রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৭:১৩ অপরাহ্ন

বঙ্গবন্ধু, জয়বাংলা ও ভুঁইফোঁড় সংগঠন

ইবার্তা ডেস্ক
আপডেট : রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সাজ্জাদ কাদির: ক’দিন আগে ‘বঙ্গলীগ’ নামে একটি রাজনৈতিক দলের কথা জানলাম পত্রিকা মারফত। জানা যায় ২০১৫ সালে ‘বাংলাদেশ জাতীয় বঙ্গলীগ’ নামে এই দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। নির্বাচন কমিশনে বর্তমানে নিবন্ধিত ৪১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে এই দলের নাম নেই। বঙ্গলীগ নামে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ অনুমোদিত কোন অঙ্গসংগঠনও নেই বলে জানা যায় দলীয় সূত্র থেকে। বিস্তারিত অনুসন্ধানে জানা যায় যে লীগ শব্দটি যুক্ত করে সাধারণ মানুষের নিকট বিভ্রান্তি তৈরি ও প্রতারণার উদ্দেশ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে এমন একটি ভুঁইফোঁড় রাজনৈতিক দল। এর প্রতিষ্ঠাতা একজন প্রতারক। একসময় মানুষের বাসায় গৃহকর্মী এবং সেনাসদস্য (চাকরিচ্যুত) হিসেবে কাজ করে নানা অনৈতিক কর্মের মাধ্যমে রাজধানী ঢাকা এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে অঢেল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। সেনাবাহিনী থেকে অসদাচরণের দায়ে চাকরিচ্যুত এই ব্যক্তি নিজেকে (অব.) মেজর পরিচয় দিয়ে দেদার প্রতারণা করে বেড়াতেন। তার প্রতারণার সর্বশেষ ধাপ ছিল এই বঙ্গলীগ। যে বঙ্গলীগের প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল চাঁদাবাজি, প্রতারণা ও ক্ষমতার দাপট দেখানো। সর্বশেষ একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নিকট চাঁদাবাজির অভিযোগে বঙ্গলীগ সভাপতি এখন কারাগারে।

দেশের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর আবেগের শব্দ বঙ্গবন্ধু, জয় বাংলা এবং লীগ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই আবেগের শব্দগুলো ব্যবহার করে দেশে অনিয়মের লঙ্কাকাণ্ড বাধিয়ে দেওয়া হয়েছে। আবেগকে পুঁজি করে সমানে বিবেক বর্জিত কাজ করে চলেছে এক শ্রেণীর স্বার্থান্বেষী মহল। অথচ ভাবতেও অবাক লাগে ’৭৫ পরবর্তী একটি দীর্ঘ সময় এই দেশেই এই শব্দগুলো নিষিদ্ধ ছিল। কোন সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে তো দূরের কথা ত্যাগী আওয়ামী লীগ নেতা ছাড়া কারও মুখেও উচ্চারিত হতো না এগুলো। অনেক ক্ষেত্রেই উচ্চারণ করতে দেয়া হতো না। এমনকি নাটক, সিনেমা, শিল্প, সাহিত্য থেকেও শব্দগুলো নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। সাহস করে যদি কেউ তাদের সৃজনশীল কর্মে এই শব্দগুলো ব্যবহার করতেনও তাহলেও নানারূপ হয়রানির খড়গ নেমে আসত। সিনেমা বা নাটক হলে বঙ্গবন্ধু, জয়বাংলা এবং লীগ শব্দ কর্তন না করে সেন্সর ছাড়পত্র পেত না বা প্রচারের মুখ দেখত না। আবার সাহিত্য কর্ম হলেও শব্দগুলো বাদ দেওয়ার জন্য জোরালো চাপ দেয়া হতো।

এই তিনিটি শব্দের সঙ্গেই এদেশের অস্তিত্ব মিশে আছে। যার নামের সাথে বঙ্গবন্ধু উপাধি ব্যবহার করা হয়েছে সেই তিনি ছিলেন হাজার বছরের এক শ্রেষ্ঠ বাঙালী এবং প্রচণ্ড এক পরাক্রমশালী নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। যার পাহাড়সম নেতৃত্বে এই দেশটির জন্ম হয়েছিল। সেই তাঁকে দেয়া উপাধি উচ্চারণ করা যেত না তারই দেশে।

