে সব ঠিক-ঠাক আছে কিনা তা যাচাই করতে গিয়েছিল মেজর রশিদ ও মেজর নূর চৌধুরীরা। এই যে প্রস্তুতি পর্ব তার সিগ্যনাল তো ফারুক রশিদকে জিয়াউর রহমান আগেই দিয়ে দিয়েছেন। সাংবাদিক এ্যান্থনি মাসকারেনহাসকে দেয়া সাক্ষাতকারে তারা জানিয়েছেন, ১৫ আগস্টের অনেক আগেই জিয়াকে তারা এ বিষয়টি অবহিত করেন। ’৭৫ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে যখন সৈয়দ ফারুক রহমান জিয়ার বাসায় যান তখন জিয়া তাকে ঘরের বাইরে বাড়ির লনে নিয়ে গিয়ে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করেন। মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজকে ১৯৯৭ সালে ইউরোপে দেয়া এক সাক্ষাতকারেও খন্দকার আব্দুর রশিদ বিস্তারিত জানান। সে জোরালোভাবে জানায়, ‘১৫ আগস্ট হত্যাকা-ের আগে রশিদ অনেকবার জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাত করেছে। ফলে জিয়া আগস্ট হত্যাকান্ডের সব কিছুই জানে।’

হত্যাকা-ের আগে জিয়ার সঙ্গে ফারুক-রশিদের সাক্ষাত এবং আলোচনা যে আরও অনেক বার হয়েছে তার প্রমাণ মেলে রশিদের স্ত্রী জোবায়দা রশিদের একটি বক্তব্য থেকে। তিনি বলেন, ‘একদিন রাতে ফারুক জিয়ার বাসা থেকে ফিরে এসে আমার স্বামীকে (রশিদ) জানায়, সরকার পরিবর্তন হলে জিয়া প্রেসিডেন্ট হতে চায়। শুধু তাই নয়, জিয়া আরও বলে, যদি মিশন সফল হয় তবে আমার কাছে এসো, আর যদি ব্যর্থ হয় তবে আমাকে এর সঙ্গে জড়াবে না।’

এরপরও কি আর প্রমাণ বাকি থাকে জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত নয়। জিয়া-মোশতাকের সবুজ সঙ্কেত পেয়েই তো খুনীরা ১৫ আগস্ট ভোর রাতে হত্যাযজ্ঞের মিশনে নামে। তখন কে এম সফিউল্লাহ সেনাবাহিনী প্রধান থাকলেও প্রকৃত অর্থে তার কোন ক্ষমতা ছিল না। বরং পাকিস্তান ফেরত সেনা কর্মকর্তাদের একাংশ দেশে ফিরে এসে জিয়ার সঙ্গে যোগ দেয়ায় সেনা বাহিনীতে জিয়ামুখী একটি মেরুকরণ তৈরি হয়। সেই মেরুকরণটিই সেনাবাহিনীতে জিয়ার হাতকে শক্তিশালী করে এবং হত্যাকান্ডের পেছনে মুখ্য ভূমিকা রাখতে সাহায্য করে।

খন্দকার মোশতাক তার প্রথম বেতার ভাষণে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের বিষয়ে ‘টু’ শব্দটি করেনি। মোশতাক আহমেদের প্রথম বেতার ভাষণের পূর্ণ বিবরণ পাওয়া যায় দৈনিক বাংলা পত্রিকায়। যেখানে তিনি দাবি করেছিলেন, ‘জাতির সামনে ‘অভূতপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি করেছেন’। ‘আরব ভাইদের ন্যায়সঙ্গত’ সংগ্রামে সমর্থন জানানোর পাশাপাশি, সর্বপ্রকার কলুষ থেকে দেশকে রক্ষা করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।’ তার ভাষণে মানুষকে মনে করানোর চেষ্টা হয়েছিল আসলে দেশে কিছুই ঘটেনি, সব স্বাভাবিক আছে। যদি সব স্বাভাবিকই থাকে তাহলে মোশতাকের মতো একজন বিশ্বাসঘাতক কি করে বাণিজ্যমন্ত্রী থেকে দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে বেতার ভাষণ দেন। এটি কি মানুষের বুঝতে তখন বাকি ছিল?

