শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২০, ০৬:০২ অপরাহ্ন

শেখ হাসিনা: রাষ্ট্রনায়ক থেকে বিশ্বনেতা

ইবার্তা ডেস্ক
আপডেট : মঙ্গলবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

জন্মদিনের আনন্দময় দিনে প্রধানমন্ত্রী এখন ওয়াশিংটনে। লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমাহীন নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। তাই জন্মদিনের অনুষ্ঠানের সব আনুষ্ঠানিকতা পরিহার করছেন তিনি। আজ তার ৭১তম জন্মদিন। ১৯৪৭ সালের এই দিনে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ ফজিলাতুম্নেছা মুজিবের প্রথম সন্তান শেখ হাসিনা। রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হিসেবে ছাত্রজীবনেই প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
থেকে গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি পাওয়া শেখ হাসিনা ষাটের দশকে ছাত্রলীগের অন্যতম নেত্রী ছিলেন।

১৯৯৬ সালে প্রথম দফায় প্রধানমন্ত্রিত্বের সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি ও গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি করে শেখ হাসিনা নিজের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সুসংহত প্রকাশ ঘটান। দেশবাসী যেমন, তেমনি আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোও ক্রমাল্প্বয়ে তার ওপর আস্থাশীল হয়ে ওঠে। দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ তেল-গ্যাসকে জনগণের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে বিদেশের হাতে তুলে দিতে রাজি হননি তিনি। আবার তার সময়েই দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে। এ দেশের মানুষের সাংস্কৃতিক আবেগ জড়িয়ে আছে যে একুশের সঙ্গে, তার সময়েই সেই একুশে ফেব্রুয়ারি বা ভাষা দিবস আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গৌরব অর্জন করে। ২০১৫ সালের ৭ মে বাংলাদেশ-ভারত স্থলসীমান্ত চুক্তির মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের ছিটমহলগুলোকে মূল ভূখন্ডের সঙ্গে যুক্ত করে ৪৪ বছর ধরে অপেক্ষমাণ ছিটমহলবাসীর দুঃখের অবসান ঘটান; ভারত বিভক্তির পর দীর্ঘ ৬৮ বছর ধরে ঝুলে থাকা সমস্যার সমাধান করেন। রাষ্ট্রনায়কোচিত এসব পদক্ষেপ ও সাফল্য তাকে জনগণের আরও কাছে নিয়ে গিয়েছে, বিশ্বনেতৃত্বের পরিসরে বাংলাদেশকেও যুক্ত করেছে।

চলমান আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী আন্দোলনে শেখ হাসিনা এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। শুধু তাই নয়, জলবায়ু পরিবর্তনকে নিরাপত্তার অন্যতম হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে বিশ্বনেতাদেরও সেদিকে মনোযোগী করে তোলার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা তাকে বিশ্বনেতৃত্বের ধারায় নিয়ে গেছে। বর্তমানে নির্যাতিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ব্যাপারে মানবিক ও আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রনায়কোচিত পদক্ষেপ নিয়ে তিনি বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার অনন্য পথিৃকৎ হয়ে উঠেছেন। বাংলাদেশে বর্তমানে তার নেতৃত্বাধীন সরকার ২০২১ সালের মধ্যে ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত ও মধ্যম আয়ের আধুনিক ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উম্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য পূরণে নিয়োজিত আছে।