দলমত নির্বিশেষে জয় বাংলা আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের এক প্রচণ্ড শক্তিশালী স্লোগান। যে স্লোগান শত্রুর ভিত কাঁপিয়ে দিত। সেই স্লোগান সর্বসাধারণ উচ্চারণ করতে পারত না দীর্ঘ সময়। সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে বলা হতো জয় বাংলা দলীয় স্লোগান। ’৭১-এ যদি দলমতের উর্ধে উঠে একটি স্লোগানকে জাতীয়ভাবে ধারণ করা যায় তাহলে ক’বছর যেতে না যেতেই সেটিকে কেন দলীয় স্লোগান বলে ত্যাগ করতে হবে? বিভেদ সৃষ্টির জন্য তাই করা হয়েছিল এই দেশে। আজকে দেশে এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে জয় বাংলাকে জাতীয় স্লোগান করতে হাইকোর্ট থেকে আদেশ জারি করতে হয়।

লীগ শব্দটি জড়িয়ে আছে এদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে দেশটিকে স্বাধীন করা রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছর পরেই আওয়ামী লীগকে স্বাধীনতা বিরোধীদের নিয়ে গঠিত নব্য রাজনৈতিক দলগুলো খানিকটা পরিত্যাক্ত দলের কাতারে ফেলে দেয়। আওয়ামী লীগ নেতা কর্মী এবং তাদের পরিবার পরিজনের ওপর এমন নির্যাতনের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল যে ভয়ে নতুন করে কেউ আওয়ামী লীগ করতে চাইত না। একটা সময় এমন হয়েছিল যে অনেক জেলা উপজেলাতেই আওয়মী লীগ করার লোক খুঁজে পাওয়া যেত না। মিছিল মিটিং করারও লোক পাওয়া যেত না। এমনকি আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ সংগঠনের কমিটি করার মত লোক পাওয়া যেত না জেলা উপজেলায়।

আওয়ামী লীগ আজ প্রায় একযুগ রাষ্ট্রক্ষমতায়। এই এক যুগে বহু ভালো কাজ করেছে যা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দলের নাম ভাঙিয়ে যেভাবে অন্যায় করা হচ্ছে তা সব অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে। এই অন্যায় কারা করছে? এটি নিশ্চিত করে বলা যায় প্রকৃত ত্যাগী আওয়ামী লীগ নেতারা দেশবিরোধী কোন কাজ করতে পারে না। সাম্প্রতিক সময়ের কিছু ঘটনা তাই প্রমাণ করে। যেমন রিজেন্ট কাণ্ডের শাহেদ আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল। আবার কথিত বঙ্গলীগ প্রতিষ্ঠাতাও একজন প্রতারক। লীগ শব্দ ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের আবেগকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে। এভাবেই জাতীয় পর্যায় থেকে শুরু করে আঞ্চলিক পর্যায় পর্যন্ত এই সব অনুপ্রবেশকারীদের তাণ্ডবে প্রকৃত আওয়ামী লীগ নেতারা এখন কোণঠাসা। দলীয় পদ-পদবী, সুযোগ-সুবিধার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ উপভোগ করছে এই অনুপ্রবেশকারীরাই। অথচ রোদ, বৃষ্টি, ঝড়-ঝঞ্জা, মিথ্যা হয়রানিমূলক মামলা, হামলা মাথায় নিয়ে একসময় আন্দোলন সংগ্রামের সামনে থাকা বহু ত্যাগী নেতাকে এখন আর পাওয়া যায় না। ভুঁইফোঁড়দের তাণ্ডবে তারা এখন সামনে আসতে অনেক ক্ষেত্রেই বিব্রত বোধ করে। এই ভুঁইফোঁড়রাই একসময় আওয়ামী লীগ, জয়বাংলা কিংবা বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করতে দেয়নি। আবার এখন অন্য কোন রাজনৈতিক দলের নাম উচ্চারণ হয় না সেটিও এদের কারণেই। যা সামগ্রিক রাজনীতির জন্য; গণতন্ত্রের জন্য মোটেই সুখকর নয়। যেন রাজনীতির এক দমবন্ধ অবস্থা বিরাজমান। একটি দেশে ভিন্ন মত; ভিন্ন রাজনীতি অবশ্যই থাকতে হবে। নইলে বুঝে ওঠা কঠিন সরকার আসলে সঠিক নাকি ভুল পথে আছে। এখন এমন অবস্থা যেদিকে তাকানো যায় সেদিকেই শুধু আওয়ামী লীগ আর আওয়ামী লীগ। সারাদেশে বিএনপির এক বিশাল অংশ আওয়ামী লীগ হয়ে গেছে সেই কবে। এমনকি কট্টর আওয়ামীবিরোধী শত শত জামায়াত শিবির করা বিশাল জনগোষ্ঠীও এখন খোলস পাল্টিয়ে সাময়িকভাবে আওয়ামী লেবাস ধারণ করেছে। সময় মতো আবারও খোলস পাল্টিয়ে ছোবল বসাবে এরা।