মোশতাকের অবস্থানকে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রকারী উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের তদন্তকারীরা বলছেন, ‘তাকে (মোশতাক) এই মামলায় বিচারের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি ঠিকই, কিন্তু মাস্টারমাইন্ডের তালিকায় তার নাম ছিল। কারণ, এই জঘন্য খেলার অংশীদার ছিলেন তিনি।’

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তৎকালীন সেনাবাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল কেএম শফিউল্লাহ, নৌবাহিনীর প্রধান রিয়ার এ্যাডমিরাল মোশাররফ হোসেন খান এবং বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল একে খন্দকার এসে খন্দকার মোশতাকের আনুগত্য প্রকাশ করেন। পরের দিনের পত্রিকায় ‘সবকিছু নিয়ন্ত্রণে’, ‘সব কাজ শুরু হচ্ছে’ এ ধরনের বক্তব্যে ভরে ওঠে পত্রিকার পাতা। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, তিন বাহিনীর তিন প্রধানের এই ঘোষণার পর ‘বিদ্রোহ’ দমনের সামান্য সম্ভাবনাটুকুও নিভে যায়। আসলে এর সবই হয়েছে মাস্টারমাইন্ডদের পূর্ব পরিকল্পনা মতো।

তার ওপর রাষ্ট্রপতির ভার অর্পণের বিষয়ে মোশতাক বলেন, ‘প্রিয় দেশবাসী ভাই-বোনেরা, এক ঐতিহাসিক প্রয়োজনে এবং বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের সঠিক ও সত্যিকারের আকাক্সক্ষাকে বাস্তবে রূপদানের পুত পবিত্র দায়িত্ব সামগ্রিক ও সমষ্টিগতভাবে সম্পাদনের জন্য পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালা ও বাংলাদেশের গণমানুষের দোয়ার ওপর ভরসা করে রাষ্ট্রপতি হিসেবে সরকারের দায়িত্ব আমার ওপর অর্পিত হয়েছে।’

পরিকল্পিত নীল নকশায় বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর ক্ষমতা দখলকে জায়েজ করার জন্য খন্দকার মোশতাক নানা ছল-ছাতুরি ও চালাকির আশ্রয় নেয়। সাধারণ মানুষ অন্ধকারে থাকায় মোশতাকের পক্ষে এই চালাকি বা চাতুরি করা সম্ভব হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে যে তার মতো কুলাঙ্গারের পক্ষে কোন দিন বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা সম্ভব হতো না তা বোধকরি তিনি ভুলে গিয়েছিলেন ক্ষমতার মোহে। খুনীরা রাতের অন্ধকারে চোরাপথে গিয়ে ক্যু না করে দিনের আলোতে ক্যু করতে গেলে জনগণের তোড়ে কোথায় ভেসে যেত?

তার এই বক্তব্যকে চালাকি আখ্যা দিয়ে ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন বলেছেন, এ ধরনের মিথ্যাচার ষড়যন্ত্রকারীদের পক্ষে করা সম্ভব। তার ওপর কে দায়িত্ব দিয়েছে এবং কি প্রক্রিয়ায় সে দায়িত্ব নিয়েছে সেটার সাক্ষী ইতিহাস।

খন্দকার মোশতাকের প্রথম ভাষণেই স্পষ্ট হয়ে যায় বঙ্গবন্ধুবিহীন বাংলাদেশ কোন পথে পরিচালিত হবে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে বঙ্গবন্ধুর মূল নীতি তিনি অব্যাহত রাখেন। প্রথম ভাষণে ঘোষণা দেন ‘বর্ণবাদ, বর্ণ বৈষম্যবাদ, উপনিবেশবাদবিরোধী আমাদের নীতি অব্যাহত থাকবে।’ ইসলামী সম্মেলন, কমনওয়েলথ ও জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সস্পর্ক অটুট রাখার ঘোষণা দেন মোশতাক। তবে পাকিস্তানী কায়দায় দেশ পরিচালনার জন্য তিনি নিজেই জিন্নাহ টুপি মাথায় দিয়ে জনসম্মুখে হাজির হন। তার আগে মেজর ডালিম রেডিও স্টেশন দখল করে বাংলাদেশকে একটি ইসলামিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা দেন। পরদিন জুলফিকার আলী ভুট্টোও ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানান এবং এই ধারণা সৌদি আরবকেও দেয়ার চেষ্টা করেন। ধর্মনিরপেক্ষ একটি রাষ্ট্রকে রাতারাতি ইসলামিক প্রজাতন্ত্র তৈরির চেষ্টা করা হয়। যার সবই ছিল ধর্ম নিরপেক্ষতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিসর্জন দিয়ে বাংলাদেশকে আর একটি পাকিস্তান বানানোর উদ্দেশ্যে।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডকে জায়েজ করতে খন্দকার মোশতাক তার ভাষণে বলেছেন, ‘দেশের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন সর্বমহলের কাম্য হওয়া সত্ত্বেও বিধান অনুযায়ী তা সম্ভব না হওয়ায় সরকার পরিবর্তনের জন্য সামরিক বাহিনীকে এগিয়ে আসতে হয়েছে। সশস্ত্রবাহিনী পরমতম নিষ্ঠার সঙ্গে তাদের দায়িত্ব সম্পন্ন করে দেশবাসীর সামনে সম্ভাবনার এক স্বর্ণদ্বার উন্মোচন করেছে।’

