রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৭:৪৩ অপরাহ্ন

মুজিববর্ষে প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা

ইবার্তা ডেস্ক
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২০

মোঃ শফিকুল ইসলাম

‘১৯৫০ সালের শেষ দিকের কথা, তখন খুলনা জেলার সিভিল সার্জন মোহাম্মদ হোসেন জেলা এক্স অফিস ইউ সুপারিনটেনডেন্ট। তিনি জেল পরিদর্শন করতে এসে আমার কথা শুনে আমাকে অফিসে নিয়ে যেতে বললেন। আমি গিয়ে দেখি তিনি বসে আছেন। আমাকে বসতে বললেন তার কাছে। আমি বসবার সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি কেন জেল খাটছেন?’ ‘আমি উত্তর দিলাম, ক্ষমতা দখল করার জন্য’। তিনি আমার মুখের দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে রইলেন! তারপর বললেন, ‘ক্ষমতা দখল করে কি করবেন?’ বললাম, ‘যদি পারি দেশের জনগণের জন্য কিছু করব’। তিনি আমাকে বললেন, বহুদিন জেলের সঙ্গে আমার সম্পর্ক রয়েছে। অনেক রাজবন্দীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে। অনেকের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। এভাবে কেউ উত্তর দেয়নি, যেভাবে আপনি উত্তর দিলেন। সকলের একই কথা, জনগণের জন্য জেল খাটছি। দেশের খেদমত করছি, অত্যাচার সহ্য করতে পারছি না বলে প্রতিবাদ করছি, তাই জেলে এসেছি। কিন্তু আপনি সোজা কথা বললেন, তাই আপনাকে ধন্যবাদ দিলাম।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী পৃষ্ঠা-১৮৫)

কথাগুলো বলেছিলেন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যিনি ক্ষমতা দখল বলতে বুঝিয়েছেন নিপীড়িত ও শোষিত মানুষের অধিকার আদায় এবং পাকিস্তানীদের শোষণ ও নিপীড়ন থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাওয়া এবং তারই লক্ষ্যে বাঙালীকে উৎসাহিত করা। অত্যন্ত স্পষ্টভাষী ও সুদূরপ্রসারী চিন্তার মহান পুরুষ এবং বিশ্বমানচিত্রে বাংলাদেশ নামের দেশটির স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ। বীর পুরুষ ও অবিসংবাদিত নেতা, আমাদের জাতির জনকের জন্মশতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে ১৭ মার্চ ২০২০ থেকে ১৭ মার্চ ২০২১ পর্যন্ত মুজিববর্ষ হিসেবে ঘোষণা করে সরকার।

মুজিববর্ষ ঘিরে ২৯৬টি পরিকল্পনা সংবলিত একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য মহামারী করোনায় আমরা পরিকল্পনা অনুযায়ী মুজিববর্ষ পালন করতে পারছি না। তারপরও সকল নাগরিক ও সব প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্যবিধি অনুসারে মুজিববর্ষ পালন করে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু কন্যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশেও পালিত হচ্ছে মুজিববর্ষ। আমরা তাঁকে স্মরণ করছি এবং সারা বিশ্ব তাঁকে মনে করছে যা তরুণ প্রজন্মকে জাতির পিতা সম্পর্কে জানতে সহায়তা করবে। বাংলাদেশ নামটি জাতির পিতা ছাড়া ভাবাও যায় না। বঙ্গবন্ধুর চেতনা, আদর্শ ও পরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে সারা বিশ্বে উন্নয়নের মডেল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