ক্রান্তিকালে হাল ধরেন তিনি :১৯৭৫ সালের আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশকে উল্টোপথে নিয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা শুরু করে দেশি-বিদেশি অপশক্তি। দেশ ও দলের এ দুঃসময়ে ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রধানের দায়িত্ব নেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। এরপর গত ৩৪ বছর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও আপসহীন নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে তিনি শুধু দলের নয়, পুরো দেশের গণতান্ত্রিক-অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির মূল স্রোতধারার প্রধান নেতা হয়ে উঠেছেন।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এবং বিভিম্ন রাজনৈতিক জোট ও দল প্রায় এক দশক সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলন চালিয়ে ১৯৯০ সালে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে বিজয়ী হয়। ১৯৯৬ সালে তার নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চার ক্ষেত্রে দেশকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেন তিনি। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শাসনামলে প্রধান বিরোধী দলের নেতা হিসেবে তার নেতৃত্বে অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর সমল্প্বয়ে প্রথমে ১৪ দলীয় জোট ও পরে মহাঐক্যজোট গড়ে ওঠে। ২০০৭ সালে রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২২ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন করার প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয় তার নেতৃত্বাধীন এই মহাঐক্যজোট।
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি হওয়ার পর ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ওই বছরের ১৬ জুলাই কথিত চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির মামলায় গ্রেফতার করে শেখ হাসিনাকে। সংসদ ভবন চত্বরের বিশেষ কারাগারে দীর্ঘ প্রায় ১১ মাস কারাবন্দি ছিলেন তিনি। গণতান্ত্রিক আন্দোলন করতে গিয়ে এর আগেও কয়েক দফা গৃহবন্দি হন তিনি। বঙ্গবন্ধুর মতো তিনিও দেশ-জাতির স্বার্থের বাইরে না গিয়ে বারবার কারা ও গৃহবন্দিত্বকেই বেছে নিয়েছেন।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠাই তার লক্ষ্য :শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এ পর্যন্ত তিন মেয়াদে সরকার গঠন করেছে। ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন তার নেতৃত্বে দীর্ঘ ২১ বছর পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ। এর আগে ১২ জুনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হন তিনি। নতুন প্রজন্মের সামনে দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে দীর্ঘ দুই দশক ধরে কত অপপ্রচার চালানো হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে, কীভাবে ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসকে। এরপর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের ঐতিহাসিক নির্বাচনে চার-তৃতীয়াংশ আসনে বিশাল বিজয় অর্জন করে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার গঠিত হয়। দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ের পর ১২ জানুয়ারি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দ্বিতীয় মেয়াদের মহাজোট সরকার গঠিত হয়। এ ছাড়া ১৯৮৬ সালের তৃতীয়, ১৯৯১ সালের পঞ্চম ও ২০০১ সালের অষ্টম সংসদে, অর্থাৎ মোট তিন দফায় বিরোধী দলের নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। প্রতিবারই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সরকার পরিচালনা ও নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। এসব কারণে রাষ্ট্র ও গণতন্ত্রবিরোধী, শান্তি ও অসাম্প্রদায়িকতাবিরোধী অপশক্তি এ পর্যন্ত কমপক্ষে ১৯ বার তাকে হত্যার অপচেষ্টা চালিয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা।

পেয়েছেন বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি :এ অঞ্চলে গণতন্ত্র, শান্তি ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং নারীশিক্ষার বিস্তার, শিশুমৃতু্যর হার হ্রাস ও দারিদ্র্য বিমোচনের সংগ্রামে অসামান্য ভূমিকা রাখার স্বীকৃতি হিসেবে দেশি-বিদেশি অনেক পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছেন শেখ হাসিনা। পরিবেশ সংরক্ষণে অসামান্য অবদানের জন্য ২০১৫ সালে জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ‘চ্যাম্পিয়নস অব দি আর্থ’ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। এ ছাড়া তিনি সাউথ-সাউথ ভিশনারি পুরস্কার-২০১৪, শান্তি বৃক্ষ-২০১৪, জাতিসংঘ পুরস্কার-২০১৩ ও ২০১০, রোটারি শান্তি পুরস্কার-২০১৩, গোভি পুরস্কার-২০১২, সাউথ-সাউথ পুরস্কার-২০১১, ইন্দিরা গান্ধী শান্তি পুরস্কার-২০১০, পার্ল এস. বার্ক পুরস্কার-২০০০, সিইআরইএস মেডেল-১৯৯৯, এম কে গান্ধী পুরস্কার-১৯৯৮, মাদার তেরেসা শান্তি পুরস্কার-১৯৯৮, ইউনেস্কোর ফেলিক্স হোফুয়েট-বোয়েগনি শান্তি পুরস্কার-১৯৯৮ প্রভৃতি পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছেন।


আরও সংবাদ