এখানে আমিন আহমেদ চৌধুরীর বিবিসি বাংলাকে দেয়া সেই সাক্ষাতকারটিকে আবার মনে করিয়ে দেয়। তিনি মারা যাওয়ার আগে ওই সাক্ষাতকারে জানিয়ে গেছেন, সেনানিবাসের দুটি ব্যাটালিয়ন এ অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত থাকলেও পুরো সেনাবাহিনী সেটার পক্ষে ছিল না। কিন্তু খন্দকার মোশতাক তার প্রথম বেতার ভাষণে বঙ্গবন্ধু হত্যা এবং ক্ষমতার পরিবর্তনের পুরো কৃতিত্ব দিয়েছেন সামরিক বাহিনীকে। বলেছেন, ‘— বিধান অনুযায়ী তা সম্ভব না হওয়ায় সরকার পরিবর্তনের জন্য সামরিক বাহিনীকে এগিয়ে আসতে হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনী পরমতম নিষ্ঠার সঙ্গে তাদের দায়িত্ব সম্পন্ন করে দেশবাসীর সামনে সম্ভাবনার এক স্বর্ণদ্বার উন্মোচন করেছে।’ তাহলে এই ভাষণ থেকে কি প্রশ্ন বেরিয়ে আসে? এ বিষয়টিও পরিষ্কার করার জন্য সঠিক তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার একাধিক সাক্ষীর সাক্ষ্য ও আসামির জবানবন্দী থেকে জানা গেছে, পঁচাত্তরের মাঝামাঝি মোশতাকের ষড়যন্ত্র শুরু হয়। তিনি নিজে ও আত্মীয়দের মাধ্যমে সেনা সদস্যদের নিয়ে জাতির পিতাকে হত্যার পরিকল্পনা করতে থাকেন। এ সময় তিনি গাজীপুর, কুমিল্লাসহ ঢাকায় সহযোগীদের নিয়ে একাধিক বৈঠকও করেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যার আসামি তাহের উদ্দিন ঠাকুরও তার জবানবন্দীতে বলেছেন, ১৯৭৫ সালের মে বা জুনের প্রথম দিকে গাজীপুরের সালনা হাইস্কুলে ঢাকা বিভাগীয় স্বনির্ভর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আমিও সেখানে উপস্থিত ছিলাম। সালনাতে মোশতাক সাহেব সেনা অফিসারদের জিজ্ঞাসা করেন, ‘তোমাদের আন্দোলনের অবস্থা কি?’ জবাবে তারা জানান, ‘বস সবকিছুর ব্যবস্থা নিচ্ছেন। আমরা তার প্রতিনিধি।’ ১৯৭৫ সালের জুনে দাউদকান্দি মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সেনা অফিসারদের মধ্যে মেজর রশীদ, মেজর বজলুল হুদা, মেজর শাহরিয়ার, মেজর ফারুক যোগদান করেন।