সমতার নীতি অনুসারে প্রত্যন্ত গ্রামে-গঞ্জে উন্নয়ন পৌঁছে দিতে দেশের প্রথম মুজিবনগর সরকারের ১৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে উন্নতি হয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের ৩৯টি মন্ত্রণালয় ও ২৫টি বিভাগ বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিনির্মাণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। যে কারণে আজ বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৮তম অর্থনীতিক শক্তিশালী দেশ। বিগত ১০ বছরে বাংলাদেশে বিপুল উন্নয়ন কাজ সাধিত হয়েছে, যদিও করোনায় কিছুটা বিঘœ সৃষ্টি করছে। প্রধানমন্ত্রীর দক্ষ এবং সুচিন্তিত পরিকল্পনায় আমরা তা কাঠিয়ে উঠতে সক্ষম হব নিশ্চয়ই। যদি সার্বিক উন্নয়ন বিশ্লেষণ করি, আমরা দেখতে পাই অনগ্রসর এবং কম উন্নত এলাকা ও জনগোষ্ঠীকে শনাক্ত করে বর্তমান সরকার নিচ্ছে নানামুখী পদক্ষেপ এবং অনেক মেগা প্রকল্প। মুজিববর্ষকে স্বাগত জানাতে আইসিটি খাতে আমাদের লক্ষণীয় অর্জন সরকারী অফিস আদালতে ই-গভর্নেন্স প্রতিষ্ঠা। ২৫টি মন্ত্রণালয়ের ৯০ শতাংশ কাজ এই ইলেকট্রনিক ব্যবস্থাপনায় সম্পন্ন হচ্ছে। এছাড়াও জ্বালানি, বিদ্যুত, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যোগাযোগ ও শিক্ষা খাতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী মুজিববর্ষে শতভাগ বিদ্যুত নিশ্চিত করতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত প্রকল্পের কাজ চলমান। ২০২৩ সালে প্রকল্পটি থেকে বিদ্যুত উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। প্রকল্প থেকে সময়মতো বিদ্যুত উৎপাদনের লক্ষ্যে বহির্বিশ্বের আটটি দেশের প্রায় তিন হাজার মানুষ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। সঙ্গে আমাদের দেশের অনেক লোকও কাজ করছেন।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যোগাযোগ নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করতে এশিয়ান হাইওয়ে নির্মাণ পরিকল্পনা এবং ঢাকা থেকে বিভিন্ন বিভাগে যাতায়াতের জন্য চার লেন মহাসড়ক নির্মাণ পরিকল্পনা। দেশের দক্ষিণ অঞ্চলকে সমহারে উন্নয়নের লক্ষ্যে অর্থনীতিক ও বাণিজ্যিক কর্মকা- সম্প্রসারণ করে জিডিপি বৃদ্ধি করতে নির্মাণ কাজ চলেছে কর্ণফুলী টানেল এবং পদ্মা বহুমুখী সেতুর। শিক্ষাকে জাতীয়করণ, জাতীয় স্বাস্থ্য নীতিমালা ২০১১ বাস্তবায়নে নারী ও শিশু মৃত্যু হার হ্রাস, রাজধানীকে যানযট নিরসনে মেট্রোরেল প্রকল্প, ৪জি প্রযুক্তি চালু ইত্যাদি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের স্থপতির জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপনে আমাদের জন্য বিশাল সাফল্য ও প্রাপ্তি।

মুজিববর্ষ উদযাপনের অংশ হিসেবে সারাদেশে এক কোটি চারা বিতরণ ও রোপণ কর্মসূচীর সিদ্ধান্তটি প্রশংসনীয়। কারণ দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করতে বৃক্ষরোপণের কোন বিকল্প নেই। সারাদেশে এক কোটি চারা বিতরণ ও রোপণ কর্মসূচীটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজে বৃক্ষরোপণ করে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচীর উদ্বোধন করেছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৪ সাল থেকে প্রতি বছর পহেলা আষাঢ় আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন কৃষক লীগ আনুষ্ঠানিকভাবে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচী পালন করে আসছে। এবার মুজিববর্ষ উপলক্ষে বিশেষভাবে এই কর্মসূচীটি পালিত হচ্ছে। বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রত্যেক নাগরিকই এই কর্মসূচী যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করবেন।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দূরবস্থা থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হচ্ছে দেশ। কিন্তু সরকারের রূপকল্প ২০২১ অর্জন এবং মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির জন্য আরও কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। প্রথমত, শিক্ষাখাতে বাজেট বৃদ্ধি করাসহ শিক্ষাকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে ভবিষ্যতের বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। কারণ গুণগত শিক্ষা ও গবেষণা ছাড়া দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এছাড়াও প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি করা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আলাদা বেতন কাঠামো নির্ধারণ প্রসঙ্গে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলে মনে করি। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স নীতি সঠিকভাবে কার্যকর করা এবং রাষ্ট্রের সকল বিভাগে জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, সকল অন্যায় ও অপরাধের যথাযথ বিচার নিশ্চিত করা। কারণ শিক্ষক, চিকিৎসক, সরকারী কর্মকর্তা এবং সাধারণ নাগরিক বিভিন্নভাবে অত্যাচার ও নির্যাতনের সম্মুখীন হচ্ছে, যা কনভাবেই কাম্য নয়। চতুর্থত, শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে কৃষি ও খাদ্যে উৎপাদনমুখী নানা পরিকল্পনা এবং আমদানি, রফতানি গ্যাপ কমিয়ে নিয়ে আসতে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ। পঞ্চমত, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বেকারত্ব দূরীকরণে শিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি করতে কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদানসহ সহজ শর্তে ঋণ প্রদান এবং ঋণ পরিশোধ প্রক্রিয়া সহজকরণ। ষষ্ঠ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যত অঙ্গসংগঠন রয়েছে সেগুলো গতিশীল করা। তার জন্য যে পদক্ষেপ নিলে দল শক্তিশালী হবে সে বিষয়ে নজর দিতে হবে। সপ্তম, মাদক, নারী নির্যাতন এবং ধর্ষণ বন্ধে শক্তিশালী পদক্ষেপ নেয়া ইত্যাদি।

মুজিবশতবর্ষ উদযাপনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর জীবন, আদর্শ ও কর্ম থেকে শিক্ষা নিয়ে তা যদি দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানো যায়, তবে তাই হবে বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা ও স্মরণ করার শ্রেষ্ঠ উপায়। জাতির জনকের উক্তি দিয়ে শেষ করতে চাই ‘এই স্বাধীন দেশে মানুষ যখন পেট ভরে খেতে পারবে, পাবে মর্যাদাপূর্ণ জীবন, তখনই শুধু লাখো শহীদের আত্মা তৃপ্তি পাবে।’

লেখক : শিক্ষক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

[email protected]


আরও সংবাদ