আজ এই ভুঁইফোঁড়রাই সামনে এসে এত বেশি শাসক দলের বন্দনা উচ্চারণ করে যার কারণে মানুষের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে বিরক্তির কারণ ঘটিয়ে দিচ্ছে। বাস্তব অবস্থা এমন যে যত বেশি অন্তর থেকে আওয়ামী বিরোধী সে তত জোরে এখন আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু ও জয় বাংলা স্লোগান উচ্চারণ করে। সেদিন ফেসবুকে দেখলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাবেক শিবিরি কর্মীর স্ট্যাটাস যে কিনা নিজেই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজাকারের আদর্শের রাজনীতি করে এসেছে সে আর একজনকে রাজাকারের বাচ্চা বলে গালি দিচ্ছে। ১৫ আগস্টের শোক দিবসের দিন দেখলাম একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের রাজনীতিতে যুক্ত থাকা লোকটিও ফেসবুকে শোক প্রকাশ করছে। এখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও বঙ্গবন্ধু, লীগ ও জয় বাংলা স্লোগান ব্যবহার করে সংগঠন গড়ে উঠছে অথবা গড়বার নতুন নতুন পরিকল্পনা হচ্ছে। অবস্থা বিশ্লেষণ করে একথা নিশ্চিত করে বলা যায় যে এগুলোর ৯০% উদ্দেশ্য অসৎ।

আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে যে এই মুহূর্তে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী? আমি নির্দ্বিধায় বলব, দলের ভিতরে বাইরে দাপিয়ে বেড়ানো এই সমস্ত দুর্বৃত্তকে দমন করতে হবে। এদের দমন করতে না পারলে দল আওয়ামী লীগ এবং সরকারের ভবিষ্যত খারাপ হতে বাধ্য। মনে রাখতে হবে নজরুলের অমর বাণী, ‘চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়।/আজিকে যে রাজাধিরাজ কাল সে ভিক্ষা চায়।’ এই মুহূর্তে হয়ত আমাদের দৃষ্টিসীমার বাহিরে আছে এমন কোন ঝড় এসে উড়িয়ে নিয়ে যাবে যা আমরা কল্পনাও করতে পারছি না এখন। বিগত একযুগে দেশের নানা ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ উন্নয়নের চেষ্টা করে গেছে এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। কোন ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় সাফল্যও পেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নতুন প্রজন্মকে ফিরিয়ে আনতে ব্যাপক চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুর্বৃত্তদের নানা অনাচারের মধ্যেও বৈশ্বিক দুর্যোগ করোনা মোকাবেলায় এবং দেশের অর্থনীতির গতি স্বাভাবিক রাখতে সরকার অনেক ক্ষেত্রেই সফল হয়েছে। কিন্তু দেশের মানুষের মতামতটা নিয়ে একটু গবেষণা করে দেখুন, দেখবেন মানুষ এই দুর্বৃত্তদের অত্যাচারে চরম অখুশি। কাজেই দেশের মানুষকে শান্তি দিতে এবং মন জয় করতে হলে এই সমস্ত দুর্বৃত্তকে দমন করতেই। আর সবার আগে নামের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু, জয়বাংলা ও লীগ যুক্ত করা ভুঁইফোঁড় সংগঠন বন্ধ করতেই হবে। বাঁচতে হলে এছাড়া আর কোন বিকল্প পথ খোলা নেই।

লেখক : গণমাধ্যম কমী


আরও সংবাদ