তাহের উদ্দিন ঠাকুর ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট সচিবালয়ে তার অফিসে গেলে খন্দকার মোশতাক বলেন, ‘এ সপ্তাহে ব্রিগেডিয়ার জিয়া দুইবার এসেছিলেন। তিনি এবং তার লোকেরা তাড়াতাড়ি কিছু একটা করার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছেন।’ আমি জিজ্ঞাসা করায় খন্দকার মোশতাক জানান, ‘বলপূর্বক মত বদলাতে চায়, প্রয়োজনবোধে যে কোন কাজ করতে প্রস্তুত।’ খন্দকার মোশতাককে জিজ্ঞাসা করায় তিনি জানান, তিনি তার মতামত দিয়েছেন। কারণ, এছাড়া অন্য আর কাজ কিছু নাই। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সকাল অনুমান ৬টার সময় খাদ্যমন্ত্রী টেলিফোনে আমার কাছে জানতে চান যে, ‘গুলির আওয়াজ শুনেছি কিনা।’ আমি না বলে জানাই। পরে আমাকে পুনরায় টেলিফোনে রেডিও শুনতে বলেন। রেডিওতে শুনি মেজর ডালিমের ঘোষণা, ‘শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে।’ বুঝলাম, তাদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর হত্যার মূল পরিকল্পনায় যে মোশতাক ছিলেন, তা আরও স্পষ্ট হয় ’৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এই বর্বরোচিত হত্যাকান্ডের পরপরই। ওইদিনই মোশতাক নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন এবং বঙ্গবন্ধুর খুনীদের সূর্যসন্তান বলে আখ্যায়িত করেন। ক্ষমতায় বসে ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর এ হত্যাকান্ডের বিচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে মোশতাক ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) অধ্যাদেশ জারি, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগান চালু করেন। তার শাসনামলেই চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মোঃ মনসুর আলী ও এএইচএম কামরুজ্জামানকে ৩ নবেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয়। কারাবন্দী করা হয় আওয়ামী লীগের শত শত নেতাকর্মীকে। অবশ্য এত কিছুর পরও ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেননি মোশতাক। ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র ৮৩ দিনের মাথায় ১৯৭৫ সালের ৫ নবেম্বর খালেদ মোশাররফের পাল্টা অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন তিনি। ৬ নবেম্বর ১৯৭৫ সালে তাকে বন্দী করা হয়। জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা গ্রহণের পর মোশতাক প্রথমে বন্দী থাকলেও ১৯৭৬ সালে তাকে মুক্তি দেয়া হয়। মুক্ত হয়ে ডেমোক্র্যাটিক লীগ নামে নতুন রাজনৈতিক দল গড়তে গিয়ে ব্যর্থ হন। পরে সামরিক শাসককে অপসারণের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগে তাকে আবারও গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে দুটি দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়। আদালত তাকে পাঁচ বছরের শাস্তি প্রদান করেন। জেল থেকে মুক্তিলাভের পর তিনি সক্রিয় রাজনীতি শুরু করেন। তবে রাজনীতিতে আর সফলতা পাননি। হত্যাকান্ডের ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত সহকারী আ. ফ. ম. মুহিতুল ইসলাম ধানমন্ডি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। কিন্তু এর আগেই ওই বছরের ৫ মার্চ মোশতাক মৃত্যুবরণ করেন। ফলে হত্যার দায় থেকে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান তিনি।

আসলে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচার থেকে এই জঘন্য হত্যাকান্ডের পেছনের কুশীলব কারা ছিল, হত্যাকান্ডের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কি ছিল তা বিচারের রায়ে না হোক, অন্তত রায়ের পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বের করে আনা উচিত ছিল। মৃত ব্যক্তিদের নাম মামলা থেকে বাদ দিলেও মামলার পর্যবেক্ষণের জন্য মামলার সঙ্গে রাখা দরকার ছিল। এ প্রসঙ্গে অবশ্য মামলাটির তদন্তের সমন্বয়কারী আব্দুল হান্নান বলেছেন, ‘আমরা অনেকের নামই হাজির করেছিলাম। কিন্তু আদালত হত্যায় জড়িত সেনাসদস্যদের বিষয়ে মনোযোগ দিয়েছিল।’ খন্দকার মোশতাকের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, হত্যাকাণ্ডের স্থানে তিনি উপস্থিত না থাকলেও এই হত্যা এবং হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী বিষয়াদির সুবিধা সবটাই তিনি নিয়েছেন এবং এর একটি অংশ হিসেবে তার দায় আছে।

লেখক : সাংবাদিক, দৈনিক জনকণ্ঠ





সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরও সংবাদ





ebarta24.com © All rights reserved. 2021